আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ
৫৩- বিবাহ-শাদী সম্পর্কিত অধ্যায়
হাদীস নং: ৪৭১২
আন্তর্জাতিক নং: ৫০৭৯
- বিবাহ-শাদী সম্পর্কিত অধ্যায়
২৬৫৫. তালাকপ্রাপ্তা অথবা বিধবা রমণীকে শাদী করা (প্রসঙ্গে)।
উম্মে হাবীবা (রাযিঃ) বলেন, মহানবী (ﷺ) আমাকে বললেন, তোমাদের কন্যা বা বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব দিও না।
উম্মে হাবীবা (রাযিঃ) বলেন, মহানবী (ﷺ) আমাকে বললেন, তোমাদের কন্যা বা বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব দিও না।
৪৭১২। আবু নু’মান (রাহঃ) ......... জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মহানবী (ﷺ) এর সঙ্গে এক জিহাদ থেকে ফিরছিলাম। আমি আমার দুর্বল উটটি দ্রুত চালাতে চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় কোন একজন আরোহী আমার পিছন থেকে এসে আমার উটটিকে ছড়ি দ্বারা খোঁচা দিলে উটটি দ্রুত চলতে লাগল। পিছনে ফিরে দেখি মহানবী (ﷺ)। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, জাবির, তোমার এত তাড়াতাড়ি করার কারণ কী? আমি উত্তর দিলাম, আমি নতুন শাদী করেছি। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কুমারী শাদী করেছ, না বিধবাকে? আমি উত্তর দিলাম বিধবাকে। তিনি বললেন, তুমি কেন কুমারী মেয়েকে শাদী করলে না? যার সাথে ক্রীড়া-কৌতুক করতে আর সেও তোমার সাথে খেল-তামাসা করত।
বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমরা মদীনায় প্রবেশ করব এমন সময় মহানবী (ﷺ) আমাকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর এবং রাতে প্রবেশ কর, যেন তোমার মহিলাটি (স্ত্রী, যার স্বামী এতদিন কাছে ছিল না) নিজের অগোছালো কেশরাশি বিন্যাস করে নিতে পারে এবং ক্ষৌরকার্য করতে পারে।
বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমরা মদীনায় প্রবেশ করব এমন সময় মহানবী (ﷺ) আমাকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর এবং রাতে প্রবেশ কর, যেন তোমার মহিলাটি (স্ত্রী, যার স্বামী এতদিন কাছে ছিল না) নিজের অগোছালো কেশরাশি বিন্যাস করে নিতে পারে এবং ক্ষৌরকার্য করতে পারে।
كتاب النكاح
بَابُ تَزْوِيجِ الثَّيِّبَاتِ وَقَالَتْ أُمُّ حَبِيبَةَ: قَالَ لِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لاَ تَعْرِضْنَ عَلَيَّ بَنَاتِكُنَّ وَلاَ أَخَوَاتِكُنَّ»
5079 - حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، حَدَّثَنَا سَيَّارٌ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَفَلْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ غَزْوَةٍ، فَتَعَجَّلْتُ عَلَى بَعِيرٍ لِي قَطُوفٍ، فَلَحِقَنِي رَاكِبٌ مِنْ خَلْفِي، فَنَخَسَ بَعِيرِي بِعَنَزَةٍ كَانَتْ مَعَهُ، فَانْطَلَقَ بَعِيرِي كَأَجْوَدِ مَا أَنْتَ رَاءٍ مِنَ الإِبِلِ، فَإِذَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: «مَا يُعْجِلُكَ» قُلْتُ: كُنْتُ حَدِيثَ عَهْدٍ بِعُرُسٍ، قَالَ: «أَبِكْرًا أَمْ ثَيِّبًا؟» ، قُلْتُ: ثَيِّبًا، قَالَ: «فَهَلَّا جَارِيَةً تُلاَعِبُهَا وَتُلاَعِبُكَ» ، قَالَ: فَلَمَّا ذَهَبْنَا لِنَدْخُلَ، قَالَ: «أَمْهِلُوا حَتَّى تَدْخُلُوا لَيْلًا - أَيْ عِشَاءً - لِكَيْ تَمْتَشِطَ الشَّعِثَةُ وَتَسْتَحِدَّ المُغِيبَةُ»
হাদীসের ব্যাখ্যা:
পারিবারিক শান্তি ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সদ্ভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যা-কিছু দ্বারা তা নষ্ট হতে পারে, তা থেকে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য। দীর্ঘ সফর শেষে রাতের বেলা আকস্মিক ঘরে প্রবেশও সেরকম একটি বিষয়। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি নিজেও এর থেকে বিরত থাকতেন। তিনি সফর থেকে রাতের বেলা ফিরলে সকালে বা বিকেলে ঘরে প্রবেশ করতেন। রাতের বেলা আকস্মিক প্রবেশের ভেতর কী রকম অনিষ্ট নিহিত আছে, বিভিন্ন হাদীছে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যেমন হযরত জাবির রাযি. বর্ণনা করেন-
نَهَى رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ أَنْ يَطْرُقَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ لَيْلًا يَتَخَوَّنُهُمْ، أَوْ يَلْتَمِسُ عَثَرَاتِهِمْ
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষকে তার পরিবারের প্রতি অবিশ্বাসের সন্দেহে কিংবা তাদের দোষত্রুটির অনুসন্ধানার্থে রাতের বেলা তাদের কাছে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।' (সহীহ মুসলিম: ৭১৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৩৬৪৪; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৯০৯৬)
অর্থাৎ পরিবারের প্রতি অহেতুক এই সন্দেহ পোষণ করা উচিত নয় যে, তার অনুপস্থিতিতে স্ত্রী কোনও খেয়ানত করেছে কি না। স্বামীর পক্ষ হতে স্ত্রীর প্রতি এরূপ সন্দেহ এবং সেই সন্দেহের বশবর্তীতে গোপনে খোঁজখবর নেওয়া কিছুতেই উচিত নয়। তাতে স্ত্রীর অন্তরেও স্বামীর প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থা জন্ম নেয়। আকস্মিক প্রবেশ দ্বারা স্ত্রী ভাবতে পারে স্বামী বুঝি তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাই নজরদারি করার জন্য তার আকস্মিক এ আগমন। তার প্রতি স্বামীর বিশ্বাসের এ ঘাটতি যদি তার মনে একবার বসে যায়, তবে ক্রমে তা দানা বাঁধতে শুরু করবে এবং একপর্যায়ে দাম্পত্য-মাধুর্য সম্পূর্ণ তিক্ততায় পর্যবসিত হবে। তাই এ জাতীয় অবিশ্বাসমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা অতীব জরুরি।
তাছাড়া রাতের বেলা আকস্মিক প্রবেশ দ্বারা দৃষ্টিভ্রমজনিত অনর্থ ঘটারও আশঙ্কা থাকে। রাতের অন্ধকারে বা আবছা আলোয় কী দেখতে কী দেখে ফেলেছে, তা যথাযথভাবে উপলব্ধি নাও করতে পারে। বাস্তবে এক, কিন্তু দেখেছে আরেক। আর সেই ভুল দেখার ভিত্তিতে সে বড় রকমের অনর্থ ঘটিয়ে বসবে। ওদিকে শয়তান তো আছেই। সেও মনের ভেতর খামোখাই সন্দেহ সৃষ্টি করে দিতে পারে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাযি. রাতের বেলা তার স্ত্রীর কাছে আসলেন। তখন তার কাছে এক মহিলা ছিল, যে তার চুল আঁচড়াচ্ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাযি. তাকে একজন পুরুষ মনে করলেন। ফলে তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়েছিলেন। পরে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘটনা জানালে তিনি (মুসাফির) পুরুষকে রাতের বেলা স্ত্রীর কাছে আসতে নিষেধ করে দেন। (সহীহ আবূ আওয়ানা: ৬০৮৯)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ নিষেধাজ্ঞার পর দুই ব্যক্তি রাতের বেলা তাদের স্ত্রীদের কাছে এসেছিল। তারা উভয়ই তাদের স্ত্রীদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দেখতে পেয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ: ৫৮১৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৪০১৮: সুনানে দারিমী ৪৫৮। খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক: ৮০২)
এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا تَلِجُوْا عَلَى الْمُغِيبَاتِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّم
যে নারীর স্বামী অনুপস্থিত, তোমরা তার কাছে প্রবেশ করো না। কেননা শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে। (জামে' তিরমিযী: ১১৭২। তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৮৯৭৪; শারহুস সুন্নাহ। ২২৫৩)
যদিও এ নিষেধাজ্ঞাটি সাধারণ পুরুষদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আকস্মিক প্রবেশকারী স্বামীর বেলায়ও এটি প্রযোজ্য। কারণ তার স্ত্রীর তো আগে থেকে জানা নেই যে, তার স্বামী আসছে। ফলে সে তার জন্য প্রস্তুত থাকবে না। অপ্রস্তুত স্ত্রীর পক্ষে স্বামী একজন পরপুরুষই বিবেচিত হবে। তো শয়তান এ ক্ষেত্রে সুযোগ নিতে পারে। সে স্বামী বা স্ত্রী যে-কারও মনেই কুধারণা সৃষ্টি করে দিতে পারে, যা তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য অনিষ্টকর হতে পারে।
আকস্মিক প্রবেশের এছাড়া আরও ক্ষতি আছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا دَخَلْتَ لَيْلًا، فَلا تَدْخُلْ عَلَى أَهْلِكَ ، حَتَّى تَسْتَحِدَّ المُغِيبَةُ، وَتَمْتَشِطَ الشَّعِثَةُ
রাতের বেলা (নিজ এলাকায়) প্রবেশ করলে (তখন) পরিবারের কাছে প্রবেশ করো না, যাতে তোমার স্ত্রী ক্ষৌরকর্ম করে নিতে পারে এবং তার আলুথালু চুল আঁচড়ে নিতে পারে। (সহীহ বুখারী: ৫২৪৬; সহীহ মুসলিম: ৭১৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা। ৯১০০; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ। ২৭৬৪; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৫১৮৯)
সাধারণত স্বামী সফরে থাকলে স্ত্রী তার সাজসজ্জার প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখে না। বেশভূষারও যত্ন নেয় না। অপরিপাটি ও অগোছালো অবস্থায় থাকে। কেউ হয়তো অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায়ও থাকে। কাজেই স্বামী যদি হঠাৎ করে বাড়ি ফেরে আর স্ত্রীকে এরূপ অবস্থায় দেখতে পায়, তবে তা তার মনে বিরক্তির সঞ্চার করতে পারে। এমনকি ঘৃণারও উদ্রেক করতে পারে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাফির স্বামীকে হঠাৎ করে বাড়িতে প্রবেশ না করে স্ত্রীকে খানিকটা সময় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে সেই সময়ে স্ত্রী পরিষ্কার ও পরিপাটি হয়ে নিতে পারে এবং স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।
সবগুলো হাদীছ সামনে রাখলে বোঝা যায় মূল উদ্দেশ্য হলো আকস্মিকভাবে ঘরে না ফেরা এবং স্ত্রীকে প্রস্তুতি গ্রহণের সময় দেওয়া। কাজেই কেউ যদি রাতের বেলা বাড়ি ফেরে এবং আগে থেকেই স্ত্রীকে সে কথা জানিয়ে রাখে, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। পক্ষান্তরে স্ত্রীর যদি জানা না থাকে আর এ অবস্থায় স্বামী দিনের বেলায়ও আকস্মিকভাবে ঘরে ঢোকে, তবে তাও পছন্দনীয় হবে না। এজন্যই হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে-
أَمْهِلُوا، حَتَّى تَدْخُلُوا لَيْلًا - أَيْ عِشَاءً - لِكَيْ تَمْتَشِطَ الشَّعِثَةُ، وَتَسْتَحِدَّ المُغِيبَةُ
তোমরা বিলম্ব করো। অবশেষে রাতের বেলা প্রবেশ করো, যাতে আলুথালু কেশের স্ত্রী মাথা আঁচড়ে নিতে পারে এবং ক্ষৌরকর্ম করে পরিষ্কার হয়ে নিতে পারে। (সহীহ বুখারী: ৫২৪৫; সহীহ মুসলিম: ৭১৫; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৭৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯০৯৯; সুনানে দারিমী ২২৬২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৪৪৭২)
সুতরাং মূল বিষয় হলো দিনে বা রাতে যখনই সফর থেকে ফেরা হোক, স্ত্রীর অজ্ঞাতসারে ঘরে প্রবেশ সমীচীন নয়। এজন্য আগেই বাড়ির লোকদের জানানো উচিত সে কখন বাড়ি ফিরছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এরকমই করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. বর্ণনা করেন-
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ أَقْبَلَ مِنْ غَزْوَةٍ، فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ، لَا تَطْرُقُوا النِّسَاءَ لَيْلًا، وَلَا تَعْتَرُوهُنَّ، وَبَعَثَ رَاكِبًا إِلَى الْمَدِينَةِ بِأَنَّ النَّاسَ دَاخِلُونَ بِالْغَدَاةِ.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক যুদ্ধাভিযান থেকে ফিরে আসলেন। তখন তিনি বললেন, হে লোকসকল! তোমরা রাতের বেলা স্ত্রীদের কাছে যেয়ো না এবং তাদেরকে হতচকিত করো না। অতঃপর তিনি এক আরোহীকে মদীনায় এই সংবাদ দেওয়ার জন্য পাঠালেন যে, কাফেলার লোকজন আগামীকাল ভোরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। (খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক: ৮০৩)
হযরত উমর রাযি. থেকেও অনুরূপ আমল বর্ণিত আছে। তিনি যখন শামের সফর থেকে মদীনায় ফেরেন, তখন তাঁর আযাদকৃত গোলাম আসলাম রহ.-কে মদীনাবাসীদেরকে এই সংবাদ দেওয়ার জন্য আগে আগে পাঠিয়ে দেন যে, আমরা তোমাদের কাছে অমুক সময়ে এসে পৌঁছাচ্ছি। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক : ১৪০১)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একের প্রতি অন্যের বিশ্বস্ত থাকা উচিত এবং একজনের প্রতি অন্যজনের অহেতুক সন্দেহ পোষণ করা বাঞ্ছনীয় নয়।
খ. স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস জন্মাতে পারে বা সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে এরকম কাজ থেকে তাদের প্রত্যেকেরই বিরত থাকা উচিত।
গ. স্বামী-স্ত্রীর কারওই এমন কোনও আচরণ করা উচিত নয়, যা দ্বারা অপরজনের অন্তরে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হতে পারে।
ঘ. স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেরই অপরজনের সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকা উচিত।
ঙ. দূরের সফর থেকে বাড়িতে আকস্মিক উপস্থিত হতে নেই। আগে থেকে জানিয়ে আসা উচিত।
نَهَى رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ أَنْ يَطْرُقَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ لَيْلًا يَتَخَوَّنُهُمْ، أَوْ يَلْتَمِسُ عَثَرَاتِهِمْ
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষকে তার পরিবারের প্রতি অবিশ্বাসের সন্দেহে কিংবা তাদের দোষত্রুটির অনুসন্ধানার্থে রাতের বেলা তাদের কাছে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।' (সহীহ মুসলিম: ৭১৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩৩৬৪৪; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৯০৯৬)
অর্থাৎ পরিবারের প্রতি অহেতুক এই সন্দেহ পোষণ করা উচিত নয় যে, তার অনুপস্থিতিতে স্ত্রী কোনও খেয়ানত করেছে কি না। স্বামীর পক্ষ হতে স্ত্রীর প্রতি এরূপ সন্দেহ এবং সেই সন্দেহের বশবর্তীতে গোপনে খোঁজখবর নেওয়া কিছুতেই উচিত নয়। তাতে স্ত্রীর অন্তরেও স্বামীর প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থা জন্ম নেয়। আকস্মিক প্রবেশ দ্বারা স্ত্রী ভাবতে পারে স্বামী বুঝি তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাই নজরদারি করার জন্য তার আকস্মিক এ আগমন। তার প্রতি স্বামীর বিশ্বাসের এ ঘাটতি যদি তার মনে একবার বসে যায়, তবে ক্রমে তা দানা বাঁধতে শুরু করবে এবং একপর্যায়ে দাম্পত্য-মাধুর্য সম্পূর্ণ তিক্ততায় পর্যবসিত হবে। তাই এ জাতীয় অবিশ্বাসমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা অতীব জরুরি।
তাছাড়া রাতের বেলা আকস্মিক প্রবেশ দ্বারা দৃষ্টিভ্রমজনিত অনর্থ ঘটারও আশঙ্কা থাকে। রাতের অন্ধকারে বা আবছা আলোয় কী দেখতে কী দেখে ফেলেছে, তা যথাযথভাবে উপলব্ধি নাও করতে পারে। বাস্তবে এক, কিন্তু দেখেছে আরেক। আর সেই ভুল দেখার ভিত্তিতে সে বড় রকমের অনর্থ ঘটিয়ে বসবে। ওদিকে শয়তান তো আছেই। সেও মনের ভেতর খামোখাই সন্দেহ সৃষ্টি করে দিতে পারে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাযি. রাতের বেলা তার স্ত্রীর কাছে আসলেন। তখন তার কাছে এক মহিলা ছিল, যে তার চুল আঁচড়াচ্ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাযি. তাকে একজন পুরুষ মনে করলেন। ফলে তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়েছিলেন। পরে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘটনা জানালে তিনি (মুসাফির) পুরুষকে রাতের বেলা স্ত্রীর কাছে আসতে নিষেধ করে দেন। (সহীহ আবূ আওয়ানা: ৬০৮৯)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ নিষেধাজ্ঞার পর দুই ব্যক্তি রাতের বেলা তাদের স্ত্রীদের কাছে এসেছিল। তারা উভয়ই তাদের স্ত্রীদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দেখতে পেয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ: ৫৮১৪; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১৪০১৮: সুনানে দারিমী ৪৫৮। খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক: ৮০২)
এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا تَلِجُوْا عَلَى الْمُغِيبَاتِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّم
যে নারীর স্বামী অনুপস্থিত, তোমরা তার কাছে প্রবেশ করো না। কেননা শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে। (জামে' তিরমিযী: ১১৭২। তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৮৯৭৪; শারহুস সুন্নাহ। ২২৫৩)
যদিও এ নিষেধাজ্ঞাটি সাধারণ পুরুষদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আকস্মিক প্রবেশকারী স্বামীর বেলায়ও এটি প্রযোজ্য। কারণ তার স্ত্রীর তো আগে থেকে জানা নেই যে, তার স্বামী আসছে। ফলে সে তার জন্য প্রস্তুত থাকবে না। অপ্রস্তুত স্ত্রীর পক্ষে স্বামী একজন পরপুরুষই বিবেচিত হবে। তো শয়তান এ ক্ষেত্রে সুযোগ নিতে পারে। সে স্বামী বা স্ত্রী যে-কারও মনেই কুধারণা সৃষ্টি করে দিতে পারে, যা তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য অনিষ্টকর হতে পারে।
আকস্মিক প্রবেশের এছাড়া আরও ক্ষতি আছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا دَخَلْتَ لَيْلًا، فَلا تَدْخُلْ عَلَى أَهْلِكَ ، حَتَّى تَسْتَحِدَّ المُغِيبَةُ، وَتَمْتَشِطَ الشَّعِثَةُ
রাতের বেলা (নিজ এলাকায়) প্রবেশ করলে (তখন) পরিবারের কাছে প্রবেশ করো না, যাতে তোমার স্ত্রী ক্ষৌরকর্ম করে নিতে পারে এবং তার আলুথালু চুল আঁচড়ে নিতে পারে। (সহীহ বুখারী: ৫২৪৬; সহীহ মুসলিম: ৭১৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা। ৯১০০; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ। ২৭৬৪; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৫১৮৯)
সাধারণত স্বামী সফরে থাকলে স্ত্রী তার সাজসজ্জার প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখে না। বেশভূষারও যত্ন নেয় না। অপরিপাটি ও অগোছালো অবস্থায় থাকে। কেউ হয়তো অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায়ও থাকে। কাজেই স্বামী যদি হঠাৎ করে বাড়ি ফেরে আর স্ত্রীকে এরূপ অবস্থায় দেখতে পায়, তবে তা তার মনে বিরক্তির সঞ্চার করতে পারে। এমনকি ঘৃণারও উদ্রেক করতে পারে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাফির স্বামীকে হঠাৎ করে বাড়িতে প্রবেশ না করে স্ত্রীকে খানিকটা সময় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে সেই সময়ে স্ত্রী পরিষ্কার ও পরিপাটি হয়ে নিতে পারে এবং স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।
সবগুলো হাদীছ সামনে রাখলে বোঝা যায় মূল উদ্দেশ্য হলো আকস্মিকভাবে ঘরে না ফেরা এবং স্ত্রীকে প্রস্তুতি গ্রহণের সময় দেওয়া। কাজেই কেউ যদি রাতের বেলা বাড়ি ফেরে এবং আগে থেকেই স্ত্রীকে সে কথা জানিয়ে রাখে, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। পক্ষান্তরে স্ত্রীর যদি জানা না থাকে আর এ অবস্থায় স্বামী দিনের বেলায়ও আকস্মিকভাবে ঘরে ঢোকে, তবে তাও পছন্দনীয় হবে না। এজন্যই হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে-
أَمْهِلُوا، حَتَّى تَدْخُلُوا لَيْلًا - أَيْ عِشَاءً - لِكَيْ تَمْتَشِطَ الشَّعِثَةُ، وَتَسْتَحِدَّ المُغِيبَةُ
তোমরা বিলম্ব করো। অবশেষে রাতের বেলা প্রবেশ করো, যাতে আলুথালু কেশের স্ত্রী মাথা আঁচড়ে নিতে পারে এবং ক্ষৌরকর্ম করে পরিষ্কার হয়ে নিতে পারে। (সহীহ বুখারী: ৫২৪৫; সহীহ মুসলিম: ৭১৫; সুনানে আবু দাউদ: ২৭৭৮; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯০৯৯; সুনানে দারিমী ২২৬২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ১৪৪৭২)
সুতরাং মূল বিষয় হলো দিনে বা রাতে যখনই সফর থেকে ফেরা হোক, স্ত্রীর অজ্ঞাতসারে ঘরে প্রবেশ সমীচীন নয়। এজন্য আগেই বাড়ির লোকদের জানানো উচিত সে কখন বাড়ি ফিরছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এরকমই করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. বর্ণনা করেন-
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ أَقْبَلَ مِنْ غَزْوَةٍ، فَقَالَ: أَيُّهَا النَّاسُ، لَا تَطْرُقُوا النِّسَاءَ لَيْلًا، وَلَا تَعْتَرُوهُنَّ، وَبَعَثَ رَاكِبًا إِلَى الْمَدِينَةِ بِأَنَّ النَّاسَ دَاخِلُونَ بِالْغَدَاةِ.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক যুদ্ধাভিযান থেকে ফিরে আসলেন। তখন তিনি বললেন, হে লোকসকল! তোমরা রাতের বেলা স্ত্রীদের কাছে যেয়ো না এবং তাদেরকে হতচকিত করো না। অতঃপর তিনি এক আরোহীকে মদীনায় এই সংবাদ দেওয়ার জন্য পাঠালেন যে, কাফেলার লোকজন আগামীকাল ভোরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। (খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক: ৮০৩)
হযরত উমর রাযি. থেকেও অনুরূপ আমল বর্ণিত আছে। তিনি যখন শামের সফর থেকে মদীনায় ফেরেন, তখন তাঁর আযাদকৃত গোলাম আসলাম রহ.-কে মদীনাবাসীদেরকে এই সংবাদ দেওয়ার জন্য আগে আগে পাঠিয়ে দেন যে, আমরা তোমাদের কাছে অমুক সময়ে এসে পৌঁছাচ্ছি। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক : ১৪০১)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একের প্রতি অন্যের বিশ্বস্ত থাকা উচিত এবং একজনের প্রতি অন্যজনের অহেতুক সন্দেহ পোষণ করা বাঞ্ছনীয় নয়।
খ. স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস জন্মাতে পারে বা সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে এরকম কাজ থেকে তাদের প্রত্যেকেরই বিরত থাকা উচিত।
গ. স্বামী-স্ত্রীর কারওই এমন কোনও আচরণ করা উচিত নয়, যা দ্বারা অপরজনের অন্তরে বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হতে পারে।
ঘ. স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেরই অপরজনের সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকা উচিত।
ঙ. দূরের সফর থেকে বাড়িতে আকস্মিক উপস্থিত হতে নেই। আগে থেকে জানিয়ে আসা উচিত।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