রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ১০০৬
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
সুন্দর আওয়াজে কুরআন পাঠ করা সুমধুর সুরের ব্যক্তিকে কুরআন পড়তে বলা এবং মনোযোগ দিয়ে সেই তিলাওয়াত শোনা: নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুর
১০০৬. হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইশার নামাযে সূরা তীন পড়তে শুনি। আমি তাঁর চেয়ে বেশি সুমধুর সুর আর কারও শুনিনি। -বুখারী ও মুসলিম (সহীহ বুখারী: ৭৬৯: সহীহ মুসলিম: ৪৬৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৩০৬৬)
كتاب الفضائل
باب استحباب تحسين الصوت بالقرآن وطلب القراءة من حسن الصوت والاستماع لها
1006 - وعن البَراءِ بنِ عازِبٍ رضي اللهُ عنهما، قَالَ: سَمِعْتُ النبيَّ - صلى الله عليه وسلم - قَرَأَ فِي الْعِشَاءِ بالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ، فَمَا سَمِعْتُ أحَدًا أحْسَنَ صَوْتًا مِنْهُ. متفقٌ عَلَيْهِ. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: البخاري 9/ 194 (7546)، ومسلم 2/ 41 (464) (177).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ইশার নামাযের কোনও এক রাকাতে সূরা তীন পড়েছিলেন। এ হাদীছটির বর্ণনাকারী হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. নিজেও সে নামাযে ছিলেন। অন্যান্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন কোনও এক সফরে ছিলেন। হযরত বারা রাযি. বলেন, আমি তাঁর চেয়ে বেশি সুন্দর সুর আর কারও শুনিনি।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুর ছিল খুবই সুন্দর। সব নবীরই সুর সুন্দর ছিল। হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا حَسَنَ الْوَجْهِ ، حَسَنَ الصَّوْتِ ، وَكَانَ نَبِيُّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَسَنَ الْوَجْهِ ، حَسَنَ الصَّوْت

'আল্লাহ তা'আলা এমন কোনও নবী পাঠাননি, যাঁর চেহারা ও সুর সুন্দর ছিল না। তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সুন্দর চেহারা ও সুন্দর সুরের অধিকারী ছিলেন।' (তিরমিযী, আশ-শামাইলুন নাবাবিয়্যাহ : ৩২১; ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ১ খণ্ড, ৩৭৬; ফাতহুল বারী, ৭ খণ্ড, ২৬৪ পৃষ্ঠা)

ইবন হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারী গ্রন্থে যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তাতে আছে, তাঁর চেহারা ছিল সর্বাপেক্ষা সুন্দর এবং সুরও ছিল সর্বাপেক্ষা সুন্দর।

তাঁর সুর অত্যধিক সুন্দর হওয়ায় তাঁর তিলাওয়াতের আছরও হতো দুর্দান্ত। একে আল্লাহ তা'আলার কালামই অলৌকিক। তার উপর যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুরের সৌন্দর্য আরোপিত হতো, তখন যে তাছির প্রকাশ পেত, তা উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না কারওই। তাই কাফের-মুশরিক পর্যন্ত তাঁর তিলাওয়াত শুনে অভিভূত হয়ে যেত। তিনি যখন রাতের বেলা নামাযের ভেতর কুরআন পাঠ করতেন, তখন তারা বারবার তাঁর সে পাঠের মাধুর্য উপভোগ করার জন্য ছুটে আসত। কুরায়শের বিখ্যাত নেতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা নিজেও তাঁর কুরআন পাঠ শোনার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে আসত। এজন্য আবু জাহল তাকে তিরস্কার করেছিল। উত্তরে সে বলেছিল, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা পাঠ করে তার রয়েছে বিশেষ মিষ্টতা, তার রয়েছে বিশেষ স্নিগ্ধতা, তার উপরটা ফলদায়ী, তলদেশ গভীরে প্রোথিত। (হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৩৮৭২: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান ১৩৩; যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১ খণ্ড, ২১৪ পৃষ্ঠা)

হযরত জুবায়র ইবন মুত'ইম রাযি. হিজরী ২য় বছর বদর যুদ্ধে যেসকল মুশরিক বন্দি হয়েছিল তাদেরকে মুক্ত করে নেওয়ার জন্য মদীনা মুনাউওয়ারায় এসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখনও তিনি মুশরিক। এ সময় একদিন মাগরিবের নামাযে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সূরা তুর পাঠ করতে শোনেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে তাঁর সে কুরআন পাঠ শুনছিলেন। পরে তিনি অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন যে, তিনি যখন সূরার আয়াতগুলো পড়ছিলেন, তখন (আমার অন্তরে তার এমন প্রভাব পড়েছিল যে,) মনে হচ্ছিল যে, আমার হৃদয়টা বুঝি উড়ে যাবে। (সহীহ বুখারী: ৪৮৫৪; সুনানে ইবন মাজাহ: ৮৩২; জাম'উল ফাওয়াইদ : ১৪৩৯; খতীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ: ৪৪৪৮; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ৮৩৪)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. অন্যান্য সদগুণের মতো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কণ্ঠস্বরও ছিল সর্বাপেক্ষা সুন্দর।

খ. ইশার নামাযে আওসাতে মুফাসসালের অন্তর্ভুক্ত সূরাসমূহ থেকে পড়া মুস্তাহাব। সূরা তারিক থেকে সূরা বায়্যিনা পর্যন্ত সূরাসমূহকে আওসাতে মুফাসসাল বলা হয়। সূরা তীন এ সূরাসমূহেরই অন্তর্ভুক্ত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ১০০৬ | মুসলিম বাংলা