রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০১৪
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
বিশেষ বিশেষ সূরা ও আয়াত পাঠের প্রতি উৎসাহদান: সূরা ফালাক ও সূরা নাসের ফযীলত
১০১৪. হযরত উকবা ইবন আমির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তুমি কি ওই আয়াতগুলো দেখনি, যা আজ রাতে নাযিল হয়েছে, তার সমতুল্য কিছু কখনও দেখা যায়নি? তা হলো قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ও قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ। -মুসলিম (সহীহ মুসলিম : ৮১৪; সুনানে নাসাঈ : ৯৫৪; জামে‘ তিরমিযী : ২৯০২; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর : ৯৬৮; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ১২১৩; ইবনু শাব্বাহ, তারীখুল মাদীনা, ৩ খণ্ড, ১০১১ পৃষ্ঠা)
كتاب الفضائل
باب الحث عَلَى سور وآيات مخصوصة
1014 - وعن عقبة بن عامِر - رضي الله عنه: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قَالَ: «ألَمْ تَرَ آيَاتٍ أُنْزِلَتْ هذِهِ اللَّيْلَةَ لَمْ يُرَ مِثْلُهُنَّ قَطُّ؟ {قُلْ أَعْوذُ بِرَبِّ الفَلَقِ} وَ {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ}». رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 2/ 200 (814) (264).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

সূরা ফালাক ও সূরা নাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ সূরা। দৈহিক ও আত্মিক সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষায় এ সূরাদু’টি খুবই কার্যকর। তাই প্রত্যেক মুমিনের এ সূরাদু’টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পড়া উচিত।

শানে নুযূল :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জনৈক ইহুদির জাদু করার ঘটনা

একবার এক ইহুদী নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাদু করেছিল। এর প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষভাবে তাঁর স্মরণশক্তিতে এর আছর দেখা দেয়। অনেক সময় এমনও হতো যে, তিনি যে কাজ করেননি, মনে করতেন তা বুঝি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা স্বপ্নযোগে তাঁকে তাঁর এ অসুস্থতার কারণ সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.-কে লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে আমার রোগ সম্পর্কে বলে দিয়েছেন। স্বপ্নযোগে দু’জন লোক আমার কাছে আসল। তাদের একজন আমার শিয়রে এবং অন্যজন পায়ের কাছে বসল। যে ব্যক্তি শিয়রের কাছে ছিল, সে পায়ের কাছের জনকে বলল, তার রোগটা কী? সে বলল, তার উপর জাদু করা হয়েছে। প্রথমজন জিজ্ঞেস করল, কে তাকে জাদু করেছে? সে বলল, লাবীদ ইবন আ‘সাম নামক এক ইহুদী। জিজ্ঞেস করল, সে জাদু করেছে কীসে? উত্তর দিল, একটি চিরুনি ও আঁচড়াতে ঝরে পড়া চুলের ভেতর। জিজ্ঞেস করল, চিরুনিটি কোথায়? উত্তর দিল, খেজুরের কোষের ভেতর রেখে সেটি যারওয়ান কুয়ার তলদেশে একটি পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছে।

ঘুম থেকে জাগার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কুয়াটির কাছে গেলেন। বললেন, স্বপ্নে আমাকে এ কুয়াটিই দেখানো হয়েছে। তারপর সে কুয়ার তলদেশ থেকে চিরুনিটি বের করে আনা হলো। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. বললেন, আপনি জানিয়ে দিচ্ছেন না কেন (যে, আপনার উপর যে লোকটি জাদু করেছে সে কে)? তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে রোগ থেকে মুক্তিদান করেছেন। আমি কারও অনিষ্টের কারণ হতে চাই না। অন্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, কোষটির ভেতর একটি সুতাও ছিল এবং সে সুতায় ছিল ১১টি গিঁট। প্রত্যেকটি গিঁটে একটি করে সুই গেঁথে রাখা হয়েছিল। সুতার সেই গিঁটগুলো খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অসুস্থতা ৬ মাস স্থায়ী হয়েছিল।

কোনও বর্ণনায় আছে, কয়েকজন সাহাবী জানতে পেরেছিলেন যে, জাদুকরী সে লোকটি ছিল লাবীদ ইবন আ‘সাম। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে আরয করেছিলেন, আমরা কি ওই লোকটিকে হত্যা করব না? কিন্তু তিনি আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.-কে যে জবাব দিয়েছিলেন তাদেরকেও সেই একই
জবাব দিলেন। তিনি তাকে হত্যা করতে তো দিলেনই না, এমনকি তার প্রতি নিজের পক্ষ থেকে কোনও মন্দ আচরণও কোনওদিন করেননি। বুঝতেই দেননি যে, তিনি জানেন সে-ই তাঁর উপর জাদু করেছে।
জাদুর সে ১১টি গিঁট কীভাবে খোলা হয়েছিল? বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তা‘আলা ১১টি আয়াত নাযিল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একেকটি আয়াত পাঠ করতে থাকেন এবং একেকটি গিঁট খুলতে থাকেন। এভাবে ১১টি আয়াত পড়ে ১১টি গিঁট খুলে ফেলেন। সবগুলো গিঁট খুলে যাওয়া মাত্রই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান। তাঁর মনে হচ্ছিল যেন একটি ভারী বোঝা তাঁর উপর থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই এগারো আয়াতই হলো সূরা নাস ও সূরা ফালাকের সর্বমোট আয়াত। সূরা ফালাকে পাঁচ আয়াত ও সূরা নাসে ছয় আয়াত। এই হলো সূরাদু’টি নাযিলের শানে নুযূল বা প্রেক্ষাপট। (সহীহ বুখারী : ৩২৬৮; সহীহ মুসলিম : ২১৫৬; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৫৬৯; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫৪৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ২৩৫১৯; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ৫৯৩৪; সহীহ ইবন হিব্বান : ৬৫৮৩; তাবারানী, আল মু‘জামুল আওসাত : ৫৯২৬)

