আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৬৭- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়

হাদীস নং: ৬১২১
আন্তর্জাতিক নং: ৬৫৬৭ - ৬৫৬৮
- নম্রতা ও যুহদের অধ্যায়
৩৪৬২. জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা।
৬১২১। কুতায়বা (রাহঃ) ......... আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, বদরের যুদ্ধে হারিসা (রাযিঃ) অদৃশ্য তীরের আঘাতে শাহাদাতবরণ করলে তার মাতা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট আগমন করে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার অন্তরে হারিসার স্নেহ-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাত লাভ করে তবে আমি তার জন্য কান্নাকাটি করব না। আর যদি ব্যতিক্রম হয়, তবে আপনি অচিরেই দেখতে পাবেন আমি কি করি। তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তুমি তো নির্বোধ। জান্নাত কি একটি নাকি? জান্নাত তো অনেক, আর সে তো সবচেয়ে উন্নতমানের জান্নাত ফিরদাউসে রয়েছে।
তিনি আরও বললেনঃ এক সকাল বা এক বিকাল আল্লাহর রাস্তায় চলাফেরা দুনিয়া ও তার মধ্যবর্তী সবকিছুর চেয়ে উত্তম। তীরের দু’প্রান্তের দূরত্বের সমান বা কদম পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তৎমধ্যবর্তী সবকিছুর চেয়ে উত্তম। জান্নাতের কোন নারী যদি দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তবে সমস্ত দুনিয়া আলোকিত ও খুশবুতে মোহিত হয়ে যাবে। জান্নাতি নারীর নাসীফ (ওড়না) দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে উত্তম।
كتاب الرقاق
باب صِفَةِ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ جَعْفَرٍ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ أُمَّ حَارِثَةَ، أَتَتْ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ هَلَكَ حَارِثَةُ يَوْمَ بَدْرٍ، أَصَابَهُ غَرْبُ سَهْمٍ. فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ عَلِمْتَ مَوْقِعَ حَارِثَةَ مِنْ قَلْبِي، فَإِنْ كَانَ فِي الْجَنَّةِ لَمْ أَبْكِ عَلَيْهِ، وَإِلاَّ سَوْفَ تَرَى مَا أَصْنَعُ. فَقَالَ لَهَا " هَبِلْتِ، أَجَنَّةٌ وَاحِدَةٌ هِيَ إِنَّهَا جِنَانٌ كَثِيرَةٌ، وَإِنَّهُ فِي الْفِرْدَوْسِ الأَعْلَى ". (وَقَالَ :غَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا، وَلَقَابُ قَوْسِ أَحَدِكُمْ أَوْ مَوْضِعُ قَدَمٍ مِنَ الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا، وَلَوْ أَنَّ امْرَأَةً مِنْ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ اطَّلَعَتْ إِلَى الأَرْضِ، لأَضَاءَتْ مَا بَيْنَهُمَا، وَلَمَلأَتْ مَا بَيْنَهُمَا رِيحًا، وَلَنَصِيفُهَا ـ يَعْنِي الْخِمَارَ ـ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীসের প্রথম অংশে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার অর্থাৎ কোন দ্বীনি কাজে সফর করার ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। সকাল-সন্ধ্যা দীনী কাজের জন্য সফর করা দুনিয়া এবং তার যাবতীয় বস্তু থেকে উত্তম। সকাল-সন্ধ্যার উল্লেখ এজন্য করা হয়েছে যে, আরব দেশে সকালবেলা বা সন্ধ্যাবেলা সফরে বের হওয়ার রেওয়াজ ছিল। যদি কোন ব্যক্তি দুপুরের সময়ও দীনের খেদমতের জন্য ঘর থেকে বের হয় তাহলে সেও অনুরূপ ফযীলত লাভ করবে।

হাদীসের দ্বিতীয় অংশে আহলে জান্নাতের জান্নাতী স্ত্রীদের অসাধারণ রূপ সৌন্দর্য এবং তাদের অমূল্য পোশাকের উল্লেখ করা হয়েছে। দীনী কাজের জন্য বাড়ীঘর ত্যাগ করে সফর করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদেরকে একথা বলা যে, যদি তোমরা দীনের কাজের জন্য ঘরবাড়ী এবং স্ত্রী পরিবার পরিজন ছেড়ে সামান্য সময়ের জন্য বের হও তাহলে তোমরা জান্নাতে চিরদিনের জন্য এমন সুন্দরী স্ত্রী লাভকরবে যারা দুনিয়ার দিকে তাকালে দুনিয়া ও আসমানের মধ্যবর্তী সবকিছু আলোকিত ও খুশবুতে ভরপুর হয়ে যাবে এবং তাদের মাথার চাদর এমন মূল্যবান যে, তা 'দুনিয়া ও মাফিহা' দুনিয়া এবং তার যাবতীয় বস্তু থেকে উত্তম হবে।

আল্লাহর রাস্তায় সামান্যতম সময় ব্যয় করা দুনিয়ার যাবতীয় কাজের চেয়ে বেশী মর্যাদাসম্পন্ন এবং দুনিয়ার তামাম সম্পদের চেয়ে বেশী মূল্যবান। পার্থিব লালসা চরিতার্থ করার জন্য বা দুনিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য যে সময় ব্যয় করা হয় তার ফল খুব ক্ষণস্থায়ী। অপরপক্ষে আল্লাহর রাস্তায় যে সময় ব্যয় হয় তার ফল নিজের এবং দনিয়াবাসীর জন্য মঙ্গলজনক ও চিরস্থায়ী হয়। দুনিয়ার মানুষের সুখ-শান্তি ও সংহতি বহন করে নিয়ে আসে। আল্লাহর দুনিয়া থেকে শয়তানের প্রভাব খতম করতে সক্ষম হলে আল্লাহর বান্দাগণ আরাম-আয়েশের জীবন-যাপনে সক্ষম হন। অন্যায় ও যুলুমের অবসান হয়।

দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর রাস্তায় যে সময় ব্যয় করা হয় আখিরাতে তা বিরাট সাফল্যের কারণ হবে। মানুষ দুনিয়ার জীবনে সুন্দরী মেয়ে, সুন্দর বাসগৃহ এবং পার্থিব সম্পদের লোভে পড়ে আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে সরে পড়ে। এ ধরনের নির্বোধেরা চিন্তা করে না, দুনিয়ার যিন্দেগী ক্ষণস্থায়ী আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। আর আখিরাতের জীবনে আল্লাহভীরু লোকদের জন্য এমন সব নি'আমত রয়েছে যা তামাম দুনিয়ার মানুষ চেষ্টা করেও দুনিয়াতে হাসিল করতে পারবে না। তাদের জানা উচিত যে, দুনিয়ার এসব সুন্দরী নারী বেহেশতের হুরের তুলনায় কিছুই নয়। আল্লাহ্ তা'আলা এসব হুর তার প্রিয় বান্দাদের জন্য রেখেছেন। তাঁরা এতো অপরূপ সুন্দরী যে, তাদের একজন যদি পৃথিবীর দিকে সামান্যতম চোখ তুলে তাকায় তা হলে আসমান-যমীনের মধ্যস্থ সবকিছু আলোকজ্জল ও সুগন্ধীময়। তাদের পরিধানের কাপড়-চোপড় এত মূল্যবান যে, শুধু মাথার একটি ওড়না দুনিয়া ও তার মধ্যস্থিত সবকিছু থেকে উত্তম ও মূল্যবান।

আল্লাহ্ আমাদের নির্বোধদের মধ্যে বুদ্ধির উদয় করুন এবং আমাদের সকলকে আখিরাতের কল্যাণ দান করুন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)