রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৯. ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা

হাদীস নং: ৯৯২
ফাযাঈলে আ'মালের বর্ণনা
আযানের ফযীলত: সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরানের বিশেষ মর্যাদা
৯৯২. হযরত নাউওয়াস ইবন সাম'আন রাযি. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন কুরআন এবং ওই কুরআনওয়ালাদেরকে নিয়ে আসা হবে, যারা দুনিয়ায় কুরআনের উপর আমল করত। তার সামনে থাকবে সূরা বাকারা ও আলে ইমরান। তারা তাদের সঙ্গীর পক্ষে বিতর্ক করবে। -মুসলিম
كتاب الفضائل
باب فضل قراءة القرآن
992 - وعن النَّوَّاسِ بنِ سَمْعَانَ - رضي الله عنه - قَالَ: سَمِعْتُ رسولَ الله - صلى الله عليه وسلم - يقولُ: «يُؤْتَى يَوْمَ القِيَامَةِ بِالقُرْآنِ وَأهْلِهِ الذينَ كَانُوا يَعْمَلُونَ بِهِ في الدُّنْيَا، تَقْدُمُه سورَةُ البَقَرَةِ وَآلِ عِمْرَانَ، تُحَاجَّانِ عَنْ صَاحِبِهِمَا». رواه مسلم. (1)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: مسلم 2/ 197 (805) (253).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কিয়ামতের দিন কুরআনকে উপস্থিত করার অর্থ কুরআন তিলাওয়াতের ও এর উপর আমল করার ছাওয়াবকে বিশেষ আকৃতি দিয়ে উপস্থিত করা হবে।

কুরআনওয়ালা বলা হয়েছে এমনসব লোককে, যারা কুরআনের উপর আমল করে। অর্থাৎ কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এবং কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করে। বোঝা গেল যারা কুরআন পড়ে বটে, কিন্তু কুরআনের উপর আমল করে না, তারা প্রকৃত কুরআনওয়ালা নয়। তাই তারা এ হাদীছে বর্ণিত ফযীলতেরও অধিকারী হবে না। বরং কুরআনের উপর আমল না করাটা তাদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হবে। কুরআন তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্যদান করবে। নিঃসন্দেহে সে সাক্ষ্য গৃহীতও হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ.

কুরআন তোমার পক্ষে প্রমাণ হবে অথবা তোমার বিপক্ষে। (সহীহ মুসলিম: ২২৩; জামে তিরমিযী: ৩৫৭১; সুনানে নাসাঈ ২৪৩৭; সুনান ইবন মাজাহ: ২৮১; সুনানে দারিমী: ৬৭৯; সহীহ ইবন হিব্বান ৮৪৪; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৩৪২৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৮৫; শু'আবুল ঈমান: ২৪৫৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪৮)

অর্থাৎ তুমি যদি কুরআন তিলাওয়াত কর, কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চল এবং কুরআন অনুযায়ী জীবন গড়, তবে আখিরাতে তা তোমার প্রকৃত মুমিন হওয়ার সাক্ষী হবে। ফলে তুমি নাজাত পাবে। অন্যথায় কুরআন তোমার বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে যে, তুমি কুরআন পাঠ করনি ও কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী চলনি। ফলে তুমি নাজাত লাভে ব্যর্থ হবে।

হাদীছটিতে সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরানের বিশেষ ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে- تَقْدمُهُ سُوْرَةُ الْبَقَرَةِ وَآلِ عِمْرَانَ (তার সামনে থাকবে সূরা বাকারা ও আলে ইমরান)। অর্থাৎ সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পড়া ও সে অনুযায়ী আমল করার ছাওয়াবকে আলাদা আলাদা আকৃতি দান করা হবে। সে আকৃতিদু'টি তাদের পাঠকের অগ্রভাগে থাকবে অথবা সম্পূর্ণ কুরআনপাঠের যে ছাওয়াব তার অগ্রভাগে থাকবে।

এ সূরাদু'টি সামনে থেকে কী কাজ করবে? বলা হয়েছে- تُحَاجَّانِ عَنْ صَاحِبِهِمَا (এ সূরাদু'টি তাদের সঙ্গীর পক্ষে বিতর্ক করবে)। অর্থাৎ যারা দুনিয়ায় নিয়মিত এ সূরাদু'টি পড়ত ও সে অনুযায়ী আমলও করত, তাদের পক্ষে জোর সুপারিশ করবে, যাতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে নাজাত দেন ও তাদেরকে জান্নাতবাসী করেন।

تحَاجَّان এর উৎপত্তি اَلْمُحَاجَّةُ থেকে। এর অর্থ প্রতিরক্ষা দেওয়া, প্রতিহত করা, তর্ক-বিতর্ক করা। এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য যে, সেদিন কুরআন জোরদার সুপারিশ করবে। তার সে জোরদার সুপারিশ গৃহীত হবে বলে বান্দা থেকে জাহান্নামের আযাব ও জাহান্নামের ফিরিশতা প্রতিহত হয়ে যাবে।

বস্তুত সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান কুরআন মাজীদের অতীব গুরুত্বপূর্ণ দু'টি সূরা। এ সূরাদু'টিকে একসঙ্গে الزَّهْرَاوَانِ (সমুজ্জ্বল দুই সূরা) বলা হয়। এ সূরাদু'টির ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীছ আছে। যেমন

يُؤْتَى بِالْقُرْآنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَأَهْلِهِ الَّذِينَ كَانُوا يَعْمَلُونَ بِهِ تَقَدَّمُهُمْ سُورَةُ الْبَقَرَة وَآلِ عِمْرَانَ، وَضَرَبَ لَهُمَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلاثَةَ أَمْثَالِ، مَا نَسِيتُهُنَّ بَعْدُ ، قَالَ : كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ، أَوْ ظُلْتَان سَوْدَاوَانِ، بَيْنَهُمَا شَرْقٌ، أَوْ كَانَهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرِ صَوَافَّ، يُحَاجانِ عَنْ صَاحِبِهِمَا.

'কিয়ামতের দিন কুরআন এবং কুরআনওয়ালাদেরকে, যারা দুনিয়ায় কুরআনের উপর আমল করত, তাদেরকে নিয়ে আসা হবে। তাদের সামনে থাকবে সূরা বাকারা ও আলে ইমরান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু'টির তিনটি উপমা পেশ করেছেন। আমি তা এখনও ভুলিনি। তিনি বলেন, সে দু'টি যেন দুই খণ্ড মেঘ অথবা ঘন কালো দু'টি ছায়া, যার মাঝখানে রয়েছে ফাঁকা, অথবা সে দু'টি যেন সারিবদ্ধ দুই ঝাঁক পাখি। তারা তাদের সঙ্গীর পক্ষে বিতর্ক করবে।'

সূরাদু'টিকে অর্থাৎ এর ছাওয়াবকে এরূপ আকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্য সম্ভবত অনুসারীদেরকে ছায়াদান করা। কেননা হাশরের ময়দান হবে বড়ই উত্তপ্ত। থাকবে প্রখর রোদ। সূর্য থাকবে খুব কাছাকাছি। তাই কুরআনের পাঠকদেরকে ছায়া দান করার জন্য আল্লাহ তা'আলা এরূপ ব্যবস্থা নেবেন।

হযরত আবু উমামা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

اقْرَبُوا الزَّهْرَاوَيْنِ، سُورَةَ الْبَقَرَةِ وَسُورَةَ آلِ عِمْرَانَ، فَإِنَّهُمَا يَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَيَايَتَانِ ، أَوْ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ ، أَوْ كَأَنَّهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرِ صَوَاف يُحَاجَّانِ عَنْ صَاحِبِهِمَا ، أقْرَءُوا الْبَقَرَةَ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ ، وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ، وَلَا يَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ.

তোমরা সমুজ্জ্বল সূরাদু'টি পড়ো। অর্থাৎ সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান। সে দু'টি যেন শামিয়ানা অথবা দুই খণ্ড মেঘ অথবা সে দু'টি যেন সারিবদ্ধ দুই ঝাঁক পাখি। তারা তাদের সঙ্গীর পক্ষে বিতর্ক করবে। তোমরা সূরা বাকারা পড়ো। কেননা এটি অবলম্বন করা বরকত এবং পরিত্যাগ করা আক্ষেপ। জাদুকরেরা এ সূরা মুখস্থ করতে পারে না। (সহীহ মুসলিম: ৮০৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫৯৯১; মুসনাদুল বাযযার: ৮৫৪৭; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৭৫৪৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ৩১৩৫; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ১৮২৬)

আলাদাভাবে সূরা বাকারার ফযীলত সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لِكُلِّ شَيْءٍ سَنَامٌ ، وَإِنَّ سَنَامَ القُرْآنِ سُوْرَةُ الْبَقَرَةِ، وَفِيهَا آيَةٌ هِيَ سَيِّدَةُ أَي الْقُرْآنِ، هِيَ آيَةُ الكُرْسِيِّ.

'প্রত্যেকটি বস্তুরই একটি চূড়া আছে। কুরআনের চূড়া হলো সূরা বাকারা। এ সূরায় এমন একটি আয়াত আছে, যা কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তা হলো আয়াতুল কুরসী।' (জামে' তিরমিযী: ২৮৭৮)

হযরত সাহল ইবন সা'দ রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ سَنَامًا ، وَإِنَّ سَنَامَ الْقُرْآنِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ، مَنْ قَرَأَهَا فِي بَيْتِهِ لَيْلًا لَمْ يَدْخُلِ الشَّيْطَانُ بَيْتَهُ ثَلَاثَ لَيَالٍ ، وَمَنْ قَرَأَهَا نَهَارًا لَمْ يَدْخُلِ الشَّيْطَانُ بَيْتَهُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ

প্রত্যেকটি বস্তুরই একটি চূড়া আছে। কুরআনের চূড়া হলো সূরা বাকারা। যে ব্যক্তি রাতের বেলা তার ঘরে এ সূরাটি পড়বে, শয়তান তিন রাত তার ঘরে প্রবেশ করবে না। যে ব্যক্তি দিনের বেলা এটি পড়বে, শয়তান তিন দিন তার ঘরে প্রবেশ করবে না। (সহীহ ইবন হিব্বান: ৭৮০; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৭৫৫৪; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৫৮৬৪; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান ২১৬১)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠ দুই সূরা।

খ. কিয়ামতের দিন কুরআনওয়ালাগণ কুরআন মাজীদের শাফা'আত লাভ করবে।

গ. আমাদের নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত।

ঘ. প্রকৃত কুরআনওয়ালা তারাই, যারা কুরআন তিলাওয়াত করে এবং কুরআনের যথাযথ অনুসরণে সচেষ্ট থাকে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ৯৯২ | মুসলিম বাংলা