আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

১৭- জিহাদের বিবিধ বিধানাবলী

হাদীস নং: ৮৭১
- জিহাদের বিবিধ বিধানাবলী
মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীর বর্ণনা।
৮৭১। আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল কারী (রাহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত । তিনি (মুহাম্মাদ) বলেন, আবু মুসা আশআরী (রাযিঃ)-র পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-র কাছে এলো। তিনি তার কাছে ওখানকার লোকদের হাল-অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। সে এ সম্পর্কে তাকে অবহিত করলো। উমার (রাযিঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কাছে কি নতুন কোন খবর আছে? সে বললো, হ্যাঁ, এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়েছে। তিনি বলেন, তোমরা তার সাথে কি ব্যবহার করেছো? সে বললো, আমরা তাকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করেছি। তিনি বলেন, কেন তোমরা তাকে তিন দিন একটি ঘরে বন্দী করে রাখলে না, প্রতিদিন তাকে আহার করাতে, তাকে তওবা করতে বলতে, হয়তো সে তওবা করতো এবং পুনরায় আল্লাহ্র নির্দেশের দিকে ফিরে আসতো? (অতঃপর তিনি বলেন), হে আল্লাহ! আমি (তাদের) এই নির্দেশ দেইনি, আমি উপস্থিতও ছিলাম না এবং আমার নিকট খবর পৌঁছলে তাতে আনন্দিতও হইনি।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান ইচ্ছা করলে তিন দিন পর্যন্ত বন্দী করে রাখতে পারেন, যদি তার তওবা করার কোন সম্ভাবনা থাকে অথবা মুরতাদ নিজে তার কাছে এজন্য আবেদন করে। যদি তার তওবা করার কোন আশা না থাকে এবং সেও কোন আবেদন না করে, এ অবস্থায় তাকে (অবকাশ না দিয়ে) হত্যা করলে কোন দোষ নেই।**
أبواب السير
بَابُ: الْمُرْتَدِّ
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدٍ الْقَارِيُّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَدِمَ رَجُلٌ عَلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مِنْ قِبَلِ أَبِي مُوسَى، فَسَأَلَهُ عَنِ النَّاسِ، فَأَخْبَرَهُ، ثُمّ قَالَ: هَلْ عِنْدَكُمْ مِنْ مُغْرِبَةٍ خَبَرٌ؟ قَالَ: نَعَمْ، رَجُلٌ كَفَرَ بَعْدَ إِسْلامِهِ، فَقَالَ: مَاذَا فَعَلْتُمْ بِهِ؟ قَالَ: قَرَّبْنَاهُ، فَضَرَبْنَا عُنُقَهُ، قَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: فَهَلا طَبَقْتُمْ عَلَيْهِ بَيْتًا، ثَلاثًا، وَأَطْعَمْتُمُوهُ كُلَّ يَوْمٍ رَغِيفًا، فَاسْتَتَبْتُمُوهُ، لَعَلَّهُ يَتُوبُ، وَيَرْجِعُ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ إِنِّي لَمْ آمُرْ، وَلَمْ أَحْضُرْ، وَلَمْ أَرْضَ إِذْ بَلَغَنِي ".
قَالَ مُحَمَّدٌ: إِنْ شَاءَ الإِمَامُ أَخَّرَ الْمُرْتَدَّ ثَلاثًا إِنْ طَمِعَ فِي تَوْبَتِهِ أَوْ سَأَلَهُ عَنْ ذَلِكَ الْمُرْتَدُّ، وَإِنْ لَمْ يَطْمَعْ فِي ذَلِكَ وَلَمْ يَسْأَلْهُ الْمُرْتَدُّ، فَقَتَلَهُ، فَلا بَأْسَ بِذَلِكَ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** মুরতাদ (المرتد)ঃ যে ব্যক্তি দীন ইসলাম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করে কাফের অথবা নাস্তিক হয়ে যায় তাকে ইসলামী আইনের পরিভাষায় মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলে । কুরআন মজীদে মুরতাদ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَٰئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ وَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

“তোমাদের মধ্যে যে কেউ তার দীন থেকে ফিরে যাবে এবং কুফরীর মধ্যে প্রাণত্যাগ করবে, দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই তার যাবতীয় কাজ নিষ্ফল হয়ে যাবে। এ ধরনের সব লোকই জাহান্নামী হবে এবং চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে" (সূরা বাকারাঃ ২১৬)।

إِنَّ ٱلَّذِينَ ٱرْتَدُّواْ عَلَىٰٓ أَدْبَٰرِهِم مِّنۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ ٱلْهُدَى ۙ ٱلشَّيْطَٰنُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَىٰ لَهُمْ

“হেদায়াতের পথ সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হওয়ার পর যারা তা থেকে ফিরে গেছে, তাদের জন্য শয়তান এই আচরণকে সহজ বানিয়ে দিয়েছে এবং মিথ্যা আশা-আকাংখার মোহ তাদের জন্য দীর্ঘ করে রেখেছে" (সূরা মুহাম্মাদঃ ২৫)।
যে ব্যক্তি মুসলমান হওয়ার পর পুনরায় কুফরীর দিকে ফিরে যায়, ইসলামী আইনে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাতের বিশেষজ্ঞ আলেমদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত আছে। মুরতাদের শাস্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। তিনি বলেনঃ
من بدل دينه فاقتلوه

“যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করে তাকে হত্যা করো” (বুখারীঃ কিতাবুল জিহাদ, ইতিসাম, ইসতাতাবা; আবু দাউদঃ কিতাবুল হুদূদ; তিরমিযীঃ হুদূদ; নাসাঈঃ তাহরীম; ইবনে মাজাঃ হুদূদ; মুওয়াত্তা ইমাম মালেকঃ কিতাবুল আকদিয়া; মুসনাদে আহমাদঃ ১ম ও ৫ম খণ্ড)। হাদীসটি হযরত আবু বাকর সিদ্দীক, উছমান, আলী, মুআয ইবনে জাবাল, আবু মূসা আশআরী, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, খালিদ ইবনে ওলীদ, যায়েদ ইবনে আসলাম (রা) এবং আরো অনেক সাহাবীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসের প্রায় সবগুলো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে এ হাদীস বিদ্যমান রয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, তিনটি কারণের কোন একটি ছাড়া তার রক্তপাত করা (হত্যা করা) হালাল নয়। কারণ তিনটি হচ্ছেঃ অবৈধভাবে কাউকে হত্যা করলে, বিবাহিত অবস্থায় যেনা করলে এবং নিজের দীন ও জামাআত থেকে পৃথক হয়ে গেলে (তার উপর হত্যার দণ্ড কার্যকর হবে)” (বুখারীঃ কিতাবুদ দিয়াত, মুসলিমঃ কিতাবুল কাসামা ওয়াল মুহারিবীন ওয়াল কিসাস ওয়াদ দিয়াত; আবু দাউদঃ কিতাবুল হুদূদ)।
হযরত আয়েশা (রা) এবং হযরত উছমান (রা)-র সূত্রে নাসাঈ গ্রন্থে (বাবঃ যিকরি মা ইয়াহিল্লু বিহি দামাল-মুসলিম) অনুরূপ বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস উল্লেখ আছে। হযরত উছমান (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে বলতে শুনেছিঃ “তিনটি অপরাধের কোন একটিতে লিপ্ত না হলে কোন মুসলমানকে হত্যা করা হালাল নয়। বিবাহিত লোক যেনা করলে তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে, কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে তাকে কিসাস স্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে এবং কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর তা পরিত্যাগ করলে তাকে হত্যা করবে” (নাসাঈঃ বাবুল হুকমি ফিল মুরতাদ)।
আবু মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ তাকে ইয়ামনের গভর্ণর নিযুক্ত করে পাঠান, অতঃপর মুআয ইবনে জাবাল (রা)-কে সহকারী হিসাবে পাঠান। তিনি সেখানে পৌছে বলেন, হে জনগণ! আমি আল্লাহর রাসূলের দূত হিসাবে তোমাদের কাছে এসেছি। আবু মূসা (রা) তাকে হেলান দিয়ে বসার জন্য একটি বালিশ দিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হলো। সে পূর্বে ইহূদী ছিলো, অতঃপর মুসলমান হয়, অতঃপর ইহুদী ধর্মে ফিরে যায়। মুআয (রা) বলেন, এই ব্যক্তিকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি বসবো না। তার সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এই নির্দেশ রয়েছে। তিনি কথাগুলো তিনবার বলেন। অবশেষে তাকে হত্যা করা হলে তিনি আসন গ্রহণ করেন" (নাসাঈঃ বাব হুকমিল মুরতাদ; বুখারীঃ বাব হুকমিল মুরতাদ; আবু দাউদঃ কিতাবুল হুদূদ) ।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। উহুদ যুদ্ধের দিন (মুসলমানদের পরাজয় হলে) একটি স্ত্রীলোক মুরতাদ হয়ে যায়। তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিলেনঃ “তাকে তওবা করাতে হবে। যদি সে তাতে সম্মত না হয় তবে তাকে হত্যা করবে” (বায়হাকী)।
হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। “উম্মে রুমান (অথবা উম্মু মারওয়ান) নাম্নী একটি স্ত্রীলোক মুরতাদ হয়ে যায়। নবী ﷺ তার সামনে ইসলাম পেশ করার নির্দেশ দিলেন। যদি সে তওবা করে তো ভালো, অন্যথায় তাকে হত্যা করবে" (বায়হাকী, দারু কুতনী)। বায়হাকীর অপর বর্ণনায় আছে, “সে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। অতএব তাকে হত্যা করা হলো।"
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনে আবু সাররাহ এক সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সচিব ছিলো। অতঃপর শয়তান তার পদস্খলন ঘটায় এবং সে (মক্কার) কাফেরদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। কিন্তু পরে হযরত উসমান (রা) তার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে তার আবেদন মঞ্জুর করেন” (আবু দাউদঃ কিতাবুল হুদূদ)। এই একই হাদীস কিছু শাব্দিক পার্থক্য সহকারে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা)-র সূত্রে আবু দাউদের একই অনুচ্ছেদে উল্লেখিত আছে।

মুরতাদের বিরুদ্ধে খোলাফায়ে রাশেদার কর্মনীতি
হযরত আবু বাকর সিদ্দীক (রা)-র খিলাফতকালে উম্মে কারফা নাম্নী একটি মেয়েলোক মুরতাদ হয়ে যায় । তিনি তাকে তওবা করার নির্দেশ দেন (দারু কুতনী, বায়হাকী)।
মিসরের গভর্ণর আমর ইবনুল আস (রা) খলীফা উমার (রা)-কে লিখে পাঠান যে, এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর পুনরায় কাফের হয়ে গেছে। সে আবার ইসলাম গ্রহণ করার পর কাফের হয়ে গেছে। সে কয়েকবার এরূপ করেছে। এখন তার ইসলামকে গ্রহণ করা হবে কি না? তিনি জবাবে লিখে জানালেন, আল্লাহ যতোক্ষণ তাকে ইসলাম কবুল করান, তোমরাও ততোক্ষণ তার ইসলাম গ্রহণ করতে থাকো। তার সামনে ইসলামকে তুলে ধরো। তা মেনে নিলে তাকে ছেড়ে দাও, অন্যথায় হত্যা করো (কানযুল উম্মাল)।
কুফায় মুসায়লামা কাযযাবের দাবি প্রচার করার অপরাধে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলো। হযরত উসমান (রা)-কে এ সম্পর্কে লেখা হলে তিনি জবাব দেন যে, তাদের সামনে দীনে হক এবং কলেমা শাহাদাত পেশ করা হোক। যে ব্যক্তি তা কবুল করবে এবং মুসায়লামাকে পরিত্যাগ করবে তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর যে ব্যক্তি মুসায়লামার দাবির উপর অবিচল থাকবে তাকে হত্যা করবে (তাহাবীঃ কিতাবুস সিয়ার)।
হযরত আলী (রা)-র সামনে এক ব্যক্তিকে হাযির করা হলো। সে পূর্বে খৃস্টান ছিলো, পরে ইসলাম গ্রহণ করে, অতঃপর মুরতাদ হয়ে যায় (পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়)। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার এরূপ করার কারণ কি? সে জবাবে বললো, আমি তোমাদের ধর্মের তুলনায় খৃস্টান ধর্ম উত্তম পেয়েছি। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ঈসা (আ) সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? সে বললো, তিনি আমার রব অথবা বললো, তিনি আলীর রব। অতঃপর তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন (তাহাবীঃ কিতাবুস সিয়ার)।
এ ধরনের আরো বহু দৃষ্টান্ত হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ফাতহুল বারী (খণ্ড ১২, পৃ. ২৩৮, ২৩৯) এবং কানযুল উম্মাল (খণ্ড ১, পৃ. ৮) গ্রন্থদ্বয়ে এ ধরনের আরো দৃষ্টান্ত বিদ্যমান রয়েছে। আরবের বিভিন্ন গোত্রের মুরতাদদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বা (রা) ১১টি সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। তার প্রতিটি বাহিনীর অধিনায়কের হাতে তিনি ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কে যে নির্দেশমালা দিয়েছিলেন, তা হাফেয ইবনে কাছীরের আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে (খণ্ড ৬, পৃ. ৩১৬) হুবহু উল্লেখ আছে।

ফিকহের ইমাম ও মুজতাহিদগণের ঐক্যমত
মুরতাদের শাস্তি যে মৃত্যুদণ্ড এ ব্যাপারে ফিরে চার ইমামও একমত। শুধু তাই নয়, গত চৌদ্দ শত বছর ধরে গোটা উম্মাতের মুজতাহিদ ইমামগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করে আসছেন। ইমাম মালেক (র)-এর মাযহাব তার মুওয়াত্তা গ্রন্থে এভাবে লেখা আছেঃ
যায়েদ ইবনে আসলাম (রা)-র সূত্র পরস্পরায় ইমাম মালেক (র) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
من غير دينه فاضربوا عنقه

“যে ব্যক্তি নিজের দীন পরিবর্তন করে (ইসলাম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করে) তার ঘাড় উড়িয়ে দাও।"
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম মালেক (র) লিখেছেন, “আমরা যতোদূর অনুধাবন করতে পেরেছি, তাতে নবী ﷺ -এর এ হাদীসের অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারী হয়ে যায়, কিন্তু তা গোপন রেখে ইসলামের কথা প্রকাশ করে, তার এ অপরাধ প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পর তাকে হত্যা করতে হবে এবং তওবা করার আহ্বান জানানোর প্রয়োজন নেই। কেননা এ ধরনের লোকের তওবার উপর নির্ভর করা যায় না। আর যে ব্যক্তি প্রকাশ্যভাবে দীন ইসলাম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্মের অনুসারী হয়ে যায়, তাকে প্রথমে তওবা করে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে হবে। সে যদি তওবা করে তো ভালো, অন্যথায় তাকে হত্যা করতে হবে” (কিতাবুল আকদিয়া, বাবুল কাদা ফী মান ইরতাদ্দা আনিল ইসলাম)।
হাম্বলী মাযহাবের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফিক্হের গ্রন্থ আল-মুগনী (المغنى)-তে লেখা আছেঃ “ইমাম আহমাদের মত এই যে, যদি কোন প্রাপ্তবয়স্ক নারী অথবা পুরুষ সজ্ঞানে ইসলাম গ্রহণ করার পর তা পরিত্যাগ করে, তবে তাকে তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসার জন্য তিন দিনের অবকাশ দিতে হবে। অতঃপর সে যদি তওবা না করে তবে তাকে হত্যা করতে হবে। হাসান বসরী, যুহরী, ইবরাহীম নাখঈ, মাকতূল, হাম্মাদ, মালেক, লাইছ, আওযাঈ, শাফিঈ এবং ইসহাক ইবনে রাহ্ওয়ায়-এরও এই মত" (১০ খ., পৃ. ৭৪)।
হানাফী মাযহাবের ফিকহ গ্রন্থ হিদায়ায় (الهداية) শাফিঈ মাযহাবের মত এভাবে তুলে ধরা হয়েছেঃ “ইমাম শাফিঈ থেকে বর্ণিত আছে যে, ইমাম (বা তার বিচার বিভাগ) মুরতাদকে তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসার জন্য তিন দিনের অবকাশ দিবেন। গ্রেপ্তার করার সাথে সাথেই তাকে হত্যা করা জায়েয নয়। কেননা কোন মুসলমান সন্দেহ-সংশয়ের শিকার হয়েও মুরতাদ হতে পারে। অতএব তাকে চিন্তা-ভাবনা করার কিছু সময়-সুযোগ অবশ্যই দেয়া উচিৎ। আর এজন্য আমরা তিন দিনের অবকাশই যথেষ্ট মনে করি” (বাবঃ আহকামিল মুরতাদ্দীন)।
এ সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের রায় ইমাম তাহাবী তার শারহু মাআনিল আছার (شرح معانى الاثار) গ্রন্থে এভাবে তুলে ধরেছেনঃ “ইসলাম ধর্ম থেকে ফিরে যাওয়া (মুরতাদ) ব্যক্তি সম্পর্কে উম্মাতের ফিকহবিদদের মধ্যে কেবল এ বিষয় মতভেদ আছে যে, তাকে তওবা করার সুযোগ দেয়া হবে কি না। একদল ফিকহবিদ বলেন, ইমাম যদি তাকে তওবা করে ফিরে আসতে বলেন, তবে এটা খুবই ভালো। অতঃপর সে যদি তওবা করে তবে তাকে ছেড়ে দিতে হবে, অন্যথায় হত্যা করতে হবে। ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবনে হাসান (র) উপরোক্ত মত ব্যক্তকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অপর দল বলেন, তাকে তওবা করে ফিরে আসার আহ্বান জানানোর প্রয়োজন নেই। তাদের মতে মুরতাদ এবং শত্রু রাষ্ট্রের কাফের দুশমনদের অবস্থা একই। শত্রু রাষ্ট্রের যেসব কাফের পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। অবশ্য যাদের পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কার্যক্রম শুরু করার পূর্বে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতে হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি দীন ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত মুরতাদ হয়েছে তাকে ইসলামের সঠিক ধারণা দেয়ার মাধ্যমে পুনরায় দীনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি বুঝেশুনেই মুরতাদ হয়েছে তাকে তওবা করার আহ্বান না জানিয়েই হত্যা করতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফের একটি কথাও এ মতের সমর্থক। তিনি 'কিতাবুল ইমলায়' লিখেছেন, আমি মুরতাদকে হত্যা করবো এবং তার কাছে তওবার দাবি করবো না। হ্যাঁ, যদি সে নিজেই অবিলম্বে তওবা করে, তবে আমি তাকে ছেড়ে দিবো এবং তার ব্যাপার আল্লাহর হাতে ন্যস্ত করবো"
کتاب الاسير بحث استابة المرتد

হিদায়া গ্রন্থে মুরতাদ সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি ইসলাম থেকে ফিরে গেলে (العياذ بالله) তার সামনে ইসলামকে পেশ করতে হবে। এ ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ থাকলে তা দূরীভূত করার চেষ্টা করবে। কেননা তার কোন সংশয়ে পতিত হওয়াটা খুবই সম্ভব এবং আমাদের উচিৎ তার এই সংশয় দূর করে দেয়া। তাহলে তার একটি খারাপ পরিণতি (হত্যা) একটি শুভ পরিণতির (পুনর্বার ইসলাম গ্রহণ) দ্বারা দূর হতে পারে। কিন্তু প্রবীণ ফিক্হবিদদের মতে তার সামনে ইসলাম পেশ করা বাধ্যতামূলক নয়। কারণ সে ইসলামের দাওয়াত পূর্বেই পেয়ে গেছে” (বাবঃ আহকামিল মুরতাদ্দীন)।
ইমাম আবু হানীফার মতে, স্ত্রীলোক মুরতাদ হলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে হবে।
এরপর আর কারো সন্দেহ-সংশয় অবশিষ্ট থাকার কথা নয় যে, ইসলামী আইনে মুরতাদের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবদ্দশায় এবং চার খলীফার শাসনামলে সুস্পষ্টভাবে এই আইন কার্যকর করা হয়েছে, যার দৃষ্টান্ত আমরা ইতিপূর্বে তুলে ধরেছি। আর এই দীর্ঘ কালেও মুসলিম উম্মাতের ফিকহবিদদের মধ্যে মুরতাদের শাস্তি সম্পর্কে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত রয়েছে (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান