আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৪৯- নবীজী সাঃ ও সাহাবা রাঃ ; মর্যাদা ও বিবিধ ফাযায়েল

হাদীস নং: ৩৩৫৬
আন্তর্জাতিক নং: ৩৬১৪
- নবীজী সাঃ ও সাহাবা রাঃ ; মর্যাদা ও বিবিধ ফাযায়েল
২০৭৫. ইসলাম আগমনের পর নবুওয়্যাতের নিদর্শনসমূহ
৩৩৫৬। মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার (রাহঃ) .... বারা ইবনে আযিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সাহাবী (উসায়দ ইবনে হুযায়ব) (রাত্রি কালে) সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর বাড়িতে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। ঘোড়াটি তখন (আতঙ্কিত হয়ে) লাফালাফি করতে লাগল। তখন ঐ সাহাবী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর নিকটে দুআ করলেন। তারপর তিনি দেখতে পেলেন, একখণ্ড মেঘ এসে তাকে ঢেকে ফেলেছে। তিনি নবী কারীম (ﷺ)- এর দরবারে বিষয়টি আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, হে অমুক! তুমি এভাবে তিলাওয়াত করতে থাকবে। ইহা তো সাকীনা (প্রশান্তি) ছিল, যা কুরআন তিলাওয়াতের কারণে নাযিল হয়েছিল।
كتاب المناقب
باب عَلاَمَاتِ النُّبُوَّةِ فِي الإِسْلاَمِ
3614 - حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا غُنْدَرٌ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، سَمِعْتُ البَرَاءَ بْنَ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَرَأَ رَجُلٌ الكَهْفَ، وَفِي الدَّارِ الدَّابَّةُ، فَجَعَلَتْ تَنْفِرُ، فَسَلَّمَ، فَإِذَا ضَبَابَةٌ، أَوْ سَحَابَةٌ غَشِيَتْهُ، فَذَكَرَهُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «اقْرَأْ فُلاَنُ، فَإِنَّهَا السَّكِينَةُ نَزَلَتْ لِلْقُرْآنِ، أَوْ تَنَزَّلَتْ لِلْقُرْآنِ»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত বারা ইবন আযিব রাযি. বর্ণিত এ হাদীছটিতে যে সাহাবীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তাঁর নাম এখানে উল্লেখ করা হয়নি। অন্য বর্ণনা দ্বারা জানা যায় তিনি ছিলেন হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.। হাদীছের বিভিন্ন কিতাবে হযরত উসায়দ ইবন হযায়রের ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে- তিনি এক রাতে সূরা বাকারা পড়ছিলেন। কাছেই তাঁর ঘোড়াটি বাঁধা ছিল। হঠাৎ ঘোড়াটি ছটফট করে ওঠে। তিনি চুপ করলেন। ঘোডাটিও ক্ষান্ত হলো। তিনি আবার পড়তে শুরু করলেন। ঘোড়াটি ও ছটফট করতে থাকল। তিনি চুপ করলেন। ঘোডাটিও ক্ষান্ত হলো। তিনি আবারও পড়তে শুরু করলেন। আবারও ঘোড়াটি ছটফট করতে থাকল। শেষে তিনি উঠে গেলেন। তাঁর পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়াটির কাছেই ছিল। তাঁর ভয় হলো ঘোড়াটি তাকে আঘাত করতে পারে। তিনি পুত্রকে তুলে নিয়ে আসলেন। এ সময় আকাশের দিকে তাকালেন এবং শামিয়ানার মতো কিছু দেখতে পেলেন। তার মধ্যে রয়েছে বহু প্রদীপ। অতঃপর সেটি উপরে উঠে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

ভোরবেলা তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে এ বৃত্তান্ত তাঁকে জানালেন। তিনি বললেন, পড়ো হে ইবন হুযায়র! পড়ো হে ইবন হুযায়র। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ভয় পেলাম ঘোড়াটি ইয়াহইয়াকে পিষ্ট করবে। সে ঘোড়াটির কাছেই ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জান তা কী ছিল? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা ছিল ফিরিশতা। তোমার পড়ার আওয়াজ শুনে কাছে চলে এসেছিল। তুমি যদি পড়া অব্যাহত রাখতে, তবে ভোরবেলা মানুষ তা দেখতে পেত; তাদের চোখের আড়াল হতো না। (সহীহ বুখারী: ৫০১৮; সহীহ মুসলিম: ৭৯৬)

হযরত ছাবিত ইবন কায়স রাযি. সম্পর্কেও এ জাতীয় ঘটনা বর্ণিত আছে। তবে এসব বর্ণনায় সূরা বাকারা পড়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আলোচ্য হাদীছটিতে সূরা কাহফ পড়ার কথা আছে। মূলত এসব বর্ণনার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। ঘটনা একাধিক। সব সূরাই কুরআন মাজীদের অংশ। সবই আল্লাহ তা'আলার কালাম। কাজেই যে-কোনও সূরা পাঠ করার ক্ষেত্রেই আল্লাহ তা'আলার কুদরত ও রহমতের এ জাতীয় ঘটনা ঘটতে পারে।

হাদীছটিতে বলা হয়েছে যে, এক সাহাবী যখন সূরা কাহফ পাঠ করছিলেন, তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর উপর ছেয়ে যায় এবং তা ক্রমে তাঁর কাছাকাছি নেমে আসতে থাকে। ফলে তাঁর বেঁধে রাখা ঘোড়াটি লাফালাফি করতে থাকে।

সাকীনা বলতে কী বোঝায়
সে মেঘখণ্ডটি আসলে কী ছিল? কুরআন তিলাওয়াতকালে কেনই বা তা নিচে নেমে এসেছিল? আর কেনই বা তাতে ঘোড়াটি অস্থিরতা প্রকাশ করছিল? সেই সাহাবী অর্থাৎ হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর তা বুঝে আসছিল না। তাই ভোরবেলা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন এবং রাতের এ ঘটনা তাঁর কাছে খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

تِلْكَ السَّكِينَةُ تَنَزَّلَتْ لِلْقُرْآنِ (তা ছিল সাকীনা, যা কুরআনের কারণে নেমে এসেছিল)। উপরে বর্ণিত হযরত উসায়দ ইবন হুযায়র রাযি.-এর ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তা ছিল ফিরিশতা, যারা কুরআন তিলাওয়াতের শব্দে কাছে নেমে এসেছিল। এর দ্বারা বোঝা যায় আলোচ্য হাদীছে ফিরিশতাকেই সাকীনা বলা হয়েছে।

কুরআন ও হাদীছে সাকীনা শব্দটির বহুল ব্যবহার রয়েছে। এর মূল অর্থ শান্তি, মনের স্থিরতা এবং রহমত ও দয়া। মানুষের মনে বিভিন্ন কারণে যে ভয়-ভীতি, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়, তা দূর করার জন্য আল্লাহ তা'আলা যে বিশেষ রহমত নাযিল করেন, তাকে সাকীনা বলা হয়। যখন সে রহমত নাযিল হয়, তখন বান্দার মনে সাহস জন্মায়। ফলে সব দুশ্চিন্তা ও ভয়-ভীতি কেটে গিয়ে বান্দার মন সম্পূর্ণ শান্ত ও স্থির হয়ে যায়। যেমন হিজরতের সময় ছাওর পাহাড়ের গুহায় থাকাকালে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. শত্রুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণনাশের আশঙ্কায় তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ভয় করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। সেই ভীতিকর অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি যে বিশেষ রহমত নাযিল করেন, সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ

সুতরাং আল্লাহ তার প্রতি নিজের পক্ষ থেকে সাকীনা (প্রশান্তি) বর্ষণ করলেন। (সূরা তাওবা, আয়াত ৪০)

যা হোক, সাকীনা এর প্রকৃত অর্থ প্রশান্তি, স্থিরতা এবং রহমত ও দয়া। আল্লাহ তা'আলা অনেক সময় তাঁর রহমত নাযিল করেন ফিরিশতাদের মাধ্যমে। তাই রহমতের বাহক ফিরিশতাদেরকেও সাকীনা বলা হয়। আলোচ্য হাদীছেও সাকীনা দ্বারা ফিরিশতা বোঝানো হয়েছে। এটা কুরআন মাজীদের এক বৈশিষ্ট্য যে, কুরআন তিলাওয়াতকালে ফিরিশতা হাজির হয় এবং মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শুনতে থাকে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا

স্মরণ রেখো, ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে থাকে সমাবেশ। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৭৮)

সমাবেশ দ্বারা ফিরিশতাদের সমাবেশ বোঝানো হয়েছে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بينهم، إِلاَّ نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَحَفَّتْهُمُ المَلاَئِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَه

কোনও লোকসমষ্টি আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্যে কোনও একটি ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত এবং নিজেদের মধ্যে তার পঠন-পাঠনে মশগুল থাকলে তাদের উপর সাকীনা নাযিল হয়, রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয়, ফিরিশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখেন এবং আল্লাহ তার কাছে উপস্থিত (ফিরিশতা)-দের মধ্যে তাদের উল্লেখ করেন। (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯; জামে তিরমিযী: ২৯৪৫; বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ১০৭৩৭; আল-মাদখাল ইলা সুনানিল কুবরা ৩৪৬; আল-আদাব ৯২; সুনানে ইবন মাজাহ: ২২৫; বাগাবী, শারহুস্সুন্নাহ: ১২৭; মুসনাদে আহমাদ: ৭৪২৭)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সূরা কাহফ পড়ার বিশেষ ফযীলত রয়েছে।

খ. কুরআন পাঠকালে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ রহমত নাযিল হয়।

গ. কুরআন পাঠকালে বিশেষ রহমতের ফিরিশতা নেমে আসে।

ঘ. ফিরিশতাদের উপস্থিতি মানুষ টের না পেলেও অন্যান্য জীবজন্তু ঠিকই টের পায়।

ঙ. অসাধারণ বা অলৌকিক কোনও বিষয় অনুভব করতে পারলে সে বিষয়ে নিজে নিজে কোনও ফয়সালা না নিয়ে কোনও মুত্তাকী অভিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে তার ব্যাখ্যা জেনে নেওয়া উচিত।

চ. পোষা প্রাণী ও যে-কোনও সম্পদ ভালোভাবে হেফাজত করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)