শরহু মাআ’নিল আছার- ইমাম ত্বহাবী রহঃ

৬. হজ্বের অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৯৪২
আন্তর্জাতিক নং: ৩৯৪৩
হজ্বের অধ্যায়
মুযদালিফায় উকুফ (অবস্থান) করার বিধান
৩৯৪২-৪৩। আলী ইবন মা'বাদ (রাহঃ) ..... আব্দুর রহমান ইবন ইয়ামুর দায়লী (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আরাফাতে অবস্থানরত দেখেছি। তাঁর কাছে নজদ অধিবাসী কিছু লােক এসে তাঁকে হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, হজ্জ হল আরাফা দিবস। যে ব্যক্তি ফজরের সালাতের পূর্বে মুযদালিফায় পৌঁছে যাবে সে হজ্জকে পেয়ে গেল। মিনার দিন হল তিন দিন অর্থাৎ আইয়ামে তাশরিক। যে ব্যক্তি উভয় দিনের (পরে প্রত্যাবর্তনে) তাড়াতাড়ি করবে তার কোন গুনাহ্ নেই আর যে ব্যক্তি (তৃতীয় দিন অবস্থানে) বিলম্ব করবে তারও কোন গুনাহ নেই। তারপর তিনি তাঁর পিছনে তাঁর বাহনে এক ব্যক্তিকে বসালেন, যে একথাগুলাে ঘােষণা দিচ্ছিল।


আলী ইব‌ন মা’বাদ (রাহঃ) ..... আব্দুর রহমান ইব্‌ন ইয়ামুর (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন। তারপর তিনি অনুরূপ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি নজদ অধিবাসীদের প্রশ্ন এবং এক ব্যক্তিকে পিছে বসানাের উল্লেখ করেন নি।
বস্তুত এই হাদীসে ব্যক্ত হয়েছে যে, নজদ অধিবাসী কতিপয় লােক রাসূলুল্লাহ্ কে হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছে এবং তাদেরকে তার উত্তর ছিলঃ হজ্জ হল আরাফা দিবস। এ কথা আমরা অবশ্যই অবহিত আছি যে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) -এর উত্তরটি পূর্ণাঙ্গ ছিল, যাতে হ্রাস-বৃদ্ধি ছিল না। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে ‘জাওয়ামিউল কালিম' (ব্যাপক ব্যঞ্জনামূলক বাক্যাবলী) দান করেছেন। যদি হজ্জ সম্পর্কে প্রশ্ন করার প্রাক্কালে তাদের ইচ্ছা এটা হতাে যে, হজ্জের মধ্যে কি কি বিষয়াবলী আবশ্যক, তাহলে তিনি অবশ্যই আরাফাত, তাওয়াফ ও মুযদালিফাসহ ঐ বিষয়গুলাে উল্লেখ করতেন, যা হজ্জের মধ্যে করা হয়ে থাকে। যখন তিনি তার উত্তরে তা ছেড়ে দিয়েছেন তাতে বুঝা গেল যে, তাদের প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল এটা যে, হজ্জের মাঝে কোন কোন বিষয় রয়েছে যা ছুটে গেলে হজ্জ ছুটে যায়। তখন তিনি তাদেরকে উত্তর দিয়ে বললেন, হজ্জ হল আরাফা দিবস। যদি মুযদালিফার হুকুমও আরাফার অনুরূপ হত তাহলে তিনি তাদেরকে আরাফার সঙ্গে মুযদালিফারও উল্লেখ করতেন। কিন্তু তিনি শুধু আরাফাতের উল্লেখ করেছেন। কেননা তা হজ্জের ফরয সমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা ছুটে গেলে হজ্জ ছুটে যায়। তারপর তিনি নতুনভাবে কথা বললেন, যেন লােকদেরকে শিক্ষা দিতে পারেন। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি ফজর উদিত হওয়ার পূর্বে মুযদালিফাকে পেল সে হজ্জকে পেল। এটার এই অর্থ নয় যে, সে সমস্ত হজ্জকে পেল। কেননা তার প্রথমােক্ত বাক্য দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, হজ্জ হল আরাফাতে অবস্থান) করা। এতে অবধারিতরূপে সাব্যস্ত হল যে, আরাফাতের (উকুফ) ছুটে যাওয়া হজ্জ ছুটে যাওয়ার নামান্তর। তারপর বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ফজরের সালাতের পূর্বে মুযদালিফাকে পেল সে হজ্জকে পেল । এর অর্থ এটা নয় যে, তার উপর হজ্জের কোন আমল অবশিষ্ট নেই। কেননা এর পরে তাওয়াফে যিয়ারত রয়েছে যা ওয়াজিব (ফরয), যা আদায় করা অপরহাির্য। (বরং এর অর্থ হল যে, সে প্রথমে তার আরাফাতে অবস্থানের কারণে হজ্জকে পেল। এই সমস্ত রিওয়ায়াতের অর্থাবলীর এই ব্যাখ্যাই সঠিক ও উৎকৃষ্ট, কেননা এতে পারস্পরিক বৈপরিত্য বিদ্যমান থাকে না।
এ বিষয়ের যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ হল নিম্নরূপঃ আমরা এক সর্ববাদিসম্মত মূলনীতি লক্ষ্য করছি যে, দুর্বল। লােকেরা মুযদালিফা থেকে রাতে যাত্রা ত্বরান্বিত করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বানূ আব্দুল মুত্তালিব এর শিশু-কিশােরদেরকেও অনুরূপ নির্দেশ প্রদান করেছেন। এই বিষয়টি আমরা এই গ্রন্থেরই স্বস্থানে অতিসত্বর উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ্। তিনি সাওদা (রাযিঃ) কে মুযদালিফায় উকুফ (অবস্থান) পরিত্যাগ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন।
كتاب مناسك الحج
3942 - حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مَعْبَدٍ , قَالَ: ثنا يَعْلَى بْنُ عُبَيْدٍ , قَالَ: ثنا سُفْيَانُ , عَنْ بُكَيْرِ بْنِ عَطَاءٍ , عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ يَعْمُرَ الدِّيلِيِّ , قَالَ: " رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاقِفًا بِعَرَفَاتٍ , فَأَقْبَلَ أُنَاسٌ مِنْ أَهْلِ نَجْدٍ فَسَأَلُوهُ عَنِ الْحَجِّ. فَقَالَ: " الْحَجُّ يَوْمُ عَرَفَةَ , وَمَنْ أَدْرَكَ جَمْعًا قَبْلَ صَلَاةِ الصُّبْحِ , فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ أَيَّامَ مِنًى ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ , أَيَّامَ [ص:210] التَّشْرِيقِ {فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ} [البقرة: 203] عَلَيْهِ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ «ثُمَّ أَرْدَفَ خَلْفَهُ رَجُلًا يُنَادِي بِذَلِكَ»

