রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৮. সফরের আদব-বিধান

হাদীস নং: ৯৫৯
সফরের আদব-বিধান
সফরসঙ্গী সন্ধান করা এবং সকলে যার আনুগত্য করবে এমন একজনকে নিজেদের আমীর বানিয়ে নেওয়া:
সফরসঙ্গী অন্তত তিনজন হওয়া চাই
৯৫৯. হযরত আমর ইবন শু'আয়ব তাঁর পিতার সূত্রে দাদা (হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আম্র রাযি.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, একজন আরোহী একটি শয়তান। দুজন আরোহী দুটি শয়তান। আর তিনজন আরোহী একটি যাত্রীদল। -আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ। (জামে' তিরমিযী: ১৬৭৪; সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৪; মুসনাদে আহমাদ: ৬৭৪৯; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৮৭৯৮; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২৪৯৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১০৩৪৭; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৬৭৫)
كتاب آداب السفر
167 - باب استحباب طلب الرفقة وتأميرهم عَلَى أنفسهم واحدًا يطيعونه
959 - وعن عمرِو بن شُعَيْبٍ، عن أبيه، عن جَدهِ - رضي الله عنه - قَالَ: قَالَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم: «الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ، وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ، وَالثَّلاَثَةُ رَكْبٌ». رواه أَبُو داود والترمذي والنسائي بأسانيد صحيحةٍ، وقال الترمذي: «حديث حسن» (1).

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: أبو داود (2607)، والترمذي (1674)، والنسائي في «الكبرى» (8849).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিও এক ব্যক্তির একাকী সফর করার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে। বলা হয়েছে- الرَّاكِبُ شَيْطَانُ (একজন আরোহী একটি শয়তান)। হাদীছটিতে 'আরোহী' বলে সুনির্দিষ্টভাবে যানবাহনে সফরকারীকেই বোঝানো হয়নি; বরং পায়ে হেঁটে সফর করলেও একই কথা। তার ক্ষেত্রেও এ হাদীছ প্রযোজ্য। বোঝানো উদ্দেশ্য সফরে যেভাবেই যাক, যানবাহনে হোক বা পায়ে হেঁটে, কোনও অবস্থায়ই একাকী যাওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা তা নানাবিধ ক্ষতির কারণ। সে ক্ষতির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য 'শয়তান' শব্দের মতো একটি কঠিন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, 'একাকী সফরকারী শয়তান' এ কথার অর্থ কী?

আসলে শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। শব্দটির মূল অর্থ দূরবর্তী, বঞ্চিত ও বিতাড়িত। শয়তান আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে দূরে। তাই তাকে শয়তান বলা হয়। যে ব্যক্তি একা সফর করে, সেও আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকে। কেননা সে নিজেই নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। সঙ্গী না রেখে সে নিজেকে নানা কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন করেছে। যেমন একা অবস্থায় ওযু-ইস্তিঞ্জার পেরেশানি, চোর-ডাকাতের কবলে পড়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও সেবা-যত্নজনিত সমস্যা, মারা গেলে লাশের হেফাজত ও দাফন-কাফনের পেরেশানি ইত্যাদি। যে ব্যক্তি কৃতকর্ম দ্বারা নিজের জন্য এসব বিপদ ডেকে আনে, আল্লাহ তা'আলাও তার প্রতি রহমত ও দয়া করেন না। এভাবে একাকী সফরকারী রহমত থেকে দূরে থাকে বলে তাকে শয়তান বলা হয়েছে।

তাছাড়া শয়তান অর্থ দুষ্টু জিন। নিজেও এরকমই। দুষ্টু জিনেরা বনে-জঙ্গলে, মাঠে-ময়দানে ও নিভৃত স্থানে একা একা ঘুরে বেড়ায় আর মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। কোনও ব্যক্তির একা সফর করাটাও শয়তানের মতোই কাজ। শয়তানও একা চলে, সেও একা সফর করছে। তাই তাকে শয়তান সাব্যস্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সে শয়তানের মতো, তার কাজটি শয়তানের কাজের মতো।

একাকী সফরকারী শয়তানের লক্ষ্যবস্তুও বটে। যে একা থাকে, শয়তান তার মনে নানা ওয়াসওয়াসা দেয়। তাকে পাপকাজের প্ররোচনা দেয়। সফরে অনেক কিছুই চোখে পড়ে। শয়তানও তার সুযোগ গ্রহণ করে। একেকটা জিনিস দেখায় আর তা নিয়ে তার অন্তরে কুচাহিদার জন্ম দেয়। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী নানা কুচিন্তা সরবরাহ করে। সঙ্গী-সাথি থাকলে সেই সুযোগ শয়তান পায় না। তাই হাদীছটিতে বলা হয়েছে, একাকী সফরকারী শয়তান। অর্থাৎ সে শয়তানের লক্ষ্যবস্তু। এটা বলা হয়েছে আরবী অলংকার শাস্ত্রের নিয়মে। কোনও একটা শব্দ ব্যবহার করে তা দ্বারা তার প্রকৃত অর্থ না বুঝিয়ে বরং সে শব্দের সঙ্গে যে-কোনওভাবে সম্পর্কযুক্ত কোনও অর্থ বোঝানো আরবী ভাষার এক বহুল ব্যবহৃত নিয়ম। সে নিয়ম অনুসারেই একা সফরকারী ব্যক্তিকে শয়তান বলা হয়েছে, যেহেতু একাকিত্বের কারণে সে শয়তানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যায়।

দুই ব্যক্তির বেলায়ও বলা হয়েছে- وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ (দু'জন আরোহী দু'টি শয়তান)। অর্থাৎ সফরকারী যদি দু'জন হয়, সে ক্ষেত্রেও উপরে বর্ণিত ক্ষতিসমূহের আশঙ্কা থেকে যায়, যদিও একাকী সফরকারীর তুলনায় কম। সফর অবস্থায় মানুষকে নানা ঝক্কিঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। সফরসঙ্গী বেশি হলে তার মোকাবিলা করা সহজ হয়। কেবল দু'জনের পক্ষে তা মোকাবিলা করা কঠিন। এর জন্য আরও বেশি সঙ্গী দরকার। তাই সবশেষে বলা হয়েছে-
وَالثَّلَاثَةُ رَكْبٌ (আর তিনজন আরোহী একটি যাত্রীদল)। অর্থাৎ তিনজন দ্বারা একটি জামাত বা দল হয়। সফরকারী দল হিসেবে সর্বনিম্ন তিনজনই উপযুক্ত, এর কম নয়। যত বেশি হবে ততই ভালো। তবে সর্বনিম্ন তিনজন হলেও তারা একে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে। তাদের পক্ষে সম্মিলিতভাবে বিপদ-আপদ, অনিষ্ট ও ক্ষতির মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। শয়তানকে প্রতিরোধ করাও আসান হয়। এক-দু'জনকে ওয়াসওয়াসা দিয়ে পাপকর্মে লিপ্ত করা যত সহজ, তিনজনের বেলায় তা সহজ নয়। ফলে সফরসঙ্গী অন্ততপক্ষে তিনজন হলে বিভিন্ন রকম গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। তাই এ হাদীছটিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যে, সফর করতে চাইলে অন্ততপক্ষে তিনজনে মিলে করো। তাহলে দীনী ও দুনিয়াবী বিপদ-আপদ থেকে সহজে বাঁচতে পারবে।

উল্লেখ্য, এ হুকুম সাধারণ অবস্থার জন্য। ওজরের ব্যাপারটি আলাদা। যদি সফরসঙ্গী পাওয়া না যায় বা বিশেষ কারণে একাকী সফর করার প্রয়োজন হয়, তবে একাকী সফর করতে নিষেধ নেই। সে ক্ষেত্রে হাদীছের হুকুম অমান্য করেছে বলে দোষ দেওয়া যাবে না।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. বিনা ওজরে একাকী সফর করতে নেই।

খ. সফরসঙ্গী অন্ততপক্ষে তিনজন হওয়া চাই।

গ. ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাবশে নিজেকে বিপদের মধ্যে ফেলতে নেই।

ঘ. শয়তান সর্বদা মানুষের ক্ষতি করার জন্য ওত পেতে থাকে। তাই তার থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

ঙ. কখনও এমন কোনও কাজ করতে নেই, যা শয়তানের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান