মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত শরীফ)

২- ঈমানের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৪৭
- ঈমানের অধ্যায়
৫. প্রথম অনুচ্ছেদ - কিতাব ও সুন্নাহকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা
১৪৭। হযরত রাফে' ইবনে খাদীজ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন হিজরত করে মদীনায় এলেন, তখন তথাকার লোকেরা খেজুর বৃক্ষে তাবীর (পরাগায়ন) করছিল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এটা করছ কেন? তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সর্বদাই এটা করে আসছি। তিনি বললেন, মনে হয় এরূপ না করলেই ভাল হত। অতঃপর (তাঁর কথায়) লোকজন এটা পরিত্যাগ করল; কিন্তু তাতে (সেই বৎসর) গাছের ফলন কম হল। (বর্ণনাকারী বলেন,) লোকজন এ খবর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জানালে তিনি বললেন, আমি তোমাদেরই ন্যায় একজন মানুষ। আমি যখন তোমাদেরকে দীন সম্পর্কে কোন নির্দেশ দেই তখন তা তোমরা মেনে নেবে। আর যখন (পার্থিব কোন বিষয় সম্পর্কে) আমার নিজস্ব মতানুসারে তোমাদেরকে কোন কথা বলি, তখন (জেনে রাখো) আমি তো একজন মানুষ। অর্থাৎ তাতে আমারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে। -মুসলিম
كتاب الإيمان
بَابُ الْإِعْتِصَامِ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ
وَعَن رَافع بن خديج قَالَ: قَدِمَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وهم يأبرون النَّخْلَ فَقَالَ: «مَا تَصْنَعُونَ» قَالُوا كُنَّا نَصْنَعُهُ قَالَ «لَعَلَّكُمْ لَوْ لَمْ تَفْعَلُوا كَانَ خَيْرًا» فَتَرَكُوهُ فنفضت قَالَ فَذَكَرُوا ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ: «إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْي فَإِنَّمَا أَنا بشر» . رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

মদীনা তাইয়্যিবা খেজুর ফলনের বিশেষ অঞ্চল ছিল। আর এখনও এরকমই আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজরত করে সেখানে পৌঁছালেন তখন তিনি দেখলেন, সেখানের লোকজন খেজুর গাছগুলোর মধ্যে একটি গাছকে নর ও অন্য গাছটিকে মাদা নির্ধারণ করে সেগুলোর ফুলের কলিতে এক বিশেষ পদ্ধতিতে সংযোগ স্থাপন করছে। যাকে তা'বীর বলা হত। যেহেতু মক্কা মুকাররমা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে খেজুর ফলত না, এজন্য এ তা'বীরের কাজ তাঁর জন্য একটি নতুন বিষয় ছিল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা-করলেন, তোমরা এটা কী করছ এবং কি জন্য করছ? তারা এর কোন বিশেষ রহস্য ও উপকারিতা বলতে পারেননি। তারা কেবল এই বলেন যে, প্রথম থেকেই আমরা তা করে আসছি। অর্থাৎ আমাদের বাপ-দাদাকে করতে দেখেছি এজন্য আমরাও করছি।

এটাকে তিনি জাহিলী যুগের অন্যান্য বহু অনর্থক বিষয়ের ন্যায় এক অতিরিক্ত ও ফায়দাহীন কাজ মনে করলেন এবং বললেন, সম্ভবত যদি এটা না কর ভাল হবে। তারা তাঁর এ কথা শুনে তা'বীরের কাজ ছেড়ে দিলেন। কিন্তু ফল দাঁড়ালো যে, খেজুরের ফলন কমে গেল। তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এটা উল্লেখ করা হল। তিনি বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرِّ مِثْلُكُمُ الخ (অর্থাৎ আপন সত্তাগতভাবে আমি একজন মানুষ) আমার সব কথা দীনী হিদায়াত ও ওহীর ভিত্তিতে নয় বরং একজন মানুষ হিসাবেও কথা বলি। তবে যখন আমি নবী ও রাসূল হিসাবে দীনের লাইনে কোন নির্দেশ দেই, তা অবশ্য পালনীয়। আর যখন আমি কোন পার্থিব ব্যাপারে নিজের ব্যক্তিগত অভিমতে কিছু বলি, তবে এর মর্যাদা একজন মানুষের অভিমত। এতে ভুলও হতে পারে। আর তা'বীরের ব্যাপারে যে কথা আমি বলেছি, তা আমার ব্যক্তিগত ধারণা ও আমার ব্যক্তিগত অভিমত ছিল।

ঘটনা এই যে, বহু জিনিসে আল্লাহ্ তা'আলা আশ্চর্যজনক ও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যাবলি রেখেছেন, যার পূর্ণ জ্ঞানও কেবল তাঁরই রয়েছে। তা'বীরের কাজে আল্লাহ্ তা'আলা বৈশিষ্ট্য রেখছেন যে, এর দ্বারা ফলন বেশি হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছু বলা হয়নি। আর তাঁর এটা জানার প্রয়োজনও ছিল না। তিনি উদ্যান কাজের রহস্য বলার জন্য আসেননি। বরং মনুষ্য জগতের হিদায়াত এবং এ জগতকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। আর এজন্য যে ইলমের প্রয়োজন ছিল তা তাঁকে পরিপূর্ণ দান করা হয়েছিল।

আলোচ্য হাদীস থেকে এটাও জানা গেল যে, এ দুনিয়ার প্রত্যেক বিষয় ও প্রত্যেক জিনিসের ইলম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছিল, এ ধারণা ও আকীদা পোষণ করা ভুল। যারা এরূপ আকীদা পোষণ করে তারা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উচ্চাসন সম্পর্কে একেবারে অপরিচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)