আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ৪৭৭
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ)-এর বিছানার বর্ণনা
৪৭৭। রাবী ইব্‌ন যিয়াদ আল হারিসী (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইরাকের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে উমর ইব্‌ন খাত্তাব (রা)-এর দরবারে আসলাম। তিনি আমাদের প্রত্যেকের সম্মানার্থে একটি করে আবা (ঢিলা জামা বিশেষ) উপহার দিতে আদেশ করলেন। (তাঁর কন্যা উম্মুল মু’মিনীন) হযরত হাফসা (রা) তাঁকে বলে পাঠালেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! ইরাকের জ্ঞানীগুণী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ আপনার কাছে এসেছেন। আপনি তাদেরকে ভালভাবে সম্মান করুন। উমর (রা) বললেন, হাফসা আমি তাদেরকে একটি করে আবা-এর অধিক আর কিছু দিতে পারিনি। তুমি আমাকে বলো তোমার ঘরে নবী (ﷺ)-এর জীবনে সবচাইতে নরম ও আরামদায়ক বিছানা কি ছিলো এবং সবচাইতে উত্তম খাদ্যই বা তিনি কি খেয়েছিলেন? হাফসা (রা) বললেন, আমাদের কাছে শুধু পশমী মাদুর ছিলো। খায়বার যুদ্ধের গনীমতের অংশ হিসেবে আমরা তা লাভ করেছিলাম। আমি সেই পশমী মাদুরটি বিছানা বানিয়ে দিয়েছিলাম। আমি প্রতি রাতে সেটাই নবী (ﷺ)-এর জন্য বিছিয়ে দিতাম এবং তিনি সেটার ওপরেই আরাম করতেন (যাতে তা অধিক আরামদায়ক হয় সেজন্য)। এক রাতে আমি সেটাকে চার ভাঁজ করে বিছিয়ে দিয়েছিলাম। সকালে উঠে তিনি আমাকে বললেন, হাফসা গত রাতে তুমি আমাকে কী বিছানা দিয়েছিলে ? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! প্রতিদিন আপনাকে যে বিছানা পেতে দেই আজকেও সেটিই দিয়েছিলাম। তবে চার ভাঁজ করে দিয়েছিলাম। তিনি বললেন, হে হাফসা! তা পূর্বের মতই থাকতে দাও। কারণ, এর কোমলতা আজকে আমার (ইবাদতে) প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিলো। হাফসা (রা) বলেন, খাদ্য হিসেবে আমাদের কাছে এক সা’ যব ছিলো। একদিন তা চালুনিতে চেলে নবী (ﷺ)-এর জন্য যাঁতায় পিষে আনলাম। আমাদের কাছে এক কৌটা ঘি ছিলো। সেই ঘির কিছুটা আটায় মিশালাম এবং রুটি প্রস্তুত করলাম। নবী (ﷺ) তা খেতে শুরু করেছেন। এমন সময় আবূ দারদা (রা) এসে হাযির হলেন। তিনি বললেন, আমার মনে হয় আপনাদের কাছে ঘি খুব কমই আছে। আমার কাছে একটা ঘি ভর্তি বড় কৌটা রয়েছে। এই বলে তিনি তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরে গেলেন এবং উক্ত ঘি পাঠিয়ে দিলেন। তিনি ঐ আটার মধ্যে এই ঘিও মিশিয়ে নিলেন এবং দু’জনে একসাথে খানা খেলেন। হাফসা (রা) বলেন, আমার জীবনে আমি নবী (ﷺ)-এর জন্য এটাই সবচাইতে কোমল বিছানা পেতেছিলাম। আর এটা ছিলো তাঁর খাওয়ার সবচাইতে উত্তম খাদ্য। এ কথা শুনে হযরত উমর (রা) কাঁদতে থাকলেন এবং তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে থাকলো। তখন তিনি বললেন, নবী (ﷺ) এই খাদ্য খেয়েছেন এবং এই ছিলো তাঁর বিছানা, আল্লাহ্‌র শপথ! আমি তাদের প্রত্যেককে একটি আবা-এর বেশী আর কিছুই দেবো না।
أبواب الكتاب
ذِكْرُ فِرَاشِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
477 - حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُوسَى الْأَنْصَارِيُّ، نَا سَهْلُ بْنُ بَحْرٍ، نَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رُشَيْدٍ، نَا أَبُو عُبَيْدَةَ، عَنْ أَبَانَ، وَعَنْ إِبْرَاهِيمَ الْجُعْفِيِّ، عَنِ الرَّبِيعِ بْنِ زِيَادٍ الْحَارِثِيِّ، قَالَ: قَدِمْتُ عَلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي الْعِرَاقِ، فَأَمَرَ لِكُلِّ رَجُلٍ مِنَّا بِعَبَاءٍ، عَبَاءٍ، فَأَرْسَلَتْ إِلَيْهِ حَفْصَةُ، فَقَالَتْ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ أَتَاكَ أَلْبَابُ الْعِرَاقِ، وَوجُوهُ النَّاسِ، فَأَحْسِنْ كَرَامَتَهُمْ، فَقَالَ: مَا أَزِيدُهُمْ عَلَى الْعَبَاءِ يَا حَفْصَةُ، أَخْبِرِينِي بِأَلْيَنِ فِرَاشٍ فُرِشَتْ لِرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ وَأَطْيَبِ طَعَامٍ أَكَلَهُ عِنْدَكَ؟ فَقَالَتْ: كَانَ لَنَا كِسَاءٌ مِنْ هَذِهِ الْمُلَبَّدَةَ، أَصَبْنَاهُ يَوْمَ خَيْبَرٍ فَكُنْتُ أَفْرِشُهُ لِرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلَّ لَيْلَةٍ، وَيَنَامُ عَلَيْهِ، وَإِنِّي رَبَّعْتُهُ ذَاتَ لَيْلَةٍ، فَلَمَّا أَصْبَحَ قَالَ: يَا حَفْصَةُ مَا كَانَ فِرَاشِي الْبَارِحَةَ؟ قُلْتُ: فِرَاشُكَ كُلَّ لَيْلَةٍ، إِلَّا أَنِّي رَبَّعْتُهُ اللَّيْلَةَ، قَالَ: يَا حَفْصَةُ أَعِيدِيهِ لِمَرَّتِهِ الْأُولَى، فِإِنَّهُ مَنَعْتَنِي وِطَاءَتُهُ الْبَارِحَةَ مِنَ الصَّلَاةِ. قَالَتْ: وَكَانَ لَنَا صَاعٌ مِنْ سُلْتٍ، وَإِنِّي نَخِلْتُهُ ذَاتَ يَوْمٍ، وَطَحَنْتُهُ لِرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَانَ لَنَا قَعْبٌ مِنْ سَمْنٍ فَصَبَبْتُ عَلَيْهِ، فَبَيْنَمَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْكُلُ، إِذْ دَخَلَ أَبُو الدَّرْدَاءِ، فَقَالَ: إِنَّى أَرَى سَمْنَكُمْ قَلِيلًا، وَعِنْدَنَا قَعْبٌ مِنْ سَمْنٍ، فَأَرْسَلَ أَبُو الدَّرْدَاءِ، فَصَبَّ عَلَيْهِ فَأَكَلَا، فَقَالَتْ حَفْصَةُ: فَهَذَا أَلْيَنُ فِرَاشٍ فَرَشْتُهُ لِرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهَذَا أَطْيَبُ طَعَامٍ أَكَلَهُ. فَأَرْسَلَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَيْنَيْهِ بِالْبُكَاءِ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَا أَزِيدُهُمْ عَلَى الْعَبَاءِ شَيْئًا، وَهَذَا طَعَامُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهَذَا فِرَاشُهُ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীস থেকে অনুমান করুন যে, হযরত হাফসা (রা) ঘি মিশ্রিত আটার রুটিকে যা একটি সাধারণ খাদ্য— নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাওয়ার সব চাইতে উত্তম খাদ্য বলে আখ্যায়িত করছেন। প্রকাশ থাকে যে, কোন বাধ্যবাধকতা বা দারিদ্রের কারণে তিনি এ ধরনের খাদ্য পছন্দ করেননি বরং তাঁর উম্মত যাতে তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আখিরাতের নিয়ামতসমূহকে দুনিয়ার নিয়ামতের ওপরে অগ্রাধিকার দিতে শিখে সে জন্য তা পছন্দ করেছিলেন। হাদীসে বলা হয়েছেঃ
(১) আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে ইখ্‌তিয়ার দিয়েছিলেন যে, তিনি চাইলে নবুওয়াতের সাথে বাদশাহী কিংবা বন্দেগী যেটি ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। তিনি নবুওয়াতের সাথে বন্দেগী গ্রহণ করেছেন।
(২) একদিন আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর কাছে পাহাড়ের অধিকর্তা ফিরিশ্‌তাকে পাঠিয়েছিলেন এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি চাইলে মক্কার পাহাড়গুলোকে সোনা ও রূপায় পরিণত করে দেয়া হবে এবং সেগুলো তাঁর সাথে চলতে থাকবে। কিন্তু তিনি ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের এই প্রদর্শনী অপছন্দ করলেন এবং বললেন, আমি একদিন ক্ষুধার্ত থেকে সবর করা এবং একদিন পেটপুরে পরিতৃপ্ত হয়ে খেয়ে আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করা পছন্দ করি।
(৩) একবার নিদ্রাবস্থায় তাঁর কাছে এক ফিরিশ্‌তা তাঁর পবিত্র হাতে গোটা পৃথিবীর সম্পদ ও ধন ভাণ্ডারের চাবি তুলে দেন। অনুরূপ একটি হাদীসে ইতোপূর্বে একথাও জেনেছেন যে, তিনি হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-কে বলেছেন, আমি চাইলে আল্লাহ্ তা’আলা আমার সাথে সোনা-রূপার পাহাড় পরিচালিত করে দিতেন। এ সব হাদীস থেকে জানা যায় যে, তিনি নিজের ইচ্ছায় সহজ-সরল জীবনযাত্রা গ্রহণ করেছিলেন। এ কথা সত্য যে, পার্থিব সমস্ত নিয়ামত অস্থায়ী ও নশ্বর এবং আখিরাতের নিয়ামতসমূহ স্থায়ী । তাছাড়া দুনিয়ার অঢেল নিয়ামত আখিরাত থেকে গাফেল হওয়ার ও মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব, সত্যিকার জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান সেই যে দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে অগ্রাধিকার দান করেন এবং দুনিয়ার এসব অস্থায়ী নিয়ামত অর্জনকে জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত করেন না।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান