আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ১৩৭
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) -এর নম্রতা ও বিনয়
১৩৭। হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) থেকে কখনো উচ্ছিষ্ট ভুনা মাংস তুলে নেয়া হয়নি এবং তার জন্য কখনো কার্পেট বিছান হয়নি।
أبواب الكتاب
مَا ذُكِرَ مِنْ تَوَاضُعِهِ
137 - حَدَّثَنَا جَعْفَرُ بْنُ عُمَرَ النَّهَاوَنْدِيُّ، نَا جُبَارَةُ، نَا كَثِيرُ بْنُ سُلَيْمٍ، قَالَ: سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَقُولُ: «مَا رُفِعَ مِنْ بَيْنِ يَدَيْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَضْلُ شِوَاءٍ قَطُّ، وَلَا حُمِلَتْ مَعَهُ طِنْفِسَةٌ»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন বিনয়ী সাধারণ মানুষের মতই মাটিতে বসে আহার করতেন। আহার শেষে তিনি বরতন খুব ভাল করে পরিষ্কার করতেন এবং অহংকারী লোকদের মতো খাবার বরতনে উচ্ছিষ্ট রেখে দিতেন না। খাবার বরতনে যেসব গর্বিত ও অহংকারী লোক কিছু না কিছু উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়, তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ তারা যেনো তাদের ঐ উচ্ছিষ্ট খাবারের প্রতি তার পরিমাপ যা-ই হোক না কোন আদৌ মুখাপেক্ষী নয়। তাদের দৃষ্টিতে আহার্যের কোন কদর ও মর্যাদা নেই। (নাউযুবিল্লাহ্) নবী আকরাম হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর শিক্ষা ও তাঁর জীবন পদ্ধতি এই অর্থহীন অবজ্ঞা লোক-দেখানো প্রাচুর্য থেকে (যা মূলত নিয়ামতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ছিল। তা ছিল বিনয়, বশ্যতা ও আনুগত্যের উপর ভিত্তিশীল । তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে (আহারের পর) আঙুল, বরতন (রেকাবী, প্লেট প্রভৃতি) ভালভাবে পরিষ্কার করে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমরা কি জানো খাবারের কোন্ লোকমা ও কোন্ অংশের মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে ? (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩) খাবার খেয়ে রেকাবীতে উচ্ছিষ্ট রেখে দেয়া তা নষ্ট করার নামান্তর ও নিয়ামতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন স্বরূপ। তাই বরতন ও আঙুলে লেগে থাকা খাবার উত্তমরূপে চেটে খাওয়া উচিত। অবশ্য খাবার যদি বেশি বেঁচে যায় এবং তা নষ্ট করা উদ্দেশ্য না হয়, তবে তা অবশিষ্ট রেখে দিতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু তা এইভাবে অবশিষ্ট রেখে দিবে যা নিজের কিংবা অন্য কারো খেতে ঘৃণা না হয়। এক্ষেত্রে উত্তম পন্থা হচ্ছে, প্রথমেই আহার্য প্রয়োজন মাফিক বরতনে তুলে নিতে হবে। অনুরূপভাবে চামচ বা আঙুলে যে আহার্য লেগে থাকে তাও অবশ্যই চেটে খাওয়া উচিত, যাতে আল্লাহ্ প্রদত্ত এই নিয়ামত নষ্ট না হয়।
অনুরূপ যদি আহার্যের কোনো লোকমা মাটিতে পড়ে যায়, তবে তাও তুলে নিতে হবে। অবশ্য যদি নোংরা ও নাপাক স্থানে না পড়ে। সে ক্ষেত্রে মাটি মিশ্রিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিষ্কার অংশ খেতে হবে। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহ্‌র দেয়া নিয়ামতের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, বিনয় ও আনুগত্যের নিয়ম। এক হাদীসে হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ শয়তান প্রতিটি কাজের সময় তোমাদের কাছে উপস্থিত থাকে এমনকি আহার করার সময়ও। তাই যখন আহার করার সময় লোকমা মাটিতে পড়ে যাবে, তখন তা তুলে নিবে এবং ধুলাবালি পরিষ্কার করে লোকমাটি খাবে। শয়তানের জন্য রেখে দিবে না। অনুরূপভাবে যখন তোমরা আহার শেষ করবে, তখন স্বীয় আঙুলসমূহ পরিষ্কার করবে এবং যে আহার্য তাতে লেগে থাকবে তা চেটে খাবে। কেননা আহার্যের কোন্ অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমাদের জানা নেই। (মিশকাত, পৃষ্ঠা ৩৬৩)
হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রা)-এর উপরোক্ত হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাটিতে বসে খেতেন এবং নিজের জন্য কোনো বিশেষ স্থান বা বিছানা পত্রের ব্যবস্থা করতেন না। যেমনিভাবে অহংকারী ও আত্মপূজারী লোকেরা স্বীয় শানশওকত প্রকাশের জন্য খাবার মজলিসে কার্পেট গালিচা কিংবা টেবিল চেয়ারের বন্দোবস্ত করে থাকে। বরং সরদারে দু’জাহান শাহানশাহে আরব ও আজম সাধারণ মানুষের মত কোনো বিছানা ছাড়াই মাটিতে বসে খানা খেতেন। এতে তার আল্লাহ্‌র বান্দাসুলভ বিনয় ও চরম গর্বহীনতাই প্রকাশ পায়। অনুরূপভাবে তিনি আসন করে বসে কিংবা ঠেস দিয়ে কখনো আহার করতেন না । এটাও আত্মগর্বীদের অভ্যাস। এ সম্পর্কে হযরত আবূ জুহায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আমি আসন করে বসে (কিংবা ঠেস লাগিয়ে) কখনো আহার করি না। (মিশকাত, পৃষ্ঠা-৩৬৩)
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আম্‌র (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কখনো আসন করে আহার করতে দেখা যায়নি। আর তিনি কখনো তাঁর সঙ্গীদের আগে আগে চলতেন না। (বরং বিনয়বশত তাদের মাঝখানে চলতেন) (মিশকাত, পৃষ্ঠা ২৬৬)
এক হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা আহার করার সময় জুতা খুলে নাও। কেননা এটা (জুতা খুলে নেয়া) একটি ভাল অভ্যাস। (জামি সগীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮)
যেসব মুসলমান আজকাল ইউরোপের অন্ধ অনুসরণে জুতা পরিধান করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার করাকেই ভদ্রতা মনে করে, তাদের চিন্তা করা উচিত যে, হাশরের দিন তারা আল্লাহ্‌র হাবীব ও উম্মতের সুপারিশকারী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনে কিভাবে উপস্থিত হবে।
এই সব হাদীস থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহার করার সময় কি পরিমাণ বিনয় নম্রতা অবলম্বন করতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আল্লাহ্ তা’আলা সকল মুসলমানকে তাঁর সুন্দরতম চরিত্র ও অনুপম আদর্শ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান