আল মুওয়াত্তা-ইমাম মুহাম্মাদ রহঃ

২- নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৬৮
- নামাযের অধ্যায়
রাতের নামায (সালাতুত তাহাজ্জুদ)।
১৬৮। যায়েদ ইবনে খালিদ আল-জুহানী (রাযিঃ) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে কি নিয়মে নামায পড়েন আমি অবশ্যই তা দেখবো। অতএব আমি তাঁর ঘরের চৌকাঠ অথবা তাঁবুর খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দুই রাকআত, লম্বা কিরাআতে দুই রাকআত, দুই রাকআত এর চেয়ে কম দীর্ঘ এবং আরো দুই রাকআত তার চেয়েও কম দীর্ঘ সময়ে পড়লেন। অতঃপর এক রাআত বেতের পড়লেন।**
أبواب الصلاة
أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي بَكْرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ قَيْسِ بْنِ مَخْرَمَةَ، عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ، قَالَ: قُلْتُ: " لأَرْمُقَنَّ صَلاةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: فَتَوَسَّدْتُ عَتَبَتَهُ أَوْ فُسْطَاطَهُ، قَالَ: فَقَامَ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ طَوِيلَتَيْنِ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ دُونَهُمَا ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ دُونَ اللَّتَيْنِ قَبْلَهُمَا، ثُمَّ أَوْتَرَ "

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

** মুওয়াত্তার বিভিন্ন সংকলনে হাদীসটি বিভিন্নভাবে উক্ত হয়েছে। এখানে বেতের বাদে আট রাকআত, অপর সংকলনে দশ রাআত এবং ইয়াহ্ইয়া আন্দালুসীর সংকলনে অর্থাৎ মুওয়াত্তা ইমাম মালেক-এ (বেতের অনুচ্ছেদ) বারো রাকআত উল্লেখ।
মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য, তার স্রষ্টা মহান আল্লাহর সাথে সুগভীর সম্পর্ক স্থাপন এবং আল্লাহর দীনের পথে অবিচল থেকে ব্যাপকভাবে তার প্রচার-প্রসারের মানসিক শক্তি অর্জন এবং এ পথের প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তির মুকাবিলা করার শক্তি অর্জনের জন্য দৈনন্দিন বিধিবদ্ধ ইবাদতের সাথে সাথে ঐচ্ছিক নৈশ ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন মজীদে বাধ্যতামূলক ইবাদতের পাশাপাশি ঐচ্ছিক ইবাদতে মগ্ন হওয়ার জন্যও উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে, তার ফযীলাত বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ﷺ -কে সম্বোধন করে বলেনঃ “এবং রাতের কিছু অংশে তুমি তাহাজ্জুদ কায়েম করো, তা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য" (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৭৯)। “হে বস্ত্রাবৃত! রাতে জাগ্রত হও, কিছু অংশ ব্যতীত, অর্ধ রাত বা তদপেক্ষা কিছু বেশি” (সূরা মুযযাম্মিলঃ ১-৪)। "রাতে উত্থান (প্রবৃত্তিকে) দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। দিনের বেলা তোমার রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম যিকির করো এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন হও" (সূরা মুযযাম্মিলঃ ৬-৮)। “নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক জানেন যে, তুমি কখনো রাতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, কখনো অর্ধাংশ এবং কখনো এক-তৃতীয়াংশ জাগরণ করো, তোমার সাথে যারা আছে তাদের একটি দলও" (মুযযাম্মিলঃ ২০)। “তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাতো। রাতের শেষভাগে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো” (সূরা যারিয়াতঃ ১৭-১৮)।
তাই নবী ﷺ -এর জীবনধারায় আমরা লক্ষ্য করি রাতের ইবাদতের কঠোর অনুশীলন, সাথে সাথে তাঁর সাহাবীগণের জীবনেও। তবে তাঁকে প্রতিটি অনুশীলনেই ভারসাম্য বজায় রাখতে লক্ষ্য করা যায় । আনাস ইবনে মালেক (রা) বলেন, “তুমি তাঁকে নামাযরত অবস্থায় দেখতে চাইলে তাই দেখতে পেতে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইলে তাই দেখতে পেতে" (বুখারীঃ ১০৭০ নং হাদীস)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে কখনো বেতেরসহ ১৩ রাকআত, কখনো ১১ রাকআত, কখনো ৯ রাকআত, আবার কখনো ৭ রাকআত নফল নামায পড়তেন, তার মধ্যে বেতের হতো কখনো এক রাকআত, কখনো তিন রাকআত আবার কখনো পাঁচ রাআত। তবে অধিকাংশই তিনি বেতের এক অথবা তিন রাকআত পড়তেন। এ সম্পর্কে বেশির ভাগ হাদীস উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত। আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে ১১ রাকআত নামায পড়তেন। তিনি এক একটি সিজদা এতো দীর্ঘ করতেন যে, তোমাদের যে কেউ ততোক্ষণে পঞ্চাশ আয়াত পরিমাণ তিলাওয়াত করতে পারতো” (বুখারীঃ ১০৫১, মুসলিমঃ ১৫৮৭, ১৫৮৮, ১৫৯৬; আবু দাউদঃ ১৩৩৪, ১৩৩৫, ১৩৩৬, ১৩৪১; তিরমিযীঃ ১১৪, নাসাঈ, ইবনে মাজা ১৩৫৮)। মুসলিমের বর্ণনায় আছে, তিনি দুই রাকআত করে পড়তেন এবং বেতের এক রাকআত। ইমাম মালেক (র)-র আল-মুওয়াত্তায়ও তদ্রূপ উল্লেখ আছে (বেতের নামায অধ্যায়)। এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, তিনি রাতে দশ রাকআত নফল নামায পড়েছেন। আয়শা (রা) বলেন, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে রাতে এই নামায পড়তে সক্ষম না হলে তিনি দিনের বেলা বারো রাকআত নামায পড়ে নিতেন (মুসলিমঃ ১৬০৯, ১৬১৩, ১৬১৪; তিরমিযীঃ ৪১৮; আবু দাউদঃ ১৩৪২, ১৩৪৬, ১৩৫১)।
আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর রাতের (নফল) নামায ছিল সাত রাকআত অথবা নয় রাকআত অথবা এগারো রাকআত, বেতের ও ফজরের সুন্নাতও তার অন্তর্ভুক্ত (বুখারীঃ ১০৬৮)। তাঁর অপর বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বেতের ও ফজরের সুন্নাতসহ মোট ১৩ রাকআত নামায পড়তেন (বুখারীঃ ১০৬৯; আবূ দাঊদঃ ১৩৫৯, ১৩৩৮, ১৩৩৯, ১৩৪০; মুসলিমঃ ১৫৯০, ১৫৯২)। আবু দাউদের ১৩৫৯ নং হাদীস অনুযায়ী ছয় রাকআত নফল, পাঁচ রাকআত বেতের এবং দুই রাকআত ফজরের সুন্নাত। মুসলিমের ১৫৯০ এবং আবু দাউদের ১৩৩৮ নং হাদীস অনুযায়ী ১৩ রাকআতের মধ্যে পাঁচ রাকআত বেতের। মুসলিম ১৫৯২ নং হাদীস অনুসারে উক্ত তেরো রাকআতের মধ্যে ফজরের দুই রাকআত সুন্নাতও অন্তর্ভুক্ত। আবু দাউদের ১৩৪০ নং হাদীস অনুযায়ী আট রাকআত নফল, এক রাকআত বেতের এবং দুই রাকআত বসে পড়া নফল এবং দুই রাকআত ফজরের সুন্নাত। আয়েশা (রা) কর্তৃক বিভিন্ন সনদে বর্ণিত এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর নফল নামায ছিল দশ রাআত, আট রাকআত অথবা ছয় রাকআত ।
আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ রমযান মাস বা অন্য সময়ে (রাতে) এগারো রাকআতের অধিক (নফল) নামায পড়তেন না। তুমি তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি চার রাকআত নামায পড়তেন, তাঁর সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে তুমি আমাকে আর জিজ্ঞেস করো না, অতঃপর তিন রাকআত (বিতর) পড়তেন (বুখারীঃ ১০৭৬, মুসলিমঃ ১৫৯৩, তিরমিযীঃ ৪২৫; মুওয়াত্তা, বেতের অনুচ্ছেদ)। তিরমিযীর বর্ণনায় এক রাকআত বেতের উল্লেখিত হয়েছে। এ হাদীস অনুসারে বেতের তিন রাকআত হলে নফল আট রাকআত এবং বেতের এক রাকআত হলে নফল হবে দশ রাকআত ।
আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তেরো রাকআত নামায পড়তেন, আট রাকআত পড়ার পর বেতের পড়তেন, অতঃপর বসে দুই রাকআত পড়তেন, অতঃপর ফজরের ফরযের পূর্বে দুই রাকআত পড়তেন (মুসলিমঃ ১৫৯৪, আবু দাউদঃ ১৩৫২)। এ হাদীস অনুযায়ী হাল্কী নফলসহ রাতের নফল নামাযের রাকআত সংখ্যা হয় দশ।
আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে জাগ্রত হয়ে উযু করে নয় রাকআত নামায পড়তেন, অষ্টম রাকআতে বসে দোয়া পড়তেন, তারপর সালাম না ফিরিয়েই উঠে দাঁড়িয়ে নবম রাআত পড়তেন, অতঃপর দোয়া করে সালাম ফিরাতেন, অতঃপর বসে দুই রাআত নামায পড়তেন (মুসলিমঃ ১৬০৯, আবু দাউদঃ ১৩৪২, ১৩৪৬, ১৩৫১)। এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, মহানবী ﷺ এক সালামে নয় রাকআত নামায পড়তেন, যার মধ্যে এক রাকআত ছিলো বেতের এবং তিনি অষ্টম ও নবম রাকআতে বৈঠক করতেন, অতঃপর বসে দুই রাকআত (হাল্কী) নফল নামায পড়তেন। অর্থাৎ তিনি দশ রাকআত নফল নামায পড়তেন।
আয়েশা (রা) বলেন, রাতের বেলা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর নামায ছিল দশ রাকআত, এক রাকআত বেতের পড়তেন এবং ফজরের দুই রাকআত সুন্নাতও পড়তেন। এই হলো তেরো রাকআত (মুসলিমঃ ১৫৯৭)। ইমাম মালেক (র)-এর মুওয়াত্তা গ্রন্থেও ফজরের দুই রাকআত সুন্নাতসহ তেরো রাকআতের উল্লেখ আছে (বেতেরের নামায অনুচ্ছেদ)।
আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে চার রাআত ও তিন রাআত বেতের পড়তেন, কখনো হয় রাকআত ও তিন রাকআত বেতের পড়তেন, কখনো আট রাকআতও পড়তেন এবং (কখনো) তিনি মোট তেরো রাকআত নামায পড়তেন। তিনি কখনো সাত রাকআতের কম এবং তেরো রাকআতের অধিক নামায পড়তেন না। তিনি কখনো ফজরের সুন্নাত ত্যাগ করতেন না (আবু দাউদঃ ১৩৬২)। এই হাদীসে আয়েশা (রা)-র মুখেই তৎকর্তৃক বর্ণিত সবগুলো হাদীসের সারাংশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে তাহাজ্জুদের নামায রীতিমত আট রাকআতই পড়তেন না, বরং বারো থেকে ছয় রাকআতের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ ছিলো। এখন দেখা যাক, অপরাপর সাহাবী থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বলেন, এক ব্যক্তি মহানবী ﷺ -কে জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাতের নামায কিরূপ? তিনি বলেন, দুই রাকআত করে। তুমি ভোর হয়ে যাওয়ার আশংকা করলে এক রাকআত বেতের পড়ে নিও (বুখারীঃ ১০৬৬; মুসলিমঃ ১৬১৮, ১৬১৯, ১৬২০, ১৬২১, ১৬৩০, ১৬৩১, ১৬৩৩; আবু দাউদঃ ১৩২৬; তিরমিযীঃ ৪১২)। এ হাদীসে রাতের তাহাজ্জুদ নামাযের রাকআত সংখ্যার উল্লেখ নাই, তবে তা দুই রাকআত করে পড়তে হবে এবং এক রাকআত বেতেরের কথা উল্লেখ আছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী ﷺ -এর রাতের নামায ছিলো তেরো রাকআত (বুখারীঃ ১০৬৭)। উম্মুল মুমিনীন মাইমূনা (রা)-র ঘরে ঘুমানোর রাতে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ নামায পড়তে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি তাঁর বাম পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমার হাত ধরে আমাকে তাঁর ডান পাশে এনে দাঁড় করান। রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর রাতের নামায তেরো রাকআত পূর্ণ হলো (মুসলিমঃ ১৬৫৮)। মুসলিমের ১৬৬১ ও ১৬৬৪ নং হাদীসেও তেরো রাকআতের উল্লেখ আছে (তিরমিযী ৪১৬, ইবনে মাজা ১৩৬৩)। মুসলিমের ১৬৫৯ নং হাদীসে আছেঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার দুই দুই রাকআত করে মোট বারো রাকআত নামায পড়েন, তারপর বেতের পড়েন। অতঃপর মুআযযিন এলে তিনি ফজরের দুই রাকআত সুন্নাত পড়েন। ইমাম মালেকের মুওয়াত্তা গ্রন্থের বেতের অনুচ্ছেদেও উক্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুনান আবু দাউদে ১৩৬৭ নং হাদীসের বক্তব্যও তাই, তবে এখানে এক রাকআত বিতরের উল্লেখ আছে। মুসলিমের ১৬৬২ এবং আবু দাউদের ১৩৬৪ ও ১৩৬৫ নম্বর হাদীসে এগারো রাকআত উল্লেখ আছে এবং আবু দাউদের বর্ণনায় তার মধ্যে এক রাকআত বিতরের উল্লেখ আছে। সহীহ মুসলিমের ১৬৬৯ নম্বর হাদীসে ছয় রাকআতের উল্লেখ আছে। আবু দাউদের ১৩৫৩ নং হাদীসেও ছয় রাকআত এবং বেতের তিন রাকআত উল্লেখ আছে । একই গ্রন্থের ১৩৫৫ নং হাদীসে (ফাদল ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত) এক রাআত বেতেরসহ এগারো রাকআত উল্লেখ আছে।
অতএব আমরা আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের ন্যায় ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে বারো রাকআত থেকে ছয় রাকআতের মধ্যে তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন। তিনি সর্বদা আট রাকআতই পড়তেন, এরূপ দাবি যথার্থ নয়।
যায়েদ ইবনে খালিদ আল-জুহানী (রা) বলেন, (আমি স্থির করলাম) আজ রাতে আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর নামাযের প্রতি দৃষ্টি রাখবো। তিনি প্রথমে সংক্ষেপে দুই রাকআত পড়েন, তারপর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর দুই রাকআত পড়েন, তারপর দুই রাকআত পড়েন যা তৎপূর্ববর্তী দুই রাকআতের চেয়ে কম দীর্ঘ, তারপর তৎপূর্ববর্তী দুই রাকআতের চেয়ে কম দীর্ঘ দুই রাকআত পড়েন, তারপর তৎপূর্ববর্তী দুই রাকআতের চেয়ে কম দীর্ঘ দুই রাকআত পড়েন, তারপর তৎপূর্ববর্তী দুই রাকআতের চেয়ে কম দীর্ঘ দুই রাকআত পড়েন, তারপর বেতের পড়েন। এই হলো মোট তেরো রাকআত (মুসলিমঃ ১৬৭৪, আবু দাউদঃ ১৩৬৬; মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, বেতের অনুচ্ছেদ; ইবনে মাজাঃ ১৩৬২)। এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ নফল (তাহাজ্জুদ) নামায বারো রাকআত পড়তেন এবং সবগুলো হাদীস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি অধিকাংশ সময় বারো রাকআতই পড়তেন, আট রাকআত নয়।
এই স্থানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনাযোগ্য। (এক) রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতের অধিকাংশ সময় নামাযে কাটাতেন, তারপরও তাঁর নামাযের রাকআত সংখ্যা এতো কম কেন? তার কারণ এই যে, তিনি এসব নামাযে সূরা বাকারা, আল ইমরান, নিসা, মাইদা ও আনআমের মতো দীর্ঘ সূরা পড়তেন, রুকূ-সিজদায়ও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতেন এবং দীর্ঘ দোয়া পড়তেন, আমাদের মতো ফাতিহা ও আলাম তারা দ্বারা নামায শেষ করতেন না। তাছাড়া তিনি কিছুক্ষণ নামায পড়ে আবার কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। এভাবে তাঁর রাত শেষ হয়ে যেতো। (দুই) এখন প্রশ্ন হলো, রাতে বারো রাকআতের অধিক নামায পড়া কি জায়েয আছে? আমরা নিশ্চিত জানি যে, পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামায ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নাতে মুআক্কাদা নামাযের রাকআত সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি করা যায় না। কিন্তু নফল নামাযের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা নেই। নফল নামায যেমন ঐচ্ছিক নামায, তেমনি ইচ্ছা করলে তা বারো রাকআতের অধিকও পড়া যায়। দীর্ঘ সূরা, দীর্ঘ দোয়া খুব কম লোকেরই জানা আছে। অতএব তারা যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সূরাগুলো দ্বারা অধিক সংখ্যক রাআত নামায পড়ে, তাতে আপত্তি করার কিছু নেই।
তৃতীয় প্রশ্ন হলো, রমযান মাসেও কি রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বোচ্চ বারো রাকআত নামায পড়তেন? এখানে মনে রাখতে হবে যে, সাধারণ মাসগুলোর রাতের নফল নামায় সালাতুল লাইল (রাতের নামায) বা সালাতুত তাতাব্বু (ঐচ্ছিক নামায) নামে অভিহিত এবং রমযান মাসের রাতের নামায কিয়ামুল লাইল (রাতের দাঁড়ানো) নামে অভিহিত। এই মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ দুই নামাযই পড়তেন। যেমন বাইতুল্লাহ শরীফে (কাবার চত্বরে) ও মদীনার মসজিদে নববীতে বর্তমান কালেও রমযান মাসের রাতের প্রথমাংশে বিশ রাকআত তারাবীহ নামায (দুইজন ইমাম দশ রাকআত করে পড়ান) এবং শেষাংশে সাহরীর পূর্বে বারো রাকআত নামায পড়া হয়। উক্ত দুই নামাযের পরও লোকেরা ঐ দুই মসজিদে রমযান মাসে সারা রাত নামায, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-দুরূদ পাঠে মশগুল থাকেন।
অবশ্য সিহাহ সিত্তায় রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর তারাবীহ নামাযের বিষয় উল্লেখ আছে, কিন্তু তাতে তার রাকআত সংখ্যা উল্লেখ নাই । উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে নামায পড়ছিলেন। কিছু সংখ্যক লোক তাঁর সাথে নামাযে যোগদান করেন। পরবর্তী রাতেও তিনি নামায পড়েন এবং লোকের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। তৃতীয় বা চতুর্থ রাতেও তারা সমবেত হন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের নিকট যাননি। ভোরবেলা তিনি বলেন, তোমরা যা করেছো আমি তা দেখেছি। তোমাদের নিকট বের হয়ে আসতে এ আশংকাই আমার প্রতিবন্ধক ছিলো যে, এটা তোমাদের জন্য ফরয করা হয় কিনা। এটি রমযান মাসের ঘটনা (বুখারীঃ১০৫৭, মুসলিমঃ ১৬৫৩, ১৬৫৪; আবু দাউদ, ১২৭৩, ১৩৭৪)। হাদীসটি আবু যার (রা) কর্তৃকও বর্ণিত আছে (আবু দাউদঃ ১৩৭৫, তিরমিযীঃ ৭৫৩; ইবনে মাজাঃ ১৩২৭) (অনুবাদক)।
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান