রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৮. সফরের আদব-বিধান
হাদীস নং: ৯৮৩
সফরের আদব-বিধান
কোনও মঞ্জিলে যাত্রাবিরতির সময় যে দুআ পড়বে
৯৮৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর করতেন আর এ অবস্থায় রাত আসত, তখন বলতেন-
يَا أَرْضُ رَبِّي وَرَبُّكِ اللَّهُ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّكِ وَشَرِّ مَا فِيكِ وَشَرِّ مَا خُلِقَ فِيكِ وَمِنْ شَرِّ مَا يَدِبُّ عَلَيْكِ وَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ أَسَدٍ وَأَسْوَدَ وَمِنَ الْحَيَّةِ وَالْعَقْرَبِ وَمِنْ سَاكِنِ الْبَلَدِ وَمِنْ وَالِدٍ وَمَا وَلَدَ "
'হে ভূমি। আমার ও তোমার রব্ব আল্লাহ। আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি তোমার অনিষ্ট হতে, তোমার ভেতর যা আছে তার অনিষ্ট হতে, তোমার ভেতর যা-কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে এবং তোমার উপর যা-কিছু বিচরণ করে তার অনিষ্ট হতে। (হে আল্লাহ।) আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি সিংহ, আসওয়াদ (কালো, বিশাল ও ভয়ংকর সাপ), সাপ, বিচ্ছু, শহরের বাসিন্দাগণ এবং জনক ও জাতক থেকে'। -আবু দাউদ (সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৩; মুসনাদে আহমাদ: ৬১৬২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা। ১০৩২২; সহীহ ইবন খুযায়মা ২৫৭২; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক ৮২৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৬৩৭: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ১০৩২১; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৩৪৯)
يَا أَرْضُ رَبِّي وَرَبُّكِ اللَّهُ أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّكِ وَشَرِّ مَا فِيكِ وَشَرِّ مَا خُلِقَ فِيكِ وَمِنْ شَرِّ مَا يَدِبُّ عَلَيْكِ وَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ أَسَدٍ وَأَسْوَدَ وَمِنَ الْحَيَّةِ وَالْعَقْرَبِ وَمِنْ سَاكِنِ الْبَلَدِ وَمِنْ وَالِدٍ وَمَا وَلَدَ "
'হে ভূমি। আমার ও তোমার রব্ব আল্লাহ। আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি তোমার অনিষ্ট হতে, তোমার ভেতর যা আছে তার অনিষ্ট হতে, তোমার ভেতর যা-কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে এবং তোমার উপর যা-কিছু বিচরণ করে তার অনিষ্ট হতে। (হে আল্লাহ।) আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি সিংহ, আসওয়াদ (কালো, বিশাল ও ভয়ংকর সাপ), সাপ, বিচ্ছু, শহরের বাসিন্দাগণ এবং জনক ও জাতক থেকে'। -আবু দাউদ (সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৩; মুসনাদে আহমাদ: ৬১৬২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা। ১০৩২২; সহীহ ইবন খুযায়মা ২৫৭২; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক ৮২৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৬৩৭: বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা। ১০৩২১; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৩৪৯)
كتاب آداب السفر
باب مَا يقول إِذَا نزل منْزلًا
983 - وعن ابن عمر رضي الله عنهما، قَالَ: كَانَ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إِذَا سَافَرَ فَأقْبَلَ اللَّيْلُ، قَالَ: «يَا أرْضُ، رَبِّي وَرَبُّكِ اللهُ، أعُوذُ بِاللهِ مِنْ شَرِّكِ وَشَرِّ مَا فِيكِ، وَشَرِّ مَا خُلِقَ فِيكِ، وَشَرِّ مَا يَدِبُّ عَلَيْكِ، وَأعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ أسَدٍ وَأسْوَدٍ، وَمِنَ الحَيَّةِ وَالعَقْرَبِ، وَمِنْ سَاكِنِ البَلَدِ، وَمِنْ وَالِدٍ وَمَا وَلَدَ». رواه أَبُو داود. (1)
وَ «الأَسْوَدُ»: الشَّخْصُ، قَالَ الخَطَّابِيُّ: وَ «سَاكِنُ البَلَدِ»: هُمُ الجِنُّ الَّذِينَ هُمْ سُكَّانُ الأرْضِ. قَالَ: وَالبَلَد مِنَ الأرْضِ: مَا كَانَ مَأْوَى الحَيَوانِ، وَإنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ بِنَاءٌ وَمَنَازلُ. قَالَ: وَيَحْتَمِلُ أنَّ المُرَادَ: «بِالوَالِدِ» إبليسُ: «وَمَا وَلَدَ»: الشَّيَاطِينُ (2).
وَ «الأَسْوَدُ»: الشَّخْصُ، قَالَ الخَطَّابِيُّ: وَ «سَاكِنُ البَلَدِ»: هُمُ الجِنُّ الَّذِينَ هُمْ سُكَّانُ الأرْضِ. قَالَ: وَالبَلَد مِنَ الأرْضِ: مَا كَانَ مَأْوَى الحَيَوانِ، وَإنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ بِنَاءٌ وَمَنَازلُ. قَالَ: وَيَحْتَمِلُ أنَّ المُرَادَ: «بِالوَالِدِ» إبليسُ: «وَمَا وَلَدَ»: الشَّيَاطِينُ (2).
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) أخرجه: أبو داود (2603).
(2) انظر: معالم السنن 2/ 224.
হাদীসের ব্যাখ্যা:
স্থান-কালের পরিবর্তন দ্বারা মানুষ নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। নতুন সে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তার জন্য কী ভালো বা মন্দ অবস্থা অপেক্ষা করছে, তার তা জানা থাকে না। সেজন্য তার উচিত স্থান-কালের প্রতিটি পরিবর্তনকালে আল্লাহ তা'আলার শরণাপন্ন হওয়া। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে শিক্ষাই আমাদের দিয়েছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার শরণাপন্ন হতেন। কোনও মঞ্জিলে অবতরণকালে যেমন আল্লাহ তা'আলার সমীপে নিজ অক্ষমতা প্রকাশ করে সকল ক্ষতি থেকে তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, তেমনি সফরকালে দিনশেষে যখন রাত আসত, তখনও তিনি আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী হয়ে সর্বপ্রকার অনিষ্ট থেকে তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতেন। আলোচ্য হাদীছে দেখানো হয়েছে তাঁর সে আশ্রয়গ্রহণ কতটা পূর্ণাঙ্গ ভাষায় হতো। তাঁর সে ভাষার মধ্যে রয়েছে সবরকম অনিষ্টের উল্লেখ। তিনি দুআটি শুরু করেছেন এই বলে যে-
يَا أَرْضُ، رَبِّي وَرَبُّكَ اللهُ (হে ভূমি! আমার ও তোমার রব্ব আল্লাহ)। তিনি ভূমিকে লক্ষ্য করে এই যে আল্লাহর রাবুবিয়্যাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে ভূমির প্রাণ আছে এবং তাকে লক্ষ্য করে যা বলা হচ্ছে তা উপলব্ধি করার ক্ষমতাও তার আছে। কুরআন মাজীদের বহু আয়াত ও বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা ভূমির অনুভূতি শক্তি থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া আল্লাহ তা'আলার প্রতিটি মাখলুকই যে তাঁর তাসবীহ ও হাম্দ-ছানা করে, কুরআন মাজীদে তো তা সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে।
'আমার ও তোমার রব্ব আল্লাহ' বলার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আমাদের উভয়েরই মালিক ও মনিব যখন আল্লাহ, তখন এটা কিছুতেই সমীচীন নয় যে, আমরা একে অন্যের ক্ষতি করব।
রাবূবিয়্যাতের সাক্ষ্যদান আল্লাহ তা'আলার একরকম প্রশংসাও বটে। দুআর শুরুতে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করা দুআ কবুলের পক্ষে সহায়ক। অতঃপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে বিভিন্ন রকমের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন-
أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّكِ (আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি তোমার অনিষ্ট হতে)। যাতে আল্লাহ তা'আলা তোমার সত্তা দ্বারা যত রকম অনিষ্ট হওয়া সম্ভব তার সবকিছু থেকেই আমাকে হেফাজত করেন। যেমন মাটির ভেতর ধসে যাওয়া, ভূমিকম্পের কবলে পড়া, গর্তের মধ্যে পড়ে যাওয়া, উঁচু স্থানে হোঁচট খাওয়া, রাস্তায় পদস্খলিত হয়ে পড়ে যাওয়া, পথ হারিয়ে ফেলা, দিগভ্রান্ত হওয়া ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটিই ভূমি সংশ্লিষ্ট বিপদ। তাই এর প্রত্যেকটি থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে।
وَشَرِّ مَا فِيْكِ (তোমার ভেতর যা আছে তার অনিষ্ট হতে)। যেমন খানাখন্দে পড়ে যাওয়া, গাছ-পাথরে হোঁচট খাওয়া, চোরাবালিতে দেবে যাওয়া, আগ্নেয়গিরির লাভায় পড়ে যাওয়া, পাঁক-কাদায় আটকে যাওয়া ইত্যাদি।
وَشَرِّ مَا خُلِقَ فِيْكِ (তোমার ভেতর যা-কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে)। অর্থাৎ ভূগর্ভে ও ভূপৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট যত মাখলুক আছে সকলের অনিষ্ট থেকে।
وَشَرِّ مَا يَدِبُّ عَلَيْكِ (এবং তোমার উপর যা-কিছু বিচরণ করে তার অনিষ্ট হতে)। যেমন সাপ-বিচ্ছু, বাঘ-সিংহ ইত্যাদি। এর দ্বারা মাটির উপর চলাফেরা করে এমন হিংস্র জীবজন্তু ও বিষাক্ত পোকা-মাকড়সহ যত ক্ষতিকর প্রাণী আছে সকলের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা উদ্দেশ্য।
وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ أَسَدٍ وَأَسْوَدِ 'আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি সিংহ ও আসওয়াদ থেকে'। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি। পেছনে নামবাচকে বলা হয়েছিল আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি। এখানে নামপুরুষ থেকে মধ্যম পুরুষে কথার বাঁকবদল হয়েছে। অর্থাৎ এবার সরাসরি আল্লাহ তা'আলাকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি। বক্তব্যে এরূপ বাঁকবদলকে আরবীতে “ইলতিফাত” বলা হয়। এটা আরবী অলংকার শাস্ত্রের বহুল ব্যবহৃত এক নিয়ম।
أسدٍ মানে সিংহ। আর اَسْودُ হলো কালো বর্ণের, অত্যন্ত বিষাক্ত ও বিশালাকার একপ্রকার সাপ। বলা হয়ে থাকে, এ সাপই সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর। রাত্রিবেলায় এরা শব্দের অনুসরণ করে পথচারী ও আরোহীদের উপর হামলা চালায়।
وَمِنَ الْحَيَّةِ وَالْعَقْرَبِ (এবং সাপ ও বিচ্ছু থেকে)। সাপ ও বিচ্ছু যদিও পূর্বে বর্ণিত ما يَدِبُّ অর্থাৎ যমীনে বিচরণকারী প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি যেহেতু এ দু'টি প্রাণী তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর, তাই স্বতন্ত্রভাবেও এর থেকে আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে।
وَمِنْ سَاكِنِ الْبَلَدِ (শহরের বাসিন্দাগণ হতে)। ইমাম নববী রহ. বলেন, এর দ্বারা জিনদের বোঝানো হয়েছে, যারা ভূমিতে বাস করে। الْبَلَدِ শব্দটির অর্থ যদিও শহর, কিন্তু এখানে বোঝানো উদ্দেশ্য জীবজন্তুর বাসস্থান, যদিও সেখানে মানুষের কোনও ঘর-বাড়ি না থাকে।
অবশ্য এখানে শহরের বাসিন্দা বলে মানুষকেও বোঝানো উদ্দেশ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শহর বলতে প্রচলিত অর্থে নগরকেই বোঝানো হবে। মানুষের মধ্যেও অনেকে যেহেতু নবাগত বা বহিরাগত কাউকে পেলে ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাই এ বাক্যে তাদের থেকেও আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা উদ্দেশ্য হতে পারে।
وَمِنْ وَالِدٍ وَمَا وَلَدَ (এবং জনক ও জাতক থেকে)। ইমাম খাত্তাবী রহ. বলেন, সম্ভবত জনক বলে ইবলীস এবং জাতক বলে তার বংশধর শয়তানদের বোঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, ইবলীস হলো জিন-শয়তানদের আদি পুরুষ। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
এমনও হতে পারে যে, এ বাক্যটি দ্বারা সাধারণভাবে যাদের মধ্যে প্রজননধারা চালু আছে এমন সকল প্রাণীকে বোঝানো হয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. বান্দার উচিত হার হালে (প্রতিটি অবস্থায়) নিজেকে আল্লাহর মুখাপেক্ষী করে রাখা।
খ. সফর অবস্থায় দিনের তুলনায় রাতে ক্ষতির ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই রাত আসলে সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত।
গ. আল্লাহ তা'আলা মানুষ ও যাবতীয় মাখলুকের রব্ব ও প্রতিপালক। তিনিই সকলের প্রতিপালন করেন। উপকারী-অপকারী যত প্রাণী আছে, সকলের জীবন ও জীবিকা তাঁরই হাতে।
يَا أَرْضُ، رَبِّي وَرَبُّكَ اللهُ (হে ভূমি! আমার ও তোমার রব্ব আল্লাহ)। তিনি ভূমিকে লক্ষ্য করে এই যে আল্লাহর রাবুবিয়্যাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে ভূমির প্রাণ আছে এবং তাকে লক্ষ্য করে যা বলা হচ্ছে তা উপলব্ধি করার ক্ষমতাও তার আছে। কুরআন মাজীদের বহু আয়াত ও বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা ভূমির অনুভূতি শক্তি থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া আল্লাহ তা'আলার প্রতিটি মাখলুকই যে তাঁর তাসবীহ ও হাম্দ-ছানা করে, কুরআন মাজীদে তো তা সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে।
'আমার ও তোমার রব্ব আল্লাহ' বলার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আমাদের উভয়েরই মালিক ও মনিব যখন আল্লাহ, তখন এটা কিছুতেই সমীচীন নয় যে, আমরা একে অন্যের ক্ষতি করব।
রাবূবিয়্যাতের সাক্ষ্যদান আল্লাহ তা'আলার একরকম প্রশংসাও বটে। দুআর শুরুতে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করা দুআ কবুলের পক্ষে সহায়ক। অতঃপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে বিভিন্ন রকমের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন-
أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّكِ (আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি তোমার অনিষ্ট হতে)। যাতে আল্লাহ তা'আলা তোমার সত্তা দ্বারা যত রকম অনিষ্ট হওয়া সম্ভব তার সবকিছু থেকেই আমাকে হেফাজত করেন। যেমন মাটির ভেতর ধসে যাওয়া, ভূমিকম্পের কবলে পড়া, গর্তের মধ্যে পড়ে যাওয়া, উঁচু স্থানে হোঁচট খাওয়া, রাস্তায় পদস্খলিত হয়ে পড়ে যাওয়া, পথ হারিয়ে ফেলা, দিগভ্রান্ত হওয়া ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটিই ভূমি সংশ্লিষ্ট বিপদ। তাই এর প্রত্যেকটি থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে।
وَشَرِّ مَا فِيْكِ (তোমার ভেতর যা আছে তার অনিষ্ট হতে)। যেমন খানাখন্দে পড়ে যাওয়া, গাছ-পাথরে হোঁচট খাওয়া, চোরাবালিতে দেবে যাওয়া, আগ্নেয়গিরির লাভায় পড়ে যাওয়া, পাঁক-কাদায় আটকে যাওয়া ইত্যাদি।
وَشَرِّ مَا خُلِقَ فِيْكِ (তোমার ভেতর যা-কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে)। অর্থাৎ ভূগর্ভে ও ভূপৃষ্ঠে আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট যত মাখলুক আছে সকলের অনিষ্ট থেকে।
