আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ৭২৭
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ)-এর বাণীঃ নারী ও সুগন্ধিকে আমার প্রিয় বানিয়ে দেয়া হয়েছে
৭২৭। হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ দুনিয়ার দু'টি জিনিসের প্রতি আমার মধ্যে ভালবাসা দেয়া হয়েছেঃ সুগন্ধি ও নারী। আর আমার চোখের শীতলতা (মনের প্রশাস্তি) দেয়া হয়েছে সালাতের মধ্যে।
أبواب الكتاب
ذِكْرُ قَوْلِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حُبِّبَ إِلَيَّ النِّسَاءُ وَالطِّيبُ
727 - حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، نَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْحَسَنِ الْعَلَّافُ، وَأَبُو كَامِلٍ، قَالَا: حَدَّثَنَا أَبُو الْمُنْذِرِ سَلَّامٌ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: حُبِّبَ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا الطِّيبُ وَالنِّسَاءُ، وَجُعِلَ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসটিতে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাপক এবং মৌলিক বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে; যা ঈমান, সমাজ এবং আখিরাত এ তিনটির সাথেই সম্পৃক্ত।
(১) সুগন্ধির প্রতি আকর্ষণ
সুগন্ধি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় ছিল। হাদীসে এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আতর ও খোশবু ব্যবহার সম্পর্কে স্বতন্ত্র শিরোনামে অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। সুগন্ধির প্রতি ভালবাসা ও আকর্ষণ ঈমানের নিদর্শন। আল্লাহ্ পবিত্র সৃষ্টি ফেরেশতাগণ সুগন্ধি এত ভালবাসেন যে, সুগন্ধি যেখানেই থাকে সেখানেই তাঁরা নাযিল হন। এবং যেখানে দুর্গন্ধ থাকে সেখানে তাঁরা আসেন না। জান্নাত তো সুগন্ধিতে আমোদিত থাকবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি তোমাকে সুগন্ধি তুলসী ফুলও পেশ করা হয় তাহলে তুমি তা ফিরিয়ে দিও না। কেননা, মূলত তা জান্নাত থেকে এসেছে। (শামাইলে তিরমিযী) আলিমগণ লিখেছেন, প্রকৃত সুগন্ধি আছে জান্নাতে । আল্লাহ্ তা'আলা পৃথিবীতে তার নমুনা সৃষ্টি করেছেন যাতে তা জান্নাতের প্রতি আকর্ষণের কারণ হতে পারে। পার্থিব বিচারেও সুগন্ধি একটি উত্তম বস্তু। সুগন্ধি মন-মস্তিষ্কের উত্তম খাদ্য। যা দ্বারা তা তরতাজা থাকে এবং শক্তি অর্জন করে। সুগন্ধি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার নির্যাস। এটি ঈমানের একটি অংশ। এ কারণে দীন ও শরীয়তের ধারক ও বাহক আল্লাহ্‌র রাসূল হযরত মুহাম্মদ-এর কাছে নগণ্য পার্থিব বস্তুসমূহের মধ্যে সুগন্ধি ছিলো অতীব পছন্দনীয়। তিনি শুধু সুগন্ধির প্রতি আকৃষ্টই ছিলেন না বরং নিজেই ছিলেন সুগন্ধির উৎস। এটা ছিলো তাঁর সত্যতার সুস্পষ্ট মুজিযা। কতিপয় হাদীসে একথা প্রমাণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র ঘাম এতই সুগন্ধিময় ছিল যে, সাহাবীগণ তা সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করতেন। হযরত উম্মে সুলাইম (রা) থেকে মুসলিম শরীফে এমর্মে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমানোর সময় তাঁর পবিত্র শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। তিনি তখন ঐ ঘাম একটি ছোট বোতলে জমা করতে শুরু করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম র-এর নিদ্রা ভঙ্গের পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন একি করছো? উম্মে সুলাইম (রা) বললেনঃ এ ঘাম আমি আমার খোশবুর সাথে মিশাব কারণ এ ঘাম সর্বাপেক্ষা খোশবুযুক্ত। সুগন্ধি না লাগালেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র শরীর থেকে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়তো। হযরত আনাস (রা) থেকে একটি হাদীসে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (শরীরের) সুগন্ধির চেয়ে অধিক সুগন্ধিযুক্ত কোন মিশক আম্বর বা অন্য কোন সুগন্ধি আমি দেখিনি। আবূ ইয়ালা প্রমুখ মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পথ দিয়ে যেতেন ছড়িয়ে থাকা খোশবু থেকে সে পথে যাতায়াতকারী যে কেউ বুঝতে পারতো যে, একটু আগেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এপথ অতিক্রম করেছেন। নিজের শরীর সুগন্ধিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও উম্মতের শিক্ষার জন্য তিনি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন ।
(২) নারীর প্রতি ভালবাসা
এ বিষয়টি বোঝার জন্য ইসলামপূর্ব সমাজ এবং ইতিহাসের প্রতি একবার চোখ বুলিয়ে নেয়া দরকার । যাতে হাদীসটির সঠিক অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলিমগণ এর বহুবিধ যুক্তি ও কল্যাণকারিতা বর্ণনা করেছেন।
বিশেষজ্ঞ আলিমগণ লিখেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেয়েদেরকে (তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ) ভালবাসা ও একাধিক স্ত্রী গ্রহণের মধ্যে বহু সংখ্যক যুক্তি এবং মৌলিক বিষয় ছিল যার মধ্য থেকে কয়েকটি নিচে বর্ণনা করা হলোঃ
১. একাধিক স্ত্রী গ্রহণের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিলো স্ত্রীদের সাথে কিভাবে জীবন যাপন করতে হয় এবং নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতে হয় উম্মতকে তা শিক্ষা দেয়া। তিনি বাস্তব কর্মের মাধ্যমেই এ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাপেক্ষা উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। তোমাদের মধ্যে আমি আমার স্ত্রীর জন্য সর্বাপেক্ষা উত্তম।
২. যে সব কাফির ও মুশরিক বলতো, তিনি আল্লাহ্‌র রাসূল হয়ে থাকলে নারীদের সাথে সম্পর্ক রাখতেন না তাদেরকে এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার প্রয়োজন ছিল। বর্তমান কালের খ্রিস্টানরাও এই একই অভিযোগ করে থাকে। এর জবাবে পবিত্র কুরআনও সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেঃ وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً - الايه আমি তোমার পূর্বে বহু সংখ্যক রাসুল পাঠিয়েছিলাম। আর আমি তাদেরকে স্ত্রী এবং সন্তানও দিয়েছিলাম। (সূরা রা'দ)
বিজ্ঞ আলিমগণ লিখেছেন যে, বিয়ে-শাদী মোটেই কৃচ্ছ্রতা ও তাওয়ার পরিপন্থী নয়। কারণ, এটি নবী-রাসূলগণের সুন্নত। অথচ কৃচ্ছ্রতা ও তাওয়ার প্রকৃত উৎসই হচ্ছেন নবী-রাসূলগণ ।
৩. এমন অনেক আদেশ-নিষেধ উম্মতের কাছে পৌঁছানো তাঁর কর্তব্য ছিলো যা মেয়েদের সাথে সম্পর্কিত এবং শুধু মেয়েরাই তার ব্যাখ্যা ও প্রচারের কাজ আঞ্জাম দিতে পারে। যেমন- হায়েয, নিফায, প্রভৃতি। সুতরাং এসব বিষয়ে জানার জন্য সাহাবায়ে কিরাম সব সময় উম্মাহাতুল মু'মিনীনগণের শরণাপন্ন হতেন। কারণ, ঐ সব বিষয়ে তারাই সর্বাপেক্ষা বেশি জানতেন ।
এসব আদেশ-নিষেধ ও যুক্তি ছাড়া আরো একটি মৌলিক কারণ আছে। সে হলো, ইসলামপূর্ব অন্ধকার যুগে যেখানে অনেক অকল্যাণ ছাড়াও ছিলো মানবতা বিধ্বস্ত। সেখানে সবচাইতে একটি বড় জুলুম ছিলো এই যে, সমাজে নারীর মর্যাদা ও অস্তিত্ব একেবারেই অস্বীকার করা হয়েছিলো। তারা নারীকে নিজেদের জন্য দুঃখ-কষ্ট ও লাঞ্ছনার কারণ বলে মনে করতো। তার সাথে দাস-দাসীর চেয়েও জঘন্য আচরণ করা হতো। তারা নিজেদের কন্যা সন্তানদের জীবিত কবর দিতো। নারীর ওপর নির্যাতন চালানো, তাকে ঘৃণা ও হেয় করা ছিল তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। এ বিষয়ে কুরআন মজীদেই ইরশাদ হয়েছে; وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ -সেই দিনের কথা স্মরণ করো, যেদিন জীবন্ত কবর দেয়া মেয়েদের জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো? (সূরা তাকবীর)
ইসলাম এসে সমস্ত অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন ও অকল্যাণকে একেবারে বিদূরীত করে সমাজকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে দিয়েছে। নারীর অধিকারসমূহ করা হয়েছে সংরক্ষিত। সমাজে তাদের স্থান ও মর্যাদা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে এবং সমাজ সংস্কারের সর্বাধিক উন্নত পন্থা যা হতে পারে তা কার্যকর করে ঐ সব মন্দ ও অকল্যাণকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কার্যত একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করে (যা ছিল তাঁর একারই বৈশিষ্ট্য) সমাজের সংস্কার সাধন করেছেন । সমাজ মন থেকে নারীদের প্রতি ঘৃণা দূর করেছেন। এক্ষেত্রে মহান আল্লার কুদরত দেখার মতো। পুত্র সন্তানের পরিবর্তে তাঁর কন্যা সন্তানেরাই দীর্ঘায়ু লাভ করেছেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের সাথে যে আচরণ করেছেন তা সবার সামনে বিদ্যমান। তাঁর এই আচরণে নারী জাতি নবজীবন লাভ করলো। তিনি তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিলেন। মানুষের মনে তাদের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করলেন। নিজে ঘোষণা করলেনঃ এসব অসহায় ও নির্যাতিত নারীদেরকে আমি ভালবাসি। আমি তাদের প্রতি আদৌ কোন প্রকার ঘৃণাপোষণ করি না। এসব কথা নারীদের জন্য এমন সৌভাগ্যের যে, এজন্য তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারবে না। এ জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের একটিই মাত্র পথ আছে আর সেটি হচ্ছে নিজের মধ্যে ইসলামী ভাবধারা সৃষ্টি করা, ইসলামী মূল্যবোধ সৃষ্টি করা এবং ইসলামী সমাজকে আপন করে নেয়া। ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্য ভূমিকা রেখে যাওয়া ।
৩. আমার চোখের শীতলতা দেয়া হয়েছে সালাতের মধ্যে
গোটা এই হাদীসটির নির্যাস এবং সারমর্ম হচ্ছে এই বাক্যটি। পার্থিব বস্তুসমূহের প্রতি যতো গভীর সম্পর্কই হোক তা ঐ পর্যন্ত সীমিত থাকা উচিত। প্রকৃত ভালবাসার সম্পর্ক এবং প্রশান্তি আখিরাতের সাথে সম্পর্কিত বস্তুসমূহের সাথে হওয়া উচিত। কারণ, সেটাই চিরস্থায়ী অবস্থানের জায়গা। আল্লাহ্‌র সাথে মজবুত সম্পর্ক কায়েম হলেই কেবল আখিরাতের সাথে সম্পর্ক কায়েম হতে পারে। সালাত মু'মিনের জন্য মি'রাজ এবং আল্লাহ্‌র সাথে নিরিবিলি কথোপকথনের একমাত্র উপায়। আল্লাহওয়ালাগণ সালাতের মধ্যে সব সময় প্রশান্তি ও আরাম লাভ করে থাকেন। এ ব্যাপারে নবীগণের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত পড়তে চাইলে বিলালকে বলতেনঃ ارحنا يا بلال হে বিলাল! আমার জন্য আরামের ব্যবস্থা করো অর্থাৎ সালাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করো, আযান দাও। তিনি সালাতে অত্যন্ত প্রশান্তি লাভ করতেন। প্রতিটি বিপদের মুহূর্তে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন সালাতে।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান