মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৭. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১১৬৭
নামাযের অধ্যায়
(৩) অনুচ্ছেদ: সফরে সাথী নেয়া এবং তার কারণ প্রসঙ্গে
(১১৬৩) আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, মানুষ যদি জানত যে, একাকী ভ্রমণে কি ক্ষতি রয়েছে। তবে কোন মানুষই কখনই রাত্রিবেলা একাকী সফর করত না।
(বুখারী, নাসায়ী, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ)
كتاب الصلاة
(3) باب اتخاذ الرفيق فى السفر وسببه
(1167) عن ابن عمر رضى الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لو يعلم النَّاس ما فى الوحدة ما سار أحد وحده بليل أبدًا

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটির মূল বিষয়বস্তু হলো একাকী সফর করা সম্পর্কে সতর্কীকরণ, বিশেষত রাতের বেলা। কেননা তাতে নানা রকম ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। সেদিকে ইঙ্গিত করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لَوْ أَنَّ النَّاسَ يَعْلَمُوْنَ مِنَ الْوَحْدَةِ مَا أَعْلَمُ 'একাকিত্বের ভেতর যে (ক্ষতি) রয়েছে তা যদি লোকে জানত, যেমনটা আমি জানি'। অর্থাৎ আমি তার এতসব ক্ষতি সম্পর্কে জানি, যা সংক্ষেপে বর্ণনা করা কঠিন। একাকী সফর করার ভেতর দীনী ও দুনিয়াবী সব রকমেরই ক্ষতি রয়েছে। যেমন তাতে নামায কাযা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, বিশেষত জামাত ছুটে যাওয়ার। কোনও বিপদে পড়লে সাহায্য করার মতো কেউ থাকে না। যেমন চোর-ডাকাতের কবলে পড়লে একাকী অবস্থায় আত্মরক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। রাতের বেলা সফরে জিন দ্বারা আক্রান্ত হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। খামোখাও ভূত-প্রেতের ভয়ে শারীরিক-মানসিক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। একাকী সফরকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে সেবা-শুশ্রূষা পাওয়া সম্ভব হয় না। সফর অবস্থায় মৃত্যুও হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সঙ্গী না থাকলে লাশ নিয়ে পেরেশানি দেখা দেয়। তাছাড়া একাকী সফরে ওযু-ইস্তিঞ্জা, পানাহার-বিশ্রাম সবকিছুতেই পেরেশানি হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

مَا سَارَ رَاكِبٌ بِلَيْلٍ وَحْدَهُ (তবে কোনও আরোহী রাতে একা সফর করত না)। আরোহীর কথা বলা হয়েছে আরব অঞ্চলের সাধারণ পরিবেশ-পরিস্থিতি হিসেবে। কেননা সে অঞ্চলে সফর সাধারণত উটের পিঠে করা হতো, যেমন বর্তমানকালে যানবাহনে করা হয়। না হয় পদযোগে সফর করার বেলায়ও একই কথা। মোটকথা পায়ে হেঁটে হোক বা কোনও বাহনে চড়ে হোক, সর্বাবস্থায়ই একাকী সফর করা বিপজ্জনক। তাই একাকী সফর করা উচিত নয়। রাতের বেলা কিছুতেই নয়। কেননা রাতের বেলা এমন অনেক কিছু ঘটে যায়, যা সাধারণত দিনের বেলা ঘটে না। এ বিষয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি.-এর একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একবার আমি সফরে বের হলাম। পথে জাহিলী যুগের এক পুরোনো কবরস্থান পড়ল। হঠাৎ দেখলাম কবর থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে আসল। সে আগুনে জ্বলছিল। তার গলায় একটি শেকল লাগানো। আমার কাছে পানির একটি পাত্র ছিল। সে আমাকে দেখে বলল, হে আব্দুল্লাহ! আমাকে পানি পান করাও। মনে মনে বললাম, সে হয়তো আমাকে চেনে, সেজন্য আমার নাম ধরে ডেকেছে। এরই মধ্যে কবর থেকে আরেক ব্যক্তি তার পেছনে পেছনে বের হয়ে আসল। সে বলল, হে আব্দুল্লাহ! তুমি তাকে পানি পান করিয়ো না। সে একজন কাফের। এই বলে সে শেকল ধরে তাকে টানতে থাকল এবং পুনরায় তাকে কবরের ভেতর ঢুকাল। তারপর সেই রাতে আমি এক বৃদ্ধার বাড়িতে অতিথি হলাম। তার পাশেই ছিল একটি কবর। আমি সে কবর থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম। যেন কেউ বলছে, পেশাব, পেশাব। কলস, কলস। আমি বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী? সে বলল, আমার এক স্বামী ছিল। সে পেশাব করার সময় সতর্ক থাকত না। পেশাব তার গায়ে লেগে যেত। আমি তাকে বলতাম, ছিঃ, উটও তো পেশাব করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করে। কিন্তু সে আমার কথা শুনত না। তারপর তার মৃত্যু হয়ে যায়। মৃত্যুর দিন থেকেই সে কবরে পেশাব পেশাব বলে আওয়াজ করছে। জিজ্ঞেস করলাম, কলসের ব্যাপারটা কী? সে বলল, একবার এক তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি আসল এবং পানি চাইল। আমার স্বামী একটা কলস দেখিয়ে দিল। সে লক্ষ করে দেখল তাতে কোনও পানি নেই। অমনি তার মৃত্যু হয়ে গেল। সেদিন থেকে লোকটি কবরে কলস কলস বলে আওয়াজ করছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. মদীনা মুনাউওয়ারায় ফিরে এসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘটনা জানালেন। তখন তিনি একাকী সফর করতে নিষেধ করে দেন।

ইমাম ইবন আব্দুল বার রহ, তাঁর বিখ্যাত 'আত-তামহীদ' গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এ ঘটনার নির্ভরযোগ্য কোনও সনদ নেই। আর আমি দলীল হিসেবে এটি উল্লেখও করিনি। আমি এটি উল্লেখ করেছি কেবলই শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. একাকী সফর করা উচিত নয়। রাতের বেলা কিছুতেই নয়।

খ. যেসব ক্ষেত্রে বা যেসব কাজে বিপদের আশঙ্কা থাকে, তাতে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

গ. ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাভরে নিজেকে বিপদে ফেলতে নেই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ - হাদীস নং ১১৬৭ | মুসলিম বাংলা