আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

৬- হজ্ব - উমরার অধ্যায়

হাদীস নং: ৫৩০
- হজ্ব - উমরার অধ্যায়
প্রাপ্তবয়স্কা বিবাহিতা নারী নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের তুলনায় অধিক কর্তৃত্বশীল।
৫৩০। খিযাম-কন্যা খানসা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে বিবাহ দিলেন, অথচ তিনি ছিলেন সাইয়্যেবা। তিনি এ বিবাহ অপছন্দ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে এলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার পিতার দেয়া বিবাহ রদ করে দিলেন (বুখারী, ইবনে মাজা)।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, সাইয়্যেবা এবং প্রাপ্তবয়স্কা বাকেরাকে তার অনুমতি না নিয়ে বিবাহ দেয়া উচিৎ নয়। বাকেরার নীরবতাই তার সম্মতি বলে গণ্য হবে এবং সাইয়্যেবার ক্ষেত্রে তার মৌখিক সম্মতি নিতে হবে, তাকে তার পিতা অথবা অন্য কেউ বিরাহ দিক না কেন । ইমাম আবু হানীফা (রাহঃ) এবং আমাদের সকল ফিকহবিদের এই মত।**
كتاب الحج
بَابٌ: الثَّيِّبُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ الْقَاسِمِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، وَمُجَمِّعٍ ابْنَيْ يَزِيدَ بْنِ جَارِيَةَ الأَنْصَارِيِّ، عَنْ خَنْسَاءَ ابْنَةِ خِذَامٍ، أَنَّ «أَبَاهَا زَوَّجَهَا وَهِيَ ثَيِّبٌ، فَكَرِهَتْ ذَلِكَ، فَجَاءَتْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَدَّ نِكَاحَهُ» ، قَالَ مُحَمَّدٌ: لا يَنْبَغِي أَنْ تُنْكَحَ الثَّيِّبُ، وَلا الْبِكْرُ إِذَا بَلَغَتْ إِلا بِإِذْنِهِمَا فَأَمَّا إِذْنُ الْبِكْرِ فَصَمْتُهَا، وَأَمَّا إِذْنُ الثَّيِّبِ فَرِضَاهَا بِلِسَانِهَا، زَوَّجَهَا وَالِدُهَا أَوْ غَيْرُهُ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ وَالْعَامَّةِ مِنْ فُقَهَائِنَا

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** বাকেরা (بكرة) শব্দের অর্থ প্রাপ্তবয়স্কা অবিবাহিতা কন্যা। সাইয়েব্যা (ثيبة) ও আইয়্যেম (الايم) অর্থ প্রাপ্তবয়স্কা বিবাহিতা নারী কিন্তু বিধবা; তা তালাকের কারণেও হতে পারে বা স্বামী মারা যাওয়ার কারণেও হতে পারে। শেষোক্ত শব্দটি স্ত্রীহীন পুরুষকেও বুঝায়।
প্রাপ্তবয়স্কা নারী অভিভাবক ছাড়াই বিবাহ বসতে পারে কিনা এ সম্পর্কে ইমামদের মধ্যে মতভেদ আছে । ইমাম শাফিঈ, মালেক ও আহমাদের মতে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া শুধু পাত্রীর অনুমতি ও বাক্য দ্বারা বিবাহ সিদ্ধ হয় না। কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে প্রাপ্তবয়স্কা নারী অভিভাবক ছাড়াই বিবাহ বসতে পারে। এ সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য সম্বলিত হাদীসের ভিত্তিতেই এই মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ
“তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং তাদের স্ত্রীগণ যদি জীবিত থাকে, তবে তারা নিজেদের চার মাস দশ দিন (পুনর্বিবাহ থেকে) বিরত রাখবে। যখন তাদের ইদ্দত পূর্ণ হবে, তখন তারা নিজেদের সম্পর্কে সঠিক পথে যা করতে চাইবে, তা করার অধিকার থাকবে। তোমাদের উপর তাদের কোন দায়িত্ব অর্পিত হবে না। আল্লাহ তোমাদের প্রত্যেকের কাজ সম্পর্কে আবহিত” (সূরা বাকারাঃ ২৩৪)।
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ “আয়্যিম তার নিজের বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নিজের অভিভাবকের চেয়ে অধিক হকদার। বাকেরাকে বিয়ে দিতে হলে তার অনুমতি নিতে হবে। তার নীরবতাই তার সম্মতি বলে বিবেচিত হবে।" অপর বর্ণনায় আছে, “সায়্যিবা তার নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে অধিক কর্তৃত্ব সম্পন্ন” (মুসলিম)।
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান (রা) বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর নিকট এসে বললো, আমার পিতা এমন এক ব্যক্তির সাথে আমার বিবাহ দিয়েছেন, যাকে আমি পছন্দ করি না। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার পিতাকে বলেনঃ তাকে বিবাহ দেওয়ার অধিকার তোমার নেই।” তিনি মেয়েলোকটিকে বলেনঃ “যাও! তুমি যাকে পছন্দ করো তাকে বিবাহ করো” (নাসাবুর রায়াহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৮২)।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “সায়্যেবার উপর অভিভাবকের কোন কর্তৃত্ব নেই” (আবু দাউদ, নাসাঈ)।
আয়েশা (রা) বলেন, এক যুবতী মেয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ করে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা আমাকে তার ভাইয়ের ছেলের সাথে এই উদ্দেশ্যে বিবাহ দিয়েছেন যে, তিনি আমার সাহায্যে তাকে দুর্দশা থেকে উদ্ধার করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিবাহ ঠিক রাখা বা না রাখার এখতিয়ার তাকে দান করলেন। অতঃপর যুবতী বললো, আমার পিতা যা কিছু করেছেন, আমি তা ঠিক রাখলাম। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, 'মেয়েরা জেনে নিক যে, তাদের উপর তাদের পিতাদের কোন কর্তৃত্ব নেই' (নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ)।
উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসসমূহের ভিত্তিতে হানাফী মাযহাবের বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্কা মেয়েরা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই নিজের পছন্দসই পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। অপরদিকে নিম্নোক্ত হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোন নারীর জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা জায়েয নয়ঃ
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “যে নারী নিজ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করলো, তার বিবাহ বাতিল গণ্য হবে, তার বিবাহ বাতিল গণ্য হবে, তার বিবাহ বাতিল গণ্য হবে। কিন্তু স্বামী যদি তার সাথে সহবাস করে, তবে এই সহবাসের কারণে সে মুহরের অধিকারী হবে। অভিভাবকগণ যদি বিবাদে লিপ্ত হয়, তবে যার অভিভাবক নেই, দেশের সরকার হবে তার অভিভাবক” (তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, মুসনাদে আহমাদ, দারিমী)।
আবু মূসা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেনঃ “অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হতে পারে না” (তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, মুসনাদে আহমাদ, দারিমী)।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “কোন স্ত্রীলোক অপর স্ত্রীলোককে বিবাহ দিতে পারে না এবং সে নিজকেও বিবাহ দিতে পারে না। যে নারী নিজেই নিজকে বিবাহ দেয় সে যেনাকারিণী” (ইবনে মাজা, বায়হাকীর সুনানুল কুবরা)।
হযরত উমার (রা) বলেন, “অভিভাবক অথবা সরকারী কর্মকর্তা যে নারীর বিবাহ দেয়নি, তার বিবাহ বাতিল” (বায়হাকীর সুনানুল কুবরা)।
ইকরিমা ইবনে খালিদ (র) থেকে বর্ণিত। এক বিধবা মহিলা তার পুনর্বিবাহের ব্যাপারটি এমন এক ব্যক্তির উপর অর্পণ করে, যে তার বৈধ অভিভাবক ছিলো না। সে তাকে বিবাহ দিলো। তা হযরত উমার (রা)-র কানে গেলে তিনি উভয়কে শাস্তি দেন এবং বিবাহ বাতিল ঘোষণা করেন (সুনানুল কুবরা)।
হযরত আলী (রা) বলেন, যে স্ত্রীলোক অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করলো, তার বিবাহ বাতিল । অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ জায়েয নয় (সুনানুল কুবরা)।
শাবী (র) থেকে বর্ণিত। হযরত উমার (রা), আলী (রা), শুরাইহ এবং মাসরূক (র) বলেন, অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হতে পারে না (সুনানুল কুবরা)।
উল্লেখিত হাদীসসমূহের ভিত্তিতে ইমাম শাফিয়ী, আহমদ ইবনে হাম্বল ও যাহেরী (আহলে হাদীস) মাযহাবের বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, কোন মহিলা তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করলে তা বাতিল গণ্য হবে।
উল্লেখিত দলীল-প্রমাণের দিকে লক্ষ্য করলে প্রতিভাত হয় যে, উভয় মতের সমর্থনেই শক্তিশালী যুক্তি-প্রমাণ রয়েছে। এক পক্ষের সিদ্ধান্ত ভুল, তা বলার কোন সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে আইন প্রণেতা কি বাস্তবে পরস্পর বিরোধী নির্দেশ দিয়েছেন? অথবা তিনি কি এক হুকুমের দ্বারা অপর হুকুম রহিত করেছেন? অথবা দু'টি হুকুমকে পাশাপাশি বহাল রেখে আইন প্রণেতার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব?
প্রথম সন্দেহ সুস্পষ্টভাবেই বাতিল। কেননা শরীআতের সার্বিক ব্যবস্থা শরীআত প্রণেতার পরিপূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর কাছ থেকে পরস্পর বিরোধী হুকুম পাওয়া সম্ভব নয় । দ্বিতীয় সন্দেহও বাতিল। কেননা এক হুকুম দ্বারা অন্য হুকুম রহিত করার কোন প্রমাণ নেই। এখন তৃতীয় অবস্থাটি বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে। উভয় মতের দলীলসমূহ একত্রে সামনে রেখে চিন্তা করলে আইন প্রণেতার যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য (منشاء) অনুধাবন করা যায় তা হলোঃ
(ক) বিবাহ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দুই পক্ষ হলো নারী (পাত্রী) এবং পুরুষ (পাত্র), তাদের উভয়ের অভিভাবক নয়। এরই ভিত্তিতে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে ঈজাব-কবুল (Proposal & acceptance) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
(খ) প্রাপ্তবয়স্কা মহিলাকে (বিধবা হোক অথবা কুমারী) তার অনুমতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত এবং তার মর্জির বিরুদ্ধে বিবাহ দেয়া যেতে পারে না, তা পাত্রীর পিতাই হোক না কেন। যে বিবাহে পাত্রী রাজী নয়, সেখানে ঈজাবই (Proposal) তো অনুপস্থিত। বিবাহ কেমন করে বিধিবদ্ধ হতে পারে?
(গ) কিন্তু আইন প্রণেতা এটাও জায়েয রাখেন না যে, কোন মহিলা তার বিবাহের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে যাবে এবং যে ধরনের পুরুষকেই সে পছন্দ করবে, নিজের অভিভাবকের তোয়াক্কা না করে তাকে জামাতার মর্যাদা দিয়ে নিজের বংশে অনুপ্রবেশ করাবে। এজন্য আইন প্রণেতা কোন নারীর বিবাহের ব্যাপারে তার নিজের সম্মতির সাথে সাথে অভিভাবকের সম্মতিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। কোন নারীর জন্য এটা মোটেই সমীচীন নয় যে, সে অভিভাবকের অনুমতি না নিয়ে যেখানে ইচ্ছা নিজকে বিবাহ দিবে। অভিভাবকের জন্যও এটা জায়েয হবে না যে, সে পাত্রীর সম্মতি ব্যতীত যেখানে ইচ্ছা তাকে বিবাহ দিবে।
(ঘ) যদি কোন অভিভাবক নিজের ইচ্ছামত তার অধীনস্ত কোন মহিলাকে বিবাহ দেয়, তবে তা স্ত্রীলোকটির ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে। যদি সে তা গ্রহণ করে নেয়, তবে তো কোন কথাই নেই। আর যদি সে বিবাহ মেনে না নেয়, তবে ব্যাপারটি আদালতে সোপর্দ হবে। সঠিক অনুসন্ধানের পর আদালত যে রায় দিবে তাই কার্যকর হবে।
অপরদিকে যদি কোন মহিলা তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নিজের বিবাহ নিজেই করে নেয়, তাহলে এ ব্যাপারটি অভিভাবকের সম্মতির উপর নির্ভর করবে। সে এ বিবাহ সহজভাবে মেনে নিলে কোন কথা নেই। অন্যথায় তা আদালত পর্যন্ত যাবে। আদালত অনুসন্ধান করে দেখবে, অভিভাবকের আপত্তি ও অসম্মতির ভিত্তি কি? যদি প্রকৃতই যুক্তিযুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য কারণে সে কোন ব্যক্তিকে তার কন্যার স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজী না হয়, তবে আদালত এ বিবাহ ভেঙ্গে দিতে পারে। আর যদি প্রমাণিত হয় যে, সে অকারণে এরূপ করছে অথবা কোন অবৈধ উদ্দেশ্য তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, ফলে স্ত্রীলোকটি অস্থির হয়ে নিজের বিবাহ নিজেই করে নিয়েছে, তাহলে আদালত এ বিবাহ বহাল রাখবে (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)