আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

২- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৭৬
- নামাযের অধ্যায়
আল-কুরআনের ফযীলাত এবং আল্লাহর যিকির করা মুস্তাহাব।
১৭৬। ইবনে উমার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেনঃ কুরআনের অধিকারী ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হচ্ছে রশি দিয়ে বাঁধা উটের ন্যায়। যদি তা বাঁধা থাকে তবে বসে থাকে, আর ছেড়ে দিলে পলায়ন করে।
أبواب الصلاة
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، حَدَّثَنَا نَافِعٌ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّمَا مَثَلُ صَاحِبِ الْقُرْآنِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الإِبِلِ الْمُعَلَّقَةِ، إِنْ عَاهَدَ عَلَيْهَا أَمْسَكَهَا وَإِنْ أَطْلَقَهَا ذَهَبَتْ»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন মাজীদ সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, তা হাফেজের স্মৃতিপট থেকে খুব দ্রুত চলে যায়, যদি না তা রক্ষায় নিয়মিত চেষ্টা চালানো হয়। তাই কুরআনের হাফেজদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তাদেরকে নিয়মিত কুরআন পড়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। কেননা নিয়মিত না পড়লে তারা কুরআন ভুলে যাবে।

নিয়মিত না পড়লে যে কুরআন স্মৃতিপট থেকে দ্রুত চলে যায়, এ বিষয়টাকে হাদীছে উটের পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এখানে তিনটা উপমা আছে। কুরআনের হাফেজের উপমা দেওয়া হয়েছে উটওয়ালার সঙ্গে। কুরআনের ভুলে যাওয়াকে তুলনা করা হয়েছে উটের পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে। আর নিয়মিত কুরআন পড়াকে তুলনা করা হয়েছে উট বেঁধে রাখার সঙ্গে।

উট এক পলায়নপর প্রাণী। সুযোগ পেলেই পালিয়ে যায়। তাই তাকে রশি দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে রাখতে হয়। ভালোভাবে বেঁধে না রাখা হলে সে মালিক বা রাখালের হাতছাড়া হয়ে যাবে। কুরআন মুখস্থ রাখার বিষয়টাও এরকমই। বরং এরচে'ও বেশি কঠিন। উট যত না পালায়, স্মৃতিপট থেকে কুরআন তারচে'ও বেশি দ্রুত হারিয়ে যায়। তাই কুরআন স্মৃতিপটে ধরে রাখার জন্য নিয়মিত পাঠ করতে হয়।

মানুষ স্বভাবতই বিস্মৃতিপ্রবণ। সে তার ওয়াদার কথা ভুলে যায়। ভুলে যায় শোনা কথা। কেউ তাকে কোনওকিছু একটা বলল, পরে আর তা সে মনে করতে পারে না। যা-কিছু পড়াশোনা করে, তার অনেকটাই ভুলে যায়। কতকিছু মুখস্থ করা হয়, তার কতটুকুই বা মনে থাকে? মোটকথা মানুষ অন্যেরটা তো বটেই, নিজেরও বলা কথা ভুলে যায় এবং ভুলে যায় নিজের করা কাজ। এ অবস্থায় কুরআন মাজীদ ভুলে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ কুরআনের বাণী মানুষের কথার মতো নয়। কুরআনের ভাষা অলৌকিক। তার ভাব সুগভীর। কুরআনের রয়েছে অসাধারণ শক্তি। তার প্রভাব দুর্দান্ত। কুরআনের আছে অবর্ণনীয় ওজন। তার আছে বিশেষ জ্যোতি। যে মানুষ নিজের বলা কথা পর্যন্ত ভুলে যায়, সে এতসব বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ পবিত্র কালাম কীভাবে স্মরণ রাখবে, যদি না তার বিশেষ যত্ন নেয়? তাই হাদীছে হুকুম করা হয়েছে-

تَعاهَدوا هذا القُرآنَ (তোমরা এই কুরআন সংরক্ষণে যত্নবান থাকো)। অর্থাৎ উটকে সংরক্ষণ করার জন্য যেমন মজবুত করে বেঁধে রাখা হয়, তেমনি স্মৃতিপটে কুরআন সংরক্ষণ করার জন্য তোমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করতে থাকো। নিয়মিত তিলাওয়াত করার দ্বারা স্মৃতিপটে তা আবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে। ফলে তা হারিয়ে যাবে না।

কুরআন হিফজ করার ফযীলত বিপুল। কুরআন পড়ার রয়েছে বিশাল নেকী। যে ব্যক্তি হাফেজ নয়, তার তুলনায় হাফেজের পক্ষে অনেক বেশি পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা সম্ভব। সে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, ওযু অবস্থায়, বিনা ওযূতে সর্বাবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে। অহাফেজদের পক্ষে এমনটা সম্ভব হয় না। তাই কুরআন পাঠের অশেষ ছাওয়াব অর্জনের জন্য হাফেজ হওয়ার কোনও বিকল্প নেই। এজন্য কেবল হাফেজ হওয়াই নয়; বরং হিফজকে সংরক্ষণ করাও জরুরি। তাই হাফেজদেরকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে তারা যেন নিয়মিত কুরআন পড়তে থাকে। তাহলে তারা কুরআন ভুলবে না এবং অব্যাহতভাবে কুরআন পড়ার ছাওয়াব পেতে থাকবে।

এই উৎসাহদানের আরও একটি লক্ষ্য আছে। তা হলো কুরআনের হেফাজত। কুরআন সর্বশেষ আসমানী কিতাব। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের হিদায়াতের জন্য এ কিতাবের সংরক্ষণ জরুরি ছিল। সে জরুরত পূরণের লক্ষ্যে যেমন কুরআন লিপিবদ্ধ করার পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, তেমনি মানুষের স্মৃতিশক্তিতে অঙ্কিত রাখার নিরবচ্ছিন্ন ধারাও চালু করা হয়েছে। তাই কুরআনের বাণী অত্যন্ত ভারী হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে এ যাবৎকাল পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ কুরআন মুখস্থ করার ও মুখস্থ রাখার সাধনা অব্যাহত রেখেছে। এটা সে সাধনারই সুফল যে, অত্যন্ত ভারী এবং স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার বৈশিষ্ট। সত্ত্বেও বিস্মৃতিপ্রবণ মানুষের স্মৃতিতে এ কুরআন যুগ-যুগান্তর ধরে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। এটা কুরআনের এক অলৌকিকত্বও বটে। মানুষ সহজ-সাধারণ সাহিত্যপুস্তক বা কবিতার বই পর্যন্ত মুখস্থ রাখতে পারে না। অথচ এ কঠিন ও অসাধারণ গ্রন্থ আগাগোড়া তাদের স্মৃতিপটে নিখুঁতভাবে এঁকে রাখতে পারছে। তাদের মধ্যে রয়েছে নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সর্বস্তরের লোক। এদিক থেকে মনে হয় কুরআনের হাফেজ হওয়া ও হিফজ ধরে রাখা কতইনা সহজ। সহজ ও কঠিনের কী অপূর্ব মিলন অলৌকিক এ গ্রন্থে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন তিলাওয়াতে হাফেজদের অবহেলা-অলসতার কোনও সুযোগ নেই। তাদেরকে অবশ্যই নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে। কেননা কুরআন ভুলে যাওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়।

খ. যারা হাফেজ নয়, কিন্তু কুরআনের বিশেষ বিশেষ অংশ বা বিশেষ বিশেষ সূরা মুখস্থ করেছে, তাদেরও উচিত মুখস্থ করা সে অংশ নিয়মিত পড়তে থাকা, যাতে তা ভুলে না যায়।

গ. গুরুত্বপূর্ণ কথা কসম করে বলাতে কোনও দোষ নেই।

ঘ. গুরুত্বপূর্ণ কথা উপমা বা দৃষ্টান্তের সঙ্গে বললে তা অন্তরে বেশি রেখাপাত করে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)