মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২- ঈমানের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৬২
- ঈমানের অধ্যায়
৫. দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ - কিতাব ও সুন্নাহকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা
১৬২। হযরত আবু রাফে' (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, আমি তোমাদের কাউকেও যেন এইরূপ দেখি না যে, সে তার গদিতে হেলান দিয়ে বসে থাকবে, আর তার নিকট আমার আদেশসমূহের কোন একটি আদেশ বা আমার নিষেধসমূহের কোন একটি নিষেধ পৌঁছার পর সে বলবে, আমি এই সমস্ত জানি না। আল্লাহর কিতাবে যা পাব, তদনুসারে চলব। —আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, বায়হাকী
كتاب الإيمان
باب الاعتصام بالكتاب والسنة - الفصل الثاني
وَعَن أبي رَافع وَغَيره رَفعه قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ أَمر مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لَا أَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ» . رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَالتِّرْمِذِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالْبَيْهَقِيّ فِي دَلَائِل النُّبُوَّة.

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এখানে এ কথা বুঝা চাই যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যে ওহী আসত তার দু'টি পদ্ধতি ছিল। ১. নির্দিষ্ট শব্দাবলি ও রচনার আকৃতিতে। এটাকে 'ওহী মাতলু' বলা হয়। (অর্থাৎ সেই ওহী যা তিলাওয়াত করা হয়) এটা কুরআন মজীদের অবস্থা। ২. সেই ওহী যা তাঁর প্রতি বিষয়-বস্তু সম্বন্ধে ইলকা ও ইল্হাম হত। তিনি সেগুলো তাঁর ভাষায় বলতেন, কিংবা কাজের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। এটাকে 'ওহী গায়রে মাতলু' বলে। (অর্থাৎ যে ওহী তিলাওয়াত করা হয় না) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাধারণ দীনী দিকনির্দেশ ও বাণীসমূহের গুরুত্ব এটাই। বস্তুত এর ভিত্তি তো আল্লাহর ওহীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এটা কুরআনের ন্যায়ই অপরিহার্য অনুসরণীয়।

আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এ বিষয় প্রতিভাত করে ছিলেন যে, তাঁর উম্মতের মধ্যে এরূপ লোক জন্ম লাভ করবে, যারা এ কথা বলে লোকজনকে গোমরাহ ও ইসলামী শরী'আতকে অকেজো করবে যে, দীনের আহকাম কেবল তাই যা কুরআনে রয়েছে। আর যা কুরআনে নেই তা দীনী হুকুমই নয়। আলোচ্য হাদীসে রাসূল্লাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে এ ফিতনা থেকে সাবধান করেছেন। বলেছেন, হিদায়াতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে। এতদসাথে এ ছাড়াও ওহী গায়রে মাতলুর মাধ্যমে আহকাম দেওয়া হয়েছে। আর তা কুরআনের ন্যায়ই অপরিহার্য অনুসরণীয়।

প্রকৃত কথা হচ্ছে, যে সব লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীসসমূহকে দীনের দলীল হতে অস্বীকার করে, তারা ইসলামী শরী'আতের পূর্ণ শিকল থেকে স্বাধীন হতে চায়। কুরআন মজীদের ব্যাপার হচ্ছে, তাতে মৌলিক শিক্ষা ও আহ্কাম রয়েছে। এর জন্য সেই প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা যেগুলো ছাড়া এ আহকামের ওপর আমলই করা যেতে পারে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কার্য কিংবা বাণী সম্পর্কিত হাদীসসমূহ থেকেই জানা যায়। যেমন কুরআন মজীদে নামাযের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু নামায কিভাবে আদায় করা হবে? কোন্ কোন্ সময়ে আদায় করা হবে? এবং কোন্ ওয়াক্তে কত রাকাআত নামায আদায় করা হবে? এটা কুরআনের কোথাও নেই। হাদীসসমূহ থেকেই এসব বিস্তারিত জানা যায়।

এভাবে কুরআন মজীদে যাকাতের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু এটা বলা হয়নি কোন্ হিসাবে যাকাত বের করা হবে। সারা জীবনে একবার দেওয়া হবে অথবা প্রতি বছর, কিংবা প্রতি মাসে দেওয়া হবে? এভাবে কুরআনের অধিকাংশ আহকামের অবস্থা এরূপই। বস্তুত দলীল হওয়ার ব্যাপারে হাদীস অস্বীকারের পরিণতি হচ্ছে গোটা দীনী শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করা। এজন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে উম্মতকে বিশেষভাবে সাবধান করেছেন। এ হিসাবে আলোচ্য হাদীস হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জিযা বিশেষ। উম্মতের মধ্যে সেই ফিতনা সৃষ্টি হবে বলে (হাদীস অস্বীকার)-এর সংবাদ দিয়েছেন, যা তাঁর যুগে এবং সাহাবা ও তাবিঈনের যুগে বরং তাবে তাবিঈনের যুগসমূহেও কল্পনা করা যেত না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান