আখলাকুন্নবী (ﷺ)

কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ

হাদীস নং: ১২৫
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) -এর নম্রতা ও বিনয়
১২৫। হযরত আনাস ইব্‌ন মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীদের মনে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) -এর চেয়ে অধিক ভালবাসা অন্য কারোর জন্য ছিল না। এতদ্‌সত্ত্বেও তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কে কখনো আসতে দেখে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ তারা জানতেন যে, তিনি এভাবে দাঁড়ানোকে মোটেও পছন্দ করেন না।
أبواب الكتاب
مَا ذُكِرَ مِنْ تَوَاضُعِهِ
125 - أَخْبَرَنَا أَبُو يَعْلَى، نَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْحَجَّاجِ، نَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: لَمْ يَكُنْ شَخَصٌ أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَكَانُوا إِذَا رَأَوْهُ لَمْ يَقُومُوا إِلَيْهِ، لِمَا يَعْرِفُونَ مِنْ كَرَاهِيَتِهِ لَهُ.

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসের আলোকে বোঝা যায় যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে নিষেধ করতেন। কেননা এটি অহংকারী লোকদের রীতি। অহংকারী কর্তা ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের লৌকিক সম্মান পেতে চায়। আর তাদের প্রজা ও দরবারের সদস্যরাও এ পদ্ধতিতে সম্মান জানায়। কর্তা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের বড়ত্ব ও আধিপত্যের প্রকাশ ঘটানো এবং মানুষের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক সম্মান আদায় করা। আর এ কারণেই তাদের সম্মানার্থে যারা দাঁড়াবে না, তাদেরকে অপরাধী বলে গণ্য করে। অথচ কোন সন্দেহ নেই এটি নিজের অহংকার প্রকাশেরই একটি বিকল্প মাত্র, যা মিছামিছি প্রদর্শনীর অবতারণা বৈ কিছুই নয়। এ অভ্যাস খুবই মন্দ একটি অভ্যাস। এটি ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাকের কঠিন ক্রোধ ও গযবের মধ্যে নিপতিত করে। এ কারণেই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের প্রদর্শনী করা থেকে সাহাবীদেরকে নিষেধ করতেন।
একখানা হাদীসে হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি লাঠির উপর ভর করে আমাদের দিকে আসছিলেন। আমরা তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ তোমরা অনারবদের ন্যায় আমার সম্মান প্রদর্শনের জন্য কখনো দাঁড়াবে না। অনারব লোকেরা একজন অন্যজনের সম্মানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। (আবূ দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-১২৯)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নির্দেশটি দিয়েছিলেন তাঁর একান্ত বিনয়ী মনোভাবের কারণে। যেন হঠাৎ কেউ দেখলে তাঁর প্রতি অহংকার বা দাম্ভিকতার সন্দেহটুকুও করতে না পারে। নতুবা তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন যে, সাহাবীগণ তাঁকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তাতে বিন্দু পরিমাণ খাদ নেই, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। মনের গভীর থেকেই তাঁরা তাঁকে সম্মান করে থাকেন এবং অকৃত্রিমভাবে তাঁকে ভালবাসেন। এ কারণে আলিমগণ লিখেছেন, কোন বিজ্ঞ আলিম কিংবা বুযুর্গ কিংবা ন্যায়পরায়ণ কোন শাসকের সম্মান প্রদর্শনার্থে এভাবে দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজের প্রভুত্ব, আধিপত্য ও অহংকার দেখানোর জন্য এভাবে সম্মানার্থে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয় তাহলে দাঁড়ানো মাকরূহ।
হযরত আবূ মিজলায (রা) থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুআবিয়া (রা) একবার হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়র ও ইব্‌ন আমির (রা)-এর কাছে গেলেন। হযরত মুআবিয়া (রা)-কে দেখে হযরত ইব্‌ন আমির (রা) তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে গেলেন। এদিকে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়র (রা) স্বস্থানে উপবিষ্ট থাকেন। তখন হযরত মুআবিয়া (রা) হযরত ইব্‌ন আমির (রা)-কে বললেন, স্বস্থানে বসে থাকুন। কেননা আমি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি অন্যরা তার সম্মানার্থে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে সে ব্যক্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (আবূ দাউদ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯)
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সে সময়ের জন্য, যখন আগমনকারীর দাম্ভিকতা ও অহংকার এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাই দেখা যায় একটি হাদীসে এসেছে যে, আনসারদের অন্যতম বড় আলিম ও সরদার হযরত সাদ ইব্‌ন উবাদা (রা) যখন আগমন করছিলেন তখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের আদেশ দিয়ে বলেন, তোমাদের সর্দার আগমন করছেন। তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অবশ্য এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হযরত সাদ ইব্‌ন উবাদা (রা)-এর সম্মানকে বড় করে দেখানো। কেননা তাকে তখন বনূ কুরায়যার বন্দীদের ব্যাপারে সালিস নিযুক্ত করা হয়েছিল । অনুরূপভাবে দূরদেশ থেকে আগত মুসাফিরের অভ্যর্থনা কিংবা অন্তরঙ্গ কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দাঁড়ানোর মধ্যে কোন আপত্তি নেই। শর্ত হলো উভয় পক্ষের কোন দিকে প্রাণহীন প্রদর্শনী কিংবা অহংকার থাকবে না। যেন আগমনকারী মনে মনে এই সম্মান কামনা না করেন আর অভ্যর্থনাকারী কেবল লৌকিকতার জন্যই না দাঁড়ান।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান