মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৭. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩৭৮
নামাযের অধ্যায়
(৩) অধ্যায়ঃ অন্ধ ও শিশুর ইমামতি এবং নারীদের জন্য নারীদের ইমামতি প্রসঙ্গ
(১৩৭৪) আমর ইবন সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, গ্রামেই আমরা স্থায়ী বসবাস করতাম। কিছু আরোহী, কোন কোন বর্ণনায় আছে, কিছু মানুষ রাসুল (ﷺ)-এর দরবার থেকে ফিরে আমাদের পাশ দিয়ে যেত, আমি তাদের কাছে যেতাম, তাদের কাছ থেকে শুনে শুনে আলকুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। আর তখন মানুষেরা তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য মক্কা বিজয়ের অপেক্ষা করছিল। অতঃপর যখন মক্কা বিজয় হয়ে গেল তখন কোন লোক আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর দরবারে আসতো, এসে বলতো, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ), আমি অমুক গোত্রের প্রতিনিধি। উক্ত গোত্রের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। (রাবী বলেন) আমার পিতা তাঁর গোত্রের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ নিয়ে গেলেন এবং তাদের নিকটে ফিরে এসে বললেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন যে, তোমাদের যার কাছে বেশী কুরআন আছে তাকে সামনে পাঠাও (ইমাম বানাও)। তারা দৃষ্টিপাত করলো। তখন আমি ঘন বসতি বস্তির মাঝেই ছিলাম। তারা দেখল যে, আমাদের বিরাট জনগোষ্ঠীর মাঝে আমার চেয়ে বেশী কুরআন জানে এমন কাউকে পেল না, ফলে তারা আমাকেই ইমাম বানিয়ে সামনে পাঠালো। অথচ আমি তখন ছোট। বালক। আমি তাদের সালাত পড়িয়ে দিলাম এ অবস্থায় আমার গায়ে ছিল একটি মাত্র চাদর। সেজন্য আমি যখন রুকু করছিলাম সিজদা করছিলাম তখন তা উপরে উঠে যাচ্ছিলো। ফলে আমার লজ্জাঅঙ্গ প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিলো। যখন আমাদের সালাত আদায় সম্পন্ন হল এক অতি বৃদ্ধা মহিলা বললো, তোমরা তোমাদের ক্বারী সাহেবের (ইমামের) পিছন দিক ঢেকে দাও, যেন তা আমাদের নজরে না আসে। রাবী বলেন, তখন তারা আমার জন্য একটি জামা বানিয়ে দিল। তিনি উল্লেখ করেন, এতে তিনি প্রচণ্ড খুশী হয়েছিলেন।
(অন্য সনদে এসেছে) তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয়ই তারা প্রতিনিধিরূপে রাসূলের দরবারে আগমন করলো, অতঃপর যখন তারা ফিরে যাবার মনস্থ করল তারা বললো, হে আল্লাহর রাসূল। কে আমাদের ইমামতি করবে। তিনি জবাব দিলেন, তোমাদের মাঝে যার কাছে বেশী কুরআন জমা আছে (মুখস্থ আছে) অথবা যে কুরআন অনুযায়ী বেশী আমল করে। রাবী বলেন, তারা আমার গোত্রে এমন কাউকে পাই নি যার আমার পরিমাণ কুরআন মুখস্থ আছে। রাবী বলেন, অতঃপর তারা আমাকেই (ইমাম স্থির করে) সামনে পাঠাল তখনও আমি ছোট বালক। তখন আমি আমার একমাত্র ছোট চাদরেই তাদের ইমামতি করতাম। রাবী বলেন, জীবনে আমি এ জামাআত দেখি নাই যার ইমামতি আমি করি নি। অর্থাৎ উক্ত স্থানের সকল প্রকার জামা'আতের ইমামতি আমি করতাম এবং আজ পর্যন্ত আমি তাদের জানাযার সালাতও পড়িয়ে দেই।)
(হাদীসটি বুখারী, আবু দাউদ, নাসায়ী ও বায়হাকীতে বর্ণিত হয়েছে।)
كتاب الصلاة
(3) باب إمامة الأعمى والصبى والمرأة بمثلها
(1378) عن عمرو بن سلمة رضى الله عنه قال كنَّا على حاضرٍ فكان الركبان (وفى روايةٍ فكان النَّاس) يمرُّون بنا راجعين من عند رسول الله صلى الله عليه وسلم فأذنو منهم فأسمع حتَّى حفظت قرآنًا، وكان النَّاس ينتظرون بإسلامهم فتح مكَّة، فامَّا فتحت جعل الرَّجل يأتيه فيقول يا رسول الله أنا وافد بني فلانٍ جئتك
بإسلامهم، فانطلق أبى بإسلام قومه، فرجع إليهم فقال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم قدَّموا أكثركم قرآنًا قال فنظروا، وإنَّا لعلى حواءٍ عظيمٍ فما وجدوا فيهم أحدًا أكثر قرآنًا منَّى، فقدَّمونى وأنا غلام فصلَّيت بهم وعلىَّ بردةٌ وكنت إذا ركعت أو سجدت قلصت فتبدوا عورتى، فلما صلَّينا تقول عجوزٌ لنا دهريَّة غطُّوا عنَّا أست قارئكم، قال فقطعوا لى قميصًا فذكر أنَّه فرح به فرحًا شديدًا
(ومن طريقٍ ثانٍ) عن أبيه أنَّهم وفدوا إلى النَّبيِّ صلَّى الله عليه وعلى آله وصحبه وسلَّم، فلمَّا أرادوا أن ينصرفوا قالوا يا رسول الله من يؤمنا؟ قال أكثركم جمعًا للقرآن أو أخذًا للقرآن قال فلم يكن أحدٌ من القوم جمع من القرآن ما جمعت، قال فقدَّمونى وأنا غلامٌ، فكنت أؤمُّهم وعلىَّ شملةٌ لى قال فما شهدت مجمعًا
من جرمٍ إلاَّ كنت إمامهم وأصلِّى على جنائزهم إلى يومى هذا

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
(লোকদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরআন বেশি জানে সে-ই তাদের ইমামত করবে)। কুরআন জানার দু'টি দিক আছে। এক হচ্ছে কুরআনের শব্দাবলী জানা, আরেক হচ্ছে অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা। শব্দাবলী জানাও দু'রকম- শব্দ মুখস্থ থাকা ও সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে জানা। তাহলে ‘কুরআন জানা' কথাটি পুরোপুরিভাবে ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হয়, যে কুরআন সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে পারে, যথেষ্ট পরিমাণ মুখস্থও করেছে এবং অর্থ ও ব্যাখ্যাও বোঝে। সুতরাং এ তিনওটি দিক যার মধ্যে তুলনামূলক বেশি থাকবে, ইমামতের অগ্রাধিকারও তার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। অন্য বর্ণনায় ইরশাদ হয়েছে-
فَإِنْ كَانُوا في الْقِراءَةِ سَواءً، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ (যদি কুরআন পাঠে সকলে সমান হয়, তবে তাদের মধ্যে সুন্নাহ সম্পর্কে যে বেশি জানে)। সুন্নাহ অর্থ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া তরিকা তথা দীন ও শরীআত। একে 'ফিকহ' শব্দেও ব্যক্ত করা হয়। কাজেই ‘সুন্নাহ সম্পর্কে যে বেশি জানে' এর অর্থ দীন ও শরীআতের জ্ঞান যার বেশি আছে, ফিক্হ সম্পর্কে যার জানাশোনা বেশি, এককথায় যিনি ফকীহ ও আলেম হিসেবে অন্যদের তুলনায় উচ্চস্তরের। বলাবাহুল্য এরূপ ব্যক্তির কুরআন সম্পর্কিত জ্ঞানও অন্যদের তুলনায় বেশিই থাকবে। অন্যথায় তার বড় ফকীহ হওয়ার প্রশ্ন আসে না।

এমনিতে বড় আলেম ও বড় ফকীহ'র মর্যাদা বেশি হলেও ইমামতির জন্য 'বেশি কুরআন জানা'-কে প্রথম বিবেচনা করা হয়েছে। তা বিবেচনা করার কারণ হলো, সেকালে নামাযের প্রয়োজনীয় মাসাইল সাধারণভাবে অধিকাংশেরই জানা থাকত। কিন্তু কুরআন মাজীদ জানার ক্ষেত্রে তাদের পরস্পরের মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। কেউ বেশি জানত, কেউ কম। তখন সাধারণত কুরআন মাজীদ নামাযে পড়াও হত বেশি বেশি। তখন কুরআন মাজীদ সংরক্ষণের কাজটি বিশেষভাবে মুখস্থকরণের মাধ্যমে করা হতো। তাই সকলের যাতে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যায়, সে লক্ষ্যেও নামাযে বেশি বেশি পড়ার প্রয়োজনও ছিল। এসকল কারণে কুরআন বেশি জানা ব্যক্তিকে ইমামতের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীকালে ইমামতের জন্য ইলম যার বেশি সেরকম লোকের জন্যই অগ্রাধিকার বিবেচনা করা হয়। কেননা নামাযে কেরাত অপেক্ষা ইলমেরই প্রয়োজন বেশি হয়। নামাযের শত শত মাসআলা আছে। এমন বহু কারণ আছে, যাতে নামায নষ্ট হয়ে যায়, যদ্দরুন নামায পুনরায় পড়া জরুরি হয়। এমন অনেক ভুল আছে, সাহু সিজদা দ্বারা যার প্রতিকার হয়ে যায়। যথেষ্ট ইলম না থাকলে এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে, একজন আলেমের যথেষ্ট পরিমাণ কুরআনও জানা থাকে এবং তিনি সহীহ-শুদ্ধভাবেই তা পড়ে থাকেন। এসব বিবেচনায় ইমাম আবূ হানীফা রহ.-সহ বহু ফকীহ ইমামতের জন্য কারী অপেক্ষা আলেমকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁরা এ সিদ্ধান্ত হাদীছের ভিত্তিতেই নিয়েছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষজীবনে ইমামতের জন্য হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে মনোনীত করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিতে তিনিই ছিলেন তাদের মধ্যে সবচে’ বড় আলেম । কিন্তু কারী হিসেবে বড় ছিলেন হযরত উবাঈ ইবন কা'ব রাযি.।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন-হাদীছের ইলম আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তাই প্রত্যেক মুসলিমের এ ইলম অর্জনে আগ্রহ থাকা চাই।

খ. ইমাম মনোনয়নে সুযোগ্য আলেমকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান