আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ
৪- যাকাতের অধ্যায়
হাদীস নং: ৩৪৪
- যাকাতের অধ্যায়
রোযার ফিতরা সম্পর্কে।
৩৪৪ । নাফে (রাহঃ) বলেন, ইবনে উমার (রাযিঃ) ঈদের দুই-তিন দিন আগেই রোযার ফিতরা যার কাছে স্তূপীকৃত হয় তার নিকট পাঠিয়ে দিতেন।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরাও এই মত গ্রহণ করেছি। ঈদের মাঠে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করা অতি উত্তম কাজ। ইমাম আবু হানীফারও এই মত।**
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরাও এই মত গ্রহণ করেছি। ঈদের মাঠে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করা অতি উত্তম কাজ। ইমাম আবু হানীফারও এই মত।**
كتاب الزكاة
بَابُ: زَكَاةِ الْفِطْرِ
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، حَدَّثَنَا نَافِعٌ، أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يَبْعَثُ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ إِلَى الَّذِي تُجْمَعُ عِنْدَهُ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمَيْنِ، أَوْ ثَلاثَةٍ "،قَالَ مُحَمَّدٌ رَحِمَهُ اللَّهُ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، يُعْجِبُنَا تَعْجِيلُ زَكَاةِ الْفِطْرِ قَبْلَ أَنْ يَخْرُجَ الرَّجُلُ إِلَى الْمُصَلَّى، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ
হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):
** মুসলমানগণ চরম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে রমযান মাসের রোযা রেখে আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার চেষ্টা করে। দীর্ঘ একমাস ধরে তারা রোযা রাখতে পেরেছে, আল্লাহ তাদেরকে যে রোযা রাখার যোগ্যতা দান করেছেন তার শুকরিয়া স্বরূপ তারা রোযার শেষে ঈদের দিন বিশেষভাবে দান-খয়রাত করে থাকে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলও এদিন দান-খয়রাত বাধ্যতামূলক করেছেন। পরিভাষাগতভাবে একে বলা হয় সদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা। হাদীস শরীফে ফিতরার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার বক্তব্য রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, "রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরা অবশ্যই আদায়যোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন রোযাদারকে অযথা, অবাঞ্ছনীয় ও অশ্লীল কথাবার্তা ও কাজকর্মের মলিনতা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং গরীব-মিসকীনদের (অস্তুত ঈদের দিন) খাদ্যের সংস্থান করার জন্য তিনি ফিতরার প্রবর্তন করেছেন” (আবু দাউদ, তিরমিযী)।
ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার সময়
ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মতে ঈদের ফজর (ভোর) শুরু হওয়ার সাথে সাথে ফিতরা ওয়াজিব হয়, তার পূর্বে নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র)-র মতে শেষ রোযার দিনের সূর্য ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে ওয়াজিব হয়। ইমাম মালেক (র) ও শাফিঈ (র)-এর দু'টি মত রয়েছে যা উপরোল্লিখিত দু'টি মতের সমর্থন করে। ইমাম মালেক ও আমাদের মতে ঈদের একদিন অথবা দু'দিন পূর্বে ফিতরা আদায় করা যেতে পারে। ইমাম শাফিঈর মতে রমযান মাসের প্রথম দিক থেকেই ফিতরা দেয়া জায়েয। ইমাম আবু হানীফার মতে তা রমযানের পূর্বেও পরিশোধ করা জায়েয এবং পরেও আদায় করা জায়েয। কিন্তু যে ব্যক্তি ফিতরা পরিশোধ করে না, তা তার উপর ঋণ হিসাবে থেকে যায়। এ ব্যাপারে ফিকহবিদগণ একমত ।
ফিতরা কার উপর ওয়াজিব
ইমাম নববী (র) বলেন, জমহূর উলামায়ে সালাফের মতে ফিতরা আদায় করা ফরয, ইমাম আবু হানীফার মতে ওয়াজিব এবং ইমাম মালেক, শাফিঈ ও দাউদ যাহেরীর মতে সুন্নাত। ইমামদের ঐক্যমত অনুযায়ী স্বাধীন মুসলমানদের উপর ফিতরা আদায় করা বাধ্যতামূলক। মালেক, শাফিঈ ও আহমাদের মতে যে ব্যক্তির কাছে ঈদের দিন ও রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ আছে তাকেই ফিতরা আদায় করতে হবে। আবু হানীফার মতে ঈদের দিন সকালে কোন ব্যক্তির কাছে 'মালেকে নিসাব' বা যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তার উপর ফিতরা ওয়াজিব। পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে তার নিজের, তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে। কিন্তু আবু হানীফার মতে স্ত্রীর ফিতরা আদায় করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অনুরূপভাবে সন্তানদের ফিতরা আদায় করাও মায়ের উপর বাধ্যতামূলক নয়। বাড়িতে স্থায়ী কাজের লোকদের পক্ষ থেকে নিয়োগকর্তাকে ফিতরা আদায় করতে হবে কিনা সে বিষয়ে মতভেদ আছে। একদল ফিকহবিদের মতে তাকে তাদের ফিতরা আদায় করতে হবে এবং অপর দলের মতে তা তার উপর বাধ্যতামূলক নয়।
ফিতরা বণ্টনের খাত
ফিতরা পাওয়ার প্রথম হকদার হচ্ছে একান্ত নিকটাত্মীয় গরীবগণ, অতঃপর দূরাত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী, মিসকীন, নও মুসলিম, ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি এবং সাময়িক আর্থিক সংকটে পতিত ব্যক্তিগণ। হকদার ব্যক্তি যদি দূরে থাকে তবে তার অংশ পৃথক করে রেখে দেয়া জায়েয। সাময়িকভাবে কোথাও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সেখানেও ফিতরা বণ্টন করা যেতে পারে। অমুসলিম গরীবদের যাকাত ও ফিতরার খাত থেকে সাহায্য করা যাবে না। তাদের ভিন্ন খাত থেকে সাহায্য করতে হবে।
ফিতরার উপরকণ
হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ যে জিনিসকে ফিতরা আদায়ের মাধ্যম হিসাবে নির্ধারণ করেছেন তা হচ্ছে গম, বার্লি, খেজুর, কিশমিশ ও পনির। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবদ্দশায় মাথাপিছু এক সা' খেজুর, এক সা' পনির অথবা এক সা' কিশমিশ ফিতরা হিসাবে আদায় করতাম" (মুসলিম)। আবদুল্লাহ ইবনে সালাবা (রা) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ তাঁর ভাষণে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রত্যেক স্বাধীন, ক্রীতদাস, ছোট ও বড়োর পক্ষ থেকে মাথাপিছু আধা সা’ গম বা এক সা' যব (বার্লি) বা এক সা' খেজুর ফিতরা বাবদ আদায় করো” (আবু দাউদ, যাকাত, মুসনাদে আবদুর রাযযাক, দারু কুতনী, তাবারানী, মুসতাদরাক হাকেম, মুসনাদে আহমাদ)।
ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফিঈ, আহমাদ এবং জমহূর আলেমদের মতে উল্লেখিত খাদ্যদ্রব্যগুলোর যে কোন একটির মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা জায়েয। তবে এর পরিমাণ হবে মাথা পিছু এক সা'। কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে গম বা আটার ক্ষেত্রে এর পরিমাণ অর্ধ সা' হতে পারে। ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদের মতে কেবল উল্লেখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মাধ্যমেই ফিতরা আদায় করতে হবে। এর মূল্য ফিতরা হিসাবে দান করা জায়েয নয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে উল্লেখিত বস্তুগুলোর মূল্যও ফিতরা হিসাবে আদায় করা জায়েয। ইমাম মালেক ও আহমাদের মতে ঐ পাঁচটি দ্রব্যের মধ্যে খেজুর দিয়ে ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম, অতঃপর কিশমিশ। ইমাম শাফিঈর মতে গম বা আটার মাধ্যমে এবং ইমাম আবু হানীফার মতে উল্লেখিত পাঁচটি বস্তুর মধ্যে যেটির বাজারদর সর্বাধিক তা দিয়ে ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম। ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদের মতে আটা বা ছাতু দিয়েও ফিতরা আদায় করা জায়েয। কিন্তু অপর দুই ইমামের মতে তা জায়েয নয়।
আমাদের দেশে সাধারণত গম বা আটাকে 'মান' ধরে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। গম বা আটা অথবা এর মূল্য অথবা মূল্যের সম-পরিমাণ চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করা যেতে পারে। চাল যেহেতু এখানকার প্রধান খাদ্যশস্য, তাই বিশেষজ্ঞ আলেমগণ এর মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা জায়েয বলেছেন।
সা' ( صاع )-এর পরিমাণ।
সা'-এর পরিমাণ নির্ধারণে ইমামদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ইমাম আবু হানীফার মতে এক সা' ইরাকের আট রোতলের সমান, কিন্তু ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদের মতে হিজাযী সোয়া পাঁচ রোতলের সমান। আমাদের দেশী ওজনে এক রোতল প্রায় আধা সেরের সমান, এক হিজাযী সা' প্রায় পৌনে তিন সেরের সমান এবং এক ইরাকী সা' পৌনে চার সেরের সমান। অতএব খেজুর, কিশমিশ, বার্লি, পনির অথবা গমের মাধ্যমে ফিতরা দিতে হলে আমাদের দেশী ওজনে (মাথাপিছু) প্রতিটির পরিমাণ হবে প্রায় পৌনে তিন সের অথবা পৌনে চার সের। আর অর্ধ-সা' ধরা হলে তার পরিমাণ হবে এক সের সাড়ে বারো ছটাক অথবা ছয় ছটাক। ফিতরা প্রদানকারীগণ উল্লেখিত পাঁচটি দ্রব্যের যে কোন একটি অথবা তার মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা হিজযী সা' অথবা ইরাকী সা’ এর যে কোন একটি পরিমাণ অনুসরণ করার ব্যাপারেও স্বাধীন।
সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ ধনী-গরীব সবাইকে ফিতরা আদায় করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন “তোমরা ফিতরা দিও। আল্লাহ তোমাদের অনেক গুণ বেশী ফেরত দিবেন”। আমাদের সমাজে সর্বাধিক ধনী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের ব্যক্তি পর্যন্ত সবাই (অর্থের মাধ্যমে) ফিতরা আদায় করার ক্ষেত্রে গমকেই 'মান' হিসাবে অনুসরণ করে। এর ফলে ধনী-গরীব সবার মাথাপিছু ফিতরা একই সমান হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা যাকে যতোটুকু আর্থিক সচ্ছলতা দান করেছেন তার সেই অনুযায়ী ব্যয় করা উচিত। যে পাঁচটি জিনিসকে ফিতরার উপকরণ হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, আমাদের বাজারে এগুলোর মূল্যের মধ্যে যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। যেমন (১৩ রমযান ১৪০৫ হি./মে ১৯৮৫ খৃ.) বাজারে খেজুরের দর (সের প্রতি) ৩৫,০০, খোরমা ৫০.০০, কিশমিশ ১০০.০০, বার্লি ১৮.০০ এবং গম ৫.০০ টাকা। তাহলে মাথাপিছু ফিতরার পরিমাণ দাঁড়ায় (টাকার অংকে)ঃ
(হিজাযী পরিমাপ অনুযায়ী) (ইরাকী পরিমাপ অনুযায়ী)
খেজুর (এক সা) ৯৬.২০ (এক সা) ১৩১.২৫
খোরমা ১৩৭.৫০ ১৮৭.৫০
কিশমিশ ২৭৫.০০ ৩৭৫.০০
বার্লি ৪৯.৫০ ৬৭.৫০
পনির ১১০.০০ ১৫০.০০
গম ১৩.৭৫ ১৮.৭৫
গমের ক্ষেত্রে অর্থ সা হিসাবে মাথাপিছু ফিতরার পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে টা ৬.৯০ (হিজাযী ওজন) অথবা ৯.৪০ (ইরাকী ওজন)। আমাদের দেশে ফিতরার ক্ষেত্রে সাধারণত ইরাকী ওজন অনুসরণ করা হয়। অতএব ধনবান ব্যক্তিদের সর্বাধিক মূল্যবান দ্রব্যটি দিয়ে ফিতরা দেয়া উচিৎ।
একটি ভুল ধারণার অপনোদন
একদল লোক ধারণা করে থাকে যে, গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্ধারণ করেননি, বরং আমীর মুআবিয়া (রা) তার রাজত্বকালে এর প্রবর্তন করেন। একথা ঠিক নয়। বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকেই গম সম্পর্কে দুই ধরনের (অর্ধ সা' এবং এক সা') বক্তব্য সম্বলিত হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। একটি হাদীস আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। হাসান বসরী (র) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) রমযানের শেষদিকে বসরার মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বলেন, তোমরা রোযার ফিতরা পরিশোধ করো।.....রাসূলুল্লাহ ﷺ ছোট-বড়ো, স্ত্রী-পুরুষ এবং স্বাধীন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সদাকাতুল ফিতর এক সা' খোরমা অথবা এক সা' বার্লি অথবা অর্ধ সা' গম নির্ধারণ করেছেন” (আবু দাউদ)। ইবনে আব্বাস (রা) আরো বলেন, নবী ﷺ এই সদাকা (ফিতরা) এক সা' বার্লি অথবা এক সা' খোরমা অথবা অর্ধ সা' গম নির্ধারণ করেছেন (মুসনাদে আহমাদ, ফাতহুর রব্বানী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৪১ থেকে গৃহীত)। আসমা বিনতে আবু বাকর (রা) থেকে মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে গমের অর্ধ সা' সম্পর্কিত আরো একটি হাদীস বর্ণিত আছে (ফাতহুর রব্বানী, ৯থ, ১৪৪)। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে মারফূ সূত্রে অনেক হাদীস এসেছে যাতে অর্ধ সা' গমের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করার উল্লেখ রয়েছে। যারা অর্ধ সা গমের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করার সুযোগকে অস্বীকার করেন, এসব হাদীস তাদের কাছে পৌঁছেনি (ফাতহুর রব্বানী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৪০)।
মহানবী ﷺ-এর যে সকল সাহাবী অর্ধ সা' গমের মাধ্যমে ফিতরা আদায়ের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন তারা হচ্ছেনঃ আবু বাকর সিদ্দীক, উমার ফারূক, উছমান ইবনে আফ্ফান, আলী ইবনে আবু তালিব, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মুআবিয়া এবং আসমা বিনতে আবু বা রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাবিঈদের মধ্যে রয়েছেনঃ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুজাহিদ, উমার ইবনে আবদুল আযীয, তাউস, ইবরাহীম নাখঈ, আলকামা, আসওয়াদ, উরওয়া, আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান, আবদুল মালেক ইবনে মুহাম্মাদ, আবদুর রহমান আল-আওযাঈ, সুফিয়ান সাওরী, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আবদুল্লাহ ইবনে শাইবান এবং মুসআব ইবনে সাদ (রহিমাহুমুল্লাহ) (অনুবাদক)।
ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার সময়
ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মতে ঈদের ফজর (ভোর) শুরু হওয়ার সাথে সাথে ফিতরা ওয়াজিব হয়, তার পূর্বে নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র)-র মতে শেষ রোযার দিনের সূর্য ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে ওয়াজিব হয়। ইমাম মালেক (র) ও শাফিঈ (র)-এর দু'টি মত রয়েছে যা উপরোল্লিখিত দু'টি মতের সমর্থন করে। ইমাম মালেক ও আমাদের মতে ঈদের একদিন অথবা দু'দিন পূর্বে ফিতরা আদায় করা যেতে পারে। ইমাম শাফিঈর মতে রমযান মাসের প্রথম দিক থেকেই ফিতরা দেয়া জায়েয। ইমাম আবু হানীফার মতে তা রমযানের পূর্বেও পরিশোধ করা জায়েয এবং পরেও আদায় করা জায়েয। কিন্তু যে ব্যক্তি ফিতরা পরিশোধ করে না, তা তার উপর ঋণ হিসাবে থেকে যায়। এ ব্যাপারে ফিকহবিদগণ একমত ।
ফিতরা কার উপর ওয়াজিব
ইমাম নববী (র) বলেন, জমহূর উলামায়ে সালাফের মতে ফিতরা আদায় করা ফরয, ইমাম আবু হানীফার মতে ওয়াজিব এবং ইমাম মালেক, শাফিঈ ও দাউদ যাহেরীর মতে সুন্নাত। ইমামদের ঐক্যমত অনুযায়ী স্বাধীন মুসলমানদের উপর ফিতরা আদায় করা বাধ্যতামূলক। মালেক, শাফিঈ ও আহমাদের মতে যে ব্যক্তির কাছে ঈদের দিন ও রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ আছে তাকেই ফিতরা আদায় করতে হবে। আবু হানীফার মতে ঈদের দিন সকালে কোন ব্যক্তির কাছে 'মালেকে নিসাব' বা যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তার উপর ফিতরা ওয়াজিব। পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে তার নিজের, তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে। কিন্তু আবু হানীফার মতে স্ত্রীর ফিতরা আদায় করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অনুরূপভাবে সন্তানদের ফিতরা আদায় করাও মায়ের উপর বাধ্যতামূলক নয়। বাড়িতে স্থায়ী কাজের লোকদের পক্ষ থেকে নিয়োগকর্তাকে ফিতরা আদায় করতে হবে কিনা সে বিষয়ে মতভেদ আছে। একদল ফিকহবিদের মতে তাকে তাদের ফিতরা আদায় করতে হবে এবং অপর দলের মতে তা তার উপর বাধ্যতামূলক নয়।
ফিতরা বণ্টনের খাত
ফিতরা পাওয়ার প্রথম হকদার হচ্ছে একান্ত নিকটাত্মীয় গরীবগণ, অতঃপর দূরাত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী, মিসকীন, নও মুসলিম, ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি এবং সাময়িক আর্থিক সংকটে পতিত ব্যক্তিগণ। হকদার ব্যক্তি যদি দূরে থাকে তবে তার অংশ পৃথক করে রেখে দেয়া জায়েয। সাময়িকভাবে কোথাও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সেখানেও ফিতরা বণ্টন করা যেতে পারে। অমুসলিম গরীবদের যাকাত ও ফিতরার খাত থেকে সাহায্য করা যাবে না। তাদের ভিন্ন খাত থেকে সাহায্য করতে হবে।
ফিতরার উপরকণ
হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ যে জিনিসকে ফিতরা আদায়ের মাধ্যম হিসাবে নির্ধারণ করেছেন তা হচ্ছে গম, বার্লি, খেজুর, কিশমিশ ও পনির। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবদ্দশায় মাথাপিছু এক সা' খেজুর, এক সা' পনির অথবা এক সা' কিশমিশ ফিতরা হিসাবে আদায় করতাম" (মুসলিম)। আবদুল্লাহ ইবনে সালাবা (রা) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ তাঁর ভাষণে বলেনঃ তোমরা তোমাদের প্রত্যেক স্বাধীন, ক্রীতদাস, ছোট ও বড়োর পক্ষ থেকে মাথাপিছু আধা সা’ গম বা এক সা' যব (বার্লি) বা এক সা' খেজুর ফিতরা বাবদ আদায় করো” (আবু দাউদ, যাকাত, মুসনাদে আবদুর রাযযাক, দারু কুতনী, তাবারানী, মুসতাদরাক হাকেম, মুসনাদে আহমাদ)।
ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফিঈ, আহমাদ এবং জমহূর আলেমদের মতে উল্লেখিত খাদ্যদ্রব্যগুলোর যে কোন একটির মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা জায়েয। তবে এর পরিমাণ হবে মাথা পিছু এক সা'। কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে গম বা আটার ক্ষেত্রে এর পরিমাণ অর্ধ সা' হতে পারে। ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদের মতে কেবল উল্লেখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মাধ্যমেই ফিতরা আদায় করতে হবে। এর মূল্য ফিতরা হিসাবে দান করা জায়েয নয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফার মতে উল্লেখিত বস্তুগুলোর মূল্যও ফিতরা হিসাবে আদায় করা জায়েয। ইমাম মালেক ও আহমাদের মতে ঐ পাঁচটি দ্রব্যের মধ্যে খেজুর দিয়ে ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম, অতঃপর কিশমিশ। ইমাম শাফিঈর মতে গম বা আটার মাধ্যমে এবং ইমাম আবু হানীফার মতে উল্লেখিত পাঁচটি বস্তুর মধ্যে যেটির বাজারদর সর্বাধিক তা দিয়ে ফিতরা আদায় করা সর্বোত্তম। ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদের মতে আটা বা ছাতু দিয়েও ফিতরা আদায় করা জায়েয। কিন্তু অপর দুই ইমামের মতে তা জায়েয নয়।
আমাদের দেশে সাধারণত গম বা আটাকে 'মান' ধরে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। গম বা আটা অথবা এর মূল্য অথবা মূল্যের সম-পরিমাণ চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করা যেতে পারে। চাল যেহেতু এখানকার প্রধান খাদ্যশস্য, তাই বিশেষজ্ঞ আলেমগণ এর মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা জায়েয বলেছেন।
সা' ( صاع )-এর পরিমাণ।
সা'-এর পরিমাণ নির্ধারণে ইমামদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ইমাম আবু হানীফার মতে এক সা' ইরাকের আট রোতলের সমান, কিন্তু ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদের মতে হিজাযী সোয়া পাঁচ রোতলের সমান। আমাদের দেশী ওজনে এক রোতল প্রায় আধা সেরের সমান, এক হিজাযী সা' প্রায় পৌনে তিন সেরের সমান এবং এক ইরাকী সা' পৌনে চার সেরের সমান। অতএব খেজুর, কিশমিশ, বার্লি, পনির অথবা গমের মাধ্যমে ফিতরা দিতে হলে আমাদের দেশী ওজনে (মাথাপিছু) প্রতিটির পরিমাণ হবে প্রায় পৌনে তিন সের অথবা পৌনে চার সের। আর অর্ধ-সা' ধরা হলে তার পরিমাণ হবে এক সের সাড়ে বারো ছটাক অথবা ছয় ছটাক। ফিতরা প্রদানকারীগণ উল্লেখিত পাঁচটি দ্রব্যের যে কোন একটি অথবা তার মূল্য দিয়ে ফিতরা আদায় করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা হিজযী সা' অথবা ইরাকী সা’ এর যে কোন একটি পরিমাণ অনুসরণ করার ব্যাপারেও স্বাধীন।
সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ ধনী-গরীব সবাইকে ফিতরা আদায় করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন “তোমরা ফিতরা দিও। আল্লাহ তোমাদের অনেক গুণ বেশী ফেরত দিবেন”। আমাদের সমাজে সর্বাধিক ধনী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের ব্যক্তি পর্যন্ত সবাই (অর্থের মাধ্যমে) ফিতরা আদায় করার ক্ষেত্রে গমকেই 'মান' হিসাবে অনুসরণ করে। এর ফলে ধনী-গরীব সবার মাথাপিছু ফিতরা একই সমান হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা যাকে যতোটুকু আর্থিক সচ্ছলতা দান করেছেন তার সেই অনুযায়ী ব্যয় করা উচিত। যে পাঁচটি জিনিসকে ফিতরার উপকরণ হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, আমাদের বাজারে এগুলোর মূল্যের মধ্যে যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। যেমন (১৩ রমযান ১৪০৫ হি./মে ১৯৮৫ খৃ.) বাজারে খেজুরের দর (সের প্রতি) ৩৫,০০, খোরমা ৫০.০০, কিশমিশ ১০০.০০, বার্লি ১৮.০০ এবং গম ৫.০০ টাকা। তাহলে মাথাপিছু ফিতরার পরিমাণ দাঁড়ায় (টাকার অংকে)ঃ
(হিজাযী পরিমাপ অনুযায়ী) (ইরাকী পরিমাপ অনুযায়ী)
খেজুর (এক সা) ৯৬.২০ (এক সা) ১৩১.২৫
খোরমা ১৩৭.৫০ ১৮৭.৫০
কিশমিশ ২৭৫.০০ ৩৭৫.০০
বার্লি ৪৯.৫০ ৬৭.৫০
পনির ১১০.০০ ১৫০.০০
গম ১৩.৭৫ ১৮.৭৫
গমের ক্ষেত্রে অর্থ সা হিসাবে মাথাপিছু ফিতরার পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে টা ৬.৯০ (হিজাযী ওজন) অথবা ৯.৪০ (ইরাকী ওজন)। আমাদের দেশে ফিতরার ক্ষেত্রে সাধারণত ইরাকী ওজন অনুসরণ করা হয়। অতএব ধনবান ব্যক্তিদের সর্বাধিক মূল্যবান দ্রব্যটি দিয়ে ফিতরা দেয়া উচিৎ।
একটি ভুল ধারণার অপনোদন
একদল লোক ধারণা করে থাকে যে, গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্ধারণ করেননি, বরং আমীর মুআবিয়া (রা) তার রাজত্বকালে এর প্রবর্তন করেন। একথা ঠিক নয়। বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকেই গম সম্পর্কে দুই ধরনের (অর্ধ সা' এবং এক সা') বক্তব্য সম্বলিত হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। একটি হাদীস আমরা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। হাসান বসরী (র) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) রমযানের শেষদিকে বসরার মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বলেন, তোমরা রোযার ফিতরা পরিশোধ করো।.....রাসূলুল্লাহ ﷺ ছোট-বড়ো, স্ত্রী-পুরুষ এবং স্বাধীন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সদাকাতুল ফিতর এক সা' খোরমা অথবা এক সা' বার্লি অথবা অর্ধ সা' গম নির্ধারণ করেছেন” (আবু দাউদ)। ইবনে আব্বাস (রা) আরো বলেন, নবী ﷺ এই সদাকা (ফিতরা) এক সা' বার্লি অথবা এক সা' খোরমা অথবা অর্ধ সা' গম নির্ধারণ করেছেন (মুসনাদে আহমাদ, ফাতহুর রব্বানী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৪১ থেকে গৃহীত)। আসমা বিনতে আবু বাকর (রা) থেকে মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে গমের অর্ধ সা' সম্পর্কিত আরো একটি হাদীস বর্ণিত আছে (ফাতহুর রব্বানী, ৯থ, ১৪৪)। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে মারফূ সূত্রে অনেক হাদীস এসেছে যাতে অর্ধ সা' গমের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করার উল্লেখ রয়েছে। যারা অর্ধ সা গমের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করার সুযোগকে অস্বীকার করেন, এসব হাদীস তাদের কাছে পৌঁছেনি (ফাতহুর রব্বানী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৪০)।
মহানবী ﷺ-এর যে সকল সাহাবী অর্ধ সা' গমের মাধ্যমে ফিতরা আদায়ের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন তারা হচ্ছেনঃ আবু বাকর সিদ্দীক, উমার ফারূক, উছমান ইবনে আফ্ফান, আলী ইবনে আবু তালিব, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মুআবিয়া এবং আসমা বিনতে আবু বা রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাবিঈদের মধ্যে রয়েছেনঃ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুজাহিদ, উমার ইবনে আবদুল আযীয, তাউস, ইবরাহীম নাখঈ, আলকামা, আসওয়াদ, উরওয়া, আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান, আবদুল মালেক ইবনে মুহাম্মাদ, আবদুর রহমান আল-আওযাঈ, সুফিয়ান সাওরী, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আবদুল্লাহ ইবনে শাইবান এবং মুসআব ইবনে সাদ (রহিমাহুমুল্লাহ) (অনুবাদক)।