আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

২- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ২৪৩
- নামাযের অধ্যায়
রমযান মাসে রাতের ইবাদত ও তার ফযীলাত।
২৪৩। আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল কারী (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রমযানের এক রাতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ)-র সাথে বের হলেন। তখন কতক লোক একত্রে এবং কতক লোক একাকী বিচ্ছিন্নভাবে নামায পড়ছিল। উমার (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি ভাবছি যে, আমি এই লোকদের একজন ইমামের পিছনে একত্র করে দেই, তবে তা খুবই ভালো হতো। অতঃপর তিনি তাই করার সংকল্প করলেন এবং সবাইকে উবাই ইবনে কাব (রাযিঃ)-র পিছনে একত্র করেন । রাবী আরো বলেন, আমি আরেক রাতে তার সাথে বের হলাম। তখন সব লোক একজন ইমামের পিছনে নামায পড়ছিল। উমার (রাযিঃ) বলেন, 'এটা উত্তম বিদআত।১ লোকজন প্রথম রাতে যে নামায পড়ে, তার তুলনায় সেই নামায উত্তম যা থেকে তারা ঘুমিয়ে পড়ে।' অর্থাৎ লোকেরা রাতের প্রথমাংশে নামায পড়তো। কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল, তারা যদি এই নামায শেষরাতে পড়তো।
ইমাম মুহাম্মাদ (রাহঃ) বলেন, আমরা এই কর্মপন্থা গ্রহণ করেছি। রমযান মাসে জামাআতে নফল নামায পড়ায় কোন দোষ নেই।২ কেননা এর উপর মুসলমানদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা এটাকে উত্তম মনে করেছেন। নবী ﷺ বলেনঃ
ما رأه المسلمون حسنا فهو عند الله حسن وما رأه المسلمون قبيحا فهو عند الله له قبيح

“যে জিনিসকে মুসলমানরা উত্তম মনে করে, আল্লাহর নিকটও তা উত্তম। আর যে জিনিসকে মুসলমানরা খারাপ মনে করে, তা আল্লাহর নিকটও খারাপ।”৩
أبواب الصلاة
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، أَخْبَرَنَا ابْنُ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدٍ الْقَارِيِّ، " أَنَّهُ خَرَجَ مَعَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ، فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ، يُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلاتِهِ الرَّهْطُ، فَقَالَ عُمَرُ: " وَاللَّهِ، إِنِّي لأَظُنُّنِي لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلاءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ لَكَانَ أَمْثَلَ، ثُمَّ عَزَمَ فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، قَالَ: ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى، وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلاةِ قَارِئِهِمْ، فَقَالَ: نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ، وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُومُونَ فِيهَا.
يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلِهِ ".
قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا كُلِّهِ نَأْخُذُ، لا بَأْسَ بِالصَّلاةِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ، أَنْ يُصَلِّيَ النَّاسُ تَطَوُّعًا بِإِمَامٍ، لأَنَّ الْمُسْلِمِينَ قَدْ أَجْمَعُوا عَلَى ذَلِكَ وَرَأَوْهُ حَسَنًا.
وَقَدْ رُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «مَا رَآهُ الْمُؤْمِنُونَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ حَسَنٌ، وَمَا رَآهُ الْمُسْلِمُونَ قَبِيحًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ قَبِيحٌ»

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

১. আভিধানিক অর্থে প্রতিটি নতুন উদ্ভাবিত জিনিসকে বিদআত বলা হয়। কিন্তু শরীআতের পরিভাষায় এর অর্থ হচ্ছে, “নিজের পক্ষ থেকে দীনের মধ্যে এমন কিছু প্রবর্তন করা যা দীনের অন্তর্ভুক্ত নয়”। অর্থাৎ যার সমর্থনে শরীআতের কোন দলীল নাই। সুতরাং এখানে বিদআত শব্দটি পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। কারণ এই অর্থে সব বিদআতই নিকৃষ্ট, পাপ প্রসূত এবং তা গোমরাহীর নামান্তর। এখানে শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে (আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য) (অনুবাদক)।
২. মহামহিম আল্লাহ তাআলা বছরের বারোটি মাসের মধ্যে রমযানুল মোবারক মাসের মর্যাদা স্বয়ং কুরআন মজীদে বর্ণনা করেছেন। এ মাসেই মানবজাতির মুক্তির সনদ কুরআন মজীদ নাযিল হয়। ইসলামের অন্যতম রুকন রোযা এ মাসেই ফরয করা হয়। তাই এ মাসে যে কোন সৎকাজের ফযীলাত অতুলনীয়ভাবে অত্যধিক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তা চান না। এজন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে এবং তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করবে এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো” (সূরা আল-বাকারাঃ ১৮৫)।
অর্থাৎ উক্ত আয়াতে আল্লাহ পূর্ণ এক মাস রোযা রাখার জন্য এবং তাঁর মহিমা ও গুণগান তথা ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য আহবান জানিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “এ মাসের একটি ফরয ইবাদতের মর্যাদা অন্য মাসের সত্তরটি ফরয ইবাদতের সমান এবং এ মাসের একটি নফল (ঐচ্ছিক) ইবাদতের মর্যাদা অন্য মাসের একটি ফরয ইবাদতের সমান" (বায়হাকীর সুনানুল কুবরা)। হাদীস শরীফে অনুরূপ বহুতর ফযীলাতের কথা বলা হয়েছে।
এ মাসের অতিরিক্ত ও ঐচ্ছিক ইবাদতগুলোর মধ্যে তারাবীহ নামাযও অন্তর্ভুক্ত। মহানবী ﷺ যদিও মাত্র তিন দিন এ নামায জামাআত সহকারে পড়েছেন, কিন্তু নিজ ঘরে তিনি এ নামায নিয়মিত পড়েছেন, বরং রমযান মাসে তিনি অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক ইবাদত-বন্দেগী করেছেন। কেবল ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবং উম্মাতের জন্য কষ্টকর হয়ে যাওয়ার আশংকায় তিনি তারাবীহ নামায নিয়মিত জামাআতে পড়েননি।
হানাফী, শাফিঈ ও হাম্বলী মাযহাবমতে তারাবীহ নামায নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নাতে মুআক্কাদা, অবশ্য মালিকী মাযহাবমতে কেবল সুন্নাত। হানাফী মাযহাবমতে এই নামাযের জামাআত কায়েম করা সুন্নাতে কিফায়া। অর্থাৎ যে কোন মহল্লার একদল লোক জামাআত সহকারে এই নামায পড়লে উক্ত মহল্লার পক্ষ থেকে জামাআত কায়েম করার সুন্নাত আদায় হয়ে যায়, কিন্তু জামাআত কায়েম না করলে মহল্লার সকলেই গুনাহগার হয়। জামাআত কায়েম হলে মহল্লার অবশিষ্টরা একাকী এ নামায আদায় করতে পারে বটে, কিন্তু জামাআতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকে।
এই নামাযের ওয়াক্ত এশার ফরয ও সুন্নাত পড়ার পর থেকে শুরু হয় এবং সাহরীর পূর্ব পর্যন্ত পড়া যায়। কোন ব্যক্তি যদি মসজিদে এসে দেখে যে, তারাবীর জামাআত শুরু হয়ে গেছে, তাহলে সে প্রথমে একাকী এশার ফরয ও সুন্নাত পড়ার পর তারাবীহর জামাআতে শামিল হবে। জামাআত শেষে সে ইচ্ছা করলে ছুটে যাওয়। বাকী রাকআতগুলো আদায় করতে পারে, নাও করতে পারে। এ নামায এক সালামে দুই রাকআত করে পড়তে হয়, তবে চার রাকআত করেও পড়া যায় এবং প্রতি চার রাকআত অন্তর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হয় (তারাবীহ অর্থ বিশ্রাম)। এ সময় বসে বসে দোয়া-দুরূদ পড়তে হয়। কোন কোন মসজিদে খুব তাড়াহুড়া করে এ নামায শেষ করতে দেখা যায়। এই প্রবণতা চরম আপত্তিকর। তাড়াহুড়া বর্জন করতে হবে এবং ইমাম সাহেব এমনভাবে কিরাআত পড়বেন যাতে আয়াতের প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে শুনা যায়। রুকূ-সিজদাও ধীরেসুস্থে করতে হবে, দোয়া-দুরূদ ও তাসবীহ-তাহলীলও ধীরেসুস্থে পড়তে হবে। মহানবী বলেন “তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ হতে এবং ধীর-স্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে” (তিরমিযী, কিতাবুল বিরর, নং ১৯৬১)।

তারাবীহ নামাযের রাকআত সংখ্যা
তারাবীহ নামাযের রাকআত সংখ্যা নিয়ে উম্মাতের বিশেষজ্ঞ আলেমগণের মতভেদ আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ যে তিন দিন জামাআত সহকারে এ নামায পড়েছেন তার বর্ণনা সম্বলিত হাদীসেরাকআত সংখ্যার উল্লেখ নাই। হানাফী মাযহাবের বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বিশ রাকআতের পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং তাই এ মাযহাবের অনুসারীগণ বিশরাকআত তারাবীহ পড়ে থাকেন।
ইমাম তিরমিযী (র) তাঁর জামে আত-তিরমিযী শীর্ষক হাদীস গ্রন্থে “কিয়ামে রামাদান" শীর্ষক অনুচ্ছেদে উদ্ধৃত হাদীসের (নং ৭৫৩, বি. আই. সি সংস্করণ) নিচে এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত বক্তব্য রেখেছেনঃ "রমযান মাসের রাতসমূহে (নামাযে) দণ্ডায়মান হওয়া সম্পর্কে আলেমগণের মতভেদ আছে। কোন কোন আলেম বলেন, বেতেরসহ (রাতের এই নামাযের)রাকআত সংখ্যা একচল্লিশ (৪১)। এ হলো মদীনাবাসীদের অভিমত এবং এখানকার লোকজন এরূপ আমল করেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের অভিমতে হযরত আলী (রা) ও উমার ফারূক (রা) প্রমুখ সাহাবায়ে কিরাম থেকে বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী এররাকআত সংখ্যা বিশ (২০)। সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারক ও শাফিঈ (র)-এর এই অভিমত। ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, আমাদের নগর মক্কায়ও লোকদেরকে বিশ (২০) রাকআত পড়তে দেখেছি। আহমাদ (র) বলেন, এই বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে। তিনি এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত দেননি। ইসহাক (র) বলেন, উবাই ইবনে কাব (র)-র বর্ণনা অনুযায়ী আমরা একচল্লিশ রাকআত পড়াই পছন্দ করি। ইবনুল মুবারক, আহমাদ ও ইসহাক (র) রমযান মাসে ইমামের সাথে তারাবীর নামায আদায় করা পছন্দ করেছেন" (জামে আত-তিরমিযী, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ১১১-১১২)।
ইমাম বুখারী (র) তাঁর সহীহ বুখারীতে লিখেছেন (২খ, পৃ. ২৭৮, হাদীস নং ১৮৬৮-এর অধীন, আধুনিক প্রকাশনী সংস্করণ), আবদুর রহমান ইবনে আবদুল কারী (র) বলেন, “আমি রমযানের এক রাতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর সাথে মসজিদের উদ্দেশে বের হলাম। পৌঁছে দেখলাম, বিভিন্ন অবস্থায় বহু লোক। কেউ একা একা নামায পড়ছে, কোথাও এক ব্যক্তি নামায পড়ছে, আর কিছু লোক তার সাথে নামায পড়ছে। তখন উমার (রা) বলেন, আমার মতে, এদের সকলকে একজন কারীর সাথে জামাআতবদ্ধ করে দিলে সবচাইতে ভালো হয়। অতঃপর তিনি (তা করার) মনস্থ করলেন এবং তাদেরকে উবাই ইবনে কাব (রা)-র পেছনে জামাআতবদ্ধ করে দিলেন। অতঃপর আমি পরবর্তী রাতে আবার তার সাথে বের হলাম। দেখলাম, লোকজন তাদের ইমামের সাথে নামায পড়ছে। উমার (রা) বলেছেন, এটি একটি উত্তম বিদআত (সুন্দর ব্যবস্থা)। রাতের যে অংশে লোকেরা ঘুমায় সেই অংশের তুলনায় রাতের যে অংশে তারা ইবাদত করে সেই অংশ অপেক্ষাকৃত উত্তম।” ইমাম বুখারীর এই বর্ণনায় বা তার অপর কোন বর্ণনায় তারাবীহ নামাযের রাকআত সংখ্যার উল্লেখ নাই।
হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, উমার (রা) বিচ্ছিন্নভাবে তারাবীহ পড়ুয়াদেরকে উবাই ইবনে কাব (রা)-র ইমামতিতে একত্র করেন। তিনি বিশ রাকআত তারাবীহ পড়ান। হযরত আলী (রা)-ও এক ব্যক্তিকে রমযান মাসে বিশ রাকআত শরাবীহ পড়ানোর জন্য ইমাম নিয়োগ করেন। সুতরাং বিশ রাকআতের অনুসরণ করাই উত্তম” (আল-মুগনী, ১ম খণ্ড)।
ইমাম মালেক (র)-এর “আল-মুওয়াত্তা” শীর্ষক হাদীস গ্রন্থে সাইব ইবনে ইয়াযীদ (রা) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, “উমার (রা) আট রাকআত তারাবীর প্রচলন করেন" এবং ইয়াযীদ ইবনে রূমান (রা) বর্ণিত হাদীসে তৎকর্তৃক বিশ রাকআতের প্রচলন করার উল্লেখ আছে (নামায অধ্যায়, রমযান মাসে নামায পড়ার জন্য উৎসাহ প্রদান অনুচ্ছেদ)।
মহানবী ও আবু বাকর (রা)-র খেলাফতকালে এবং উমার (রা)-র খেলাফতের প্রথম পর্যায়ে তারাবীহ নামায জামাআতে পড়া হতো না এবং সেকালে বিচ্ছিন্নভাবে আট রাকআত বা ততোধিকরাকআত নামায পড়ার পক্ষে হাদীস বিদ্যমান থাকলেও তার বিপরীতে বিশ রাকআতের পক্ষেও হাদীস বিদ্যমান আছে। যারা রাতের অতিরিক্ত নামায আট রাকআত বলেন, তাদের মধ্যে কতিপয় উগ্র ব্যক্তি এ পর্যন্তও বলেন যে, বিশ রাকআতের পক্ষপাতীগণ একটি মওযূ (মনগড়া, বানোয়াট) হাদীসও পেশ করতে পারবে না। এ দাবি সম্পূর্ণ অসার। মুওয়াত্তা ইমাম মালেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসটির অতিরিক্ত খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের একটি হাদীস এখানে পেশ করা হলোঃ

عن ابن عباس قال كان النبی ﷺ يصلي في شهر رمضان في غير جماعة بعشرين ركعة والوتر

“ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী ﷺ রমযান মাসে জামাআত ব্যতিরেকে বিশ রাকআত ও এক রাকআত বেতের পড়তেন" (ইমাম বায়হাকীর আস-সুনানুল কুবরা, বাব মা রুবিয়া ফী আদাদি রাকআতিল কিয়াম ফী শাহরি রামাদান, ২খ, পৃ. ৪৯৭; ইবনে আবু শায়বা, আল-মুসান্নাফ, ২৯, পৃ. ৩৯৪; নাসাবুর রায়া, ২খ, পৃ. ১৫৩; তাবারানীর আল-মুজামুল কবীর গ্রন্থেও এটি উক্ত হয়েছে)।
ইবনে আবু শায়বার আল-মুসান্নাফ গ্রন্থে আরো বর্ণিত আছে যে, আবুল খাত্তাব (র) বলেন, সুওয়াইদ ইবনে গাফালা (রা) রমযান মাসে আমাদের ইমামতি করতেন এবং পাঁচ সালামে বিশরাকআত তারাবীহ পড়াতেন (আল-মুসান্নাফ, ২৯, ৩৯৩)। আলী (রা)-র সহচর শুতাইর ইবনে শাল (র) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রমযান মাসে লোকদের ইমামতি করতেন এবং বিশ রাকআত তারাবীহ ও তিন রাস্আত বেতের পড়াতেন (পূর্বোক্ত বরাত, পৃ. ২৯২-৩)। আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী (র) বলেন, আলী (রা) রমযান মাসে কারীগণকে ডেকে আনেন এবং তাদের মধ্যকার একজনকে লোকদের সাথে নিয়ে বিশ রাকআত নামায পড়ার নির্দেশ দেন। রাবী বলেন, আলী (রা) তাদের সাথে বেতের পড়তেন (পূর্বোক্ত বরাত, পৃ. ৩৯৩)। আবুল হাসনা (র) বলেন, আলী (রা) এক ব্যক্তিকে লোকদের নিয়ে পাঁচ সালামে বিশ রাকআত তারাবীহ পড়ার নির্দেশ দেন (পূর্বোক্ত বরাত, পৃ. ৩৯৩)। ইয়াহ্ইয়া ইবনে সাঈদ (র) বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এক ব্যক্তিকে লোকদের বিশ রাকআত তারাবীহ পড়ানোর নির্দেশ দেন (পূর্বোক্ত বরাত, পৃ. ৩৯৩)। নাফে ইবনে উমার (র) বলেন, ইবনে আবু মুলাইকা (র) রমযান মাসে আমাদের নিয়ে বিশ রাকআত নামায পড়তেন (ঐ, ৩৯৩)। উবাই ইবনে কাব (রা) মদীনায় লোকদের নিয়ে বিশ রাকআত নামায পড়তেন এবং বেতের পড়তেন তিন রাকআত (ঐ, পৃ. ৩৯৩)। আল-হারিস (র) রমযানের রাতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকআত তারাবীহ ও তিন রাকআত বেতের পড়তেন এবং রুকূতে যাওয়ার পূর্বে দোয়া কুনূত পড়তেন (ঐ, পৃ. ৩৯৩)। আবুল বাখতারী (র) রমযান মাসে পাঁচ সালামে বিশ রাকআত তারাবীহ এবং তিন রাকআত বেতের পড়তেন (ঐ, ৩৯৩)। আতা (র) বলেন, আমি লোকদেরকে বেতেরসহ তেইশ রাকআত তারাবীহ আশায়রত পেয়েছি (ঐ, পৃ. ৩৯৩)। সাঈদ ইবনে উবাইদ (র) বলেন, আলী ইবনে রবীআ (র) রমযান মাসে তাকে নিয়ে পাঁচ সালামে বিশ রাকআত তারাবীহ ও তিন রাকআত বেতের পড়তেন (ঐ, পৃ. ৩৯৩)। দাউদ ইবনে কায়েস (র) বলেন, উমার ইবনে আবদুল আযীয (র) ও আবান ইবনে উসমান (র)-এর যমানায় আমি মদীনায় লোকদেরকে ছত্রিশ রাকআত (তারাবীহ) ও তিনরাকআত বেতের পাঠরত পেয়েছি (ঐ, পৃ. ৩৯৩)।
একদল লোক বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ রমযান ও তার বাইরে রাতে আট রাকআত সালাতুত তাতাব্বু (ঐচ্ছিক নামায) পড়তেন। যেমন আয়েশা (রা)-র রিওয়ায়াত থেকে জানা যায় (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী)। কিন্তু অপরাপর হাদীস থেকে জানা যায় যে, তিনি নিয়মিতই আট রাকআত পড়তেন না, বরং ৭, ৯, ১১, ১২, ১৩ রাকআতও পড়তেন। এমনকি আয়েশা (রা)-র অন্য রিওয়ায়াত থেকেও তা প্রমাণিত (এজন্য সিহাহ সিত্তার নামায অধ্যায় দেখা যেতে পারে)। বিভিন্ন সাহাবীর বর্ণনায়ও তাঁর রাতের নামাযের রাকআত সংখ্যায় এই পার্থক্য বিদ্যমান। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা), খালিদ ইবনে যায়েদ আল-জুহানী (রা) প্রমুখ সাহাবীর বর্ণনা থেকে বারো রাকআতের কথা জানা যায়।
অতএব মহানবী ﷺ-এর রাতের নামায কেবল আট রাকআতে সীমাবদ্ধ করার জেদ ধরা উচিত নয়। চিন্তার বিষয় এই যে, মহানবীর রাতের বেশির ভাগ সময়ই ইবাদতে কাটাতেন। অথচ তাঁর নামাযের রাকআত সংখ্যা এত কম কেন? বস্তুত রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত ধীরেসুস্থে নামায পড়তেন। তিনি এক এক রাকআতে সূরা আল-বাকারা, আল ইমরান, আন-নিসা ও আল-মাইদার মত দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করতেন এবং রুকূ-সিজদায়ও দীর্ঘক্ষণ কাটাতেন।
পাঠকগণ চিন্তা করে দেখুন, প্রতি রাকআতে এত বড়ো বড়ো সূরা পাঠ করলে এক রাতে আট থেকে বারো রাকআতের অধিক নামায পড়া কি সম্ভব? বহু হাদীসে তাঁর এই দীর্ঘ নামাযের বর্ণনা পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, এক রাতে আমি নবী ﷺ -এর সাথে নামাযে দাঁড়ালাম। তিনি এত দীর্ঘক্ষণ নামাযে দণ্ডায়মান থাকলেন যে, (ক্লান্ত হয়ে) আমার মনে একটা অশুভ ধারণার উদ্ভব হয়। ইবনে মাসউদ (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার মনে কি ধারণা এসেছিলো? তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে একা নামাযে রেখে বসে পড়ার মনস্থ করেছিলাম (শামায়েলে তিরমিযী)।

ঐচ্ছিক নামাযের রাকআত সংখ্যা কি বাড়ানো-কমানো জায়েয?
আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি যে, পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামায এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নাত নামাযেররাকআত সংখ্যা নির্ধারিত আছে, তার হ্রাস-বৃদ্ধি করা জায়েয নাই। অবশ্য যে সুন্নাত সম্পর্কে দ্বিবিধ হাদীস আছে সেখানে তদনুযায়ী আমল করা যয়। যেমন যোহরের ফরয নামাযের পূর্বে চার রাকআত বা দুই রাকআত সুন্নাত পড়ার হাদীস আছে। আমরা হানাফী মাযহাব অনুসারীরা চাররাকআত সুন্নাত পড়ে থাকি এবং অন্যরা দুই রাকআত পড়েন। কিন্তু সালাতুত তাতাব্বু (ঐচ্ছিক নামায)-এর রাকআত সংখ্যা বাড়ানো-কমানো জায়েয। যেমন কেউ যোহরের ফরয ও দুইরাকআত সুন্নাত পড়ার পর আসরের পূর্ব পর্যন্ত ঐচ্ছিক নামায পড়তে থাকলো। আমরা তাকে একথা বলতে পারি না যে, তোমার এ নামায জায়েয নয়, কারণ মহানবী এ সময় এভাবে নামায পড়েননি। বস্তুত ঐচ্ছিক নামাযের ব্যাপারে প্রচুর স্বাধীনতা আছে। তারাবীহ নামাযও ঐচ্ছিক (তাতাব্বু) নামাযের অন্তর্ভুক্ত। এখন কেউ যদি এ নামায না পড়ে বা চার, আট, বারো, বিশ, ছাব্বিশ, ছত্রিশ বা ততোধিক রাকআত পড়ে তবে আমরা তাকে ভর্ৎসনা করতে পারি না, কেবল তাকে নামায পড়তে বলতে পারি। এজন্যই তারাবীহ নামাযের রাকআত সংখ্যায় পার্থক্য আছে। কারণ রাসূলুল্লাহ যে তিন দিন সাহাবীদের নিয়ে তারাবীহ পড়েছেন তা যেমন অত্যন্ত সহীহ সনদ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তদ্রূপ তাতে যে তাঁর নামাযের রাকআত সংখ্যার উল্লেখ নাই তাও সত্য
খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের হাদীস কি গ্রহণযোগ্য? খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের হাদীস কি গ্রহণযোগ্য বা এর ভিত্তিতে কোন আমল করা যায় কি? এটি একটি চিন্তার বিষয়। হাদীস বিশারদগণ (মুহাদ্দিসগণ) হাদীস বর্ণনাকারী রাবীগণের জীবনচরিত আলোচনা করে তাদের স্মৃতিশক্তি, সত্যবাদিতা, আচার-ব্যবহার ও প্রসিদ্ধি ইত্যাদির ভিত্তিতে হাদীসকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন। তার মধ্যে সহীহ (সনদের দিক থেকে বিশুদ্ধ) এবং যঈফ (সনদের দিক থেকে দুর্বল) দুইটি শ্রেণী উল্লেখযোগ্য। মুহাদ্দিসগণ ও ফকীহগণ (ইসলামী আইনবেত্তাগণ) একটি বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন। তা হলোঃ ফরয, হারাম, মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস, স্বত্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও কঠোর শাস্তি ইত্যাদি প্রমাণের ক্ষেত্রে তারা কখনো যঈফ হাদীস গ্রহণ করেননি, সর্বদা কুরআনের পরেই সর্বাধিক সহীহ হাদীস গ্রহণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তাই আমরা লক্ষ্য করছি যে, ফরয নামাযের ওয়াক্ত, ওয়াক্ত সংখ্যা ও রাকআত সংখ্যা নিয়ে গোটা মুসলিম জাতির মধ্যে কোন মতভেদ নাই (যদিও কোন কোন ওয়াক্তের সীমা নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে, যা মোটেই মারাত্মক নয়)। তদ্রূপ হালাল মৃতজীব ভক্ষণ হারাম, কিন্তু যবেহ ব্যতীতই মৃত মাছ ভক্ষণ হালাল হওয়ার বিষয়েও উম্মাতের মধ্যে কোন মতভেদ নাই। কারণ এ বিষয়গুলো অত্যন্ত মজবুত দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে উক্তরূপ কোন বিষয় সংশ্লিষ্ট নয়, বরং সুন্নাত, মুস্তাহাব, নফল, মাকরূহ, ভীতিপ্রদর্শন, উৎসাহ প্রদান, ফযীলাত, মর্যাদা ইত্যাদি বিষয় সংশ্লিষ্ট, সেসব ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ ও ফকীহগণ খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের ও যঈফ হাদীস গ্রহণ করেছেন। তারা এসব বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহকে ততো কঠোরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি, যতটা কঠোরভাবে যাচাই করেছেন পূর্বোক্ত বিষয়সমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ।
অতএব তারাবীহ নামায হলো তাতাব্বু (ঐচ্ছিক) নামাযের অন্তর্ভুক্ত এবং রমযান মাসে তা পড়ার ব্যবস্থা রাখার কারণে ফযীলাতপূর্ণ নামায। এ নামাযের ক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের পাশাপাশি খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের হাদীসও প্রমাণ হিসাবে গ্রহণযোগ্য। আরো একটি বিষয় বিবেচনাযোগ্য যে, কোন ব্যাপারের প্রমাণে অনেকগুলো যঈফ হাদীস পাওয়া গেলে দলীলটি তখন আর যঈফের পর্যায়ে থাকে না, তা শক্তিশালীর পর্যায়ে এসে যায়। আমি ইতোপূর্বে বিশ রাকআত তারাবীর পক্ষে একটি সহীহ হাদীসসহ অনেকগুলো খবরে ওয়াহেদ পর্যায়ের হাদীস উদ্ধৃত করেছি। অনন্তর এই হিজরী পঞ্চদশ (খৃষ্টীয় বিংশ) শতকে এসে বিশ রাকআত তারাবীহর প্রচলন হয়নি, বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর যুগ থেকেই (মতভেদসহ) তার প্রচলন হয়েছে, যদিও কোন কারণে তাঁর যুগের বিশ রাকআতের বর্ণনাটি প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। অনন্তর শুধু ভারতবর্ষের লোকেরাই বিশরাকআত পড়ছেন তাও নয়, বরং আবহমান কাল ধরে গোটা বিশ্বের শতকরা আটানব্বই ভাগ মুসলমান বিশ রাকআত তারাবীহ নামায পড়ে আসছেন।

মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে তারাবীহ নামায
যারা আট রাকআতের পক্ষে তারা বিশ রাকআত পড়ুয়াদেরকে কটাক্ষ করেন, অথচ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলঃ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দুইটি মসজিদ (মক্কার বাইতুল্লাহ শরীফ ও মদীনার মসজিদে নববী অর্থাৎ হারামাইন শরীফাইন) তাদেরই প্রতিনিধিত্বকারীদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বাধীনে রয়েছে। তারাই এই দুই মহান মসজিদের ইমাম নিয়োগসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করেন। সেই দুই মসজিদে রমযান মাসে এশার নামাযের পরে পর্যায়ক্রমে দুইজন ইমামের নেতৃত্বে দশ রাকআত করে বিশ রাকআত তারাবীহ নামায অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অতঃপর তিন রাকআত বেতের পড়ে এই নামায শেষ করা হয়। প্রথম ইমাম দশ রাকআত পড়িয়ে চলে যান না, বরং দ্বিতীয় ইমামের পিছনে বাকি দশ রাকআতও আদায় করেন এবং দ্বিতীয় ইমামও প্রথম থেকেই তারাবীহ নামাযে উপস্থিত থাকেন।
অতঃপর শুরু হয় সালাতুল লাইল-এর আট রাকআত নামাযের জামাআত। বলতে কি সারা রাত ধরে এই দুই মহান মসজিদে চলতে থাকে নামাযের মত মহান ইবাদত। রমযানের শেষ দশ দিনের রাতের অবস্থা এমন হয় যে, এই দুই মসজিদে তিল ধরার ঠাঁই থাকে না।
তাই আসুন আমরা সকলে নিজ নিজ এলাকায় জনগণকে নিয়ে নিজ নিজ মহল্লার মসজিদে বিশ রাকআত তারাবীর জামাআত কায়েম করে বিশ রাকআত ফরযের সমান মর্যাদা লাভে সচেষ্ট হই। সাথে সাথে কেউ যদি আট, চব্বিশ, ছত্রিশ বা চল্লিশ রাকআত তারাবীহ পড়েন তবে তাদের কটাক্ষ করা থেকেও বিরত থাকি (অনুবাদক)।
৩. হানাফী মাযহাবের ফিকহবিদ ও উসূলবিদগণ এই হাদীসটিকে মারফূ (অর্থাৎ রাসূলের বক্তব্য) হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীস বিশারদদের বক্তব্য এটাকে মাওকূফ (অর্থাৎ ইবনে মাসউদের কথা) হাদীস প্রমাণ করে। হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ নং ৩৬০০০, বাযযার, তাইয়ালিসী, তাবারানী ও আবু নুআইম ইবনে মাসউদ (রা)-র সূত্রে সংকলন করেছেন (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)