উল্লেখ্য, নবীগণও মানুষ ছিলেন। তাই মানবীয় কার্যকারণ তাদের উপরও প্রযোজ্য হতো। জাদু একটি কারণ, যা মানুষের উপর ক্রিয়াশীল হয়। কাজেই অন্যান্য মানুষের উপর যেমন জাদুর প্রভাব পড়ে থাকে, নবী-রাসূলগণের উপরও তেমনি তার প্রভাব পড়ত। এর দ্বারা নবীর নবুওয়াতের সত্যতার উপর কোনও আঁচড় পড়ে না।

সূরা ফালাক ও সূরা নাসের ফযীলত   
বিভিন্ন হাদীছে সূরা ফালাক ও সূরা নাসের বিশেষ ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন আলোচ্য হাদীছে বলা হয়েছে- أَلَمْ تَرَ آيَاتٍ أُنْزِلَتِ اللَّيْلَةَ لَمْ يُرَ مِثْلُهُنَّ قَط ؟ (তুমি কি ওই আয়াতগুলো দেখনি, যা আজ রাতে নাযিল হয়েছে, তার সমতুল্য কিছু কখনও দেখা যায়নি?) অর্থাৎ যে-কোনও অনিষ্ট হতে আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণের জন্য এরচে’ উৎকৃষ্ট কিছু দেখা যায়নি। কেননা এ সূরাদু’টির বিষয়বস্তু হলো প্রকাশ্য-গুপ্ত সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ সম্পর্কিত এবং তাও অত্যন্ত গভীর ও পূর্ণাঙ্গ ভাষায়। কুরআন মাজীদে এমন আর কোনও সূরা নেই, যার সবগুলো আয়াতের সম্পর্ক আশ্রয় গ্রহণের সঙ্গে। তাই এ সূরাদু’টির নামই হয়ে গেছে মু‘আউবিযাতান। একবচনে মু‘আউবিযাতুন। অর্থাৎ যে সূরা দ্বারা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা হয়। এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি কি তোমাকে এমন সূরা শেখাব না, যার সমতুল্য কোনও সূরা না তাওরাতে নাযিল হয়েছে, না যাবূরে, না ইনজীলে আর না কুরআনে? সাহাবী বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, কুল আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক ও কুল আ‘উযু বিরাব্বিন নাস। (ইবন শাব্বাহ, তারীখুল মাদীনা, ৩ খণ্ড, ১০১২ পৃষ্ঠা)

হযরত উকবা ইবন আমির রাযি. বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে জুহফা ও আবওয়া’র মাঝখান দিয়ে চলছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড বাতাস বইতে শুরু করল। ঘোর অন্ধকার আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং আমাকে বললেন-

يا عُقبةُ تعَوَّذْ بهما؛ فما تعوَّذَ متعَوِّذٌ بمِثْلِهما

‘হে উকবা! এ সূরাদু’টি দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করো। কোনও আশ্রয় গ্রহণকারী এর মতো কিছু দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করেনি’। (সুনানে আবূ দাউদ : ১৪৬৩; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ১২৭; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ৪০৫০; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক : ৯৯৯; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর : ৯৫০)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন খুবায়ব রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক বর্ষণমুখর অন্ধকার রাতে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুঁজতে বের হলাম। যখন তাঁকে পেয়ে গেলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, বলো। আমি বললাম, কী বলব? তিনি বললেন-

قُلْ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ حِينَ تُمْسِي، وَحِينَ تُصْبِحُ، ثَلَاثَ مَرَّاتٍ تَكْفِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ

‘প্রত্যেক সকাল ও সন্ধ্যাবেলা কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ এবং সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিনবার পড়ো। এটা তোমার পক্ষে সবকিছু থেকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।’ (সুনানে আবূ দাউদ : ৫০৮২; সুনানে নাসাঈ : ৫৪২৮; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা : ৮১; বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান : ২৩৩৬)

‘সূরা ফালাক’-এর তাফসীর   
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ (বলো, আমি ভোরের মালিকের আশ্রয় গ্রহণ করছি)। فَلَق শব্দটির মূল অর্থ বিদীর্ণ করা। কাজেই শস্যবীজ বিদীর্ণ করে অঙ্কুর উদ্গত করা, মেঘ ফুঁড়ে বৃষ্টি বর্ষণ করা, মাটি ফুঁড়ে ঝরনাধারা উৎসারিত করা, গর্ভাশয় ফুঁড়ে সন্তান ভূমিষ্ঠ করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভোর অর্থেও শব্দটির ব্যবহার এ কারণেই হয় যে, তখন রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে ভোরের আলো উৎসারিত করা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

فَالِقُ الْإِصْبَاحِ

‘(তিনিই) ভোরের উদ্ঘাটক’। (সূরা আন‘আম, আয়াত ৯৬)
ভোরবেলা রাতের অবসান ঘটে। অন্ধকার দূর হয়ে যায়। চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ে। সময়টা খুবই বরকতপূর্ণ। এক হাদীছে আছে-
بُورِكَ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا. ‘আমার উম্মতের জন্য তাদের ভোরবেলায় বরকত রাখা হয়েছে’। (মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ৫৪০৯; তাবারানী, আল মু‘জামুল আওসাত : ৭৫৪)

এ বরকতপূর্ণ ভোর আল্লাহ তা‘আলাই সৃষ্টি করেন। কাজেই ভোরের মালিক বলার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা হয়। যে-কোনও দুআ ও প্রার্থনার আগে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করলে তা দুআ কবুলের পক্ষে সহায়ক হয়। সূরাটির পরবর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলার কাছে প্রার্থনা রয়েছে। তাই শুরুটা করা হয়েছে প্রশংসার দ্বারা। এ প্রশংসার সঙ্গে প্রার্থিত বিষয়ের যথেষ্ট মিলও রয়েছে। কেননা অন্ধকারের ভেতর নানা অনিষ্টের প্রকাশ ঘটে। যখন ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ে, তখন সে অনিষ্ট দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলাই আলো সৃষ্টির দ্বারা অনিষ্টের অবসান ঘটানোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। তো যে আল্লাহ তা‘আলা অনিষ্ট দূর করার জন্য আলো সৃষ্টি করেছেন, সে আল্লাহই যে সর্বপ্রকার অনিষ্ট দূর করার ক্ষমতা রাখেন, তাতে সন্দেহ কী?
এর ভেতর ইঙ্গিত রয়েছে, প্রকাশ্য অন্ধকার ও গুপ্ত অন্ধকার সকল অন্ধকার থেকে কেবল আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করার দ্বারাই মুক্তিলাভ করা যেতে পারে।

প্রকাশ্য অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভ হয় সূর্যের আলো দ্বারা। আর গুপ্ত অন্ধকার অর্থাৎ ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসের অন্ধকার, নীতি-নৈতিকতাহীনতার অন্ধকার এবং অন্যায় কার্যকলাপের অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভ হয় দীনের আলো দ্বারা। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অদৃশ্য অন্ধকার বিতাড়নের সমুজ্জ্বল সূর্য। তাঁর নিয়ে আসা দীনের অনুসরণ দ্বারাই সে অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভ হতে পারে। সুতরাং ভোরের আলোর স্রষ্টার আশ্রয় গ্রহণ দ্বারা এটাও উদ্দেশ্য যে, তিনি যেন আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত এ সমুজ্জ্বল সূর্য ও তাঁর আনীত দীনের অনুসরণে অটল-অবিচল রাখেন।
مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ (তিনি যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে)। অর্থাৎ তাঁর সকল সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে। এ জগতে আল্লাহ তা‘আলা যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রত্যেকটির মধ্যেই যেমন নানা কল্যাণ নিহিত আছে, তেমনি কিছু না কিছু অনিষ্টও অবশ্যই আছে, তা জীবজন্তু হোক বা জড়পদার্থ। জীবজন্তুর মধ্যেও আবার মানুষ ও জিনসহ সর্বপ্রকার প্রাণী রয়েছে। সৃষ্ট বস্তু যে জাতীয়ই হোক, তার অনিষ্ট হতে পারে শারীরিক, হতে পারে আর্থিক। আবার সে অনিষ্ট হতে পারে দুনিয়াবী, হতে পারে দীনী। সর্বপ্রকার অনিষ্ট দূর করে প্রতিটি বস্তুকে নিখুঁত কল্যাণকর বানাতে পারেন কেবল তার সৃষ্টিকর্তাই। তাই আয়াতটির মাধ্যমে প্রার্থনা করা হয়েছে যে, হে আল্লাহ! হে জগতের সৃষ্টিকর্তা! সৃষ্টিরাজির যার মধ্যে যে অনিষ্ট আছে তা থেকে আত্মরক্ষার জন্য আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। আপনি আমাকে তা থেকে রক্ষা করুন।

وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ (এবং অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা ছেয়ে যায়)। غَاسِقٍ শব্দটির উৎপত্তি غَسَقَ থেকে। এর অর্থ পূর্ণ হওয়া। বলা হয়, غَسَقَ الْقَمَرُ (চাঁদ ষোলো কলায় পূর্ণ হয়েছে)। রাত অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তা এ কারণে যে, রাতের বেলা চারদিকে অন্ধকার ছেয়ে যায়, অন্ধকার পূর্ণতা লাভ করে। দিনের বেলায়ও মেঘের কারণে অন্ধকার দেখা দিতে পারে। কিন্তু সে অন্ধকার রাতের মতো পরিপূর্ণ হয় না। দরজা-জানালা বন্ধ করলে ঘরও অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু সে অন্ধকার ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে না। মোটকথা, রাতের বেলা অন্ধকার পূর্ণতা পায় বলে রাতকেও غَاسِقٍ বলা হয়।

غَسَقَ এর এক অর্থ শীতলতা। দিনের তুলনায় রাত শীতল থাকে বলে রাতকে غَاسِقٍ বলা হয়। غَاسِقٍ এর আরেক অর্থ হলো চাঁদ। চাঁদ রাতের বেলা উদিত হয়। তাই রাতের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্কের ভিত্তিতেও রূপকার্থে غَاسِقٍ দ্বারা রাত বোঝানো যেতে পারে। রাতের বেলা অন্ধকার ছেয়ে যায়।

ফলে কীটপতঙ্গ, হিংস্র
জীবজন্তু, মানব শয়তান ও জিন শয়তান সর্বপ্রকার অনিষ্টকর প্রাণী রাতের অন্ধকারে বের হয় ও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এদের দ্বারা যে-কারও যে-কোনও অনিষ্টের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ আয়াত দ্বারা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে তিনি এসবের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন।
وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ ‘এবং সেই সব ব্যক্তির অনিষ্ট হতে, যারা (তাগা বা সুতায়) গিরায় ফুঁ দেয়’। النَّفَّاثَاتِ শব্দটি আতিশয্যবোধক কর্তৃবাচ্য পদ। এটি বহুবচন। এর একবচন النَّفَّاثَةُ। শব্দটি বাহ্যত স্ত্রীলিঙ্গ। সে হিসেবে অর্থ হয় এমনসব নারী, যারা ফুঁ দেয়। অর্থাৎ যে জাদুকরেরা তাগা বা সুতার গিরায় ফুঁ দেয়। জাদুকর নারী, পুরুষ সবরকমই হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও নারীবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এ কারণে যে, জাদু মূলত অশুভ আত্মার কাজ। মানুষ বা জিন যারাই জাদু করে, তারা তাদের অশুভ আত্মার প্রভাবেই তা করে থাকে। অশুভ আত্মার আরবী প্রতিশব্দ হলো النَّفْسُ الْخَبِيثَةُ (আন-নাফসুল খাবীছা)। النَّفْسُ শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ। এ কারণেই আয়াতে এর বিশেষণ হিসেবে স্ত্রীলিঙ্গ النَّفَّاثَاتِ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন নারী জাদুকর। এটা সঠিক নয়। কারণ জাদু কেবল নারীরাই করে না। সূরাটি যে প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে, প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে তাতে জাদুকর তো ছিল একজন পুরুষ- লাবীদ ইবন আ‘সাম।

وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ (এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে)। حَاسِدٍ (হিংসুক) বলা হয় এমন লোককে, অন্যের ভালো কিছু দেখলে যার ভালো লাগে না; অন্তরে জ্বালাবোধ করে। কারও ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি দেখলে, কারও চাকরিতে প্রমোশন দেখলে, কারও ছেলেমেয়ে সুন্দর বা মেধাবী দেখলে, কারও জমিতে বা গাছে ভালো ফল-ফসল দেখলে, কারও সুনাম-সুখ্যাতি দেখলে এবং এ জাতীয় প্রশংসনীয় যা-কিছু আছে তা কাউকে পেতে দেখলে যার গাত্রদাহ হয়, তাকেই حَاسِدٍ বলা হয়। এরূপ খাসলতকে বলা হয় হাসাদ বা হিংসা।

হিংসার প্রকারভেদ   
হিংসুক দু’রকম হয়ে থাকে। (ক) যে অন্যের ভালো কিছু দেখে মনে কষ্ট পায়, কিন্তু কথা বা কাজে তা প্রকাশ করে না এবং যার প্রতি হিংসা হয় তার কোনও ক্ষতি করারও চেষ্টা করে না। এতে সে নিজে কষ্ট পায়, কিন্তু অন্যকে কষ্ট দেয় না। এটাও একটা মন্দ স্বভাব। কিন্তু এতটুকুতে কোনও গুনাহ নেই। গুনাহ না হলেও এ স্বভাব আস্তে আস্তে প্রবল হয়ে উঠতে পারে এবং একপর্যায়ে এরূপ ব্যক্তি অন্যের ক্ষতিসাধনেও লিপ্ত হতে পারে। তাই কারও অন্তরে এ রোগ থাকলে তার প্রতিকার করা উচিত। চেষ্টা করা উচিত যাতে অন্তর থেকে এটা দূর হয়ে যায়। এ স্তরের হিংসুক দ্বারা যেহেতু অন্যের কোনও ক্ষতি হয় না, তাই আয়াতে তার ক্ষতি থেকে আশ্রয় গ্রহণও করা হয়নি। বরং আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে দ্বিতীয় প্রকার হিংসুক থেকে, যে হিংসার কাজটি করে অর্থাৎ হিংসার বশবর্তীতে অন্যের ক্ষতি করে।
(খ) এমন হিংসুক, যে অন্যের ভালো কিছু দেখে কষ্টে পাওয়ার পাশাপাশি কথা বা কাজে তার ক্ষতি করারও চেষ্টা করে। এভাবে হিংসা প্রকাশ করাটা অবশ্যই গুনাহ। এরূপ ব্যক্তি কেবল নিজেই হিংসার আগুনে পুড়ে মরে না; অন্যকেও পোড়ানোর চেষ্টা করে। তাই এর প্রতিকার করা ফরয। এর প্রতিকার করার সবচে’ শক্তিশালী উপায় হলো এর মন্দত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা।

এটা যে কত মন্দ স্বভাব, তা তো এর দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদের এ সূরায় মানুষকে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় শিক্ষা দিয়েছেন। একবার চিন্তা করুন, আপনার ভেতর যদি হাসাদ থাকে, তবে মানুষ নামাযে, নামাযের বাইরে এ সূরাটি পাঠ করে আর এর মাধ্যমে আপনার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করে। মানুষ যদি আপনাকে একজন হিংসুক মনে করে, যদি আপনার থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তবে ভাবুন আপনাকে তারা কোন চোখে দেখছে! আপনার সম্পর্কে তাদের মনের ভাবনাটা কেমন! এ মন্দ স্বভাব যদি আমাদের মধ্যে থেকে থাকে, তবে আমাদের খুবই লজ্জিত হওয়া উচিত। চিন্তা করা উচিত আমি কতইনা নিকৃষ্ট লোক! আমার কি এমনই থাকা উচিত? নিজেকে এর থেকে উদ্ধার করা উচিত নয় কি?
হিংসার ভয়াবহতা   

এটা এমন এক মন্দ খাসলাত, যা মানুষকে হাজারও পাপকর্মে লিপ্ত করে। যার প্রতি হিংসা হয়, তাকে হেনস্তা করার জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করা হয়। লোকসম্মুখে তাকে ছোট করার জন্য নানা কৌশল নেওয়া হয়। তার জান, মাল ও ইজ্জতের উপর নানাভাবে আক্রমণ চালানো হয়। তাকে খাটো করার জন্য করা হয় নিজের বড়াই। নিজে কিছু না হয়েও অহংকার-অহমিকা প্রদর্শন করা হয়। সবচে’ বড় কথা তকদীরের উপর বিশ্বাসকেই করা হয় ক্ষতবিক্ষত। তকদীরের উপর যার সত্যিকারের বিশ্বাস আছে, সে কখনওই অন্যের প্রতি ঈর্ষাকাতর হতে পারে না। দেখা যাচ্ছে হাসাদ মানুষের ঈমান-আমল সব বরবাদ করে দেয়। তাই তো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেছেন-

إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ؛ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ.

‘তোমরা হাসাদ থেকে সাবধান থেকো। কেননা হাসাদ সমস্ত পুণ্য খেয়ে ফেলে (অর্থাৎ নষ্ট করে দেয়), যেমন আগুন কাঠ খেয়ে ফেলে’। (সুনান আবূ দাউদ : ৪৯০৩; সুনানে ইবন মাজাহ : ৪২০৯; মুসনাদুল বাযযার : ৬২১২; মুসনাদে আবদ ইবন হুমাইদ : ১৪৩০; বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান : ৬১৮৪; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক : ৭২২; মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ৩৪৫৬)
লক্ষণীয়, সূরা ফালাকে যেসকল অনিষ্ট হতে আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে, মৌলিকভাবে তার সম্পর্ক মানুষের দেহের সঙ্গে, যদিও ব্যাপকার্থে সবরকম ক্ষতিই এর অন্তর্ভুক্ত। তারপর সূরা নাসে যেসব ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে, তার সম্পর্ক মানুষের আত্মার সঙ্গে। মানুষ ও জিন শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে মানুষের আত্মার ক্ষতিসাধন করে। সে ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্যই মূলত সূরা নাসে আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করার হুকুম দেওয়া হয়েছে।

‘সূরা নাস’-এর তাফসীর  
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ (বলো, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি সমস্ত মানুষের প্রতিপালকের)। অর্থাৎ যেই সত্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি নিজ ইচ্ছা ও শক্তি-ক্ষমতা দ্বারা মানুষের প্রতিপালন করেন, যিনি মানুষের জীবনরক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থাপনা করেন, আমি তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করছি। তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করছি।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও তার দুর্বলতা   
আল্লাহ তা‘আলা মহাবিশ্বের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা ও মালিক। তিনি রাব্বুল আলামীন। কিন্তু এ আয়াতে কেবল মানুষের প্রতিপালক বলা হয়েছে। এর এক কারণ তো এই যে, মানুষ সৃষ্টির মধ্যমণি। জগতের সবকিছু মানুষেরই জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ছোট থেকে বড় যত মাখলূক আছে, সবকিছুকে তিনি মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِّنْهُ

‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা সবই তিনি নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন’।(সূরা জাসিয়া, আয়াত ১৩)

কাজেই মানুষের প্রতিপালক বললে বাকি সব মাখলূকও এর মধ্যে এসে যায়। তাছাড়া মানুষের প্রতিপালক বলার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার প্রতিপালকত্বের মহিমাও প্রকাশ পায়। এই যে অগণিত মাখলূক মহাবিশ্বে বিরাজ করছে, সবই যদি মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে, তবে সে মানুষ আল্লাহ তা‘আলার কাছে কতইনা মর্যাদাবান। মানুষ যাতে সৃষ্টিরাজির মধ্যে নিহিত শক্তি ও গুণাবলি নিজ কাজে লাগাতে পারে, সেজন্য আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে ক্ষমতাও দিয়েছেন প্রচুর। মানুষ বহু বিচিত্র সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের আধার। সৃষ্টির শুরু থেকে এ যাবৎকাল মানুষ তার সে সম্ভাবনা- সামর্থ্যের কী বিপুল ও কী বিস্ময়কর প্রকাশই না ঘটিয়েছে! পৃথিবীর ইতিহাস মানবকীর্তিতে পূর্ণ। মানুষের এই কীর্তি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলার রাবূবিয়াত ও প্রতিপালকত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।

অপরদিকে এতসব গুণ সত্ত্বেও মানুষের দুর্বলতারও শেষ নেই। এতসব ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তার সামনে এসে পড়ে হাজারও প্রতিকূলতা। সে প্রতিকূলতার সামনে মানুষ একেবারেই অসহায়। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সে চলতেই পারে না। বিশ্বজগতের বস্তুরাজি নিয়ে তাকে চলতে হয়। মৌলিকভাবে অন্য কোনওকিছুরই মানুষের মুখাপেক্ষী নয়। মানুষকে প্রয়োজন পড়ে না কারও। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন থাকে সকলের কাছে। সেই সকল কিছু যাতে মানুষ নিজ প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারে আর তা করতে গিয়ে যাতে সে কোনও ক্ষতির সম্মুখীন না হয় এবং আপতিত সব ক্ষতি থেকে যাতে সে বাঁচতে পারে, সেজন্য আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। ‘আউযু বিরাব্বিন নাস’-এর মধ্যে রয়েছে সে সাহায্য প্রার্থনারই আকুতি।

কুল মাখলূকাত দ্বারা উপকৃত হওয়া ও সবকিছুর ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার বিষয়টা মানুষেরই সাথে সম্পৃক্ত। তাই আশ্রয় গ্রহণের আকুতির সঙ্গে ‘মানুষের প্রতিপালক’ সম্বোধনই বেশি সংগতিপূর্ণ। সাধারণভাবে রাব্বুল আলামীন বা সকলের প্রতিপালক বলার তুলনায় এই বিশেষ সম্বোধনের মধ্যে মুখাপেক্ষী মানুষের পক্ষ হতে তার প্রতিপালকের রহমত ও দয়া প্রার্থনার আকুলতা খানিকটা বেশিই প্রকাশ পায়।

তাছাড়া বিশ্বের বস্তুর্রাজির অনিষ্ট বিশেষত যারা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, তাদের অনিষ্ট দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ। আল্লাহ তা‘আলা যেমন এই মানুষের সৃষ্টিকর্তা, তেমনি যাদের দ্বারা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদেরও সৃষ্টিকর্তা। তিনিই অনিষ্টকারীদেরকে মানুষের অনিষ্ট সাধন থেকে বিরত রাখতে পারেন এবং মানুষকে তাদের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করতে পারেন। এ হিসেবে অনিষ্টের শঙ্কায় শঙ্কিত মানুষের জন্য তো করণীয় এটাই যে, সে তার হেফাজতের জন্য তার যিনি মালিক ও সৃষ্টিকর্তা, তাঁরই আশ্রয়ার্থী হবে।

مَلِكِ النَّاسِ (সমস্ত মানুষের অধিপতির)। অর্থাৎ আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি সেই সত্তার, যাঁর আধিপত্য মানুষের উপর পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান। মানুষ তাঁরই খালিক্ব বিধানের অধীন। মানুষের উপর তাঁরই শর‘ঈ বিধান আরোপিত। তাঁরই ইচ্ছা ও তাঁরই হুকুম মানুষের উপর কার্যকর হয়। মানুষের উপর তাঁর ফয়সালাই চূড়ান্ত। মানুষ অন্যের উপর আপন আপন ইচ্ছা ও ক্ষমতা আরোপ করে, কিন্তু তার উপর আরোপিত হয় সেই পরম অধিপতির ইচ্ছা। মানুষ সর্বতোভাবে কেবল তাঁরই ক্ষমতার অধীন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার সর্বময় কর্তৃত্ব ও আধিপত্য প্রকাশ পাবে চূড়ান্ত রূপে। সুতরাং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

- يَقبِضُ اللهُ الأرضَ يَومَ القيامةِ، ويَطوي السَّماءَ بيَمينِه، ثُمَّ يقولُ: أنا المَلِكُ، أينَ مُلوكُ الأرضِ؟

‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবী মুষ্টিবদ্ধ করবেন এবং আকাশমণ্ডলী হাতের ভেতর গুটিয়ে ধরবেন। তারপর বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় পৃথিবীর বাদশাহগণ?’ (সহীহ বুখারী : ৪৮১২; সহীহ মুসলিম : ২৭৮৭; সুনানে দারিমী : ২১৪১; সুনানে ইবন মাজাহ : ১৯২; মুসনাদুল বাযযার : ৭৭৫১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৬৪৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ৪৩০৪; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত : ৪৩; আল আজুররী, আশ শারী‘আহ : ৭৪০)

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

يَوْمَ هُمْ بَارِزُونَ ۖ لَا يَخْفَىٰ عَلَى اللَّهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ ۚ لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ۖ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْيَوْمَ تُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ ۚ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

‘যেদিন তারা সকলে প্রকাশ্যে এসে যাবে। আল্লাহর কাছে তাদের কোনোকিছুই গোপন থাকবে না। (বলা হবে) আজ রাজত্ব কার? (উত্তর হবে একটিই যে,) কেবল আল্লাহর, যিনি এক, পরাক্রমশালী। আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে। আজ কোনও যুলুম হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সূরা মুমিন, আয়াত ১৬, ১৭)

إِلٰهِ النَّاسِ (সমস্ত মানুষের মাবূদের)। প্রথমে বলা হয়েছে মানুষের প্রতিপালক। তারপর বলা হয়েছে মানুষের অধিপতি ও বাদশাহ। যিনি মানুষের প্রতিপালক, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, মানুষের প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেছেন, জীবনরক্ষার যাবতীয় উপকরণের জোগান দিয়েছেন, যাঁর ইচ্ছা ও নির্দেশেই কার্যকর হয়ে থাকে এবং যিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, কেবল তিনিই তো ইবাদতের উপযুক্ত হতে পারেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাই মানুষের সত্যিকারের মাবূদ। একমাত্র তিনিই ইবাদত- উপাসনার উপযুক্ত।

বায়যাবী রহ. এ আয়াত তিনটির পর্যায়ক্রম ব্যাখ্যা করেন, মানুষ প্রথমে তার মধ্যে যে প্রকাশ্য ও গুপ্ত নি‘আমতের সমাহার দেখতে পায়, তা দ্বারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, তার একজন রব্ব ও প্রতিপালক আছেন। তারপর সে আবার দৃষ্টিপাত করে। তখন তার কাছে প্রতিভাত হয় যে, তার প্রতিপালক সবকিছু থেকে বেপরোয়া। সবকিছুই তাঁর কর্তৃত্বাধীন। যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ তাঁরই হাতে। সুতরাং তিনিই প্রকৃত মালিক ও অধিপতি। অতঃপর তার কাছে এর পর্যবেক্ষণ দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেই একক সত্তাই ইবাদত-বন্দেগীর উপযুক্ত, অন্য কেউ নয়।

তিন আয়াতে النَّاسِ শব্দটি তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমবার بِرَبِّ النَّاسِ (মানুষের প্রতিপালক) বলার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার النَّاسِ (মানুষ)- এই বিশেষ্য পদের স্থানে সর্বনামও ব্যবহার করা যেত। বলা যেত পারত- مَلِكِهِمْ (তাদের বাদশাহ ও অধিপতি) এবং إِلٰهِهِمْ (তাদের মাবূদ)। কিন্তু তা না করে বার বার ‘মানুষ’ শব্দের পুনরাবৃত্তি কেন করা হলো? এর উত্তর হচ্ছে, এরূপ করার দ্বারা মানুষের অন্তরে আল্লাহ সম্পর্কিত আকীদা-বিশ্বাস সুদৃঢ় করা উদ্দেশ্য। আরবী ভাষার নিয়ম অনুসারে কোনও শব্দ বা বাক্য পুনরাবৃত্তি করার দ্বারা সংশ্লিষ্ট বিষয় সুদৃঢ় ও পাকাপোক্ত করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই এ আয়াতসমূহ গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়লে অন্তরে এ আকীদা পাকাপোক্ত হয়ে উঠবে যে, আল্লাহ তা‘আলাই মানুষের ও সারা জাহানের প্রতিপালক, তিনিই সকলের অধিপতি এবং তিনিই একমাত্র মাবূদ। তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য বানানো, অন্য কারও ইবাদত-বন্দেগী করা এবং অন্য কারও নিরঙ্কুশ আনুগত্য কোনক্রমেই বৈধ হতে পারে না।

مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ ە الْخَنَّاسِ (সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে পেছনে আত্মগোপন করে)। অর্থাৎ যিনি মানুষের সব মাখলূকের সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক, যাঁর আধিপত্য সকলের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যিনি সকলের মাবূদ, তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করছি সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, যে পেছনে আত্মগোপন করে। যে কুমন্ত্রণা দেয় এবং যাকে কুমন্ত্রণা দেয়, উভয়েই আল্লাহর মাখলূক। উভয়ের উপর আল্লাহ তা‘আলার একচ্ছত্র মালিকানা ও ক্ষমতা বিদ্যমান। কাজেই কুমন্ত্রণাদাতা যত বড় শক্তিশালীই হোক এবং তার কৌশল যতই অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হোক, তার পক্ষে এমন কারও ক্ষতি করা কিছুতেই সম্ভব নয়, যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আশ্রয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করাটা এক অব্যর্থ অস্ত্র। এ অস্ত্র দ্বারা যে-কোনও কুমন্ত্রণাদাতাকে ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব। এ অস্ত্র সকল কুমন্ত্রণার অস্ত্র অকার্যকর করে দিতে পারে।

লক্ষণীয়, আয়াতে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে اَلْوَسْوَاسِ (ওয়াসওয়াস)। শব্দটি মাসদার (ক্রিয়ামূল)। এর মূল অর্থ অস্পষ্ট ধ্বনি, যে ধ্বনির মর্ম অন্তরে পৌঁছে যায়, কিন্তু কানে শুনতে পাওয়া যায় না। বোঝানো উদ্দেশ্য কুমন্ত্রণা। কুমন্ত্রণা বিষয়টি এরকমই। জিন শয়তানের কুমন্ত্রণার ধ্বনি তো মোটেই শুনতে পাওয়া যায় না, কিন্তু অন্তরে তা ঠিকই পৌঁছে যায়। মানব শয়তানও যে কুমন্ত্রণা দেয়, তাও সাধারণত অস্ফুট ধ্বনিতেই হয়ে থাকে। তা কানে কানে বলা হয়।

اَلْوَسْوَاسِ শব্দটি ক্রিয়ামূল হলেও এবং সে হিসেবে এর প্রকৃত অর্থ কুমন্ত্রণা হলেও এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য اَلْمُوَسْوِسُ (কুমন্ত্রণাদাতা)। শব্দটি কর্তৃবাচ্য বিশেষ্য। কুমন্ত্রণা হলো কুমন্ত্রণাদাতার কর্ম বা বিশেষণ। আরবীতে বিশেষণ দ্বারা কখনও কখনও বিশেষ্যও বোঝানো হয়। কর্তৃবাচ্য বিশেষ্যের (যার দ্বারা মাসদারের ব্যবহার হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হয় কর্তৃবাচ্য বিশেষ্যের ভেতর কর্ম বা বিশেষণটির আধিক্য ও আতিশয্য বোঝানো। কাজেই اَلْمُوَسْوِسُ (কুমন্ত্রণাদাতা)-এর স্থলে اَلْوَسْوَاسِ (কুমন্ত্রণা) শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হচ্ছে যে, কুমন্ত্রণাদাতার ভেতর কুমন্ত্রণা দেওয়ার স্বভাবটি এতই প্রবল, যেন সে নিজেই এক সাক্ষাৎ কুমন্ত্রণা। সে এক মূর্তিমান কুমন্ত্রণা। তার কাজই হলো মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বেড়ানো। অর্থাৎ সে মানুষের আকল-বুদ্ধির উপর সওয়ার হয়ে যায়। নানা কৌশলে মানুষের সামনে ভালোটিকে মন্দ ও মন্দটিকে ভালো রূপে তুলে ধরে। আর এভাবে মানুষকে মন্দ কাজের প্ররোচনা দেয় ও ভালো কাজের প্রতি নিরুৎসাহিত করে। একেকজনের ক্ষেত্রে তার পন্থা হয় একেক রকম। আলেমকে কুমন্ত্রণা দেয় ইলমের রঙে। আবেদকে কুমন্ত্রণা দেয় ইবাদতের ছলে। কিন্তু তার চাতুর্য যত কঠিনই হোক, মুমিনের অস্ত্র আরও বেশি শক্তিশালী। সেই অস্ত্রের সামনে তার সব চেষ্টাই দুর্বল সাব্যস্ত হয়। তাই আয়াতে তাকে اَلْخَنَّاسِ বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে। কেননা তার কৌশল সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হলেও সে কাজটা করে নিজেকে লুকিয়ে রেখে। তা করে নানা ছলচাতুরীর সাথে। তার এ হিম্মত নেই যে, সরাসরি সামনে এসে কুমন্ত্রণা দেবে।

اَلْخَنَّاسِ শব্দটির উৎপত্তি خَنَسَ বা خُنُوسٌ থেকে। এর অর্থ সরে যাওয়া, আত্মগোপন করা। এটা শয়তানের স্বভাব। সে যখন কাউকে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দেয়, তখন সে মানুষের বুদ্ধি ও তার সংকল্পের সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু মানুষ তা টের পায় না। যেন সে সেখানে লুকিয়ে পড়ে। যারাই কাউকে কুমন্ত্রণা দেয়, তাদের স্বভাব এরকমই। তারা নানা কৌশলে নিজেকে আড়াল করে রাখে আর লক্ষ করে মানুষ কখন উদাসীন ও অমনোযোগী হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে তাকে কুমন্ত্রণা দেয় ও বিভ্রান্ত করে। আবার মানুষ যদি তা টের পেয়ে ফেলে আর তখন আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করে, অমনি সে সরে যায়। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ الشَّيْطَانَ وَاضِعٌ خَطْمَهُ فِي قَلْبِ ابْنِ آدَمَ، فَإِذَا ذَكَرَ خَنَسَ، وَإِذَا نَسِيَ الْتَقَمَ قَلْبَهُ.

‘শয়তান আদম সন্তানের অন্তরে শুঁড় বসায়। যখন সে আল্লাহর যিকির করে, তখন সরে পড়ে। আর যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন অন্তর গ্রাস করে নেয়’। (বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান : ৫৩৬; মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ৪৩০১; হিলয়াতুল আওলিয়া, ৬ খণ্ড, ২৬৮ পৃষ্ঠা)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত-

مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا عَلَى قَلْبِهِ الْوَسْوَاسُ فَإِنْ ذَكَرَ اللَّهَ خَنَسَ، وَإِنْ غَفَلَ وَسْوَسَ وَهُوَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ ﴿الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ

‘প্রত্যেক মানবসন্তানের অন্তরে কুমন্ত্রণাদাতা হানা দেয়। যখন সে আল্লাহর যিকির করে, অমনি সরে পড়ে। আর যদি গাফেল হয়, তবে কুমন্ত্রণা দেয়। এ সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন- اَلْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ (আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতা)’। (সহীহ বুখারী, সূরা নাস-এর তাফসীর; হাকিম, আল মুসতাদরাক : ৩৯৯১; বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান : ৬৬৬)

اَلَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ (যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়)। صُدُورِ শব্দটি صَدْر এর বহুবচন। এর অর্থ বুক। কুমন্ত্রণা বুকে দেওয়া হয় না; বরং বুকের ভেতর যে অন্তর থাকে তাতে দেওয়া হয়। অন্তর বুকের ভেতর থাকে বলে রূপকার্থে তার জন্য صَدْر অর্থাৎ বুক শব্দও ব্যবহৃত হয়, যেমন এ আয়াতে হয়েছে।
مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ (সে জিনদের মধ্য হতে হোক বা মানুষের মধ্য হতে)। অর্থাৎ কুমন্ত্রণাদাতা মানুষ হোক বা জিন, তার অনিষ্ট থেকে আমি আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করছি। কুমন্ত্রণা দেওয়া যেমন দুষ্ট জিনের কাজ, তেমনি দুষ্ট মানুষও কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। সে হিসেবে তারা উভয়েই শয়তান। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا

‘এবং (তারা যেমন আমার নবীর সাথে শত্রুতা করেছে) এভাবেই আমি (পূর্ববর্তী) প্রত্যেক নবীর জন্য কোনও না কোনও শত্রুর জন্ম দিয়েছি অর্থাৎ মানব ও জিনদের মধ্য হতে শয়তান কিসিমের লোকদেরকে, যারা ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে একে অন্যকে বড় চমৎকার কথা শেখাত’। (সূরা আন‘আম, আয়াত ১১২)

তো মানব শয়তান ও জিন শয়তান উভয়েই মানুষের শত্রু। অনেক সময় জিন শয়তান অপেক্ষা মানব শয়তানই বেশি ক্ষতিকর হয়ে থাকে। বিখ্যাত বুযুর্গ মালিক ইবন দীনার রহ. বলেন, আমার পক্ষে জিন শয়তানের তুলনায় মানব শয়তানই বেশি কঠিন মনে হয়। কারণ আমি যখন আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করি, তখন জিন শয়তান তো দূর হয়ে যায়, কিন্তু মানব শয়তান যখন আমার পেছনে লেগে পড়ে, তখন সে আমাকে গুনাহের দিকে অনবরত আকর্ষণ করতে থাকে। অর্থাৎ সে সহজে আমার পিছু ছাড়ে না।
সারকথা, নিজ ঈমান-আমল রক্ষার জন্য উভয় প্রকার শয়তান থেকেই আত্মরক্ষা করা দরকার। আর আত্মরক্ষা কেবল সম্ভব তখনই, যখন আল্লাহ নিজ কুদরত দ্বারা রক্ষা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বড়ই দয়াময়। তিনি এ সূরার মাধ্যমে মানুষকে উৎসাহ দিয়েছেন যেন তারা শয়তান থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করে।

জ্ঞাতব্য, সূরা নাস ও সূরা ফালাককে اَلْمُعَوِّذَتَانِ (মু‘আউবিযাতান) বলা হয়। এটা দ্বিবচন। এর একবচন اَلْمُعَوِّذَةُ (আল-মু‘আউবিযাতু)। শব্দটির উৎপত্তি تَعْوِيذٌ থেকে। অর্থ আশ্রয় দান করা। اَلْمُعَوِّذَةُ অর্থ আশ্রয় দানকারী। এ সূরাদু’টি পড়লে মুসিবত দূর হয়, কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এভাবে সূরাদু’টি তার পাঠককে প্রকাশ্য ও গুপ্ত বিপদ থেকে আশ্রয় দেয় ও রক্ষা করে।

মনে রাখতে হবে, সূরাদু’টি আশ্রয় গ্রহণের ভাষা। আশ্রয় গ্রহণের এ ভাষা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং গভীর বিশ্বাস ও অটল ঈমানের সঙ্গে যে ব্যক্তি এ সূরাদু’টি পাঠ করবে, সে অবশ্যই এর সুফল পাবে। অধিকাংশ লোক সূরাদু’টি পাঠ করে গাফেল মনে। মুখে উচ্চারণ করে বটে, কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকে না। তাই এর সুফলও তারা পায় না।
মানুষ যাতে গাফিলতির সঙ্গে নয়; বরং জাগ্রত মনে পাঠ করে, তাই শুরুতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওহীদ ও তাঁর বিশেষ কয়েকটি গুণ উল্লেখ করে দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও গভীর আস্থার সঙ্গেই এর তিলাওয়াত করতে হবে। এমনিতে কুরআন মাজীদের অংশ হওয়ায় এর তিলাওয়াত দ্বারা প্রতি হরফে দশ নেকী অবশ্যই পাওয়া যাবে। তারপর বাড়তি ফায়দা হিসেবে লাভ হবে দুনিয়ায় সর্বপ্রকার মসিবত ও ক্ষতি থেকে নিরাপত্তা।

হাদীছটি থেকে শিক্ষণীয়

ক. সূরা ফালাক ও সূরা নাস কুরআন মাজীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু’টি সূরা।

খ. এ সূরা পড়ার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার রুবূবিয়াত গুণের পরিচয় পাওয়া যায়।

গ. তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ সূরাদু’টির বিশেষ শিক্ষা।

ঘ. ভোরের আলো আল্লাহর তা‘আলার অনেক বড় নি‘আমত।

ঙ. হাসাদ অত্যন্ত ক্ষতিকর চারিত্রিক দোষ। এর থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাধনা- মুজাহাদা করা একান্ত জরুরি।

চ. হাসিদ (হিংসুক) ব্যক্তি অন্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই তার ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য সূরা ফালাকের পাঠ খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।

ছ. কারও উপর জাদু করা হলে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দম করার দ্বারা সে জাদুর ক্ষতি থেকে নিস্তার লাভ হয়।

জ. অন্যের কুমন্ত্রণা গ্রহণ দ্বারা ইহকালীন ও পরকালীন নানা রকম ক্ষতি হয়ে যায়। তাই কিছুতেই কারও কুমন্ত্রণা গ্রহণ করতে নেই।

ঝ. সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়ার দ্বারা কুমন্ত্রণাদাতার কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপত্তা লাভ হয়।

ঞ. আয়াত বা দুআ পড়ে দম করাকে রুক্‌য়া বলে। রোগ-ব্যাধি ও জাদুর ক্ষতি থেকে নিরাময় লাভের জন্য রুক্‌য়া করা জায়েয।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান