আখলাকুন্নবী (ﷺ)
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
হাদীস নং: ১১৮
কিতাবের পরিচ্ছেদ সমূহ
নবী (ﷺ) -এর নম্রতা ও বিনয়
১১৮। হযরত কুদামা ইব্ন আব্দুল্লাহ্ ইব্ন আমির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে (হজ্জের মৌসুমে) খাকী বর্ণের একটি উটনীর উপর সাওয়ার হয়ে (আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। (তিনি এভাবে কংকর নিক্ষেপের জন্য গিয়েছেন যে, লোকজনকে তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য) না কোন মারপিট ছিল আর না কোন প্রকারের হাঁকডাক । অনুরূপ ‘এদিকে যাও’ ‘ওদিকে সর’ এ সব কথাও বলা হয়নি।
أبواب الكتاب
مَا ذُكِرَ مِنْ تَوَاضُعِهِ
118 - أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى الْمَرْوَزِيُّ، نَا عَاصِمُ بْنُ عَلِيٍّ، وَحَدَّثَنِي الْحَسَنُ، أَخِي، نَا أَيْمَنُ بْنُ نَابِلٍ، مِنْ أَهْلِ مَكَّةَ، قَالَ: سَمِعْتُ قُدَامَةَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ: «رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْمِي الْجَمْرَةَ عَلَى نَاقَةٍ شَهْبَاءَ، لَا ضَرَبَ، وَلَا طَرَدَ وَلَا إِلَيْكَ، إِلَيْكَ»
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ অনুচ্ছেদে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিনয় ও নম্রতা বিষয়ক হাদীসসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লিখিত প্রথম হাদীসের থেকে তাঁর পূত-পবিত্র চরিত্রে পরম বিনয় নীতির প্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে। কেননা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের পথপ্রদর্শক ও সকল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্দার হওয়ার পাশাপাশি সমকালীন প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তিও ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর চাল-চলনে সর্বোচ্চ কর্তাসুলভ আচরণে কোন ভিন্নতা দেখা যায়নি। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। উপরন্তু তাঁদের অধিকাংশই থাকেন এমন চরিত্রের যারা নাগরিক রীতি-নীতি সম্পর্কে অসচেতন ও অনভ্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একজনের শরীরে অন্যজনের শরীরের ধাক্কা লাগা, ভিড়ের চাপে কেউ নিচে পড়ে যাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মর্যাদা বা মান-সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পৃথক কোন ব্যবস্থাই নেননি। তিনি সাধারণ হাজীদের সঙ্গে মিশে হজ্জের কাজকর্ম সম্পাদন করে যান। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাস্তায় পথচারীদের না আসা-যাওয়া বন্ধ করা হয়েছিল, আর না তাঁর সম্মান প্রদর্শনার্থে পথচারীদেরকে ‘সর’ কিংবা ‘দূরে থাক’ ইত্যাদি বলা হয়েছিল। মোটকথা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের প্রাধান্য প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি।
এভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আপনার অভিমত কি ? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবূওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবূওয়াত ? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবূওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবূওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবূওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু ‘রাহ্মাতুললিল্ আলামীন’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেনঃ আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না । খৃষ্টানরা তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عبد الله ورسوله “আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল” এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেনঃ وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকানঃ ৬৩)
সারকথা মু’মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু’মিনের কাজ নয়।
এ কারণেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন । পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে : وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ "বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমানঃ ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা’আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইব্ন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে । বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই । আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।
এভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নম্রতা ও বিনয় সম্পর্কে আরো জানা যায় যে, তিনি মক্কা শরীফে যখন অসহায় ও শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন। ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন ব্যতিরেকে তাঁর অন্য কোন পথ ছিল না। তখন আল্লাহ্ পাক তাঁকে ইখতিয়ার দিয়ে বলেছিলেনঃ হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আপনার অভিমত কি ? আপনি কি বাদশাহী সংযুক্ত নবূওয়াত পেতে চান, আর না আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবূওয়াত ? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরম বিনয় প্রকাশ করে বাদশাহীর পরিবর্তে আবদিয়্যাত সংযুক্ত নবূওয়াত লাভের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং নিজের জন্য অভাব-অনটনের পথ বেছে নেন। অথচ নবূওয়াতের সঙ্গে বাদশাহীর সংযুক্ত প্রার্থনা করতে কোন বাধা ছিল না। তাঁর সম্মুখে হযরত সুলায়মান (আ)-এর উদাহরণও বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া এই বাদশাহী গ্রহণ নবূওয়াতের দায়িত্ব পালনের পথে কোন প্রতিবন্ধক বলেও বিবেচিত হতো না। কিন্তু ‘রাহ্মাতুললিল্ আলামীন’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের স্বভাবজাত চাহিদার নিরিখে বাদশাহীর উপর আবদিয়্যাতকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই একাধিক হাদীসে পাওয়া যায় যে, এর পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো হাতের উপর বা পিঠের উপর ভর করে বসে পানাহার করেননি। স্বয়ং ইরশাদও করেছেনঃ আমি একজন নগণ্য বান্দা হিসাবে বসি, একজন ক্রীতদাস যেভাবে আহার করে আমিও সেভাবে আহার করি।
নম্রতা ও বিনয়ের এ নীতির কারণে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদেম বা কাজের লোককে কোন ভুলের কারণে প্রহার করতেন না। আর কখনো বকাঝকাও দিতেন না। একটি হাদীসে এতটুকুও বলা হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, আমার প্রশংসা করতে গিয়ে তোমরা খৃস্টানদের মত বাড়াবাড়ি করো না । খৃষ্টানরা তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈসা (আ)-এর প্রশংসা করতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করে এবং শেষ পর্যন্ত তার ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে অভিহিত করে। (নাউযুবিল্লাহ্) আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। কাজেই তোমরা আমাকে কেবল عبد الله ورسوله “আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল” এতটুকু প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে।
নম্রতা ও বিনয়ের অভ্যাস আল্লাহ্ পাকের কাছেও খুবই পছন্দনীয়। পক্ষান্তরে অহংকার ও বড়ত্বের মনোভাবকে তিনি খুবই অপছন্দ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের চরিত্র আলোচনা করে ইরশাদ করেনঃ وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا -দয়াময় আল্লাহ্র খাস বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। আর অজ্ঞ লোকেরা যখন সম্বোধন করে তখন তারা তর্কে অবতীর্ণ হয় না বরং শান্তি কামনা করে। (সূরা ফুরকানঃ ৬৩)
সারকথা মু’মিন মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য হলো যে, তারা আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করে চলে। কখনো কোন অজ্ঞ কিংবা অভদ্র লোক তাদেরকে কোন কটুকথা বললে তারা ক্ষমার চোখে দেখে এবং ভদ্রনীতির প্রদর্শন করে। গর্ব করা, অহংকার করা কিংবা আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা মু’মিনের কাজ নয়।
এ কারণেই একবার হযরত লোকমান (আ) নিজ পুত্রকে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সে সব উপদেশের মধ্যে তিনি নম্রতা ও বিনয়ের নীতি অবলম্বনের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন । পবিত্র কুরআনে সে উপদেশটি নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণিত আছে : وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ "বৎস! অহংকারবশে তুমি কখনো মানুষকে অবজ্ঞা করো না। আর পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। কারণ আল্লাহ্ কোন উদ্ধত ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমানঃ ১৮)
আলিমগণ লিখেছেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট যেভাবে অহংকার করা পছন্দনীয় নয় তেমনি অহংকারীদের চাল-চলন, রীতি-নীতি ইত্যাদি অনুসরণ করাও পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি এমন হতে পারে যে, সে আন্তরিকভাবে অহংকারী নয় তবে অহংকারী লোকেরা যেভাবে চলে সে ব্যক্তি ঐভাবে চলাফেরা করে থাকে। আল্লাহ্ পাক তার এই চলাফেরাকে পছন্দ করেন না। ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এখানে আল্লাহ্ তা’আলার তরফ থেকে মানবীয় রীতি-নীতি ও শিষ্টাচারিতার বহু ক্ষুদ্র জিনিসকে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে।
একখানা হাদীসে হযরত ইয়ায ইব্ন হাম্মাদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, মহান আল্লাহ্ আমার নিকট এ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন কর। কেউ কারুর উপর কোন অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করো না। অনুরূপ কেউ কারুর উপর অহংকার কিংবা গর্ব প্রকাশ করো না (আবূ দাউদ, খ. ২, পৃষ্ঠা ৬৭১)।
অপর একখানা হাদীসে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, গরীবকে দান-খয়রাত করার কারণে সম্পদ হ্রাস পায় না। নম্রতা, বিনয় ও ক্ষমাপরায়ণতা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ্ পাক তার মান-সম্মান অনেক গুণে বৃদ্ধি করেন। (তিরমিযী শরীফ, খ. ২, পৃষ্ঠা ২৪)
বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনের ফলে মানব চরিত্রে অন্যান্য আরো বহু সদ্গুণের সৃষ্টি হয়ে থাকে । বিভিন্ন হাদীসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলিকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ এক. বিনয় অবলম্বন নিজেই একটি ইবাদত। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে বিনয় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই বিনয় অবলম্বনের ফলে ব্যক্তির জীবনে আল্লাহ্ পাকের একটি হুকুম প্রতিফলিত হয়। দুই. বিনয়ী ব্যক্তি একদিকে যেমন মহান আল্লাহ্র কাছে প্রিয় তেমনি মানুষের দৃষ্টিতেও সে পছন্দনীয় ও প্রিয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত। লোকজন মন থেকে তাকে ভালবাসে; তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে ও মেলামেশা করতে আনন্দ পান। বিনয়ী ব্যক্তির পক্ষে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সহজ হয়। কারণ লোকজন এ চরিত্রের মানুষকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কাজকর্মে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব প্রদান করতে ভালবাসে। বলা বাহুল্য, নম্রতা ও বিনয় এভাবেই মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের উচ্চমর্যাদা দান করে। তিন. বিনয়ী ও অমায়িক ব্যক্তির দুশমনের সংখ্যা খুবই কম হয়ে থাকে। কারণ মানুষ সাধারণত তার বিনয়ী চরিত্র অবলোকন করে তার শত্রুতা কিংবা বিরোধিতা করা এবং তাকে কোন প্রকার কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। চার. বিনয় অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো যে, বিনয়ের ফলে ব্যক্তি অতি সহজে চারিত্রিক গুণাবলির দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করতে সক্ষম হয়। তাই চরিত্রবান লোকদেরকে সাধারণভাবে বিনয়ী দেখা যায়। পক্ষান্তরে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ আল্লাহ্ পাকের দরবারে যেমন অপছন্দনীয় তেমনি মানুষের কাছেও চরম ঘৃণিত। সে দুনিয়াবাসীর অন্তরে কখনো স্থান পায় না। তদ্রূপ আখিরাতেও তার জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা। লোকজন তার ধনৈশ্বর্যের ভয়ে কিংবা ক্ষমতার কারণে হয়ত তার বিরুদ্ধে মুখে কিছু বলে না তবে মনে মনে তাকে অপছন্দ করে থাকে। এ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই । আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত সাক্ষী।