রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৮. সফরের আদব-বিধান

হাদীস নং: ৯৭৭
সফরের আদব-বিধান
মুসাফির যখন টিলা বা অনুরূপ কোনও উঁচু স্থানে চড়ে, তখন তার আল্লাহু আকবার বলা; যখন উপত্যকা বা অনুরূপ কোনও নিচু স্থানে নামে, তখন সুবহানাল্লাহ বলা এবং তাকবীর ও তাসবীহতে আওয়াজ বেশি উঁচু না করা

উপরে ওঠার বেলায় তাকবীর বলা ও নিচে নামতে তাসবীহ পড়া
৯৭৭. হযরত ইবন উমর রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হজ্জ বা উমরা থেকে ফিরতেন, তখন পথে যখনই কোনও টিলায় বা উঁচু স্থানে উঠতেন, তখন তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন। তারপর বলতেন-

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كلِّ شيءٍ قديرٌ آيِبونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ صَدَقَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَه

'আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক। তাঁর কোনও শরীক নেই। তাঁরই রাজত্ব এবং তাঁরই সকল প্রশংসা। তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী। আমরা তাওবাকারী। আমরা ইবাদতকারী। আমরা সিজদাকারী এবং আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, তিনি তাঁর বান্দার সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই শত্রুবাহিনীদের পরাজিত করেছেন'। -বুখারী ও মুসলিম (সহীহ বুখারী: ২৯৯৫, ৪১১৬; সহীহ মুসলিম: ১৩৪৪; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৭০: জামে' তিরমিযী: ৯৫০; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১০২৯৭; মুসনাদে আহমাদ: ৪৭১৭; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৩৬২৯: মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৯২৩৫; মুসনাদুল হুমায়দী: ৬৫৭)
كتاب آداب السفر
باب تكبير المسافر إِذَا صعد الثنايا وشبهها، وتسبيحه إِذَا هبط الأودية ونحوها، والنهي عن المبالغة برفع الصوتِ بالتكبير ونحوه
977 - وعنه، قَالَ: كَانَ النَّبي - صلى الله عليه وسلم - إِذَا قَفَلَ مِنَ الحَجِّ أَوْ العُمْرَةِ، كُلَّمَا أوْفَى عَلَى ثَنِيَّةٍ أَوْ فَدْفَدٍ كَبَّرَ ثَلاثًا، ثُمَّ قَالَ: «لاَ إلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. آيِبُونَ، تَائِبُونَ، عَابِدُونَ، سَاجِدُونَ، لِرَبِّنَا حَامِدُونَ، صَدَقَ اللهُ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الأحْزَابَ وَحْدَهُ». متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
وفي رواية لمسلم: إِذَا قَفَلَ مِنَ الجيُوشِ أَو السَّرَايَا أَو الحَجِّ أَو العُمْرَةِ.
قَوْلهُ: «أوْفَى» أيْ: ارْتَفَعَ، وَقَوْلُه: «فَدْفَدٍ» هُوَ بفتح الفائَينِ بينهما دال مهملة ساكِنة، وَآخِره دال أخرى وَهُوَ: «الغَليظُ المُرْتَفِعُ مِنَ الأرضِ».

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: البخاري 8/ 102 (6385)، ومسلم 4/ 105 (1344) (428).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিতেও টিলা বা অন্য কোনও উচ্চস্থানে ওঠার বেলায় আল্লাহু আকবার বলার আমল বর্ণিত হয়েছে। সেইসঙ্গে হজ্জ, উমরা ইত্যাদি সফর থেকে ফেরার সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দুআ পড়তেন তার উল্লেখ রয়েছে। দুআটি হলো-

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كلِّ شيءٍ قديرٌ آيِبونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ صَدَقَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَه

'আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক। তাঁর কোনও শরীক নেই। তাঁরই রাজত্ব এবং তাঁরই সকল প্রশংসা। তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী। আমরা তাওবাকারী। আমরা ইবাদতকারী। আমরা সিজদাকারী এবং আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, তিনি তাঁর বান্দার সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই শত্রুবাহিনীদের পরাজিত করেছেন'।

দু'আটির তিনটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশে আল্লাহ তা'আলার গুণগান। বলা হয়েছে- لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ (আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তিনি এক। তাঁর কোনও শরীক নেই)। এতে স্বীকার করা হয়েছে যে, মাবুদ একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই। ইবাদত কেবল তাঁরই করতে হয় এবং তাঁরই করা যায়। এতে তাঁর কোনও শরীক নেই। তিনি ছাড়া অন্য কারওই ইবাদত করা যায় না। কেউ এর উপযুক্ত নয়।

لَهُ الْمُلْكُ (তাঁরই রাজত্ব)। এর দ্বারা স্বীকার করা হয়েছে যে, এ মহাবিশ্বের রাজত্ব ও মালিকানা কেবল আল্লাহ তা'আলারই। তিনি ছাড়া অন্য কেউ এ জগতের কোনওকিছুরই প্রকৃত মালিক নয়। যে বস্তুতে যার যতটুকু মালিকানা, তা আল্লাহ তা'আলারই দেওয়া। তাই তাতে নিজ মালিকানার ব্যবহার আল্লাহ তা'আলার হুকুম অনুসারেই করা জরুরি।

وَلَهُ الْحَمْدُ (এবং তাঁরই সকল প্রশংসা)। অর্থাৎ এই জগতে যে যার যেভাবেই প্রশংসা করে, প্রকৃতপক্ষে সে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই। কেননা তিনিই সমস্ত সদগুণের আধার। তাই প্রকৃত অর্থে প্রশংসা কেবল তাঁরই করা যায়। তাছাড়া জগতের যা-কিছু ভালো ও যা-কিছু কল্যাণকর তা সব তাঁরই দান। তাই কারও ভালো কিছুর জন্য প্রশংসা করলে তাতে প্রশংসা করা হয় মূলত আল্লাহ তা'আলারই। এভাবে সরাসরি তাঁর প্রশংসা করলে সে প্রশংসা তো তাঁর হয়ই, অন্য কোনওকিছুর প্রশংসা করলেও পরোক্ষভাবে তা দ্বারাও আল্লাহ তা'আলারই প্রশংসা হয়।

وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِير (তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান)। মহাবিশ্বের ছোট-বড় অগণিত মাখলুক, তাদের আকৃতি-প্রকৃতি, প্রকাশ্য রূপ ও অভ্যন্তরীণ গুণ, তাদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও লয়, তাদের গতি ও যতি এবং মহাবিশ্বের বহুবিচিত্র রূপ ও শোভা আল্লাহ তা'আলার অসীম শক্তি-ক্ষমতার নিদর্শন। এর প্রত্যেকটি বিষয়ে লক্ষ করলে তাঁর কুদরত ও শক্তির অসীমতা উপলব্ধি করা যায়। আরও ধারণা পাওয়া যায় যে, তিনি কোনওকিছু করতে বাধ্য নন এবং কোনওকিছুই তাঁর জন্য অসম্ভব নয়। তাঁর ইচ্ছা কেউ ব্যর্থ করতে পারে না।

দু'আটির দ্বিতীয় অংশে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার প্রতি বান্দার অভিমুখিতা ও তাঁর প্রতি তার আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ। সুতরাং বলা হয়েছে- آيِبونَ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী)। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দয়া-অনুগ্রহেই আমরা সফর থেকে আপন ঠিকানায় ফিরে আসতে পেরেছি। আর আমরা যখন যেখানে যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, সর্বাবস্থায় আমাদের প্রত্যাবর্তন তাঁরই দিকে। আমরা শরীর ও মনে তাঁরই অভিমুখী।

تَائِبُونَ (আমরা তাওবাকারী)। এ সফরকালে হয়তো আমাদের দ্বারা কোনও অন্যায়-অনুচিত কাজ হয়ে গেছে। সেজন্য আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওবা করছি। আমরা তাওবা করছি আমাদের বিগত জীবনের যাবতীয় অন্যায়-অপরাধ থেকে। 'তাওবা'-এর আক্ষরিক অর্থ ফিরে আসা, আল্লাহর পথে ফিরে আসা। পাপকর্ম দ্বারা বান্দা আল্লাহর পথ হারিয়ে ফেলে, শয়তানের পথে চলে যায়। তারপর যখন তার চেতনা ফিরে আসে, তখন অনুতপ্ত হয়ে সে পথ পরিত্যাগ করে এবং আল্লাহ তা'আলার সরল-সঠিক পথে ফিরে আসে। এ ফিরে আসাটাই তাওবা। তো আমরা তাওবাকারী মানে আমরা সকল ভুল-ভ্রান্ত পথ পরিত্যাগ করে আল্লাহ তা'আলার সত্য-সরল পথে প্রত্যাবর্তনকারী।

عَابِدُونَ سَاجِدُونَ (আমরা ইবাদতকারী। আমরা সিজদাকারী)। অর্থাৎ আমরা আনুগত্যের পরম নিদর্শনরূপে তাঁর সামনে মাটিতে মাথা রাখি। আমরা ঘরে থাকি বা বাইরে, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার ইবাদতকারীই। তাঁর ইবাদত করার জন্যই আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটাই আমাদের জীবনের আসল কাজ। তাই বাড়িতে থাকি বা সফরে, কখনওই আমাদের এ আসল কাজ থেকে বিমুখ হওয়া চলে না। সুতরাং আমরা ইবাদতকারীরূপেই বাঁচতে চাই এবং ইবাদতকারীরূপেই মৃত্যুবরণ করতে চাই। আমাদের জীবন ও মরণ আল্লাহরই জন্য। এভাবে এ কথাটি যেন জীবনভর আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে রত থাকা ও যত বেশি সম্ভব সিজদা করতে থাকার এক প্রতিশ্রুতি।

لِرَبَّنَا حَامِدُونَ (আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী)। অর্থাৎ এই যে সফরের কার্যাবলি সমাপ্ত করে আমরা বাড়িতে ফেরার জন্য রওয়ানা করছি, এটা আল্লাহ তা'আলারই অনুগ্রহ। এজন্য আমরা তাঁর শোকর আদায় করছি। তাছাড়া সফরে থাকি বা বাড়িতে, আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নি'আমত ও অনুগ্রহ ভোগ করে থাকি। সেজন্য আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই শোকর আদায় করি।

দু'আটির তৃতীয় অংশে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ বিশেষ নি'আমতের স্বীকারোক্তি। বলা হয়েছে- صَدَقَ اللهُ وَعْدَهُ (আল্লাহ তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন)। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া ওয়াদাসমূহের কথাও বোঝানো হতে পারে, আবার সাধারণভাবে তাঁর ও মুমিনদেরকে দেওয়া ওয়াদার কথাও বোঝানো হতে পারে। যেমন এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

اِنَّا لَنَنۡصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَیَوۡمَ یَقُوۡمُ الۡاَشۡہَادُ ۙ

'নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে এবং মুমিনদেরকে পার্থিব জীবনেও সাহায্য করি এবং সেই দিনও করব, যেদিন সাক্ষীগণ দাঁড়িয়ে যাবে। (সূরা গাফির, আয়াত ৫১)

এ সাহায্য যুদ্ধক্ষেত্রেও হতে পারে এবং রোগ-ব্যাধি ও অন্যান্য বিপদ-আপদেও হতে পারে। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ওয়াদা রয়েছে যে, তিনি মুমিনদেরকে বিভিন্ন রকম বালা-মসিবত দিয়ে পরীক্ষা করবেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে-

لَتُبۡلَوُنَّ فِیۡۤ اَمۡوَالِکُمۡ وَاَنۡفُسِکُمۡ ۟ وَلَتَسۡمَعُنَّ مِنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ وَمِنَ الَّذِیۡنَ اَشۡرَکُوۡۤا اَذًی کَثِیۡرًا ؕ وَاِنۡ تَصۡبِرُوۡا وَتَتَّقُوۡا فَاِنَّ ذٰلِکَ مِنۡ عَزۡمِ الۡاُمُوۡرِ

'(হে মুসলিমগণ!) অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের অর্থসম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে পরীক্ষা করা হবে এবং তোমরা 'আহলে কিতাব' ও 'মুশরিক' উভয় সম্প্রদায়ের পক্ষ হতে অনেক পীড়াদায়ক কথা শুনবে। তোমরা যদি সবর ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয়ই এটা অতি বড় হিম্মতের কাজ (যা তোমাদেরকে অবলম্বন করতেই হবে)। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৬)

আরও ইরশাদ হয়েছে-

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَانِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ

'আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনও) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৫)

আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলায় যেমন, তেমনি তাঁর পরবর্তীকালে মুমিনদের বেলায়ও তাঁর এ ওয়াদা পূরণ করেছেন। তিনি নানাভাবে মুমিনদের পরীক্ষা করেছেন এবং তাতে তাদেরকে ধৈর্যধারণের তাওফীকও দিয়েছেন। ফলে যখনই কোনও মুমিন বিপদ-আপদের সম্মুখীন হয়, তাতে সে ধৈর্যধারণ করে এবং বলে ওঠে-

هُذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ

'এটাই সেই বিষয়, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন। (সূরা আহযাব, আয়াত ২২)

وَنَصَرَ عَبْدَهُ (তিনি তাঁর বান্দার সাহায্য করেছেন)। এর দ্বারা তাঁর কামেল বান্দা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বোঝানো উদ্দেশ্য। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বদর, খন্দক, হুদায়বিয়া ও মক্কাবিজয়সহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ সাহায্য দ্বারা যেমন প্রকাশ্য বিজয় দান করেছেন, তেমনি তাঁর জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে ভরপুর সাহায্য করে সবরকম বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। মুসাফির ব্যক্তি এর ভেতর দিয়ে তার নিজের বেলায়ও আল্লাহ তা'আলার সাহায্যের কথা স্মরণ করতে পারে যে, তার এ সফরে সে কত ভাবে আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছে। ফলে এ কথাটি দ্বারা যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রদত্ত সাহায্যের কারণে আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় হবে, তেমনি তার নিজের প্রাপ্ত সাহায্যের কারণেও আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করা হবে।

وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ (এবং তিনি একাই শত্রুবাহিনীদের পরাজিত করেছেন)।

যেমন খন্দকের যুদ্ধে মক্কা মুকাররামা ও তার বাইরের বিভিন্ন গোত্র সম্মিলিতভাবে মদীনা মুনাউওয়ারায় হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা প্রবল ঝড়ো হাওয়ার দ্বারা তাদের পর্যুদস্ত করে দেন। ফলে তারা পালাতে বাধ্য হয়। এমনিভাবে মক্কাবিজয়কালেও বিভিন্ন গোত্রের লোকজন একত্র হয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেও ব্যর্থ করে দেন। এসব ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিরাট অনুগ্রহ। সে অনুগ্রহকে সফরের দুআর অন্তর্ভুক্ত করে কিয়ামত পর্যন্ত স্মরণীয় করে রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুআটি যেমন হজ্জ ও উমরার সফর থেকে ফেরার সময় পড়েছেন, তেমনি হজ্জ আদায়কালে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করেও এটি পাঠ করেছিলেন। তাছাড়া মক্কাবিজয়ের পর তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতেও তিনি এটি পাঠ করেছিলেন।

হাদীছটি থেকে শিক্ষণীয়

ক. হজ্জ ও উমরাসহ যে-কোনও সফর থেকে ফেরার সময় এ হাদীছে বর্ণিত দুআটি পড়া মুস্তাহাব।

খ. যে-কোনও উচ্চস্থানে উঠে তিনবার আল্লাহু আকবার বলা মুস্তাহাব।

গ. আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ, তাঁর একচ্ছত্র রাজত্ব, তাঁর নি'আমত ও অনুগ্রহ ও তাঁর অসীম ক্ষমতার কথা অন্তরে স্মরণ করার পাশাপাশি মুখেও স্বীকার করা উচিত। এটা অন্তরে ঈমান বলীয়ান করা, আল্লাহ তা'আলার প্রতি তাওয়াক্কুল ও ভরসা গভীরতর করা এবং আল্লাহপ্রেম উজ্জীবিত করার পক্ষে সহায়ক।

ঘ. নিজ ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য যত বেশি সম্ভব তাওবা-ইস্তিগফার করা উচিত।

ঙ. আমাদেরকে অবশ্যই জীবনভর আল্লাহ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগীতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে।

চ. আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহের জন্য সর্বদা শোকরগুযার থাকা উচিত।

ছ. যে-কোনও সংকট ও বিপদ-আপদে সবর অবলম্বন করতে হবে।

জ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ সাহায্য ও অনুগ্রহ আমাদের জন্যও বিরাট নি'আমত। তাই জীবনভর তা স্মরণ করা এবং সেজন্য আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করা একান্ত কর্তব্য।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ৯৭৭ | মুসলিম বাংলা