وَشَرِّ مَا يَدِبُّ عَلَيْكِ (এবং তোমার উপর যা-কিছু বিচরণ করে তার অনিষ্ট হতে)। যেমন সাপ-বিচ্ছু, বাঘ-সিংহ ইত্যাদি। এর দ্বারা মাটির উপর চলাফেরা করে এমন হিংস্র জীবজন্তু ও বিষাক্ত পোকা-মাকড়সহ যত ক্ষতিকর প্রাণী আছে সকলের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা উদ্দেশ্য।
وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ أَسَدٍ وَأَسْوَدِ 'আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি সিংহ ও আসওয়াদ থেকে'। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি। পেছনে নামবাচকে বলা হয়েছিল আমি আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি। এখানে নামপুরুষ থেকে মধ্যম পুরুষে কথার বাঁকবদল হয়েছে। অর্থাৎ এবার সরাসরি আল্লাহ তা'আলাকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি। বক্তব্যে এরূপ বাঁকবদলকে আরবীতে “ইলতিফাত” বলা হয়। এটা আরবী অলংকার শাস্ত্রের বহুল ব্যবহৃত এক নিয়ম।
أسدٍ মানে সিংহ। আর اَسْودُ হলো কালো বর্ণের, অত্যন্ত বিষাক্ত ও বিশালাকার একপ্রকার সাপ। বলা হয়ে থাকে, এ সাপই সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর। রাত্রিবেলায় এরা শব্দের অনুসরণ করে পথচারী ও আরোহীদের উপর হামলা চালায়।
وَمِنَ الْحَيَّةِ وَالْعَقْرَبِ (এবং সাপ ও বিচ্ছু থেকে)। সাপ ও বিচ্ছু যদিও পূর্বে বর্ণিত ما يَدِبُّ অর্থাৎ যমীনে বিচরণকারী প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি যেহেতু এ দু'টি প্রাণী তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর, তাই স্বতন্ত্রভাবেও এর থেকে আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে।
وَمِنْ سَاكِنِ الْبَلَدِ (শহরের বাসিন্দাগণ হতে)। ইমাম নববী রহ. বলেন, এর দ্বারা জিনদের বোঝানো হয়েছে, যারা ভূমিতে বাস করে। الْبَلَدِ শব্দটির অর্থ যদিও শহর, কিন্তু এখানে বোঝানো উদ্দেশ্য জীবজন্তুর বাসস্থান, যদিও সেখানে মানুষের কোনও ঘর-বাড়ি না থাকে।
অবশ্য এখানে শহরের বাসিন্দা বলে মানুষকেও বোঝানো উদ্দেশ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শহর বলতে প্রচলিত অর্থে নগরকেই বোঝানো হবে। মানুষের মধ্যেও অনেকে যেহেতু নবাগত বা বহিরাগত কাউকে পেলে ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাই এ বাক্যে তাদের থেকেও আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা উদ্দেশ্য হতে পারে।
وَمِنْ وَالِدٍ وَمَا وَلَدَ (এবং জনক ও জাতক থেকে)। ইমাম খাত্তাবী রহ. বলেন, সম্ভবত জনক বলে ইবলীস এবং জাতক বলে তার বংশধর শয়তানদের বোঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, ইবলীস হলো জিন-শয়তানদের আদি পুরুষ। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
এমনও হতে পারে যে, এ বাক্যটি দ্বারা সাধারণভাবে যাদের মধ্যে প্রজননধারা চালু আছে এমন সকল প্রাণীকে বোঝানো হয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. বান্দার উচিত হার হালে (প্রতিটি অবস্থায়) নিজেকে আল্লাহর মুখাপেক্ষী করে রাখা।
খ. সফর অবস্থায় দিনের তুলনায় রাতে ক্ষতির ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই রাত আসলে সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত।
গ. আল্লাহ তা'আলা মানুষ ও যাবতীয় মাখলুকের রব্ব ও প্রতিপালক। তিনিই সকলের প্রতিপালন করেন। উপকারী-অপকারী যত প্রাণী আছে, সকলের জীবন ও জীবিকা তাঁরই হাতে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)