রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ
৮. সফরের আদব-বিধান
হাদীস নং: ৯৭২
সফরের আদব-বিধান
সফরে যাওয়া ও ফেরার সময় যানবাহনে উঠে পড়ার দুআ
সম্পর্কিত একটি আয়াত
وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
অর্থ: এবং তোমাদের জন্য জাহাজ ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা আরোহণ করে থাক। যাতে তোমরা তার পিঠে চড়তে পার, তারপর যখন তোমরা তাতে চড়ে বস, তখন তোমাদের প্রতিপালকের নি'আমত স্মরণ কর এবং বল, পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে। (সূরা যুখরুফ, আয়াত ১২-১৪)
আয়াতের ব্যাখ্যা
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ কিছু নি'আমতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং এর ভেতর দিয়ে তাঁর কুদরতের নিদর্শন তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে এসব নি'আমতের কারণে তাঁর শোকর আদায়ের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। পরোক্ষভাবে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসের কথাটিও উঠে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ (এবং তোমাদের জন্য জাহাজ ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা আরোহণ করে থাক)। জাহাজ বলতে সেকালের লোক তো কেবল পানির জাহাজই বুঝত। বর্তমানে উড়োজাহাজও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। উভয় জাহাজই মানুষের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ নি'আমত। এর দ্বারা মানুষ সহজে দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করতে পারে এবং পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের নানা প্রয়োজন সমাধা করতে পারে।
চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা এখানে কেবল উট, গাধা, ঘোড়া ও খচ্চর বোঝানো উদ্দেশ্য।
সাধারণত মানুষ এর পিঠেই চড়ে থাকে। গরু ও মহিষ পরোক্ষভাবে এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কেননা মানুষ সরাসরি এর পিঠে চড়ে না; বরং গরু-মহিষের টানা গাড়িতে নিজেরা চড়ে ও মালামাল পরিবহন করে। এদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে চাষাবাদের কাজ নেওয়ার জন্য। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
بَيْنَا رَجُلٌ يَسُوقُ بَقَرَةً إِذْ رَكِبَهَا فَضَرَبَهَا، فَقَالَتْ: إِنَّا لَمْ نُخْلَقْ لِهَذَا، إِنَّمَا خُلِقْنَا لِلْحَرْثِ " فَقَالَ النَّاسُ: سُبْحَانَ اللَّهِ بَقَرَةٌ تَكَلَّمُ، فَقَالَ: " فَإِنِّي أُومِنُ بِهَذَا، أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَر
'এক ব্যক্তি একটি গরু হাঁকিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ সে গরুটির উপর সওয়ার হয় এবং সেটিকে প্রহার করে। তখন গরুটি বলে ওঠে, আমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি; আমাদেরকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে চাষাবাদের কাজের জন্য। এ কথা শুনে উপস্থিত লোকজন বলে উঠল, সুবহানাল্লাহ! গরুতে কথা বলে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কিন্তু এর উপর বিশ্বাস রাখি এবং আবু বকর ও উমরও। (সহীহ বুখারী: ৩৪৭১; সহীহ মুসলিম: ২৩৮৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৮০৬০: মুসনাদুল হুমায়দী: ১০৮৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৩৪৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৬৭৮৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩৮৮৯; জামে' মা'মার ইবন রাশিদ: ২০৪০৩)
لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ (যাতে তোমরা তার পিঠে চড়তে পার)। অর্থাৎ তোমাদের প্রতি এটা আল্লাহ তা'আলার এক অনুগ্রহ যে, তিনি তোমাদের সওয়ার হওয়ার জন্য জাহাজ ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ না হলে তোমরা তাতে চড়তে পারতে না। উট তোমাদের চেয়ে অনেক বড় প্রাণী। তোমাদের চেয়ে তার শারীরিক শক্তিও অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও তোমরা তার পিঠে চড়ে যাতায়াত করতে পারছ এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল বহন করতে পারছ।
এমনিভাবে তিনি পানি এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং এমনভাবে জাহাজ তৈরির কলাকৌশল তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, তোমরা পানির উপর দিয়ে বড় বড় জাহাজ চালিয়ে দাও আর স্থলভাগের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা কর। আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ না হলে তোমরা সমুদ্রের অথই জলরাশির উপর দিয়ে জাহাজ চালাতে পারতে না আর এ পন্থায় নিজেদের নানাবিধ কল্যাণ সাধনেও সক্ষম হতে না। এমনিভাবে তিনি বাতাসকেও উড়োজাহাজ চলাচলের অনুকূল করে সৃষ্টি করেছেন। তোমাদেরকে এমন প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন, যার সাহায্যে বড় বড় ও ভারী ভারী উড়োজাহাজ দিয়ে নিজেরাও আকাশপথে চলাচল করছ এবং বয়ে নিতে পারছ ব্যাবহারিক ও বাণিজ্যিক মালামাল।
লক্ষণীয়, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ (যাতে তোমরা তার পিঠে চড়তে পার)। تَسْتَوُوا ক্রিয়াপদটির উৎপত্তি اَلاِسْتِوَاءُ থেকে। এর অর্থ সোজা হয়ে বসা, আসন গ্রহণ করা, সমাসীন হওয়া। অর্থাৎ রাজা-বাদশাহগণ যেমন সিংহাসনে সমাসীন হয়, জাহাজে ও উটের পিঠে তোমাদের আসন গ্রহণ করাটাও যেন ঠিক সে রকমই। এভাবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাঁর অন্যান্য সৃষ্টির উপর রাজকীয় মর্যাদা দান করেছেন। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তার আপন মর্যাদা সম্পর্কেও সচেতন করেছেন, যাতে সে তার যাবতীয় কাজকর্মে সেই মর্যাদা রক্ষায় যত্নবান থাকে।
ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ (তারপর যখন তোমরা তাতে চড়ে বস, তখন তোমাদের প্রতিপালকের নি'আমত স্মরণ কর)। অর্থাৎ এসব বাহনের উপর সওয়ার হয়ে চলাচল করা ও এর মাধ্যমে মালামাল বয়ে নেওয়াটা তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। কাজেই এতে আরোহণকালে তোমরা আল্লাহ তা'আলার এ নি'আমত স্মরণ করবে ও তাঁর শোকর আদায় করবে। এর দ্বারা বান্দাকে সতর্ক করা হয়েছে যে, যখনই তোমরা আল্লাহ তা'আলার কোনও নি'আমত ভোগ করবে, তখন অবশ্যই সে নি'আমতের আসল দাতা আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণে রাখবে। তোমরা নি'আমতের ভোগে নিমগ্ন হয়ে আসল দাতাকে যেন ভুলে না যাও। জাহাজ তোমাদের জলীয় নি'আমত। আর উট স্থলের নি'আমত। জলে-স্থলে এরকম অসংখ্য নি'আমত তোমাদের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিটি আল্লাহ তা'আলারই দান। তাই প্রতিটি নি'আমত ভোগ করার সময় তোমাদের কর্তব্য আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করা ও তাঁর শোকর আদায় করা।
বান্দা আল্লাহ তা'আলার নি'আমতের শোকর কীভাবে আদায় করবে, তার ভাষাও আল্লাহ তা'আলা তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তা হলো তোমরা বলবে-
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ (পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। এটা যানবাহনে চড়ার দুআ। এর মর্মকথা হলো, আল্লাহ তা'আলা এসব জন্তু ও জাহাজ আমাদেরই জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নিজের এসবের কোনও প্রয়োজন নেই। তিনি সর্বশক্তিমান। কোনওকিছুর প্রতি তাঁর কোনওরূপ মুখাপেক্ষিতা নেই। তিনি সকল দুর্বলতা ও সকল মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। কাজেই তিনি নিজ প্রয়োজনে নয়; বরং আমাদেরই কল্যাণার্থে এসব বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং এসবকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। তিনি বশীভূত না করলে আমাদের পক্ষে এগুলোকে নিজেদের কাজে লাগানো ও এদেরকে দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী উটকে কীভাবে আমরা ব্যবহার করতে সক্ষম হতাম? কীভাবেই বা ভারী ভারী নৌযান পানিতে ভাসাতাম বা ভারী ভারী উড়োজাহাজ বায়ুমণ্ডলে পরিচালনা করতাম?
দু'আটির শেষে বলা হয়েছে- وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ (নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। এর দ্বারা আখিরাতের সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দুআটি পড়া হয় দুনিয়াবী সফরকালে। দুনিয়ার সফরও সফর বটে, কিন্তু সত্যিকারের সফর আখিরাতের সফরই। মানুষ সর্বক্ষণ সে সফরের মধ্যেই থাকে। দুনিয়াবী সফর কখনও করা হয়, কখনও করা হয় না। কিন্তু আখিরাতের সফর চলতেই থাকে। জন্মের পর থেকেই সে সফর শুরু হয়ে যায়। মৃত্যুতে শেষ হয়। দুনিয়াবী সফরে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের কোনও ফায়দা হাসিল করা উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু যে সফরের সঙ্গে তার আখিরাতের অনন্ত জীবনের লাভ-লোকসান যুক্ত, সে সফর জারি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ গাফিলতির ঘুমে রয়েছে। তার যে সময় বয়ে যাচ্ছে, সে আখিরাতের দিকে এগিয়ে চলছে, অথচ সে জীবনের জন্য কোনও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে না। এভাবেই চরম উদাসীনতার ভেতর তার জীবন কাটে। অথচ ওই জীবনের সফলতা অর্জনের জন্যই তাকে এ ক্ষণস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়েছে। ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়েই সে ব্যস্ত আর আসল জীবন সম্পর্কে গাফেল। এ দুআর ভেতর দিয়ে বান্দার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ক্ষণস্থায়ী জীবনে এই যে সফর করছি, এর পাশাপাশি আমাদের আখিরাতের সফরও অব্যাহত রয়েছে। সেই সফরের শেষ গন্তব্য আমাদের প্রতিপালকের দরবার। একদিন আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব। আমাদেরকে সে বিষয়ে গাফেল হলে চলবে না। বরং সেখানকার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই হবে আমাদের আসল কাজ।
উল্লেখ্য, এ আয়াতে স্থলযানের মতো নৌযানে আরোহণকালেও পড়তে বলা হয়েছে- سُبْحْنَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَ مَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ। অপর এক আয়াতে নৌযানের জন্য বিশেষভাবে যে দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তা হলো-
بِسْمِ اللَّهِ مُجْرِهَا وَمُرْسَهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَحِيمٌ
'এর চলাও আল্লাহর নামে এবং নোঙর করাও। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (৩৬. সূরা হুদ, আয়াত ৪১)
আয়াতটি থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রকার ত্রুটি, কমতি ও মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
খ. মানুষ আল্লাহ তা'আলার অতি মর্যাদাপূর্ণ মাখলুক।
গ. সবরকম যানবাহন মানুষের জন্য আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত।
ঘ. জল-স্থল ও আকাশপথের কোনও বাহনেরই ব্যবহার কেবল মানুষের নিজ কৃতিত্বের ফল নয়; বরং আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও তাঁর কুদরতের সক্রিয়তাই আসল।
ঙ. প্রতিটি যানবাহন ব্যবহারের সময় তার আসল দাতা আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করতে হবে।
চ. কোনও নি'আমতের ভোগ-উপভোগকালে তার মধ্যে এমনভাবে মগ্ন হয়ে যেতে নেই যে, নিজ সৃষ্টিকর্তা ও নিজ জীবনের লক্ষ্যবস্তু স্মরণ থাকবে না।
ছ. মানুষ এক দুর্বল সৃষ্টি। আল্লাহ তা'আলা সাহায্য না করলে তার পক্ষে এক অবোধ পশুকেও নিজ কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
জ. যানবাহনে আরোহণকালে আয়াতে বর্ণিত দুআটি পড়া উচিত।
ঝ. মানুষ সর্বক্ষণ আখিরাতের সফরের মধ্যে রয়েছে। সে সফরের কথা কখনও ভুলতে নেই।
ঞ. মানুষের শেষ গন্তব্য মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সেজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই তার আসল কাজ।
সম্পর্কিত একটি আয়াত
وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
অর্থ: এবং তোমাদের জন্য জাহাজ ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা আরোহণ করে থাক। যাতে তোমরা তার পিঠে চড়তে পার, তারপর যখন তোমরা তাতে চড়ে বস, তখন তোমাদের প্রতিপালকের নি'আমত স্মরণ কর এবং বল, পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে। (সূরা যুখরুফ, আয়াত ১২-১৪)
আয়াতের ব্যাখ্যা
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ কিছু নি'আমতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং এর ভেতর দিয়ে তাঁর কুদরতের নিদর্শন তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে এসব নি'আমতের কারণে তাঁর শোকর আদায়ের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। পরোক্ষভাবে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসের কথাটিও উঠে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ (এবং তোমাদের জন্য জাহাজ ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা আরোহণ করে থাক)। জাহাজ বলতে সেকালের লোক তো কেবল পানির জাহাজই বুঝত। বর্তমানে উড়োজাহাজও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। উভয় জাহাজই মানুষের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ নি'আমত। এর দ্বারা মানুষ সহজে দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করতে পারে এবং পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের নানা প্রয়োজন সমাধা করতে পারে।
চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা এখানে কেবল উট, গাধা, ঘোড়া ও খচ্চর বোঝানো উদ্দেশ্য।
সাধারণত মানুষ এর পিঠেই চড়ে থাকে। গরু ও মহিষ পরোক্ষভাবে এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কেননা মানুষ সরাসরি এর পিঠে চড়ে না; বরং গরু-মহিষের টানা গাড়িতে নিজেরা চড়ে ও মালামাল পরিবহন করে। এদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে চাষাবাদের কাজ নেওয়ার জন্য। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
بَيْنَا رَجُلٌ يَسُوقُ بَقَرَةً إِذْ رَكِبَهَا فَضَرَبَهَا، فَقَالَتْ: إِنَّا لَمْ نُخْلَقْ لِهَذَا، إِنَّمَا خُلِقْنَا لِلْحَرْثِ " فَقَالَ النَّاسُ: سُبْحَانَ اللَّهِ بَقَرَةٌ تَكَلَّمُ، فَقَالَ: " فَإِنِّي أُومِنُ بِهَذَا، أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَر
'এক ব্যক্তি একটি গরু হাঁকিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ সে গরুটির উপর সওয়ার হয় এবং সেটিকে প্রহার করে। তখন গরুটি বলে ওঠে, আমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি; আমাদেরকে তো সৃষ্টি করা হয়েছে চাষাবাদের কাজের জন্য। এ কথা শুনে উপস্থিত লোকজন বলে উঠল, সুবহানাল্লাহ! গরুতে কথা বলে? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কিন্তু এর উপর বিশ্বাস রাখি এবং আবু বকর ও উমরও। (সহীহ বুখারী: ৩৪৭১; সহীহ মুসলিম: ২৩৮৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৮০৬০: মুসনাদুল হুমায়দী: ১০৮৫; মুসনাদে আহমাদ: ৭৩৪৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৬৭৮৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৩৮৮৯; জামে' মা'মার ইবন রাশিদ: ২০৪০৩)
لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ (যাতে তোমরা তার পিঠে চড়তে পার)। অর্থাৎ তোমাদের প্রতি এটা আল্লাহ তা'আলার এক অনুগ্রহ যে, তিনি তোমাদের সওয়ার হওয়ার জন্য জাহাজ ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ না হলে তোমরা তাতে চড়তে পারতে না। উট তোমাদের চেয়ে অনেক বড় প্রাণী। তোমাদের চেয়ে তার শারীরিক শক্তিও অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও তোমরা তার পিঠে চড়ে যাতায়াত করতে পারছ এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল বহন করতে পারছ।
এমনিভাবে তিনি পানি এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং এমনভাবে জাহাজ তৈরির কলাকৌশল তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, তোমরা পানির উপর দিয়ে বড় বড় জাহাজ চালিয়ে দাও আর স্থলভাগের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা কর। আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ না হলে তোমরা সমুদ্রের অথই জলরাশির উপর দিয়ে জাহাজ চালাতে পারতে না আর এ পন্থায় নিজেদের নানাবিধ কল্যাণ সাধনেও সক্ষম হতে না। এমনিভাবে তিনি বাতাসকেও উড়োজাহাজ চলাচলের অনুকূল করে সৃষ্টি করেছেন। তোমাদেরকে এমন প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন, যার সাহায্যে বড় বড় ও ভারী ভারী উড়োজাহাজ দিয়ে নিজেরাও আকাশপথে চলাচল করছ এবং বয়ে নিতে পারছ ব্যাবহারিক ও বাণিজ্যিক মালামাল।
