মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

৭. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১১৬১
নামাযের অধ্যায়
সফরের সালাতের বৈশিষ্ট্য ও তার যিকির ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী সম্পৃক্ত অনুচ্ছেদসমূহ

(১) অনুচ্ছেদ: সফরের ফযীলত সফরের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার কতিপয় নিয়ম-নীতি প্রসঙ্গে
(১১৫৭) আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি নবী (সা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, সফর আযাবের একটি টুকরা। কেননা সফর সফরকারীর পানাহার ও নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। যখন তোমাদের কারো সফরের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় তখন সে যেন দ্রুত গৃহে ফিরে আসে।
(বুখারী, মুসলিম, মুয়াত্তা মালিক, ইবন মাজাহ প্রভৃতি।)
كتاب الصلاة
أبواب صلاة السفر وآدابه وأذكاره وما يتعلق به

(1) باب فضل السفر والحث عليه وشيء من آدابه
(1161) عن أبى هريرة رضى الله عنه عن النَّبيِّ صلَّى الله عليه وآله وسلَّم قال السَّفر قطعة من العذاب، يمنع أحدكم طعامه وشرابه ونومه فإذا قضى أحدكم نهمته من سفره فليعجِّل إلى أهله

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিতে সফরকে আযাব সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এর কারণ বলা হয়েছে যে, সফর দ্বারা পানাহার ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। পানাহার ও ঘুমের কষ্ট সবচে' বড় কষ্ট। সে হিসেবেই হাদীছে এ দু'টির উল্লেখ করা হয়েছে। নয়তো সফরে আরও নানারকম কষ্ট আছে। যেমন শীত ও গরমের কষ্ট, যাতায়াতের ঝক্কিঝামেলা, অপরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার কষ্ট, প্রিয়জন থেকে দূরে থাকার কষ্ট, দীনদারদের জন্য ইবাদত-বন্দেগী ঠিকভাবে করতে না পারার কষ্ট, যেমন সুবিধামতো নামায পড়তে না পারা, জামাত ছুটে যাওয়া ইত্যাদি।

বোঝা যাচ্ছে, এ হাদীছ দ্বারা সফর করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অপরদিকে কোনও কোনও হাদীছে সফরের প্রতি উৎসাহও দেওয়া হয়েছে। যেমন এক হাদীছে আছে-

سَافِرُوا تَصِحوا

'তোমরা সফর করো, সুস্থ থাকবে।' (৭৪. মুসনাদে আহমাদ: ৮৯৪৫)

বাস্তবেও এ হাদীছের সত্যতা লক্ষ করা যায়। হাওয়া বদল করলে রোগের উপশম হয়। তাই চিকিৎসকরা অনেক সময় রোগীকে সফরের উৎসাহ দিয়ে থাকে। আসলে উভয় হাদীছের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। সফর করার দ্বারা রোগের উপশম হয় বলে কোনও কষ্ট যে হয় না, এমন নয়। কষ্ট হওয়ার সঙ্গে রোগের উপশমের কোনও বিরোধ নেই। বিভিন্ন কাজে কষ্ট থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকার লাভ ও উপকারের আশায় সে কষ্ট বরদাশত করে নেওয়া হয়। সফরের বিষয়টাও এরকমই। সফর যদি বিশেষ কোনও কল্যাণার্থে হয়ে থাকে, তবে কষ্ট-ক্লেশ সত্ত্বেও সে সফর করা যাবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে তা অপছন্দনীয় হবে না; বরং শর'ঈ মাকসাদে সফর করা জরুরিও হয়ে যায়, যেমন হজ্জের সফর, জিহাদের সফর ইত্যাদি। ইলমে দীন শিক্ষার্থে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সফর করতে তো উৎসাহই দেওয়া হয়েছে। হাঁ, ইসলামে অহেতুক কষ্ট স্বীকার পছন্দনীয় নয়। কাজেই যে সফরে ভালো কোনও উদ্দেশ্য নেই, তা থেকে বিরতই থাকা উচিত। আর সংগত কোনও কারণে সফর করলে সে ক্ষেত্রেও বাড়তি সময় ব্যয় করা সমীচীন নয়। যেমন আলোচ্য হাদীছে বলা হয়েছে-

فَإِذَا قَضَى أَحَدُكُمْ نَهمَتَهُ مِنْ سَفَرهِ، فَلَيُعَجلْ إلى أَهْلِه (কাজেই তোমাদের কেউ যখন তার সফরের উদ্দেশ্য পূরণ করে ফেলবে, তখন যেন দ্রুত পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসে)। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে সফর করেছে, সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাওয়ার পর যেন বৃথা সময় না কাটায়। হাঁ, এমন হতে পারে যে, সে উদ্দেশ্যটি পূরণ হওয়ার পর নতুন কোনও কাজ পড়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে বাড়তি সময় ব্যয় দূষণীয় হবে না।

বলা হয়েছে, কাজ শেষ হওয়ার পর দ্রুত পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসবে। এর মানে এরূপ নয় যে, কারও যদি পরিবার-পরিজন না থাকে, তবে সে অযথাই সফরে পড়ে থাকবে। পরিবার-পরিজন না থাকলেও সফরের কষ্ট-ক্লেশ তো থাকে। আর অহেতুক কষ্ট-ক্লেশ স্বীকার করা শরীয়তে পছন্দনীয় নয়। তাই পরিবার-পরিজন না থাকলেও কাজ শেষে দেশে ফিরে আসা চাই।

হাদীছটির প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যায় ব্যক্তির পক্ষে তার পরিবার-পরিজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনে পরিবার থেকে দূরে থাকা সংগত নয়। তাতে পরিবারের হক নষ্ট হয়। তাদের তত্ত্বাবধানকর্ম বিঘ্নিত হয়। অথচ পরিবারবর্গের যথাযথ তত্ত্বাবধান করা শরীয়তের হুকুম। সফর করার বৈধতা যেমন নিজ ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্য, তেমনি পরিবারের স্বার্থেও বটে। কাজেই সফরে যদি নিজের বা পরিবারের কোনও স্বার্থ না থাকে, তবে শুধু শুধু কালক্ষেপণ না করে যথাশীঘ্র পরিবারবর্গের কাছে ফিরে আসা বাঞ্ছনীয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. অপ্রয়োজনে সফর করা উচিত নয়।

খ. সফর কোনও বৈধ উদ্দেশ্যেই হওয়া উচিত।

গ. কাজ শেষ হওয়ার পর সফরে বাড়তি সময় নষ্ট করা বাঞ্ছনীয় নয়।

ঘ. অহেতুক কষ্ট স্বীকার পছন্দনীয় নয়।

ঙ. প্রত্যেকের জন্য তার পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাড়িতে থাকা হোক বা বাইরে, সর্বাবস্থায় পরিবারের খেয়াল রাখা জরুরি।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান