আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৬৯- শপথ ও মান্নতের অধ্যায়

হাদীস নং: ৬২২৪
আন্তর্জাতিক নং: ৬৬৮১
- শপথ ও মান্নতের অধ্যায়
২৭৬৭. কোন ব্যক্তি যখন বলে, আল্লাহর কসম! আজ আমি কথা বলব না। এরপর সে নামায আদায় করল অথবা কুরআন পাঠ করল অথবা সুবহানাল্লাহ বা আল্লাহু আকবার বা আলহামদুলিল্লাহ অথবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলল। তবে তার কসম তার নিয়ত হিসেবেই আরোপিত হবে। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সর্বোত্তম কথা চারটিঃ সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ওয়াল্লাহু আকবার।
আবু সুফিয়ান (রাযিঃ) বলেছেন, নবী (ﷺ) সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে এ মর্মে লিখেছিলেনঃ হে কিতাবীগণ! এসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই।
মুজাহিদ (রাহঃ) বলেন, كَلِمَةُ التَّقْوَى ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।
৬২২৪। আবুল ইয়ামান (রাহঃ) ......... সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রাহঃ) এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবু তালিবের যখন মৃত্যু উপস্থিত হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কাছে তাশরীফ আনলেন এবং বললেনঃ আপনি لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ কালেমাটি বলুন, আমি আল্লাহ তাআলার নিকট আপনার ব্যাপারে এর মাধ্যমে সুপারিশ করব।
كتاب الأيمان والنذور
بَابُ إِذَا قَالَ: وَاللَّهِ لاَ أَتَكَلَّمُ اليَوْمَ، فَصَلَّى، أَوْ قَرَأَ، أَوْ سَبَّحَ، أَوْ كَبَّرَ، أَوْ حَمِدَ، أَوْ هَلَّلَ، فَهُوَ عَلَى نِيَّتِهِوَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَفْضَلُ الكَلاَمِ أَرْبَعٌ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالحَمْدُ لِلَّهِ، وَلاَ إِلَهَ [ص:139] إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ " قَالَ أَبُو سُفْيَانَ: كَتَبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى هِرَقْلَ: {تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ} [آل عمران: 64] وَقَالَ مُجَاهِدٌ: {كَلِمَةُ التَّقْوَى} [الفتح: 26] : «لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ»
6681 - حَدَّثَنَا أَبُو اليَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: أَخْبَرَنِي سَعِيدُ بْنُ المُسَيِّبِ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِبٍ الوَفَاةُ، جَاءَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: «قُلْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، كَلِمَةً أُحَاجُّ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

যিকিরের কালেমাসমূহ: সেগুলোর বরকত-ফযীলত

রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে যিকিরের উৎসাহ ও তাগিদ দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে তিনি তার বিশেষ বিশেষ কালিমাও শিক্ষা দিয়েছেন। তা না হলে এ আশঙ্কা পুরো মাত্রায় বিদ্যমান থাকতো যে, ইলম ও মা'রিফতের অভাবে অনেকে আল্লাহর যিকির এমনভাবে করতো, যা তাঁর শানের সাথে সামঞ্জস্যশীল হতো না। অথবা তাতে তাঁর স্তুতিবাদ না হয়ে বরং তাঁর অমর্যাদাই হতো। আরিফ রুমী তাঁর মছনবীতে হযরত মূসা (আ) ও জনৈক রাখালের যে কাহিনী বর্ণনা করেছেন, তাই এর একটি উদাহরণ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যিকিরের যে সব কালিমা শিক্ষা দিয়েছেন, তা অর্থের দিক থেকে নিম্নে বর্ণিত কোন না কোন প্রকারের:

১. আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার বর্ণনামূলক কালিমা- অর্থাৎ যে কালিমাসমূহের দ্বারা সমস্ত দোষ ও অপূর্ণতা থেকে আল্লাহ তা'আলার পবিত্র থাকার কথা বুঝানো হয়েছে। سُبْحَانَ اللّٰهِ (সুবহানাল্লাহ) বলতে ঠিক এ অর্থটিই বুঝানো হয়েছে। (অর্থাৎ এর মর্মার্থ হচ্ছে সমস্ত পূর্ণতা ও কৃতিত্ব আল্লাহ তা'আলার)।

২. তাতে আল্লাহ তা'আলার হামদ বা স্তুতিবাদ থাকবে (অর্থাৎ হামদ ও ছানা তথা স্তুতিবাদ তাঁরই জন্যে শোভা পায়।) اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ (আলহামদুলিল্লাহ)-এরও ঐ একই বৈশিষ্ট্য।

৩. তাতে আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ বা একত্ববাদের শানের বর্ণনা থাকবে। لَا اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ এর শান তাই।

৪. আল্লাহ তা'আলার সেই উচ্চ মর্যাদার বর্ণনা তাতে থাকবে যে, আমরা ইতিবাচক ও নেতিবাচকভাবে তাঁর সম্পর্কে যা কিছু জেনেছি বুঝেছি, তিনি তারও অনেক ঊর্ধ্বে। اللّٰهُ أَكْبَرُ (আল্লাহু আকবার)-এর মর্মার্থ এটাই।

এই চারটি কালিমা বা শব্দের ইজমালী অর্থ সম্পর্কে ভূমিকাস্বরূপ লিখিত বাক্যগুলোতে আলোকপাত করা হয়েছে। তার দ্বারা পাঠকগণ নিশ্চয়ই উপলব্ধি করে থাকবেন যে, এ চারটি সংক্ষিপ্ত শব্দ যা তেমন গুরুগম্ভীর বা উচ্চারণেও কঠিন নয় আল্লাহ তা'আলার সমস্ত ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিশেষণকে কেমন চমৎকারভাবে ধারণ করে আছে! কোন কোন কামিল আরিফ তথা আল্লাহ তত্ত্বজ্ঞানী লিখেন, আসমাউল-হুসনা তথা আল্লাহ তা'আলার গুণবাচক নামসমূহ তাঁর যে মহৎ গুণাবলীর প্রতিনিধিত্ব করে বা অর্থ বহন করে, তার কোনটিই এ চার কালিমার বাইরে নয়।

উদাহরণ স্বরূপ ُاَلْقُدُّوْسُ السَّلَامُ الظَّاهِر প্রভৃতি যে সব গুণবাচক নাম তাঁর পবিত্র সত্তার সমস্ত অপূর্ণতা ও দোষ থেকে মুক্ত থাকার কথা ঘোষণা করে থাকে 'সুবহানাল্লাহ' শব্দের মধ্যে তা নিহিত রয়েছে। অনুরূপভাবে:

الرَّحْمٰنُ الرَّحِيْمِ الْكَرِيْمُ الْعَلِيْمُ الْقَدِيْرُ السَّمِيْعُ الْبَصِيْرُ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ.

প্রভৃতি যে সব গুণবাচক নাম আল্লাহ তা'আলার ইতিবাচক অর্থবোধক গুণসমূহের অর্থ বহন করে, সে সব اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ -এর আওতায় এসে যায়। অনুরূপ যে সমস্ত আসমাউল হুসনা পবিত্র সত্তার একত্ব ও তাঁর অনন্য ও শরীক হওয়ার অর্থবোধক সেই الْوَاحِدُ الأَحَدُ প্রভৃতি গুণবাচক নামের পূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল কালিমা হচ্ছে لَا اِلٰهَ اِلَّا اللّٰه একই রকমে الأَعْلٰى الْكَبِيْرُ الْمُتَعَالُ প্রভৃতি আসমাঊল হুসনা যেগুলোর মর্ম হচ্ছে আল্লাহকে যারা জেনেছেন বুঝেছেন আল্লাহ তা'আলা তাঁদের সে জ্ঞান বুদ্ধিরও উর্ধ্বে। االلّٰهُ أَكْبَرُ কালিমাটিতে সে অর্থের সর্বোত্তম অভিব্যক্তি ঘটেছে।
সুতরাং যিনিই পূর্ণ প্রত্যয় ও হৃদয়-মনের অনুভূতি নিয়ে উচ্চারণ করলেন:

سُبْحَانَ اللّٰهِ وَالْحَمْدُ للّٰهِ وَلَا اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ وَاللّٰهُ أَكْبَرُ.

তিনিই আল্লাহর সমস্ত গুণাবলীর প্রশংসা এবং স্তবস্তুতি করে ফেললেন, আসমাউল হুসনারূপী আল্লাহর নিরানব্বই নামের মধ্যে নিহিত ইতিবাচক ও নেতিবাচক অর্থবোধক তাঁর সমস্ত গুণাবলীর বর্ণনা ও সাক্ষ্যই তিনি দিয়ে দিলেন। এজন্যে এ চারটি কালিমা নিজ নিজ মূল্যমান মাহাত্ম্য ও বরকতের দিক থেকে নিঃসন্দেহে বিশ্ব জাহানের সে সবকিছুর তুলনায় যেগুলোর উপর সূর্যালোক পতিত হয়ে থাকে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। যে অন্তরসমূহ ঈমানের আলোতে ভাস্বর ও প্রদীপ্ত তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা অনুভব করেন। আল্লাহ তা'আলা ঈমানের এ দৌলত নসীব করুন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)