মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৭. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৩৭২
নামাযের অধ্যায়
(২) পরিচ্ছেদ: ইমামতের অধিক যোগ্য কে?
(১৩৬৮) আমর ইবন সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে কিছু আরোহী আসল আমরা তাদের কাছ থেকে কুরআন শিখছিলাম। তারা আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করলেন যে, নিশ্চয়ই রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের মাঝে যে বেশী বেশী কুরআন জানে সে-ই ইমামতি করবে।
(হাদীসটি তবারানী তাঁর মু'জামুল কাবীরে বর্ণনা করেছেন, এ হাদীসের সনদের রাবীগণ সহীহ হাদীসের সনদের রাবীদের ন্যায়।)
كتاب الصلاة
(2) باب من أحق بالإمامة
(1372) عن عمرو بن سلمة رضى الله عنه قال كانت تأتينا الرَّكبان من قبل رسول الله صلى الله عليه وسلم فنستقرئهم فيحِّثونا أن رسول الله صلَّى الله عليه وآله وسلَّم قال ليؤمَّكم أكثركم قرآنًا

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
(লোকদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরআন বেশি জানে সে-ই তাদের ইমামত করবে)। কুরআন জানার দু'টি দিক আছে। এক হচ্ছে কুরআনের শব্দাবলী জানা, আরেক হচ্ছে অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা। শব্দাবলী জানাও দু'রকম- শব্দ মুখস্থ থাকা ও সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে জানা। তাহলে ‘কুরআন জানা' কথাটি পুরোপুরিভাবে ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হয়, যে কুরআন সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে পারে, যথেষ্ট পরিমাণ মুখস্থও করেছে এবং অর্থ ও ব্যাখ্যাও বোঝে। সুতরাং এ তিনওটি দিক যার মধ্যে তুলনামূলক বেশি থাকবে, ইমামতের অগ্রাধিকারও তার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। অন্য বর্ণনায় ইরশাদ হয়েছে-
فَإِنْ كَانُوا في الْقِراءَةِ سَواءً، فَأَعْلَمُهُمْ بِالسُّنَّةِ (যদি কুরআন পাঠে সকলে সমান হয়, তবে তাদের মধ্যে সুন্নাহ সম্পর্কে যে বেশি জানে)। সুন্নাহ অর্থ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া তরিকা তথা দীন ও শরীআত। একে 'ফিকহ' শব্দেও ব্যক্ত করা হয়। কাজেই ‘সুন্নাহ সম্পর্কে যে বেশি জানে' এর অর্থ দীন ও শরীআতের জ্ঞান যার বেশি আছে, ফিক্হ সম্পর্কে যার জানাশোনা বেশি, এককথায় যিনি ফকীহ ও আলেম হিসেবে অন্যদের তুলনায় উচ্চস্তরের। বলাবাহুল্য এরূপ ব্যক্তির কুরআন সম্পর্কিত জ্ঞানও অন্যদের তুলনায় বেশিই থাকবে। অন্যথায় তার বড় ফকীহ হওয়ার প্রশ্ন আসে না।

এমনিতে বড় আলেম ও বড় ফকীহ'র মর্যাদা বেশি হলেও ইমামতির জন্য 'বেশি কুরআন জানা'-কে প্রথম বিবেচনা করা হয়েছে। তা বিবেচনা করার কারণ হলো, সেকালে নামাযের প্রয়োজনীয় মাসাইল সাধারণভাবে অধিকাংশেরই জানা থাকত। কিন্তু কুরআন মাজীদ জানার ক্ষেত্রে তাদের পরস্পরের মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। কেউ বেশি জানত, কেউ কম। তখন সাধারণত কুরআন মাজীদ নামাযে পড়াও হত বেশি বেশি। তখন কুরআন মাজীদ সংরক্ষণের কাজটি বিশেষভাবে মুখস্থকরণের মাধ্যমে করা হতো। তাই সকলের যাতে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যায়, সে লক্ষ্যেও নামাযে বেশি বেশি পড়ার প্রয়োজনও ছিল। এসকল কারণে কুরআন বেশি জানা ব্যক্তিকে ইমামতের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীকালে ইমামতের জন্য ইলম যার বেশি সেরকম লোকের জন্যই অগ্রাধিকার বিবেচনা করা হয়। কেননা নামাযে কেরাত অপেক্ষা ইলমেরই প্রয়োজন বেশি হয়। নামাযের শত শত মাসআলা আছে। এমন বহু কারণ আছে, যাতে নামায নষ্ট হয়ে যায়, যদ্দরুন নামায পুনরায় পড়া জরুরি হয়। এমন অনেক ভুল আছে, সাহু সিজদা দ্বারা যার প্রতিকার হয়ে যায়। যথেষ্ট ইলম না থাকলে এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। আর এটা তো স্পষ্ট কথা যে, একজন আলেমের যথেষ্ট পরিমাণ কুরআনও জানা থাকে এবং তিনি সহীহ-শুদ্ধভাবেই তা পড়ে থাকেন। এসব বিবেচনায় ইমাম আবূ হানীফা রহ.-সহ বহু ফকীহ ইমামতের জন্য কারী অপেক্ষা আলেমকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁরা এ সিদ্ধান্ত হাদীছের ভিত্তিতেই নিয়েছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষজীবনে ইমামতের জন্য হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে মনোনীত করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিতে তিনিই ছিলেন তাদের মধ্যে সবচে’ বড় আলেম । কিন্তু কারী হিসেবে বড় ছিলেন হযরত উবাঈ ইবন কা'ব রাযি.।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন-হাদীছের ইলম আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তাই প্রত্যেক মুসলিমের এ ইলম অর্জনে আগ্রহ থাকা চাই।

খ. ইমাম মনোনয়নে সুযোগ্য আলেমকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ - হাদীস নং ১৩৭২ | মুসলিম বাংলা