3943 - حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مَعْبَدٍ , قَالَ: ثنا شَبَابَةُ بْنُ سَوَّارٍ , قَالَ: ثنا شُعْبَةُ , عَنْ بُكَيْرِ بْنِ عَطَاءٍ , عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ يَعْمُرَ , قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ ذَكَرَ مِثْلَهُ , وَلَمْ يَذْكُرْ سُؤَالَ أَهْلِ نَجْدٍ , وَلَا إِرْدَافَهُ الرَّجُلَ فَفِي هَذَا الْحَدِيثِ أَنَّ أَهْلَ نَجْدٍ سَأَلُوا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْحَجِّ , فَكَانَ جَوَابُهُ لَهُمْ «الْحَجُّ يَوْمُ عَرَفَةَ» وَقَدْ عَلِمْنَا أَنَّ جَوَابَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ الْجَوَابُ التَّامُّ , الَّذِي لَا نَقْصَ فِيهِ , وَلَا فَضْلَ , لِأَنَّ اللهَ تَعَالَى قَدْ آتَاهُ جَوَامِعَ الْكَلِمِ وَخَوَاتِمَهُ فَلَوْ كَانَ عِنْدَمَا سَأَلُوهُ عَنِ الْحَجِّ أَرَادُوا بِذَلِكَ مَا لَا بُدَّ مِنْهُ فِي الْحَجِّ , لَكَانَ يَذْكُرُ عَرَفَةَ , وَالطَّوَافَ , وَمُزْدَلِفَةَ , وَمَا يُفْعَلُ مِنَ الْحَجِّ. فَلَمَّا تَرَكَ ذَلِكَ فِي جَوَابِهِ إِيَّاهُمْ , عَلِمْنَا أَنَّ مَا أَرَادُوا بِسُؤَالِهِمْ إِيَّاهُ عَنِ الْحَجِّ , هُوَ مَا إِذَا فَاتَ , فَاتَ الْحَجُّ , فَأَجَابَهُمْ بِأَنْ قَالَ: «الْحَجُّ يَوْمُ عَرَفَةَ» فَلَوْ كَانَتْ مُزْدَلِفَةُ كَعَرَفَةَ , لَذَكَرَ لَهُمْ مُزْدَلِفَةَ , مَعَ ذِكْرِهِ عَرَفَةَ , وَلَكِنَّهُ ذَكَرَ عَرَفَةَ خَاصَّةً , لِأَنَّهَا صُلْبُ الْحَجِّ , الَّذِي إِذَا فَاتَ , فَاتَ الْحَجُّ. ثُمَّ قَالَ كَلَامًا مُسْتَأْنَفًا , لِيَعْلَمَ النَّاسُ أَنَّ مَنْ أَدْرَكَ جَمْعًا , قَبْلَ طُلُوعِ الْفَجْرِ , فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ , لَيْسَ عَلَى مَعْنَى أَنَّهُ أَدْرَكَ جَمِيعَ الْحَجِّ , لِأَنَّهُ قَدْ ثَبَتَ فِي أَوَّلِ كَلَامِهِ «الْحَجُّ عَرَفَةَ» فَأَوْجَبَ بِذَلِكَ أَنَّ فَوْتَ عَرَفَةَ , فَوْتُ الْحَجِّ. ثُمَّ قَالَ: «وَمَنْ أَدْرَكَ جَمْعًا قَبْلَ صَلَاةِ الصُّبْحِ , فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ» لَيْسَ عَلَى مَعْنَى أَنَّهُ لَمْ يَبْقَ عَلَيْهِ مِنَ الْحَجِّ شَيْءٌ , لِأَنَّ بَعْدَ ذَلِكَ طَوَافُ الزِّيَارَةِ , وَهُوَ وَاجِبٌ لَا بُدَّ مِنْهُ , وَلَكِنْ فَقَدْ أَدْرَكَ الْحَجَّ , بِمَا تَقَدَّمَ لَهُ مِنَ الْوُقُوفِ بِعَرَفَةَ. فَهَذَا أَحْسَنُ مَا خُرِّجَ مِنْ مَعَانِي هَذِهِ الْآثَارِ , وَصُحِّحَتْ عَلَيْهِ وَلَمْ تَتَضَادَّ. وَأَمَّا وَجْهُ ذَلِكَ مِنْ طَرِيقِ النَّظَرِ , فَإِنَّا قَدْ رَأَيْنَا الْأَصْلَ الْمُجْتَمَعَ عَلَيْهِ أَنَّ لِلضَّعَفَةِ أَنْ يَتَعَجَّلُوا مِنْ جَمْعٍ بِلَيْلٍ. وَكَذَلِكَ أَمَرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُغَيْلِمَةَ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ , وَسَنَذْكُرُ ذَلِكَ فِي مَوْضِعِهِ مِنْ كِتَابِنَا هَذَا , إِنْ شَاءَ اللهُ تَعَالَى. وَرَخَّصَ لِسَوْدَةِ فِي تَرْكِ الْوُقُوفِ بِهَا

হাদীসের ব্যাখ্যা:

যেহেতু ওকূফে আরাফার উপর হজ্ব নির্ভর করে, তাই এর মধ্যে এতটুকু সুযোগ রাখা হয়েছে যে, কেউ যদি ৯ই যিলহজ্ব দিনের বেলা আরাফায় পৌঁছতে না পারে, (যা হচ্ছে ওকূফের আসল সময়,) সে যদি পরবর্তী রাতের কোন অংশেও সেখানে পৌঁছে যায়, তাহলে তার ওকূফ আদায় হয়ে যাবে এবং সে হজ্ব থেকে বঞ্চিত গণ্য হবে না।

আরাফার দিনের পরের দিনটি অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্ব হচ্ছে কুরবানীর দিন। এ দিন একটি জামরায় রমী, কুরবানী ও মাথা মুড়ানোর পর ইহরামের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় এবং এ দিনেই মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে যিয়ারত করতে হয়। তারপর মিনায় বেশীর চেয়ে বেশী তিন দিন আর কমপক্ষে দু'দিন অবস্থান করে তিনটি জামরাতেই পাথর নিক্ষেপ করা হজ্বের আহকামের অন্তর্ভুক্ত। তাই কোন ব্যক্তি যদি ১১ ও ১২ই যিলহজ্ব জামরায় পাথর নিক্ষেপ করে মিনা থেকে চলে যায়, তাহলে তার উপর কোন গুনাহ্ বর্তাবে না। আর কেউ যদি ১৩ তারিখও অবস্থান করে এবং পাথর নিক্ষেপ করে নেয়, তাহলে এটাও জায়েয।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান