রিয়াযুস সালিহীন-ইমাম নববী রহঃ

৮. সফরের আদব-বিধান

হাদীস নং: ৯৫৬
সফরের আদব-বিধান
সফর মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মানবসভ্যতার বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে এর ভূমিকা বিশাল। আবহমানকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে সফর করে আসছে। সফর করার দ্বারা সে তার দীনী ও দুনিয়াবী নানা প্রয়োজন সমাধা করছে।

তার বহু প্রয়োজন এমন রয়েছে, যা কেবল সফর করার দ্বারাই পূরণ হতে পারে। তাই ইসলাম মানুষকে সফর করার অনুমতিও দিয়েছে। বরং ক্ষেত্রবিশেষে উৎসাহদান করেছে। জীবিকা অন্বেষণের জন্য জলে-স্থলে সফর করার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি এর জন্য প্রাকৃতিক সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থা দান করাকে কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ নি'আমত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে-

ہُوَ الَّذِیۡ یُسَیِّرُکُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ ؕ حَتّٰۤی اِذَا کُنۡتُمۡ فِی الۡفُلۡکِ ۚ وَجَرَیۡنَ بِہِمۡ بِرِیۡحٍ طَیِّبَۃ

'তিনি তো আল্লাহই, যিনি তোমাদেরকে স্থলেও ভ্রমণ করান এবং সাগরেও। এভাবে তোমরা যখন নৌকায় সওয়ার হও আর নৌকাগুলো মানুষকে নিয়ে অনুকূল বাতাসে পানির উপর বয়ে চলে। (সূরা ইউনুস, আয়াত ২২)

অপর এক আয়াতে ইরশাদ-

وَلَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَحَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ

'বাস্তবিকপক্ষে আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি। ( সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭০)

অন্যত্র ইরশাদ-

وَالۡاَنۡعَامَ خَلَقَہَا ۚ لَکُمۡ فِیۡہَا دِفۡءٌ وَّمَنَافِعُ وَمِنۡہَا تَاۡکُلُوۡنَ ۪ وَلَکُمۡ فِیۡہَا جَمَالٌ حِیۡنَ تُرِیۡحُوۡنَ وَحِیۡنَ تَسۡرَحُوۡنَ ۪ وَتَحۡمِلُ اَثۡقَالَکُمۡ اِلٰی بَلَدٍ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا بٰلِغِیۡہِ اِلَّا بِشِقِّ الۡاَنۡفُسِ

'তিনিই চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে তোমাদের জন্য শীত থেকে বাঁচার উপকরণ এবং তাছাড়া আরও বহু উপকার রয়েছে এবং তা থেকেই তোমরা খেয়েও থাক। তোমরা সন্ধ্যাকালে যখন সেগুলোকে বাড়িতে ফিরিয়ে আন এবং ভোরবেলা যখন সেগুলোকে চারণভূমিতে নিয়ে যাও, তখন তার ভেতর তোমাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন শোভাও রয়েছে। এবং তারা তোমাদের ভার বয়ে নিয়ে যায় এমন নগরে, যেখানে প্রাণান্তকর কষ্ট ছাড়া তোমরা পৌছতে পারতে না। ( সূরা নাহল, আয়াত ৫-৭)

আরও ইরশাদ-

وَاٰخَرُوۡنَ یَضۡرِبُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ یَبۡتَغُوۡنَ مِنۡ فَضۡلِ اللّٰہِ

'অপর কিছু লোক এমন থাকবে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানের জন্য পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে। (সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত ২০)

অন্য এক আয়াতে আছে-

ہُوَ الَّذِیۡ جَعَلَ لَکُمُ الۡاَرۡضَ ذَلُوۡلًا فَامۡشُوۡا فِیۡ مَنَاکِبِہَا وَکُلُوۡا مِنۡ رِّزۡقِہٖ

'তিনিই তোমাদের জন্য ভূমিকে বশ্য করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা তার কাঁধে চলাফেরা করো ও তাঁর (দেওয়া) রিযিক খাও। (৫. সূরা মুলক, আয়াত ১৫)

এরকম আরও বহু আয়াত আছে, যাতে জলে-স্থলে ভ্রমণ করতে পারাকে আল্লাহ তা'আলা মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বলে উল্লেখ করেছেন এবং সে অনুগ্রহকে কাজে লাগিয়ে তাদের দীনী ও দুনিয়াবী নানা প্রয়োজন সমাধার প্রতি উৎসাহদান করেছেন। মানুষের এক প্রয়োজন তো হলো জীবিকা নির্বাহ করা। জীবিকার সন্ধানে মানুষকে দেশ-বিদেশে সফরও করতে হয়। কুরআন নাযিলের কালে মক্কা মুকারামার অধিবাসীদের উপার্জনমাধ্যমই ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য করা। তাই তাদেরকে গ্রীষ্মকালে শাম অঞ্চলে এবং শীতকালে ইয়েমেন এলাকায় বাণিজ্যিক সফর করতে হতো। সেদিকে ইঙ্গিত করে সূরা কুরায়শে ইরশাদ হয়েছে-

لِإِيلَافِ قُرَيْشٍ. إِيلَافِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَاءِ وَالصَّيْفِ. فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَٰذَا الْبَيْتِ. الَّذِي أَطْعَمَهُم مِّن جُوعٍ وَآمَنَهُم مِّنْ خَوْفٍ

'যেহেতু কুরায়শের লোকেরা অভ্যস্ত অর্থাৎ তারা শীত ও গ্রীষ্মকালে (ইয়েমেন ও শামে) সফর করতে অভ্যস্ত, তাই তারা যেন এই ঘরের মালিকের ইবাদত করে, যিনি তাদেরকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয়-ভীতি হতে তাদেরকে নিরাপদ রেখেছেন। সুরা কু্রাইশ, আয়াত: ১-৪

বিশ্বায়নের এ যুগে বাণিজ্যিক সফর এক সাধারণ বাস্তবতা। সারা বিশ্বেই মানুষ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে দেশ-দেশান্তর ভ্রমণ করছে। আজ বিশ্বঅর্থনীতির সচলতা অনেকাংশে বাণিজ্যিক সফরের উপর নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত, সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য উপলক্ষ্যে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ হামেশা জলে-স্থলে পরিভ্রমণ করছে।

ভ্রমণের একটি বড় উপলক্ষ্য হলো বিদ্যার্জন। এ উপলক্ষ্যে অগণিত শিক্ষার্থী নিজ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন ছাড়াও বহির্বিশ্বের হাজারও বিদ্যাপীঠে পাড়ি জমাচ্ছে। আধুনিক যানবাহনের সুব্যবস্থার কারণে অতি সহজেই শিক্ষার্থীগণ জ্ঞানপিপাসা নিবারণের উদ্দেশ্যে দূরদূরান্তে ছুটে যেতে পারছে। আগের দিনে বিষয়টা এমন সহজ ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তখনকার দিনে উদ্যমী শিক্ষার্থীগণ উটের পিঠে করে, এমনকি পায়ে হেঁটেও শত শত মাইল নয়; বরং হাজারও মাইল দূরের সফর করত। কুরআন মাজীদে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের শিক্ষাসফরের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি এক মহান নবী। নবুওয়াতী জ্ঞান তো তিনি ওহীর মাধ্যমেই পেয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে প্রাকৃতিক রহস্যের বিশেষ জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে সফর করার হুকুম দেন। সুতরাং তিনি খাদেম ইয়ুশা' আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। কুরআন মাজীদ তার অলৌকিক বর্ণনাশৈলীতে বিস্তারিতভাবে সে ঘটনা বর্ণনা করেছে। তার শুরুতে আছে-

وَاِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِفَتٰىہُ لَاۤ اَبۡرَحُ حَتّٰۤی اَبۡلُغَ مَجۡمَعَ الۡبَحۡرَیۡنِ اَوۡ اَمۡضِیَ حُقُبًا

'এবং (সেই সময়ের বৃত্তান্ত শোনো) যখন মূসা তার যুবক (শিষ্য)-কে বলেছিল, আমি দুই সাগরের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত চলতেই থাকব অথবা আমি চলতে থাকব বছরের পর বছর। সূরা কাহফ, আয়াত ৬০

জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যে বিপৎসংকুল সফরের দিক থেকে আমাদের ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাস বড় বিস্ময়কর। হিজরী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মক্কা-মদীনা, কূফা-বসরা, দামেশক ও বাগদাদ যখন দীনী জ্ঞানবিদ্যার কেন্দ্ররূপে আলো ছড়াচ্ছিল, তখন হাদীছ, ফিকহ ইত্যাদি শাস্ত্রীয় জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যে হাজারও শিক্ষার্থীর ভিড়ে এসব কেন্দ্র সদা সরগরম থাকত। তারা আসত আফ্রিকার দূর-দূরান্তের দেশ, পশ্চিম ইউরোপের স্পেন এবং মধ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে। এজন্য তাদেরকে দুর্গম কঠিন পথ পাড়ি দিতে হতো। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সফর করতে হতো পায়ে হেঁটে কিংবা কোনও বাহনজম্ভর পিঠে চড়ে। ইসলামের সে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। এক গৌরবজনক অধ্যায়।

বস্তুত জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর করা অপরিহার্য। সফর করা ও সফরের কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করা ছাড়া জ্ঞান অর্জন করা বিশেষত দীনী ইলম হাসিল করার সৌভাগ্য কদাচ ঘটে। তাই তো কুরআন মাজীদে দীনী ইলম হাসিল করার জন্য সফরের আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

وَمَا کَانَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لِیَنۡفِرُوۡا کَآفَّۃً ؕ فَلَوۡلَا نَفَرَ مِنۡ کُلِّ فِرۡقَۃٍ مِّنۡہُمۡ طَآئِفَۃٌ لِّیَتَفَقَّہُوۡا فِی الدِّیۡنِ وَلِیُنۡذِرُوۡا قَوۡمَہُمۡ اِذَا رَجَعُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ لَعَلَّہُمۡ یَحۡذَرُوۡنَ

'মুসলিমদের পক্ষে এটাও সমীচীন নয় যে, তারা সকলে একসঙ্গে বের হয়ে যাবে। সুতরাং তাদের প্রতিটি বড় দল থেকে একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দীনের উপলব্ধি অর্জনের চেষ্টা করে এবং সতর্ক করে তাদের কওমকে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে, ফলে তারা সতর্ক থাকবে।' (সূরা তাওবা, আয়াত ১২২)

আরেক আছে রাজা-বাদশাহদের রাজ্যবিস্তারের অভিযান। প্রাচীনকালে নৃপতিগণ যোদ্ধাদের নিয়ে বের হতে পড়ত। একের পর এক দেশ জয় করে সামনের দিকে চলতে থাকত। এভাবে কেটে যেত মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর। ইসলামের শুরুর কয়েক যুগ মুসলিম মুজাহিদগণ শাহাদাতের অদম্য উদ্দীপনায় মহান জিহাদের যে সফরসমূহ করেছেন, মানবসভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে তার রয়েছে বিশাল ভূমিকা। সে ধারা অব্যাহত না থাকায় মানবজাতি অপূরণীয় ক্ষতির শিকার। আজ বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা ও অশান্তির কবলে মানুষ ও মনুষ্যত্ব বিপর্যস্ত, তা ইসলামের ওই মহান জিহাদী সফর থেমে যাওয়ারই পরিণতি। কাজেই আজ প্রয়োজন প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে থেমে যাওয়া সে গতিধারার নবসঞ্চালন। পবিত্র কুরআন আল্লাহ তা'আলার শাশ্বত নির্দেশ শোনায়-

اِنۡفِرُوۡا خِفَافًا وَّثِقَالًا وَّجَاہِدُوۡا بِاَمۡوَالِکُمۡ وَاَنۡفُسِکُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکُمۡ خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ

'(জিহাদের জন্য) বের হয়ে পড়ো, তোমরা হালকা অবস্থায় থাক বা ভারী অবস্থায় এবং নিজেদের জান-মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করো। তোমরা যদি বুঝ-সমঝ রাখ, তবে এটাই তোমাদের পক্ষে উত্তম। (সূরা তাওবা, আয়াত ৪১)

বিশ্বজগৎ জুড়ে আল্লাহ তা'আলার অসীম ক্ষমতা ও কুদরতের যে নিদর্শনাবলি বিরাজমান রয়েছে, তা চাক্ষুষ করে উপদেশগ্রহণ করার জন্যও দেশ-বিদেশে সফর করা দরকার। কোথাও আকাশচুম্বী পাহাড়, কোথাও দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমি, কোথাও কূল-কিনারাহীন জলরাশি, দেশে দেশে বিচিত্র ভাষার মানুষ, হরেক রূপ ও বর্ণের জীবজন্তু, কী না আছে কুদরতের এ বিশাল ভান্ডারে? আছে ইতিহাসের সাক্ষী। হয়েছে কত জাতির উত্থান। কত জাতি হয়েছে ধ্বংস। ভূপৃষ্ঠ থেকে তাদের অনেকের শেষ চিহ্নটুকু মুছে গেলেও বহু জাতির ধ্বংসাবশেষ আজও পর্যন্ত কালের সাক্ষী হয়ে বিদ্যমান আছে। বুদ্ধিমান মানুষের উচিত পৃথিবী পরিভ্রমণ করে কুদরতের সেসব নিদর্শন দেখা। দরকার তা দেখে দেখে নিজ বুদ্ধি-বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টি আলোকিত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

اَفَلَمۡ یَسِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَتَکُوۡنَ لَہُمۡ قُلُوۡبٌ یَّعۡقِلُوۡنَ بِہَاۤ اَوۡ اٰذَانٌ یَّسۡمَعُوۡنَ بِہَا ۚ فَاِنَّہَا لَا تَعۡمَی الۡاَبۡصَارُ وَلٰکِنۡ تَعۡمَی الۡقُلُوۡبُ الَّتِیۡ فِی الصُّدُوۡرِ

'তবে কি তারা ভূমিতে চলাফেরা করেনি, যা দ্বারা তাদের এমন অন্তঃকরণ লাভহতো, যা দ্বারা তারা (সত্য) উপলব্ধি করত কিংবা এমন কান লাভ হতো, যা দ্বারা তা শুনতে পেত। প্রকৃতপক্ষে চোখ অন্ধ হয় না; বরং অন্ধ হয় সেই হৃদয়, যা বক্ষদেশে বিরাজ করে। (সূরা হজ্জ, আয়াত ৪৬)

সবচে' বড় কথা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ যে হজ্জ, তা আদায়ের জন্যও সফর করার প্রয়োজন হয়। আল্লাহ তা'আলার ডাকে সাড়া দেওয়ার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সে সফর বড়ই মহিমান্বিত এক সচলতা। এ সম্পর্কে কুরআন মাজীদের হৃদয়স্পর্শী ভাষায় ইরশাদ-

وَاَذِّنۡ فِی النَّاسِ بِالۡحَجِّ یَاۡتُوۡکَ رِجَالًا وَّعَلٰی کُلِّ ضَامِرٍ یَّاۡتِیۡنَ مِنۡ کُلِّ فَجٍّ عَمِیۡقٍ ۙ لِّیَشۡہَدُوۡا مَنَافِعَ لَہُمۡ

'এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পদযোগে এবং দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রমকারী উটের পিঠে সওয়ার হয়ে যেগুলো (দীর্ঘ সফরের কারণে) রোগা হয়ে গেছে। যাতে তারা তাদের জন্য স্থাপিত কল্যাণসমূহ প্রত্যক্ষ করে। (সূরা হজ্জ, আয়াত ২৭, ২৮)

আসলে সফরের রয়েছে বহু উপকারিতা। এর দ্বারা জ্ঞান-প্রজ্ঞা সমৃদ্ধ হয়, অভিজ্ঞতা বাড়ে, বিবেক-বুদ্ধি শানিত হয়, মহান ব্যক্তিবর্গের সান্নিধ্য লাভ হয়, হিম্মত জাগ্রত হয়, অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয় ও মন নরম হয়, সতর্কতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য-স্থৈর্য, কষ্টসহিষ্ণুতা ইত্যাদি সদগুণে পরিপক্বতা আসে। ইমাম শাফি'ঈ রহ. বলেন, উন্নতির সন্ধানে দেশ-বিদেশে সফর করো। সফরের বিশেষ পাঁচটি ফায়দা রয়েছে। এর দ্বারা দুঃখ-দুশ্চিন্তা লাঘব হয়, জীবিকা অর্জিত হয়, জ্ঞান অর্জন করা যায়, জীবনের বহুমুখী শিষ্টাচার শেখা যায় এবং মহান ব্যক্তিবর্গের সান্নিধ্য লাভ হয়।

সফরের একটি বিশেষ ফায়দা হলো দুআ কবুল হওয়া। সফর অবস্থায় যে দুআ করা হয়, আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لَا شَكَّ فِيهِنَّ دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ

'তিনটি দুআ কবুল হয়। তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মজলুম ব্যক্তির দুআ, মুসাফিরের দুআ এবং সন্তানের জন্য পিতার দুআ।' (জামে' তিরমিযী: ১৯০৫; সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৬; সুনানে ইবন মাজাহ: ৩৮৬২; মুসনাদে আহমাদ: ৭৫০২; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ২৬৩৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ২৬৯৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ২৪; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৬৩৯২। শু'আবুল ঈমান। ৭০৫৯)

এতসব উপকার ও কল্যাণ যার মধ্যে নিহিত, সেই সফর তো আপন আপন সামর্থ্য অনুযায়ী করাই উচিত। তবে যেমন ইচ্ছা তেমনি সফর করলেই যে সেই কল্যাণ লাভ হবে এমন নয়। এর জন্য কিছু নীতি-নিয়ম রয়েছে। রয়েছে অনেক আদব। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদীছে আমাদেরকে তা শিক্ষা দিয়েছেন। রিয়াযুস সালেহীনের এ ভাগটি সে সম্পর্কেই। সফরের বিভিন্ন নিয়ম ও আদব সংবলিত হাদীছসমূহ এ ভাগে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এসব হাদীছ মনোযোগ সহকারে পড়ব ও এ অনুযায়ী আমল করতে সচেষ্ট থাকব। আল্লাহ তা'আলা তাওফীক দান করুন।

বৃহস্পতিবারে বের হওয়া এবং দিনের শুরুভাগে বের হওয়া
৯৫৬. হযরত কা'ব ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধে বের হন বৃহস্পতিবার। তিনি বৃহস্পতিবার (সফরে) বের হওয়া পছন্দ করতেন। -বুখারী ও মুসলিম। (সহীহ বুখারী: ২৯৫০; সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৮৭৩৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৯২৭০; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ১২৯১; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৪৮৫৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৬৭৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৭৮১)

সহীহায়নের (অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিমের) অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবার ছাড়া অন্যদিনে (সফরে) কমই বের হতেন।
كتاب آداب السفر
باب استحباب الخروج يوم الخميس، واستحبابه أول النهار
956 - عن كعب بن مالك - رضي الله عنه: أنَّ النبيَّ - صلى الله عليه وسلم - خَرَجَ في غَزْوَةِ تَبُوكَ يَوْمَ الخَمِيس، وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يَخْرُجَ يَوْمَ الْخَميسِ. متفقٌ عَلَيْهِ. (1)
وفي رواية في الصحيحين: لقَلَّمَا كَانَ رسولُ الله - صلى الله عليه وسلم - يَخْرُجُ إِلاَّ في يَوْمِ الخَمِيسِ.

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):


__________
(1) أخرجه: البخاري 4/ 59 (2949) و (2950)، ولم نجده عند مسلم وكذا لم يعزه لمسلم المزي في تحفة الأشراف 7/ 566 (11147).

হাদীসের ব্যাখ্যা:

তাবুক মদীনা মুনাউওয়ারা থেকে উত্তর দিকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত। এলাকাটি ছিল তখনকার পরাশক্তি রোম সাম্রাজ্যের অধীন। হিজরী ৯ম সনের রজব মাসে এখানে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ পেলেন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদীনা মুনাউওয়ারায় এক জোরদার হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি সে শাম ও আরবের সীমান্ত এলাকায় এক বিশাল বাহিনীও মোতায়েন করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিরাক্লিয়াসের আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। সুতরাং তিনি সকল মুসলিমকে এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার হুকুম দিলেন। এটাই ছিল সর্বপ্রথম যুদ্ধ, যা তখনকার আরবভূমির বাইরে অনুষ্ঠিত হয় এবং তাও সেকালের শ্রেষ্ঠ পরাশক্তির বিরুদ্ধে। কাজেই মুসলিমদের পক্ষে এটা ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘ ১০ বছর উপর্যুপরি যুদ্ধ শেষে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। আবার সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের। ছিল দুর্গম মরুভূমির পথ। যুদ্ধের রসদ, বাহন সবকিছুই ছিল নিতান্ত নগণ্য। যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সেই বৃহত্তম শক্তির রণকৌশল সম্পর্কেও মুসলিমদের জানাশোনা ছিল না। সবদিক থেকেই ছিল কঠিন সংকট ও সীমাবদ্ধতা। তাই এ যুদ্ধের অপর নাম গাযওয়াতুল উসরা বা সংকট ও সমস্যাসংকুল যুদ্ধ। কিন্তু তা সত্ত্বেও শাহাদাতের প্রেরণায় উজ্জীবিত সাহাবীগণ দলে দলে এ যুদ্ধে নাম লেখালেন। যথাসাধ্য প্রস্তুতি শেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩০ হাজার সাহাবীর এক বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশে বের হয়ে পড়লেন। আল্লাহ তা'আলা হিরাক্লিয়াস ও তার বাহিনীর উপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দুঃসাহসিক অভিযানের এমন প্রভাব ফেললেন যে, তারা কালবিলম্ব না করে ফেরত চলে গেল। ফলে যুদ্ধ আর হলো না। তবে যুদ্ধ না হলেও এ অভিযানে ইসলাম ও মুসলিম বাহিনীর বিজয় ঠিকই অর্জিত হলো। কেননা একে তো সেকালের বৃহত্তম শক্তির উপর ইসলামী শক্তির প্রভাব পড়েছিল এবং তারা ইসলাম ও তার অনুসারীদের আমলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। দ্বিতীয়ত তাদের ফিরে যাওয়ায় আশপাশের ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গ ক্রমবর্ধমান ইসলামী শক্তির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা কালবিলম্ব না করে তাবুকে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং তাঁর সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করে। এ যুদ্ধটিই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ।

হাদীছটিতে বলা হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবার যুদ্ধের সফরে বের হওয়া পছন্দ করতেন এবং তিনি তাবুকের যুদ্ধে বৃহস্পতিবারই বের হয়েছিলেন। আরবীতে বৃহস্পতিবারকে يَوْمُ الْخَمِيسِ বলা হয়। এর শাব্দিক অর্থ পঞ্চম দিন। বৃহস্পতিবারকে পঞ্চম দিন বলার কারণ শুক্র ও শনিবারকে যথাক্রমে বলা হয় ইয়াওমুল জুমু'আ ও ইয়াওমুস সাব্‌ত। তারপর রোববারকে সপ্তাহের প্রথম দিন ধরে এর নাম দেওয়া হয়েছে ইয়াওমুল আহাদ অর্থাৎ প্রথম দিন। সে হিসেবে পঞ্চম দিন হয় বৃহস্পতিবার।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবারে বের হওয়া পছন্দ করতেন সম্ভবত এ কারণে যে, এক রেওয়ায়েতে আছে, এ উম্মতের জন্য বৃহস্পতিবারের ভোর বেলায় বরকত রাখা হয়েছে। সম্ভবত সে বরকত লাভের উদ্দেশ্যেই তিনি এদিন ভোর বেলায় বের হতেন।

যদিও তিনি বৃহস্পতিবারে বের হওয়া পছন্দ করতেন এবং অধিকাংশ সফর তিনি বৃহস্পতিবারেই করতেন, কিন্তু তার মানে এ নয় যে, অন্য কোনওদিন বের হওয়া যাবে না। কেননা তিনি কোনও কোনও সফর অন্য দিনেও করেছেন। আলোচ্য হাদীছটির ভেতরেও সেদিকে ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা বলা হয়েছে, তিনি বৃহস্পতিবার ছাড়া কমই বের হতেন। বোঝা যাচ্ছে কখনও কখনও অন্যদিনও বের হতেন। কাজেই অন্যদিন বের হওয়াটাও নিঃসন্দেহে জায়েয। এমনকি তা মাকরূহও নয়। হাঁ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু বৃহস্পতিবারে বের হওয়া পছন্দ করতেন, সে হিসেবে অন্য দিনের তুলনায় এদিন সফর করাটা অবশ্যই উত্তম।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. দিন হিসেবে সকল দিন সমান হলেও বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য একদিন অপেক্ষা অন্য দিন উত্তম হতে পারে।

খ. সফরের জন্য বৃহস্পতিবারকে বেছে নেওয়া উত্তম।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
রিয়াযুস সালিহীন - হাদীস নং ৯৫৬ | মুসলিম বাংলা