রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
হাদীস নং: ১০৩৬
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
আযানের ফযীলত: আযানের আওয়াজে শয়তানের পলায়ন
১০৩৬. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন নামাযের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান সশব্দে বায়ু ত্যাগ করতে করতে পালায়, যাতে আযানের আওয়াজ শুনতে না পায়। তারপর যখন আযান শেষ হয়ে যায়, ফিরে আসে। তারপর যখন নামাযের জন্য ইকামত দেওয়া হয়, তখনও পালায়। যখন ইকামত শেষ হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করতে থাকে আর যা তার মনে থাকে না সে সম্পর্কে বলে, অমুক বিষয়টা মনে করো, অমুক বিষয়টা মনে করো। ফলে লোকটার এমন অবস্থা হয়ে যায় যে, সে কত রাকাত পড়েছে বলতে পারে না। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ৬০৮; সহীহ মুসলিম: ৩৮৯। সুনানে আবু দাউদ। ৫১৬: সুনানে নাসাঈ। ৬৭০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৩৭৪; মুসনাদে আহমাদ ৮১২১; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৩৯২; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ২৫০৭; সুনানে দারা কুতনী: ১৪০৪)
كتاب الفضائل
باب فضل الأذان
1036 - وعن أَبي هريرة - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم: «إِذَا نُودِيَ بالصَّلاَةِ، أدْبَرَ الشَّيْطَانُ، وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لاَ يَسْمَعَ التَّأذِينَ، فَإذَا قُضِيَ النِّدَاءُ أقْبَلَ، حَتَّى إِذَا ثُوِّبَ للصَّلاةِ أدْبَرَ، حَتَّى إِذَا قُضِيَ التَّثْوِيبُ أقْبَلَ، حَتَّى يَخْطِرَ بَيْنَ المَرْءِ وَنَفْسِهِ، يَقُولُ: اذْكُرْ كَذَا واذكر كَذَا - لِمَا لَمْ يَذْكُر مِنْ قَبْلُ - حَتَّى يَظَلَّ الرَّجُلُ مَا يَدْرِي كَمْ صَلَّى». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
«التَّثْوِيبُ»: الإقَامَةُ.
«التَّثْوِيبُ»: الإقَامَةُ.
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) أخرجه: البخاري 1/ 158 (608)، ومسلم 2/ 6 (389) (19).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আযান নামায ও ঈমানের ডাক। এর শব্দসমূহ অত্যন্ত গৌরবজনক ও দুর্দান্ত প্রভাব বিস্তারকারী। ফলে শয়তানের পক্ষে তা সহ্য করা সম্ভব হয় না। তাই আযানের শব্দ শোনামাত্র সে ছুটে পালায়। কীভাবে ছুটে পালায়, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ (শয়তান সশব্দে বায়ু ত্যাগ করতে করতে পালায়)।
শয়তানের বায়ু ত্যাগ করাটা বাস্তবিক অর্থেও হতে পারে, প্রতীকী অর্থেও হতে পারে। বাস্তবিক অর্থে হওয়া এ কারণে সম্ভব যে, শয়তান মূলত জিন। জিনদেরও পানাহার করতে হয়। যারা পানাহার করে, তাদের বায়ু সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় ভয়-ভীতি ও আতঙ্কে পেটে মোচড় দেয়। ফলে বায়ু বের হয়ে আসে। আযানের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে শয়তান যখন পালাতে শুরু করে, তখন তারও এভাবে পেটে মোচড় দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। ফলে দৌড় দেওয়ার সময় তার বায়ু নির্গত হয়ে যায়। কেউ বলেন, সে বায়ু নির্গত করে ইচ্ছাকৃত। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য আযানকে হেয় করা। তাছাড়া সে তো স্বভাবগতভাবেই দুষ্ট। তাই আযানের যা উদ্দেশ্য, সে তার বিপরীত কাজ করে। আযান দেওয়ার উদ্দেশ্য মানুষকে নামাযের জন্য প্রস্তুত হতে বলা, যে প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো পাক-পবিত্র হওয়া। শয়তান বায়ু ত্যাগ করে তার উল্টোটা প্রকাশ করে। অর্থাৎ নামাযের জন্য প্রস্তুত হওয়া নয়; বরং তার বিপরীত কিছু করা।
আবার এটা প্রতীকী অর্থেও হতে পারে। বোঝানো উদ্দেশ্য দ্রুতবেগে দৌড় দেওয়া। সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে-
إِذَا أَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ حُصَاصٌ. 'মুআযযিন যখন আযান দেয়, তখন শয়তান দ্রুতবেগে পালায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৯)
حُصَاصٌ শব্দটির এক অর্থ সশব্দে বায়ু নির্গত হওয়া এবং আরেক অর্থ হলো দ্রুতবেগে দৌড়ানো। কেন শয়তান দ্রুতবেগে পালায়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
حَتَّى لَا يَسْمَعَ التَّأْذِينَ (যাতে আযানের আওয়াজ শুনতে না পায়)। সে আযানের শব্দ শুনতে চায় না। কেননা এতে ঈমানের ডাক রয়েছে। সে তো ঘোর বেঈমান; ঈমান ও ঈমানওয়ালার শত্রু। তাই আযানের শব্দ তার কাছে নিতান্তই অপ্রীতিকর; বরং বিরক্তিকর। তাই যেখানে গেলে এ আওয়াজ শোনা যাবে না, সেখানে চলে যায়। হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে-
إِنَّ الشَّيْطَانَ إِذَا سَمِعَ النِّدَاءَ بِالصَّلَاةِ ذَهَبَ حَتَّى يَكُونَ مَكَانَ الرَّوْحَاءِ.
'শয়তান যখন নামাযের ডাক শোনে, তখন সে সরে যায়, এমনকি রাওহা নামক স্থানে পৌঁছে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৮; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৬৪; সহীহ ইবন খুযায়মা ৩৯৩; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ১৮৯৫)
রাওহা হলো মদীনা মুনাউওয়ারা থেকে ৩৬ মাইল দূরে।
মহাদুষ্ট শয়তান কেবল পালিয়েই ক্ষান্ত হয় না; বরং মাঝপথেও যাতে আযানের শব্দ শুনতে না হয়, সেজন্য সশব্দে বায়ু নির্গত করে। কেননা বায়ু নির্গত হওয়ার শব্দ যেমন অমনোযোগী করে, তেমনি আওয়াজ শুনতেও বাধার সৃষ্টি করে।
শয়তানের কাজই তো শয়তানি করা, মানুষের ঈমান ও ইবাদতে বাধার সৃষ্টি করা। তাই আযানের সময় সে পালায় বটে, কিন্তু আযান শেষ হলেই আবার ফিরে আসে এবং আপন কাজে রত হয়ে যায়। তারপর যখন ইকামত হয়, তখনও আবার পালায়। কারণ ইকামতে তো হুবহু আযানের কথাগুলোই উচ্চারণ করা হয়ে থাকে, যা তার পক্ষে অসহনীয়। তারপর যখন ইকামত শেষ হয়, আবার ফিরে আসে। এবার তার কাজ কী? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
أَقْبَلَ حَتَّى يَخْطِرَ بَيْنَ الْمَرْءِ وَنَفْسِهِ (সে আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করতে থাকে)। অর্থাৎ তাকে নানা কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন হাদীছের পরের অংশে বলা হয়েছে- 'আর যা তার মনে থাকে না সে সম্পর্কে বলে, অমুক বিষয়টা মনে করো, অমুক বিষয়টা মনে করো। ফলে লোকটার এমন অবস্থা হয়ে যায় যে, সে কত রাকাত পড়েছে বলতে পারে না'। এভাবে শয়তান তাকে নামায সম্পর্কে সম্পূর্ণ অমনোযোগী করে ফেলে। অনেক সময় ভালো ভালো কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে অনেক জরুরি কথাও নামাযের মধ্যে মনে পড়ে যায়। সবই শয়তানের কারসাজি। শয়তান চায় না আল্লাহ তা'আলার কোনও বান্দা নামাযের ভেতর পরিপূর্ণ মনোযোগী থাকুক।
ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর একটি ঘটনা
ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর ঘটনা বর্ণিত আছে যে, একবার এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, আমি বহুদিন আগে কোনও এক জায়গায় আমার কিছু সম্পদ পুঁতে রেখেছিলাম। কিন্তু কোন জায়গায় পুঁতে রেখেছিলাম তা ভুলে গেছি। এ সংকট থেকে উদ্ধারে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন?
ইমাম আবু হানীফা রহ. বললেন, এটা তো ফকীহের কাজ নয়। কীভাবে আমি তোমাকে সাহায্য করব? তারপর তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, যাও, তুমি ভোর পর্যন্ত নফল নামায পড়তে থাকবে। ইনশাআল্লাহ তুমি কোথায় তা পুঁতে রেখেছিলে মনে পড়বে।
লোকটি চলে গেল এবং রাতের বেলা নামায পড়তে শুরু করল। ক্ষণিকের ভেতরই তার মনে পড়ে গেল কোথায় সে তা পুঁতে রেখেছিল। সে দ্রুত গিয়ে সে স্থানটি খুঁড়ল এবং ঠিকই তা পেয়ে গেল।
পরদিন ভোরবেলা সে এসে ইমাম সাহেবকে তা জানাল এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বস্তুটি পাওয়ার পর তুমি কী করলে? বাকি সময়টা কি নামাযে পার করলে? সে বলল, না। তিনি বললেন, বস্তুটি পাওয়ার জন্য নামায পড়লে; সেটি পাওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাকি সময়টা নামাযে কাটাতে পারলে না?
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আপনি তাকে রাতভর নামায পড়ার পরামর্শ কেন দিয়েছিলেন? তিনি বললেন, আমি জানতাম শয়তান তাকে রাতভর নামায পড়তে দেবে না। তাই সে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে বস্তুটির কথা মনে করিয়ে দেবে।
আযানের শব্দে শয়তান পালায়, নামাযকালে পালায় না কেন
প্রশ্ন হতে পারে, আযানের শব্দে শয়তান পালায়, অথচ নামায সে তুলনায় উত্তম হওয়া সত্ত্বেও পালায় তো না-ই, উল্টো নামাযের ভেতর নানা কুমন্ত্রণা দেয়, এর কারণ কী?
উলামায়ে কেরাম বলেন, এর কারণ হলো, আযানের শব্দ যতদূর পর্যন্ত যায়, ততদূর পর্যন্ত যা-কিছু আছে সকলেই মুআযযিনের পক্ষে সাক্ষ্যদান করে, যেমন পেছনে হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. বর্ণিত হাদীছে গত হয়েছে। শয়তান মানুষের ঘোর শত্রু। সে মানুষের পক্ষে সাক্ষী হতে চায় না। হাশরের ময়দানে সমস্ত মাখলুকের সামনে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরবে, এটা সে কী করে মেনে নিতে পারে?
এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তাকে যাতে না হতে হয়, সেজন্যই সে আযানের সময় পালায়, যাতে তা তার শুনতে না হয় এবং সাক্ষীও হতে না হয়। পক্ষান্তরে নামাযের বেলায় সাক্ষী হওয়ার কথা নেই। তাই সে পালায় না; উল্টো নামাযে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করে, যাতে নামাযের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনে সক্ষম না হয়।
কারও মতে আযানের সময় পালানোর কারণ আযানে তাওহীদের যে উচ্চারণ হয় এবং শাহাদাতের যে ঘোষণা হয়, তার গৌরব ও দাপট সে সইতে পারে না। পক্ষান্তরে নামাযে যদিও যিকির ও তিলাওয়াত থাকে এবং নামাযের আমলসমূহ যদিও অধিকতর শ্রেষ্ঠ, কিন্তু তার বেশির ভাগটাই হয় অনুচ্চস্বরে। কাজেই তাকে নূরানী আওয়াজের শক্তিমত্তার সম্মুখীন হতে হয় না। ফলে সে সহজেই নামাযীর নামাযে ব্যাঘাত সৃষ্টির সুযোগ পায়। এরূপ ক্ষেত্রে নামাযী ব্যক্তির উচিত শয়তানকে তাড়ানোর জন্য নামাযের ভেতর মনোযোগী থাকার চেষ্টা করা। এর সহজ উপায় হলো নামাযে যা পড়া হয় তা ধীর-শান্তভাবে পড়া, কী পড়া হচ্ছে সেদিকে লক্ষ রাখা আর যে কাজসমূহ করা হয়, তা সুন্নত ও আদব সহকারে করতে সচেষ্ট থাকা। ইনশাআল্লাহ এর দ্বারা সহজে খুশু-খুযূ পয়দা হবে এবং শয়তান থেকে আত্মরক্ষা করাও সম্ভব হবে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. শয়তান আযানের শব্দ সইতে পারে না। তাই তাকে অনেক বেশি দূরে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথাসম্ভব উচ্চ আওয়াজে আযান দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
খ. শয়তানেরাও পানাহার করে। তাই তাদের বায়ু ত্যাগের বিষয়টাও আছে।
গ. শয়তান নামাযীকে অমনোযোগী করার জন্য মনের ভেতর নানা ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। তাই তার ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার জন্য নামাযের দিকে বেশি মনোযোগী থাকা এবং সুন্নত ও আদব সহকারে সুন্দরভাবে নামায আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ (শয়তান সশব্দে বায়ু ত্যাগ করতে করতে পালায়)।
শয়তানের বায়ু ত্যাগ করাটা বাস্তবিক অর্থেও হতে পারে, প্রতীকী অর্থেও হতে পারে। বাস্তবিক অর্থে হওয়া এ কারণে সম্ভব যে, শয়তান মূলত জিন। জিনদেরও পানাহার করতে হয়। যারা পানাহার করে, তাদের বায়ু সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় ভয়-ভীতি ও আতঙ্কে পেটে মোচড় দেয়। ফলে বায়ু বের হয়ে আসে। আযানের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে শয়তান যখন পালাতে শুরু করে, তখন তারও এভাবে পেটে মোচড় দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। ফলে দৌড় দেওয়ার সময় তার বায়ু নির্গত হয়ে যায়। কেউ বলেন, সে বায়ু নির্গত করে ইচ্ছাকৃত। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য আযানকে হেয় করা। তাছাড়া সে তো স্বভাবগতভাবেই দুষ্ট। তাই আযানের যা উদ্দেশ্য, সে তার বিপরীত কাজ করে। আযান দেওয়ার উদ্দেশ্য মানুষকে নামাযের জন্য প্রস্তুত হতে বলা, যে প্রস্তুতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো পাক-পবিত্র হওয়া। শয়তান বায়ু ত্যাগ করে তার উল্টোটা প্রকাশ করে। অর্থাৎ নামাযের জন্য প্রস্তুত হওয়া নয়; বরং তার বিপরীত কিছু করা।
আবার এটা প্রতীকী অর্থেও হতে পারে। বোঝানো উদ্দেশ্য দ্রুতবেগে দৌড় দেওয়া। সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে-
إِذَا أَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ حُصَاصٌ. 'মুআযযিন যখন আযান দেয়, তখন শয়তান দ্রুতবেগে পালায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৯)
حُصَاصٌ শব্দটির এক অর্থ সশব্দে বায়ু নির্গত হওয়া এবং আরেক অর্থ হলো দ্রুতবেগে দৌড়ানো। কেন শয়তান দ্রুতবেগে পালায়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
حَتَّى لَا يَسْمَعَ التَّأْذِينَ (যাতে আযানের আওয়াজ শুনতে না পায়)। সে আযানের শব্দ শুনতে চায় না। কেননা এতে ঈমানের ডাক রয়েছে। সে তো ঘোর বেঈমান; ঈমান ও ঈমানওয়ালার শত্রু। তাই আযানের শব্দ তার কাছে নিতান্তই অপ্রীতিকর; বরং বিরক্তিকর। তাই যেখানে গেলে এ আওয়াজ শোনা যাবে না, সেখানে চলে যায়। হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে-
إِنَّ الشَّيْطَانَ إِذَا سَمِعَ النِّدَاءَ بِالصَّلَاةِ ذَهَبَ حَتَّى يَكُونَ مَكَانَ الرَّوْحَاءِ.
'শয়তান যখন নামাযের ডাক শোনে, তখন সে সরে যায়, এমনকি রাওহা নামক স্থানে পৌঁছে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৮৮; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৬৪; সহীহ ইবন খুযায়মা ৩৯৩; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ১৮৯৫)
রাওহা হলো মদীনা মুনাউওয়ারা থেকে ৩৬ মাইল দূরে।
মহাদুষ্ট শয়তান কেবল পালিয়েই ক্ষান্ত হয় না; বরং মাঝপথেও যাতে আযানের শব্দ শুনতে না হয়, সেজন্য সশব্দে বায়ু নির্গত করে। কেননা বায়ু নির্গত হওয়ার শব্দ যেমন অমনোযোগী করে, তেমনি আওয়াজ শুনতেও বাধার সৃষ্টি করে।
শয়তানের কাজই তো শয়তানি করা, মানুষের ঈমান ও ইবাদতে বাধার সৃষ্টি করা। তাই আযানের সময় সে পালায় বটে, কিন্তু আযান শেষ হলেই আবার ফিরে আসে এবং আপন কাজে রত হয়ে যায়। তারপর যখন ইকামত হয়, তখনও আবার পালায়। কারণ ইকামতে তো হুবহু আযানের কথাগুলোই উচ্চারণ করা হয়ে থাকে, যা তার পক্ষে অসহনীয়। তারপর যখন ইকামত শেষ হয়, আবার ফিরে আসে। এবার তার কাজ কী? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
أَقْبَلَ حَتَّى يَخْطِرَ بَيْنَ الْمَرْءِ وَنَفْسِهِ (সে আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করতে থাকে)। অর্থাৎ তাকে নানা কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমন হাদীছের পরের অংশে বলা হয়েছে- 'আর যা তার মনে থাকে না সে সম্পর্কে বলে, অমুক বিষয়টা মনে করো, অমুক বিষয়টা মনে করো। ফলে লোকটার এমন অবস্থা হয়ে যায় যে, সে কত রাকাত পড়েছে বলতে পারে না'। এভাবে শয়তান তাকে নামায সম্পর্কে সম্পূর্ণ অমনোযোগী করে ফেলে। অনেক সময় ভালো ভালো কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে অনেক জরুরি কথাও নামাযের মধ্যে মনে পড়ে যায়। সবই শয়তানের কারসাজি। শয়তান চায় না আল্লাহ তা'আলার কোনও বান্দা নামাযের ভেতর পরিপূর্ণ মনোযোগী থাকুক।
ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর একটি ঘটনা
ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর ঘটনা বর্ণিত আছে যে, একবার এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, আমি বহুদিন আগে কোনও এক জায়গায় আমার কিছু সম্পদ পুঁতে রেখেছিলাম। কিন্তু কোন জায়গায় পুঁতে রেখেছিলাম তা ভুলে গেছি। এ সংকট থেকে উদ্ধারে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন?
ইমাম আবু হানীফা রহ. বললেন, এটা তো ফকীহের কাজ নয়। কীভাবে আমি তোমাকে সাহায্য করব? তারপর তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, যাও, তুমি ভোর পর্যন্ত নফল নামায পড়তে থাকবে। ইনশাআল্লাহ তুমি কোথায় তা পুঁতে রেখেছিলে মনে পড়বে।
লোকটি চলে গেল এবং রাতের বেলা নামায পড়তে শুরু করল। ক্ষণিকের ভেতরই তার মনে পড়ে গেল কোথায় সে তা পুঁতে রেখেছিল। সে দ্রুত গিয়ে সে স্থানটি খুঁড়ল এবং ঠিকই তা পেয়ে গেল।
পরদিন ভোরবেলা সে এসে ইমাম সাহেবকে তা জানাল এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বস্তুটি পাওয়ার পর তুমি কী করলে? বাকি সময়টা কি নামাযে পার করলে? সে বলল, না। তিনি বললেন, বস্তুটি পাওয়ার জন্য নামায পড়লে; সেটি পাওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাকি সময়টা নামাযে কাটাতে পারলে না?
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আপনি তাকে রাতভর নামায পড়ার পরামর্শ কেন দিয়েছিলেন? তিনি বললেন, আমি জানতাম শয়তান তাকে রাতভর নামায পড়তে দেবে না। তাই সে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে বস্তুটির কথা মনে করিয়ে দেবে।
আযানের শব্দে শয়তান পালায়, নামাযকালে পালায় না কেন
প্রশ্ন হতে পারে, আযানের শব্দে শয়তান পালায়, অথচ নামায সে তুলনায় উত্তম হওয়া সত্ত্বেও পালায় তো না-ই, উল্টো নামাযের ভেতর নানা কুমন্ত্রণা দেয়, এর কারণ কী?
উলামায়ে কেরাম বলেন, এর কারণ হলো, আযানের শব্দ যতদূর পর্যন্ত যায়, ততদূর পর্যন্ত যা-কিছু আছে সকলেই মুআযযিনের পক্ষে সাক্ষ্যদান করে, যেমন পেছনে হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী রাযি. বর্ণিত হাদীছে গত হয়েছে। শয়তান মানুষের ঘোর শত্রু। সে মানুষের পক্ষে সাক্ষী হতে চায় না। হাশরের ময়দানে সমস্ত মাখলুকের সামনে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরবে, এটা সে কী করে মেনে নিতে পারে?
এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তাকে যাতে না হতে হয়, সেজন্যই সে আযানের সময় পালায়, যাতে তা তার শুনতে না হয় এবং সাক্ষীও হতে না হয়। পক্ষান্তরে নামাযের বেলায় সাক্ষী হওয়ার কথা নেই। তাই সে পালায় না; উল্টো নামাযে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করে, যাতে নামাযের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনে সক্ষম না হয়।
কারও মতে আযানের সময় পালানোর কারণ আযানে তাওহীদের যে উচ্চারণ হয় এবং শাহাদাতের যে ঘোষণা হয়, তার গৌরব ও দাপট সে সইতে পারে না। পক্ষান্তরে নামাযে যদিও যিকির ও তিলাওয়াত থাকে এবং নামাযের আমলসমূহ যদিও অধিকতর শ্রেষ্ঠ, কিন্তু তার বেশির ভাগটাই হয় অনুচ্চস্বরে। কাজেই তাকে নূরানী আওয়াজের শক্তিমত্তার সম্মুখীন হতে হয় না। ফলে সে সহজেই নামাযীর নামাযে ব্যাঘাত সৃষ্টির সুযোগ পায়। এরূপ ক্ষেত্রে নামাযী ব্যক্তির উচিত শয়তানকে তাড়ানোর জন্য নামাযের ভেতর মনোযোগী থাকার চেষ্টা করা। এর সহজ উপায় হলো নামাযে যা পড়া হয় তা ধীর-শান্তভাবে পড়া, কী পড়া হচ্ছে সেদিকে লক্ষ রাখা আর যে কাজসমূহ করা হয়, তা সুন্নত ও আদব সহকারে করতে সচেষ্ট থাকা। ইনশাআল্লাহ এর দ্বারা সহজে খুশু-খুযূ পয়দা হবে এবং শয়তান থেকে আত্মরক্ষা করাও সম্ভব হবে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. শয়তান আযানের শব্দ সইতে পারে না। তাই তাকে অনেক বেশি দূরে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথাসম্ভব উচ্চ আওয়াজে আযান দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
খ. শয়তানেরাও পানাহার করে। তাই তাদের বায়ু ত্যাগের বিষয়টাও আছে।
গ. শয়তান নামাযীকে অমনোযোগী করার জন্য মনের ভেতর নানা ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। তাই তার ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার জন্য নামাযের দিকে বেশি মনোযোগী থাকা এবং সুন্নত ও আদব সহকারে সুন্দরভাবে নামায আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)