লক্ষণীয়, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন لِتَسْتَوُوا عَلَىٰ ظُهُورِهِ (যাতে তোমরা তার পিঠে চড়তে পার)। تَسْتَوُوا ক্রিয়াপদটির উৎপত্তি اَلاِسْتِوَاءُ থেকে। এর অর্থ সোজা হয়ে বসা, আসন গ্রহণ করা, সমাসীন হওয়া। অর্থাৎ রাজা-বাদশাহগণ যেমন সিংহাসনে সমাসীন হয়, জাহাজে ও উটের পিঠে তোমাদের আসন গ্রহণ করাটাও যেন ঠিক সে রকমই। এভাবে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তাঁর অন্যান্য সৃষ্টির উপর রাজকীয় মর্যাদা দান করেছেন। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তার আপন মর্যাদা সম্পর্কেও সচেতন করেছেন, যাতে সে তার যাবতীয় কাজকর্মে সেই মর্যাদা রক্ষায় যত্নবান থাকে।
ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ (তারপর যখন তোমরা তাতে চড়ে বস, তখন তোমাদের প্রতিপালকের নি'আমত স্মরণ কর)। অর্থাৎ এসব বাহনের উপর সওয়ার হয়ে চলাচল করা ও এর মাধ্যমে মালামাল বয়ে নেওয়াটা তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। কাজেই এতে আরোহণকালে তোমরা আল্লাহ তা'আলার এ নি'আমত স্মরণ করবে ও তাঁর শোকর আদায় করবে। এর দ্বারা বান্দাকে সতর্ক করা হয়েছে যে, যখনই তোমরা আল্লাহ তা'আলার কোনও নি'আমত ভোগ করবে, তখন অবশ্যই সে নি'আমতের আসল দাতা আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণে রাখবে। তোমরা নি'আমতের ভোগে নিমগ্ন হয়ে আসল দাতাকে যেন ভুলে না যাও। জাহাজ তোমাদের জলীয় নি'আমত। আর উট স্থলের নি'আমত। জলে-স্থলে এরকম অসংখ্য নি'আমত তোমাদের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিটি আল্লাহ তা'আলারই দান। তাই প্রতিটি নি'আমত ভোগ করার সময় তোমাদের কর্তব্য আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করা ও তাঁর শোকর আদায় করা।
বান্দা আল্লাহ তা'আলার নি'আমতের শোকর কীভাবে আদায় করবে, তার ভাষাও আল্লাহ তা'আলা তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তা হলো তোমরা বলবে-
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ (পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। এটা যানবাহনে চড়ার দুআ। এর মর্মকথা হলো, আল্লাহ তা'আলা এসব জন্তু ও জাহাজ আমাদেরই জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নিজের এসবের কোনও প্রয়োজন নেই। তিনি সর্বশক্তিমান। কোনওকিছুর প্রতি তাঁর কোনওরূপ মুখাপেক্ষিতা নেই। তিনি সকল দুর্বলতা ও সকল মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। কাজেই তিনি নিজ প্রয়োজনে নয়; বরং আমাদেরই কল্যাণার্থে এসব বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং এসবকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। তিনি বশীভূত না করলে আমাদের পক্ষে এগুলোকে নিজেদের কাজে লাগানো ও এদেরকে দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী উটকে কীভাবে আমরা ব্যবহার করতে সক্ষম হতাম? কীভাবেই বা ভারী ভারী নৌযান পানিতে ভাসাতাম বা ভারী ভারী উড়োজাহাজ বায়ুমণ্ডলে পরিচালনা করতাম?
দু'আটির শেষে বলা হয়েছে- وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ (নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে)। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। এর দ্বারা আখিরাতের সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দুআটি পড়া হয় দুনিয়াবী সফরকালে। দুনিয়ার সফরও সফর বটে, কিন্তু সত্যিকারের সফর আখিরাতের সফরই। মানুষ সর্বক্ষণ সে সফরের মধ্যেই থাকে। দুনিয়াবী সফর কখনও করা হয়, কখনও করা হয় না। কিন্তু আখিরাতের সফর চলতেই থাকে। জন্মের পর থেকেই সে সফর শুরু হয়ে যায়। মৃত্যুতে শেষ হয়। দুনিয়াবী সফরে মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের কোনও ফায়দা হাসিল করা উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু যে সফরের সঙ্গে তার আখিরাতের অনন্ত জীবনের লাভ-লোকসান যুক্ত, সে সফর জারি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ গাফিলতির ঘুমে রয়েছে। তার যে সময় বয়ে যাচ্ছে, সে আখিরাতের দিকে এগিয়ে চলছে, অথচ সে জীবনের জন্য কোনও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে না। এভাবেই চরম উদাসীনতার ভেতর তার জীবন কাটে। অথচ ওই জীবনের সফলতা অর্জনের জন্যই তাকে এ ক্ষণস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়েছে। ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়েই সে ব্যস্ত আর আসল জীবন সম্পর্কে গাফেল। এ দুআর ভেতর দিয়ে বান্দার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ক্ষণস্থায়ী জীবনে এই যে সফর করছি, এর পাশাপাশি আমাদের আখিরাতের সফরও অব্যাহত রয়েছে। সেই সফরের শেষ গন্তব্য আমাদের প্রতিপালকের দরবার। একদিন আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব। আমাদেরকে সে বিষয়ে গাফেল হলে চলবে না। বরং সেখানকার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই হবে আমাদের আসল কাজ।
উল্লেখ্য, এ আয়াতে স্থলযানের মতো নৌযানে আরোহণকালেও পড়তে বলা হয়েছে- سُبْحْنَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَ مَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ। অপর এক আয়াতে নৌযানের জন্য বিশেষভাবে যে দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তা হলো-
بِسْمِ اللَّهِ مُجْرِهَا وَمُرْسَهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَحِيمٌ
'এর চলাও আল্লাহর নামে এবং নোঙর করাও। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (৩৬. সূরা হুদ, আয়াত ৪১)
আয়াতটি থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আল্লাহ তা'আলা সর্বপ্রকার ত্রুটি, কমতি ও মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
খ. মানুষ আল্লাহ তা'আলার অতি মর্যাদাপূর্ণ মাখলুক।
গ. সবরকম যানবাহন মানুষের জন্য আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত।
ঘ. জল-স্থল ও আকাশপথের কোনও বাহনেরই ব্যবহার কেবল মানুষের নিজ কৃতিত্বের ফল নয়; বরং আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও তাঁর কুদরতের সক্রিয়তাই আসল।
ঙ. প্রতিটি যানবাহন ব্যবহারের সময় তার আসল দাতা আল্লাহ তা'আলাকে স্মরণ করতে হবে।
চ. কোনও নি'আমতের ভোগ-উপভোগকালে তার মধ্যে এমনভাবে মগ্ন হয়ে যেতে নেই যে, নিজ সৃষ্টিকর্তা ও নিজ জীবনের লক্ষ্যবস্তু স্মরণ থাকবে না।
ছ. মানুষ এক দুর্বল সৃষ্টি। আল্লাহ তা'আলা সাহায্য না করলে তার পক্ষে এক অবোধ পশুকেও নিজ কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
জ. যানবাহনে আরোহণকালে আয়াতে বর্ণিত দুআটি পড়া উচিত।
ঝ. মানুষ সর্বক্ষণ আখিরাতের সফরের মধ্যে রয়েছে। সে সফরের কথা কখনও ভুলতে নেই।
ঞ. মানুষের শেষ গন্তব্য মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সেজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই তার আসল কাজ।
৯৭২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনও সফরে বের হওয়ার সময় যখন উটের পিঠে সোজা হয়ে বসতেন, তিনবার তাকবীর বলতেন। তারপর বলতেন-
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ اللهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اللهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ، اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ، وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ، وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالْأَهْلِ وَالْوَلَدِ.
(পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ। আমরা আমাদের এ সফরে আপনার কাছে চাই পুণ্য ও তাকওয়া এবং এমন আমল, যা আপনি পছন্দ করেন। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আমাদের এ সফরকে সহজ করে দিন, এর দূরত্বকে আমাদের জন্য গুটিয়ে দিন। হে আল্লাহ! সফরে আপনি আমাদের সঙ্গী এবং পরিবারবর্গে আমাদের প্রতিনিধি। হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি সফরের কষ্ট-ক্লেশ থেকে, কষ্টদায়ক দৃশ্য থেকে এবং অর্থসম্পদ, পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে মন্দ প্রত্যাবর্তন থেকে)। তিনি যখন ফিরে আসতেন, তখনও এ কথাগুলো বলতেন এবং তাতে আরও বলতেন- آیِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ، لِرَبِّنَا حَامِدُونَ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তাওবাকারী, আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী)-মুসলিম
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ اللهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ، اللهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ، اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ، وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ، وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالْأَهْلِ وَالْوَلَدِ.
(পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অন্যথায় একে বশীভূত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ। আমরা আমাদের এ সফরে আপনার কাছে চাই পুণ্য ও তাকওয়া এবং এমন আমল, যা আপনি পছন্দ করেন। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আমাদের এ সফরকে সহজ করে দিন, এর দূরত্বকে আমাদের জন্য গুটিয়ে দিন। হে আল্লাহ! সফরে আপনি আমাদের সঙ্গী এবং পরিবারবর্গে আমাদের প্রতিনিধি। হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি সফরের কষ্ট-ক্লেশ থেকে, কষ্টদায়ক দৃশ্য থেকে এবং অর্থসম্পদ, পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে মন্দ প্রত্যাবর্তন থেকে)। তিনি যখন ফিরে আসতেন, তখনও এ কথাগুলো বলতেন এবং তাতে আরও বলতেন- آیِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ، لِرَبِّنَا حَامِدُونَ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তাওবাকারী, আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী)-মুসলিম
كتاب آداب السفر
باب مَا يقول إذا ركب دَابَّة للسفر قَالَ الله تَعَالَى: {وَجَعَلَ لَكُمْ مِنَ الفُلْكِ وَالأنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ} [الزخرف: 12 - 13].
972 - وعن ابن عمر رضي الله عنهما: أنَّ رسول الله - صلى الله عليه وسلم - كَانَ إِذَا اسْتَوَى عَلَى بَعِيرِهِ خَارِجًا إِلَى سَفَرٍ، كَبَّرَ ثَلاثًا، ثُمَّ قَالَ: «سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ. اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ. اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ. اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالأَهْلِ وَالوَلَدِ». وَإِذَا رَجَعَ قَالَهُنَّ. وَزَادَ فِيهِنَّ «آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ». رواه مسلم. (1)
مَعْنَى «مُقْرِنِينَ»: مُطِيقِينَ. وَ «الوَعْثَاءُ» بفتحِ الواوِ وَإسكان العين المهملة وبالثاء المثلثة وبالمد وَهِيَ: الشِّدَّةُ. وَ «الكَآبَةُ» بِالمَدِّ، وَهِيَ: تَغَيُّرُ النَّفْسِ مِنْ حُزْنٍ وَنَحْوهِ. وَ «المُنْقَلَبُ»: المَرْجِعُ.
مَعْنَى «مُقْرِنِينَ»: مُطِيقِينَ. وَ «الوَعْثَاءُ» بفتحِ الواوِ وَإسكان العين المهملة وبالثاء المثلثة وبالمد وَهِيَ: الشِّدَّةُ. وَ «الكَآبَةُ» بِالمَدِّ، وَهِيَ: تَغَيُّرُ النَّفْسِ مِنْ حُزْنٍ وَنَحْوهِ. وَ «المُنْقَلَبُ»: المَرْجِعُ.
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
__________
(1) أخرجه: مسلم 4/ 104 (1342) (425).
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছটিতে সফরে বের হওয়ার সময় ও সফর থেকে ফেরার সময় যখন যানবাহনে আরোহণ করা হয় তখনকার দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। দুআটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে পড়তেন। তিনি কখন তা পড়তেন? হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. বর্ণনা করেন-
كَانَ إِذَا اسْتَوَى عَلَى بَعِيرِهِ خَارِجًا إِلَى سَفَرٍ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনও সফরে বের হওয়ার সময় যখন উটের পিঠে সোজা হয়ে বসতেন)। অর্থাৎ তিনি দুআটি পড়তেন উটের পিঠে বসার পর এবং তা পড়তেন যাত্রার শুরুতেই। সুতরাং যদি কোনও দূরপথের যাত্রা হয় আর তাতে একের পর এক যানবাহন পরিবর্তন করা হয়, তবে প্রধান বাহনটিতে আরোহণকালের জন্য দু'আটিকে স্থগিত রাখা হবে না। যেমন হজ্জযাত্রী কেবল উড়োজাহাজে চড়েই যে এ দুআটি পড়বে তা নয়; বরং বাড়ি থেকে বের হয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছার জন্য প্রথম যে বাহনটিতে চড়া হয়, তখনও এ দুআটি পড়তে হবে। আর এ দুআটি পড়া হবে যানবাহনে ঠিকঠাক হয়ে বসার পর, তার আগে নয়। শুরুতে পড়তে ভুলে গেলে পরে যখন মনে পড়বে, তখন পড়ে নেবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. বর্ণনা করেছেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূল দুআটি পড়ার আগে كبَّرَ ثَلَاثا তিনবার তাকবীর বলতেন।
অর্থাৎ তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন। অর্থাৎ আল্লাহ মহত্তম, আল্লাহ বৃহত্তম। বস্তুত তিনি এমনই বড় যে, বড়ত্বে কোনওকিছুতেই তাঁর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি অতুলনীয়ভাবে বড়। আল্লাহু আকবার তিনবার বলার দ্বারা অন্তরে তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের অনুভূতিকে বলীয়ান করে তোলা উদ্দেশ্য, যাতে পার্থিব কোনও চাহিদাকে তাঁর ইচ্ছার সামনে প্রধান্য দেওয়া না হয় এবং তাঁর আদেশের সামনে দুনিয়ার বড় থেকে বড় কোনও ব্যক্তির আদেশকে গুরুত্ব দেওয়া না হয়। অন্তরে এ চেতনা ও এ অনুভূতি সফরকালে জাগ্রত রাখার বেশি প্রয়োজন হয়। কারণ সফরে নানারকম অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। নানা কষ্ট-ক্লেশ দেখা দেয়। তখন আল্লাহ তা'আলার হুকুম পালনে অলসতা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু অন্তরে এ চেতনা জাগ্রত থাকলে সে অলসতা কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার তাকবীর বলার পর একটা লম্বা দুআ পড়তেন। শুরুতে রয়েছে পূর্বোক্ত আয়াতে বর্ণিত দু'আ- سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ। এর ব্যাখ্যা আরেকটির তাফসীরে গত হয়েছে। এখানে দু'আটির বাকি অংশের ব্যাখ্যা দেওয়া যাচ্ছে।
اللهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى (হে আল্লাহ! আমরা আমাদের এ সফরে আপনার কাছে চাই পুণ্য ও তাকওয়া)। الْبِرّ এর অর্থ সৎকর্ম, এমন কাজ, যা করলে ছাওয়াব ও পুণ্য লাভ হয়। যেমন কুরআন মাজীদে আছে-
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا ۖ وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ
'পুণ্য তো কেবল এটাই নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; বরং পুণ্য হলো (সেই ব্যক্তির কার্যাবলি), যে ঈমান রাখে আল্লাহর, শেষ দিনের ও ফিরিশতাদের প্রতি এবং (আল্লাহর) কিতাব ও নবীগণের প্রতি। আর আল্লাহর ভালোবাসায় নিজ সম্পদ দান করে আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির ও সওয়ালকারীদেরকে এবং দাসমুক্তিতে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং যারা কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে এবং সংকটে, কষ্টে ও যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণ করে। (৩৭. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৭)
সারকথা, আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করতে আদেশ করেছেন এবং বান্দার পক্ষ হতে যেসকল কাজ তিনি পছন্দ করেন, তাকেই البر বলা হয়। এককথায় সর্বপ্রকার সৎকর্মই البر এর অন্তর্ভুক্ত। التقوى এর অর্থ পরহেযগারি। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করতে নিষেধ করেছেন বা বান্দার পক্ষ হতে যেসকল কাজ তিনি অপছন্দ করেন, তা থেকে বিরত থাকাকে التقوى বলে। এ হিসেবে হলো البر হল অর্জনীয় কাজ আর التقوى বর্জনীয় কাজ। তবে অনেক সময় ব্যাপকার্থে শরীয়তের সর্বপ্রকার আদেশ-নিষেধ পালন করাকে তাকওয়া বলা হয়। সে হিসেবে البر (সৎকর্ম)-ও তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
দু'আটির শুরুতে আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বপ্রকার সৎকর্ম করার ও অসৎকর্ম থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক কামনা করা হয়েছে। এটা করার দ্বারা বান্দা মুত্তাকী বলে গণ্য হয়। মুত্তাকী হওয়াটাই শরীয়ত অনুসরণের মূল লক্ষ্য। তাকওয়ার অধিকারী বা মুত্তাকী হওয়ার দ্বারাই জান্নাত লাভ করা যায়। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবেই বলে দেওয়া হয়েছে। এভাবে দুআটি শুরু করা হয়েছে জীবনের এ মূল লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য কামনা দ্বারা। এর কারণ সফরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। থাকে কষ্ট ও ক্লান্তি। চোখে পড়ে নানা দৃশ্য, দুনিয়াবী নানা আকর্ষণ ও পাপে লিপ্ত হওয়ার নানা প্ররোচনা। এ অবস্থায় সৎকর্মে গাফিলতি দেখা দেওয়া ও অসৎকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ছাড়া তা থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। সেজন্যই এরূপ দুআর প্রয়োজন।
وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى (এবং এমন আমল, যা আপনি পছন্দ করেন)। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি মানবজীবনের পরম লক্ষ্য। তাকওয়া অবলম্বনেরও আসল উদ্দেশ্য তা-ই। যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই করা হয়ে থাকে। উপরে বলা হয়েছে, সফরে নানা উপসর্গ থাকে। সফরের অবস্থাটা মোটেই বাড়ির অবস্থার মতো নয়। সেখানে সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। বিশ্রাম, খাওয়াদাওয়া কোনওকিছুরই নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকে না। ফলে আলস্য দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এতে করে জীবনের ওই পরম লক্ষ্য অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন যা দ্বারা সাধিত হয় সেই সৎকর্মে শৈথিল্য দেখা দিতে পারে। সে শৈথিল্য থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রয়োজন। আর সেজন্যই দুআ করা হচ্ছে যে, হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে এমন আমলের তাওফীক চাই, যা আপনি পছন্দ করেন, যা দ্বারা আমরা আপনার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি।
اللهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا
(হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আমাদের এ সফরকে সহজ করে দিন)। সফরে নানারকম কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়। পথচলার কষ্ট, পানাহারের কষ্ট, ঠিকমতো বিশ্রাম করতে না পারার কষ্ট, অপরিচিত স্থানে অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধা এবং যে কাজের জন্য সফর করা হয় সেই কাজ সম্পন্ন করার ঝক্কিঝামেলা পোহানো। তাই তো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
السَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ العَذَابِ، يَمْنَعُ أَحَدَكُمْ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَنَوْمَهُ، فَإِذَا قَضَى نَهْمَتَهُ، فَلْيُعَجِّلْ إِلَى أَهْلِهِ.
'সফর একরকম আযাব। তা তোমাদের পানাহার ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসবে। (সহীহ বুখারী: ১৮০৪; সহীহ মুসলিম: ১৯২৭)
সফরে এতসব কষ্ট থাকায় শুরুতেই আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করে নেওয়া চাই যাতে তিনি সফরকে সহজ করে দেন এবং তার যাবতীয় কষ্ট-ক্লেশ থেকে রেহাই দেন। কেননা যাবতীয় কাজে আসানি ও সহজতা কাম্য। একই লক্ষ্যবস্তু অর্জনের জন্য দুই পন্থার যেটি সহজ, শরীয়ত সেটিই অবলম্বন করতে উৎসাহ দিয়েছে। প্রয়োজনে সফর যেহেতু করতে হয় আর তাতে কষ্টও থাকে, তাই সে কষ্ট লাঘবের জন্য এ দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা চাইলে এ দুআর অসিলায় সফরের যাবতীয় কষ্ট আসানও করে দিতে পারেন। বাস্তবে দেখাও যায় যে, অনেক সময় বিভিন্ন উপায়ে সফরের কঠিন কঠিন বিষয় সহজেই সমাধা হয়ে যায়। দুআ একটি উৎকৃষ্ট উপায় বটে।
وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ (এর দূরত্বকে আমাদের জন্য গুটিয়ে দিন)। অর্থাৎ দূরত্ব কমিয়ে দিন। দূরত্ব কমিয়ে দেওয়া দু'ভাবে হতে পারে। এক তো বাস্তবিকপক্ষে কমানো। যেমন ১০০ কিলোমিটারের পথকে ৫০ কিলোমিটার করে দেওয়া হলো। আল্লাহ তা'আলার পক্ষে এটা অসম্ভব কিছু নয়। তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি 'হও' বললেই সবকিছু হয়ে যায়। এক হাদীছে আছে, এক তাওবাকারীর মৃত্যুর পর তার বাড়ির দিকের পথের তুলনায় তার গন্তব্যস্থলের দিকের পথকে বাস্তবিকপক্ষেই সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছিল। (সহীহ বুখারী: ৩৪৭০; সহীহ মুসলিম: ২৭৬৬; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৬২৬)
এমনও হতে পারে যে, পথের দূরত্ব যেমনটা তেমনই থাকবে, কিন্তু সাধারণত তা অতিক্রম করতে যে সময়ের প্রয়োজন হয় তারচে' কম সময়ের মধ্যেই সে পথ অতিক্রম করা যাবে। অনেক সময় এমন হয় যে, কোথা থেকে কীভাবে পথ শেষ হয়ে গেল তা অনুভব করা যায় না। মনে হয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছে। আল্লাহ তা'আলা চলার মধ্যে বরকত দিলে এরূপ হতেই পারে। এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে, এরূপ দুআ করার বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা অল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘ পথ পার করিয়ে দেবেন।
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ (হে আল্লাহ! সফরে আপনি আমাদের সঙ্গী)। অর্থাৎ প্রকৃত সঙ্গী আপনিই। সফরে সঙ্গী-সাথি দ্বারা নানা উপকার ও সাহায্য লাভ হয়। কিন্তু মানুষ সাহায্য করতে চাইলে কতটুকুই বা তার দ্বারা করা সম্ভব? তাছাড়া মানুষও সাহায্য করতে পারে কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তা'আলা তাকে সাহায্য করার ক্ষমতা ও সুযোগ দেন। আল্লাহ তা'আলা অশেষ শক্তি-ক্ষমতার অধিকারী। তিনি চাইলে সরাসরিও সাহায্য করতে পারেন আবার চাইলে মানুষের মাধ্যমেও করতে পারেন। তাই সর্বাবস্থায় তাঁর উপরই ভরসা করা দরকার এবং মনে মনে তাঁকেই সঙ্গী ও সাহায্যকারীরূপে গ্রহণ করা দরকার। এ বাক্যটিতে মূলত প্রার্থনার পন্থায় তাই করা হয়েছে।
وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ (এবং পরিবারবর্গে আমাদের প্রতিনিধি)। কেউ সফরে চলে যাওয়ার পর পরিবারে যদি তার কোনও প্রতিনিধি না থাকে, তবে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। দেখা দিতে পারে কোনও দুনিয়াবী সমস্যা কিংবা দীনী সমস্যা। কারও অসুখ-বিসুখ হতে পারে বা অন্য কোনও বিপদ-আপদ দেখা দিতে পারে, অর্থসম্পদের সংকট হতে পারে। এমনিভাবে অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আমল-আখলাক ও ইবাদত-বন্দেগীতে দেখা দিতে পারে শিথিলতা। পরিবারে তার কোনও প্রতিনিধি থাকলে এসব সমস্যার সমাধান সহজ হয়। প্রতিনিধি না থাকলে সমাধান হয়ে পড়ে কঠিন। তবে আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তিনি যদি পরিবারবর্গের উপর তাঁর রহমতের দৃষ্টি রাখেন, তবে তারা দীনী ও দুনিয়াবী উভয়প্রকার সমস্যা থেকে মুক্ত থাকবে। তিনি কোনও প্রতিনিধির তত্ত্বাবধান ছাড়াও তাদের সর্বপ্রকারে হেফাজত করতে পারেন। আর কোনও প্রতিনিধি থাকলে তার তত্ত্বাবধানকর্মে তিনি সাহায্য করতে পারেন। বরং তিনি সাহায্য করলেই সে প্রতিনিধির পক্ষে দায়িত্বপালন সম্ভব হয়। কাজেই কোনও মানুষ প্রতিনিধি থাকুক বা নাই থাকুক, সর্বাবস্থায় সত্যিকারের প্রতিনিধি আল্লাহ তা'আলাই। এ প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর উপরই পরিবারবর্গের হেফাজতের দায়িত্ব অর্পণ করা হচ্ছে।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ
(হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি সফরের কষ্ট-ক্লেশ থেকে)। وَعثاء এর অর্থ কষ্ট-ক্লেশ। সফর যত আরামের সাথেই হোক না কেন, তাতে কিছু না কিছু কষ্ট-ক্লেশ থাকেই। কারণ তাতে বাড়িতে থাকাকালীন সব নিয়ম-শৃঙ্খলা বদলে যায়। আর সফর করার আলাদা কষ্ট তো রয়েছেই। সে কারণেই আল্লাহ তা'আলার কাছে পানাহ চাওয়া হচ্ছে যাতে তিনি কষ্ট লাঘব করে আরামের ব্যবস্থা করে দেন এবং সফরের যাবতীয় বিষয় সহজ করে দেন।
وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ (কষ্টদায়ক দৃশ্য থেকে)। كآبة এর অর্থ শোক, দুঃখ। অর্থাৎ সফরকালে এমন কোনও দৃশ্য যেন আমার চোখে না পড়ে, যা মনের আনন্দ ও সুখ নষ্ট করে দেয় এবং তার পরিবর্তে শোক-দুঃখের জন্ম দেয়। সফর আনন্দময় হওয়া দরকার। অন্যথায় সফরের উদ্দেশ্যপূরণ ব্যাহত হয়। কেননা মন দুঃখ-ভারাক্রান্ত থাকলে সুষ্ঠু চিন্তা করা সম্ভব হয় না। কাজের হিম্মতও থাকে না। মনোবল হারিয়ে যাওয়ার দরুন শরীরেও আড়ষ্টভাব দেখা দেয়। অনেক সময় কঠিন মনোবেদনায় শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যে উদ্দেশ্যে সফর করা হয়েছিল তা পূরণ করার জন্য যে মেহনত ও পরিশ্রম করা দরকার, তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেজন্যই দুআ করা হচ্ছে যাতে আল্লাহ তা'আলা দুঃখজনক কোনও দৃশ্য ও পরিস্থিতির সম্মুখীন না করেন।
وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ والأهلِ وَالْوَلَدِ (এবং অর্থসম্পদ, পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে মন্দ প্রত্যাবর্তন থেকে)। অর্থাৎ সফর থেকে ফিরে আসার পর যেন এসব ঠিকঠাকভাবে পাওয়া যায়। সফরে চলে যাওয়ার পর যেন অর্থসম্পদ কোনও বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে। পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির কেউ যেন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়। এমন অনেক সময় হয়ে থাকে যে, মানুষ সফরে যায় আর ফিরে আসার পর জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়। হয় কোনও প্রিয়জন মারা গেছে বা কেউ কোনও কঠিন রোগের শিকার হয়ে পড়েছে কিংবা বড় ধরনের কোনও আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে। ফিরে আসার পর এরকম মন্দ কিছু যাতে দেখতে না হয়, এ প্রার্থনা ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে সে আকুতিই জানানো হয়েছে।
সফর থেকে ফিরে আসার সময়ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই একই দুআ পড়তেন। তবে তাতে অতিরিক্ত থাকত- آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তাওবাকারী, আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী)। এ কথাগুলোর ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি অভিমুখিতা, তাঁর প্রতি আত্মনিবেদন ও শোকরগুযারীর অনুভূতি প্রকাশ করা হচ্ছে। বোঝানো হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার দয়া-অনুগ্রহেই আমরা আপন ঠিকানায় ফিরে আসতে পেরেছি। সর্বাবস্থায় আমরা তাঁর অভিমুখী। এ সফরকালে হয়তো আমাদের দ্বারা কোনও অন্যায়-অনুচিত কাজ হয়ে গেছে। সেজন্য আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওবা করছি। ঘরে থাকি বা বাইরে, সর্বাবস্থায় আমরা তো আল্লাহ তা'আলার ইবাদতকারীই। তাঁর ইবাদত করার জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটাই আমাদের জীবনের আসল কাজ। বাড়িতে থাকি বা সফরে, কখনওই আমাদের এ আসল কাজ থেকে বিমুখ হওয়া চলে না। আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নি'আমত ও অনুগ্রহ ভোগ করে থাকি। সেজন্য আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই শোকর আদায় করি।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. যানবাহনে উঠে প্রথমে তিনবার আল্লাহু আকবার বলতে হয়। তারপর হাদীছে বর্ণিত দুআটি পড়তে হয়।
খ. যানবাহন আল্লাহ তা'আলার দান। তাই যত দামি যানবাহনই হোক, সেজন্য অহংকার না করে বরং আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করতে হবে।
গ. যানবাহন ও অন্যান্য নি'আমতের দ্বারা মানুষকে অপরাপর সৃষ্টির উপর বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে পাপকর্ম থেকে মুক্ত থাকার দ্বারা সে মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
ঘ. একদিন আমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। সফর অবস্থায়ও সে কথা মনে রাখতে হবে।
ঙ. সফর অবস্থায়ও ইবাদত-বন্দেগী ও সৎকর্মে মনোযোগী থাকতে হবে।
চ. সতর্ক থাকতে হবে যাতে সফরকালীন কোনও পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রভাবে পাপকর্ম না হয়ে যায়।
ছ. সকল আমলের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ করা।
জ. আল্লাহ তা'আলা চাইলে সফরের কষ্ট-ক্লেশ সহজ করে দিতে পারেন।
ঝ. আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সাহায্য থাকলে সফরের দূরত্ব কমে যেতে পারে এবং অল্প সময়েই সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করা সম্ভব হতে পারে।
ঞ. সফর অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও তাঁর 'সঙ্গ'-এর অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রাখা চাই।
ট. সফরকালে নিজ পরিবারবর্গের হেফাজতের ভার আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত রাখা চাই।
ঠ. আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করলে সফরের কষ্ট-ক্লেশ ও দুঃখজনক পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
ড. সফরের দুআ পাঠ করার দ্বারা সফরকালে নিজ পরিবারে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার আশা থাকে।
ঢ. সফর থেকে ফেরার সময়ও হাদীছে বর্ণিত দুআটি পড়া উচিত।
ণ. প্রত্যেক মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী থাকা, তাওবা-ইস্তিগফারে অভ্যস্ত থাকা, নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগী করা এবং সর্বদা শোকরগুযার থাকা।
كَانَ إِذَا اسْتَوَى عَلَى بَعِيرِهِ خَارِجًا إِلَى سَفَرٍ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনও সফরে বের হওয়ার সময় যখন উটের পিঠে সোজা হয়ে বসতেন)। অর্থাৎ তিনি দুআটি পড়তেন উটের পিঠে বসার পর এবং তা পড়তেন যাত্রার শুরুতেই। সুতরাং যদি কোনও দূরপথের যাত্রা হয় আর তাতে একের পর এক যানবাহন পরিবর্তন করা হয়, তবে প্রধান বাহনটিতে আরোহণকালের জন্য দু'আটিকে স্থগিত রাখা হবে না। যেমন হজ্জযাত্রী কেবল উড়োজাহাজে চড়েই যে এ দুআটি পড়বে তা নয়; বরং বাড়ি থেকে বের হয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছার জন্য প্রথম যে বাহনটিতে চড়া হয়, তখনও এ দুআটি পড়তে হবে। আর এ দুআটি পড়া হবে যানবাহনে ঠিকঠাক হয়ে বসার পর, তার আগে নয়। শুরুতে পড়তে ভুলে গেলে পরে যখন মনে পড়বে, তখন পড়ে নেবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. বর্ণনা করেছেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূল দুআটি পড়ার আগে كبَّرَ ثَلَاثا তিনবার তাকবীর বলতেন।
অর্থাৎ তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন। অর্থাৎ আল্লাহ মহত্তম, আল্লাহ বৃহত্তম। বস্তুত তিনি এমনই বড় যে, বড়ত্বে কোনওকিছুতেই তাঁর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তিনি অতুলনীয়ভাবে বড়। আল্লাহু আকবার তিনবার বলার দ্বারা অন্তরে তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের অনুভূতিকে বলীয়ান করে তোলা উদ্দেশ্য, যাতে পার্থিব কোনও চাহিদাকে তাঁর ইচ্ছার সামনে প্রধান্য দেওয়া না হয় এবং তাঁর আদেশের সামনে দুনিয়ার বড় থেকে বড় কোনও ব্যক্তির আদেশকে গুরুত্ব দেওয়া না হয়। অন্তরে এ চেতনা ও এ অনুভূতি সফরকালে জাগ্রত রাখার বেশি প্রয়োজন হয়। কারণ সফরে নানারকম অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। নানা কষ্ট-ক্লেশ দেখা দেয়। তখন আল্লাহ তা'আলার হুকুম পালনে অলসতা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু অন্তরে এ চেতনা জাগ্রত থাকলে সে অলসতা কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার তাকবীর বলার পর একটা লম্বা দুআ পড়তেন। শুরুতে রয়েছে পূর্বোক্ত আয়াতে বর্ণিত দু'আ- سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ। এর ব্যাখ্যা আরেকটির তাফসীরে গত হয়েছে। এখানে দু'আটির বাকি অংশের ব্যাখ্যা দেওয়া যাচ্ছে।
اللهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى (হে আল্লাহ! আমরা আমাদের এ সফরে আপনার কাছে চাই পুণ্য ও তাকওয়া)। الْبِرّ এর অর্থ সৎকর্ম, এমন কাজ, যা করলে ছাওয়াব ও পুণ্য লাভ হয়। যেমন কুরআন মাজীদে আছে-
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا ۖ وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ
'পুণ্য তো কেবল এটাই নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; বরং পুণ্য হলো (সেই ব্যক্তির কার্যাবলি), যে ঈমান রাখে আল্লাহর, শেষ দিনের ও ফিরিশতাদের প্রতি এবং (আল্লাহর) কিতাব ও নবীগণের প্রতি। আর আল্লাহর ভালোবাসায় নিজ সম্পদ দান করে আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির ও সওয়ালকারীদেরকে এবং দাসমুক্তিতে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং যারা কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে এবং সংকটে, কষ্টে ও যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণ করে। (৩৭. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৭)
সারকথা, আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করতে আদেশ করেছেন এবং বান্দার পক্ষ হতে যেসকল কাজ তিনি পছন্দ করেন, তাকেই البر বলা হয়। এককথায় সর্বপ্রকার সৎকর্মই البر এর অন্তর্ভুক্ত। التقوى এর অর্থ পরহেযগারি। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যা-কিছু করতে নিষেধ করেছেন বা বান্দার পক্ষ হতে যেসকল কাজ তিনি অপছন্দ করেন, তা থেকে বিরত থাকাকে التقوى বলে। এ হিসেবে হলো البر হল অর্জনীয় কাজ আর التقوى বর্জনীয় কাজ। তবে অনেক সময় ব্যাপকার্থে শরীয়তের সর্বপ্রকার আদেশ-নিষেধ পালন করাকে তাকওয়া বলা হয়। সে হিসেবে البر (সৎকর্ম)-ও তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
দু'আটির শুরুতে আল্লাহ তা'আলার কাছে সর্বপ্রকার সৎকর্ম করার ও অসৎকর্ম থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক কামনা করা হয়েছে। এটা করার দ্বারা বান্দা মুত্তাকী বলে গণ্য হয়। মুত্তাকী হওয়াটাই শরীয়ত অনুসরণের মূল লক্ষ্য। তাকওয়ার অধিকারী বা মুত্তাকী হওয়ার দ্বারাই জান্নাত লাভ করা যায়। কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবেই বলে দেওয়া হয়েছে। এভাবে দুআটি শুরু করা হয়েছে জীবনের এ মূল লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য কামনা দ্বারা। এর কারণ সফরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। থাকে কষ্ট ও ক্লান্তি। চোখে পড়ে নানা দৃশ্য, দুনিয়াবী নানা আকর্ষণ ও পাপে লিপ্ত হওয়ার নানা প্ররোচনা। এ অবস্থায় সৎকর্মে গাফিলতি দেখা দেওয়া ও অসৎকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ছাড়া তা থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। সেজন্যই এরূপ দুআর প্রয়োজন।
وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى (এবং এমন আমল, যা আপনি পছন্দ করেন)। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি মানবজীবনের পরম লক্ষ্য। তাকওয়া অবলম্বনেরও আসল উদ্দেশ্য তা-ই। যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই করা হয়ে থাকে। উপরে বলা হয়েছে, সফরে নানা উপসর্গ থাকে। সফরের অবস্থাটা মোটেই বাড়ির অবস্থার মতো নয়। সেখানে সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। বিশ্রাম, খাওয়াদাওয়া কোনওকিছুরই নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকে না। ফলে আলস্য দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এতে করে জীবনের ওই পরম লক্ষ্য অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন যা দ্বারা সাধিত হয় সেই সৎকর্মে শৈথিল্য দেখা দিতে পারে। সে শৈথিল্য থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রয়োজন। আর সেজন্যই দুআ করা হচ্ছে যে, হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে এমন আমলের তাওফীক চাই, যা আপনি পছন্দ করেন, যা দ্বারা আমরা আপনার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি।
اللهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا
(হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আমাদের এ সফরকে সহজ করে দিন)। সফরে নানারকম কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়। পথচলার কষ্ট, পানাহারের কষ্ট, ঠিকমতো বিশ্রাম করতে না পারার কষ্ট, অপরিচিত স্থানে অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধা এবং যে কাজের জন্য সফর করা হয় সেই কাজ সম্পন্ন করার ঝক্কিঝামেলা পোহানো। তাই তো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
السَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ العَذَابِ، يَمْنَعُ أَحَدَكُمْ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَنَوْمَهُ، فَإِذَا قَضَى نَهْمَتَهُ، فَلْيُعَجِّلْ إِلَى أَهْلِهِ.
'সফর একরকম আযাব। তা তোমাদের পানাহার ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসবে। (সহীহ বুখারী: ১৮০৪; সহীহ মুসলিম: ১৯২৭)
সফরে এতসব কষ্ট থাকায় শুরুতেই আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করে নেওয়া চাই যাতে তিনি সফরকে সহজ করে দেন এবং তার যাবতীয় কষ্ট-ক্লেশ থেকে রেহাই দেন। কেননা যাবতীয় কাজে আসানি ও সহজতা কাম্য। একই লক্ষ্যবস্তু অর্জনের জন্য দুই পন্থার যেটি সহজ, শরীয়ত সেটিই অবলম্বন করতে উৎসাহ দিয়েছে। প্রয়োজনে সফর যেহেতু করতে হয় আর তাতে কষ্টও থাকে, তাই সে কষ্ট লাঘবের জন্য এ দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা চাইলে এ দুআর অসিলায় সফরের যাবতীয় কষ্ট আসানও করে দিতে পারেন। বাস্তবে দেখাও যায় যে, অনেক সময় বিভিন্ন উপায়ে সফরের কঠিন কঠিন বিষয় সহজেই সমাধা হয়ে যায়। দুআ একটি উৎকৃষ্ট উপায় বটে।
وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ (এর দূরত্বকে আমাদের জন্য গুটিয়ে দিন)। অর্থাৎ দূরত্ব কমিয়ে দিন। দূরত্ব কমিয়ে দেওয়া দু'ভাবে হতে পারে। এক তো বাস্তবিকপক্ষে কমানো। যেমন ১০০ কিলোমিটারের পথকে ৫০ কিলোমিটার করে দেওয়া হলো। আল্লাহ তা'আলার পক্ষে এটা অসম্ভব কিছু নয়। তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি 'হও' বললেই সবকিছু হয়ে যায়। এক হাদীছে আছে, এক তাওবাকারীর মৃত্যুর পর তার বাড়ির দিকের পথের তুলনায় তার গন্তব্যস্থলের দিকের পথকে বাস্তবিকপক্ষেই সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছিল। (সহীহ বুখারী: ৩৪৭০; সহীহ মুসলিম: ২৭৬৬; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৬২৬)
এমনও হতে পারে যে, পথের দূরত্ব যেমনটা তেমনই থাকবে, কিন্তু সাধারণত তা অতিক্রম করতে যে সময়ের প্রয়োজন হয় তারচে' কম সময়ের মধ্যেই সে পথ অতিক্রম করা যাবে। অনেক সময় এমন হয় যে, কোথা থেকে কীভাবে পথ শেষ হয়ে গেল তা অনুভব করা যায় না। মনে হয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেছে। আল্লাহ তা'আলা চলার মধ্যে বরকত দিলে এরূপ হতেই পারে। এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে, এরূপ দুআ করার বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা অল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘ পথ পার করিয়ে দেবেন।
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ (হে আল্লাহ! সফরে আপনি আমাদের সঙ্গী)। অর্থাৎ প্রকৃত সঙ্গী আপনিই। সফরে সঙ্গী-সাথি দ্বারা নানা উপকার ও সাহায্য লাভ হয়। কিন্তু মানুষ সাহায্য করতে চাইলে কতটুকুই বা তার দ্বারা করা সম্ভব? তাছাড়া মানুষও সাহায্য করতে পারে কেবল তখনই, যখন আল্লাহ তা'আলা তাকে সাহায্য করার ক্ষমতা ও সুযোগ দেন। আল্লাহ তা'আলা অশেষ শক্তি-ক্ষমতার অধিকারী। তিনি চাইলে সরাসরিও সাহায্য করতে পারেন আবার চাইলে মানুষের মাধ্যমেও করতে পারেন। তাই সর্বাবস্থায় তাঁর উপরই ভরসা করা দরকার এবং মনে মনে তাঁকেই সঙ্গী ও সাহায্যকারীরূপে গ্রহণ করা দরকার। এ বাক্যটিতে মূলত প্রার্থনার পন্থায় তাই করা হয়েছে।
وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ (এবং পরিবারবর্গে আমাদের প্রতিনিধি)। কেউ সফরে চলে যাওয়ার পর পরিবারে যদি তার কোনও প্রতিনিধি না থাকে, তবে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। দেখা দিতে পারে কোনও দুনিয়াবী সমস্যা কিংবা দীনী সমস্যা। কারও অসুখ-বিসুখ হতে পারে বা অন্য কোনও বিপদ-আপদ দেখা দিতে পারে, অর্থসম্পদের সংকট হতে পারে। এমনিভাবে অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আমল-আখলাক ও ইবাদত-বন্দেগীতে দেখা দিতে পারে শিথিলতা। পরিবারে তার কোনও প্রতিনিধি থাকলে এসব সমস্যার সমাধান সহজ হয়। প্রতিনিধি না থাকলে সমাধান হয়ে পড়ে কঠিন। তবে আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তিনি যদি পরিবারবর্গের উপর তাঁর রহমতের দৃষ্টি রাখেন, তবে তারা দীনী ও দুনিয়াবী উভয়প্রকার সমস্যা থেকে মুক্ত থাকবে। তিনি কোনও প্রতিনিধির তত্ত্বাবধান ছাড়াও তাদের সর্বপ্রকারে হেফাজত করতে পারেন। আর কোনও প্রতিনিধি থাকলে তার তত্ত্বাবধানকর্মে তিনি সাহায্য করতে পারেন। বরং তিনি সাহায্য করলেই সে প্রতিনিধির পক্ষে দায়িত্বপালন সম্ভব হয়। কাজেই কোনও মানুষ প্রতিনিধি থাকুক বা নাই থাকুক, সর্বাবস্থায় সত্যিকারের প্রতিনিধি আল্লাহ তা'আলাই। এ প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর উপরই পরিবারবর্গের হেফাজতের দায়িত্ব অর্পণ করা হচ্ছে।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ
(হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি সফরের কষ্ট-ক্লেশ থেকে)। وَعثاء এর অর্থ কষ্ট-ক্লেশ। সফর যত আরামের সাথেই হোক না কেন, তাতে কিছু না কিছু কষ্ট-ক্লেশ থাকেই। কারণ তাতে বাড়িতে থাকাকালীন সব নিয়ম-শৃঙ্খলা বদলে যায়। আর সফর করার আলাদা কষ্ট তো রয়েছেই। সে কারণেই আল্লাহ তা'আলার কাছে পানাহ চাওয়া হচ্ছে যাতে তিনি কষ্ট লাঘব করে আরামের ব্যবস্থা করে দেন এবং সফরের যাবতীয় বিষয় সহজ করে দেন।
وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ (কষ্টদায়ক দৃশ্য থেকে)। كآبة এর অর্থ শোক, দুঃখ। অর্থাৎ সফরকালে এমন কোনও দৃশ্য যেন আমার চোখে না পড়ে, যা মনের আনন্দ ও সুখ নষ্ট করে দেয় এবং তার পরিবর্তে শোক-দুঃখের জন্ম দেয়। সফর আনন্দময় হওয়া দরকার। অন্যথায় সফরের উদ্দেশ্যপূরণ ব্যাহত হয়। কেননা মন দুঃখ-ভারাক্রান্ত থাকলে সুষ্ঠু চিন্তা করা সম্ভব হয় না। কাজের হিম্মতও থাকে না। মনোবল হারিয়ে যাওয়ার দরুন শরীরেও আড়ষ্টভাব দেখা দেয়। অনেক সময় কঠিন মনোবেদনায় শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যে উদ্দেশ্যে সফর করা হয়েছিল তা পূরণ করার জন্য যে মেহনত ও পরিশ্রম করা দরকার, তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেজন্যই দুআ করা হচ্ছে যাতে আল্লাহ তা'আলা দুঃখজনক কোনও দৃশ্য ও পরিস্থিতির সম্মুখীন না করেন।
وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ والأهلِ وَالْوَلَدِ (এবং অর্থসম্পদ, পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে মন্দ প্রত্যাবর্তন থেকে)। অর্থাৎ সফর থেকে ফিরে আসার পর যেন এসব ঠিকঠাকভাবে পাওয়া যায়। সফরে চলে যাওয়ার পর যেন অর্থসম্পদ কোনও বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে। পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির কেউ যেন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়। এমন অনেক সময় হয়ে থাকে যে, মানুষ সফরে যায় আর ফিরে আসার পর জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়। হয় কোনও প্রিয়জন মারা গেছে বা কেউ কোনও কঠিন রোগের শিকার হয়ে পড়েছে কিংবা বড় ধরনের কোনও আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে। ফিরে আসার পর এরকম মন্দ কিছু যাতে দেখতে না হয়, এ প্রার্থনা ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে সে আকুতিই জানানো হয়েছে।
সফর থেকে ফিরে আসার সময়ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই একই দুআ পড়তেন। তবে তাতে অতিরিক্ত থাকত- آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ (আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তাওবাকারী, আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী)। এ কথাগুলোর ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি অভিমুখিতা, তাঁর প্রতি আত্মনিবেদন ও শোকরগুযারীর অনুভূতি প্রকাশ করা হচ্ছে। বোঝানো হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার দয়া-অনুগ্রহেই আমরা আপন ঠিকানায় ফিরে আসতে পেরেছি। সর্বাবস্থায় আমরা তাঁর অভিমুখী। এ সফরকালে হয়তো আমাদের দ্বারা কোনও অন্যায়-অনুচিত কাজ হয়ে গেছে। সেজন্য আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে তাওবা করছি। ঘরে থাকি বা বাইরে, সর্বাবস্থায় আমরা তো আল্লাহ তা'আলার ইবাদতকারীই। তাঁর ইবাদত করার জন্য আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটাই আমাদের জীবনের আসল কাজ। বাড়িতে থাকি বা সফরে, কখনওই আমাদের এ আসল কাজ থেকে বিমুখ হওয়া চলে না। আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নি'আমত ও অনুগ্রহ ভোগ করে থাকি। সেজন্য আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই শোকর আদায় করি।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. যানবাহনে উঠে প্রথমে তিনবার আল্লাহু আকবার বলতে হয়। তারপর হাদীছে বর্ণিত দুআটি পড়তে হয়।
খ. যানবাহন আল্লাহ তা'আলার দান। তাই যত দামি যানবাহনই হোক, সেজন্য অহংকার না করে বরং আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করতে হবে।
গ. যানবাহন ও অন্যান্য নি'আমতের দ্বারা মানুষকে অপরাপর সৃষ্টির উপর বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে পাপকর্ম থেকে মুক্ত থাকার দ্বারা সে মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
ঘ. একদিন আমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। সফর অবস্থায়ও সে কথা মনে রাখতে হবে।
ঙ. সফর অবস্থায়ও ইবাদত-বন্দেগী ও সৎকর্মে মনোযোগী থাকতে হবে।
চ. সতর্ক থাকতে হবে যাতে সফরকালীন কোনও পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রভাবে পাপকর্ম না হয়ে যায়।
ছ. সকল আমলের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভ করা।
জ. আল্লাহ তা'আলা চাইলে সফরের কষ্ট-ক্লেশ সহজ করে দিতে পারেন।
ঝ. আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সাহায্য থাকলে সফরের দূরত্ব কমে যেতে পারে এবং অল্প সময়েই সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করা সম্ভব হতে পারে।
ঞ. সফর অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য ও তাঁর 'সঙ্গ'-এর অনুভূতি অন্তরে জাগ্রত রাখা চাই।
ট. সফরকালে নিজ পরিবারবর্গের হেফাজতের ভার আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত রাখা চাই।
ঠ. আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করলে সফরের কষ্ট-ক্লেশ ও দুঃখজনক পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
ড. সফরের দুআ পাঠ করার দ্বারা সফরকালে নিজ পরিবারে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার আশা থাকে।
ঢ. সফর থেকে ফেরার সময়ও হাদীছে বর্ণিত দুআটি পড়া উচিত।
ণ. প্রত্যেক মুমিনের উচিত সর্বদা আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী থাকা, তাওবা-ইস্তিগফারে অভ্যস্ত থাকা, নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগী করা এবং সর্বদা শোকরগুযার থাকা।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)