আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ
৪৪. কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব
হাদীস নং: ২৯১৪
আন্তর্জাতিক নং: ২৯১৪
কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব
যে কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার সাওয়াব কী হবে।
২৯১৪. মাহমুদ ইবনে গায়লান (রাহঃ) ...... আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কুরআনের শিক্ষা লাভকারীকে বলা হবে, পড়, আরোহণ কর আর দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে ধীরে পাঠ করতে সেভাবে ধীরে ধীরে পাঠ করে যাও। অতএব যে আয়াতে তোমার পাঠ শেষ হবে সেখানে হবে তোমার মনযিল।আবু দাউদ
হাদীসটি হাসান-সহীহ। বুন্দার (রাহঃ) আসিম (রাহঃ) থেকে উক্ত সনদে অনূরূপ বর্ণনা করেন।
হাদীসটি হাসান-সহীহ। বুন্দার (রাহঃ) আসিম (রাহঃ) থেকে উক্ত সনদে অনূরূপ বর্ণনা করেন।
أبواب فضائل القرآن عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
بَابُ مَا جَاءَ فِيمَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنَ القُرْآنِ مَالَهُ مِنَ الأَجْرِ
حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلاَنَ، حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ الْحَفَرِيُّ، وَأَبُو نُعَيْمٍ عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ أَبِي النَّجُودِ، عَنْ زِرٍّ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ .
حَدَّثَنَا بُنْدَارٌ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ عَاصِمٍ، بِهَذَا الإِسْنَادِ نَحْوَهُ .
حَدَّثَنَا بُنْدَارٌ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ عَاصِمٍ، بِهَذَا الإِسْنَادِ نَحْوَهُ .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছটি দ্বারা কুরআনের পাঠক ও কুরআনের হাফেজের উচ্চমর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। কিছুটা ধারণা লাভ হয় জান্নাতের ধাপসমূহের উচ্চতা ও শান-শওকত সম্পর্কেও। তাছাড়া হাদীছটির ভেতর কুরআন কীভাবে পড়া উচিত সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা রয়েছে। সর্বপ্রথম ইরশাদ হয়েছে-
يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ : اقْرَأْ وَارْتَقِ ،(কিয়ামতের দিন) কুরআনওয়ালাকে বলা হবে, পড়ো ও চড়ো। হাদীছটির শব্দ হলো صَاحِب الْقُرْآنِ (সাহিবুল কুরআন)। صاحب শব্দটির উৎপত্তি صُحْبَةٌ থেকে। صُحْبَةٌ এর অর্থ সঙ্গ, সাহচর্য। অর্থাৎ কোনওকিছুর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকা। কোনও ব্যক্তির সুহবাতে থাকার অর্থ নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তার সঙ্গে সময় কাটানো এবং তার আদর্শ, চিন্তাভাবনা ও রুচি-অভিরুচি আত্মস্থ করার চেষ্টা করা। সুতরাং সাহিবুল কুরআন বা কুরআনওয়ালা বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করার পর তা নিয়মিত তিলাওয়াত করে ও তার হিদায়াত অনুযায়ী চলতে সচেষ্ট থাকে। এর বহু ধাপ হতে পারে। এক তো হলো কুরআন সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়া। যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন পড়ে, তা বিশেষ কোনও সূরা হোক, যেমন সূরা মুলক, সূরা ইয়াসীন ইত্যাদি, সেও এক পর্যায়ের কুরআনওয়ালা। আবার যে ব্যক্তি ধারাবাহিক তিলাওয়াতের মাধ্যমে কুরআন খতম করে, সেও কুরআনওয়ালা। বলাবাহুল্য, প্রথম ব্যক্তি অপেক্ষা দ্বিতীয় ব্যক্তির স্তর উপরে। যে ব্যক্তি কুরআনের হাফেজ এবং নিয়মিত তিলাওয়াতও করে, সে আরও উচ্চস্তরের কুরআনওয়ালা। যে ব্যক্তি কুরআন বুঝে বুঝে পড়ে, তার স্তর আরও উপরে। যার বুঝ ও জ্ঞানের স্তর যত গভীর হবে, সে ততটাই উচ্চস্তরের কুরআনওয়ালা হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে স্তরভেদ হবে অনেক বেশি। উল্লিখিত সকল স্তরেই কুরআনের হিদায়াত অনুযায়ী আমল করা শর্ত। যে ব্যক্তির মোটেই আমল নেই, উল্টো কুরআনের আদেশ-নিষেধ অগ্রাহ্য করতে অভ্যস্ত, সে যতই কুরআন পড়ুক না কেন, বাস্তবিকপক্ষে সে মোটেই কুরআনওয়ালা নয়; বরং সে করআনবিরোধী আখিরাতে কুরআন তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ.
কুরআন তোমার পক্ষে প্রমাণ হবে অথবা তোমার বিপক্ষে। (সহীহ মুসলিম: ২২৩; জামে তিরমিযী: ৩৫৭১; সুনানে নাসাঈ: ২৪৩৭; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮১; সুনানে দারিমী: ৬৭৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ৮৪৪; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৩৪২৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৮৫; শু'আবুল ঈমান: ২৪৫৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪৮)
হাঁ, যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন পড়ে এবং কিছু না কিছু আমলও করে, কোনও তাকে কুরআনওয়ালা বলা যেতে পারে। কিন্তু আমলে গাফিলতির কারণে তার স্তর থাকবে অনেক নিচে। মনে রাখতে হবে আমল করাই মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের নির্দেশনা অনুযায়ী কুরআনের আদেশ-নিষেধ ভালোভাবে মেনে চলতে সচেষ্ট থাকে, কুরআনের তিলাওয়াতে তার দুর্বলতা থাকলেও আমলের উচ্চতার কারণে সে তুলনামূলক উচ্চস্তরের কুরআনওয়ালা সাব্যস্ত হবে। যে ব্যক্তি সহীহ-শুদ্ধভাবে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, সেইসঙ্গে কুরআনের আদেশ-নিষেধ পালনেও যত্নবান থাকে, সে অধিকতর উচ্চপর্যায়ের কুরআনওয়ালা। সে যদি হাফেজও হয়, কুরআনের ইলমেও পারদর্শী হয়, তবে তার স্তর ও মর্যাদা তো অনেক উপরে।
অবশ্য আলোচ্য হাদীছটির সম্পর্ক কুরআন পাঠের সঙ্গে। এর দ্বারা কুরআন পাঠের ফযীলত বোঝানো উদ্দেশ্য। কাজেই যে ব্যক্তির কুরআনের উপর আমল আছে, কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত করে না, সে এ হাদীছটিতে বর্ণিত ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। হাঁ, অন্য কোনও আমলের বদৌলতে সে জান্নাতের উচ্চমর্যাদা লাভ করতে পারে। এমনও হতে পারে যে, অন্যান্য আমলের দ্বারা সে কোনও কোনও কুরআন তিলাওয়াতকারীকেও ছাড়িয়ে যাবে।
সাধারণ স্তর অপেক্ষা উচ্চস্তরের জান্নাত কতটা উঁচুতে
কুরআনওয়ালাকে বলা হবে- اقرأ وَارْتَقِ (পড়ো ও চড়ো)। অর্থাৎ জান্নাতবাসীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদেরকে তাদের আপন আপন স্তরে যাওয়ার নির্দেশ হবে, তখন কুরআনওয়ালাকে বলা হবে, তুমি কুরআন পড়তে থাকো ও উপরের দিকে আরোহণ করতে থাকো।
বাহ্যদৃষ্টিতে মনে হয় জান্নাত বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের মতো, যার একেক তলায় একেকজন বাস করে আর প্রত্যেককে আপন আপন তলায় উঠতে হয় সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা এমন নয়। জান্নাত এমন সংকীর্ণ স্থান নয়, যার একেকটি ইমারতে বহু লোককে বাস করতে হবে। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা জানা যায়, সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতবাসীর জান্নাতও এ পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়। তাহলে 'পড়তে থাকো ও চড়তে থাকো' এ কথার অর্থ কী?
এর প্রকৃত অর্থ ও জান্নাতের বাস্তব অবস্থা দুনিয়ায় বসে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। জান্নাতের বিশালতা ও তার আরাম-আয়েশের বন্দোবস্ত কল্পনারও অতীত। যতদূর ধারণা লাভ হয়, তা হচ্ছে প্রত্যেক জান্নাতবাসী হবে বিস্তীর্ণ এক ভুবনের অধিকর্তা। সেখানে তার জন্য আরাম-আয়েশের অজস্র উপকরণ থাকবে এবং তার হুকুম পালন ও ইচ্ছা পূরণের জন্য থাকবে অসংখ্য সেবক-সেবিকা।
ঈমান-আমলের প্রভেদ অনুযায়ী জান্নাতবাসীদের মধ্যে থাকবে অগণিত স্তর। যার স্তর যত উঁচু হবে, তার জান্নাত হবে তত উপরে। জান্নাতের উচ্চতর এক স্থানের নাম গুরফাহ। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-
أُولَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلْمَا
'এরাই তারা, যাদেরকে তাদের সবরের প্রতিদানে দেওয়া হবে গুরফাহ এবং সেখানে শুভেচ্ছা ও সালামের সাথে তাদের অভ্যর্থনা করা হবে।' (সূরা ফুরকান, আয়াত ৭৫)
গুরফাবাসীদের সম্পর্কে হাদীছে বলা হয়েছে-
إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الْغُرَفِ مِنْ فَوْقِهِمْ كَمَا تَتَرَاءَوْنَ الْكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ الْغَابِرَ فِي الْأُفُقِ مِنَ الْمَشْرِقِ أَو الْمَغْرِبِ لِتَفَاضُلِ مَا بَيْنَهُم
নিশ্চয়ই জান্নাতবাসীগণ গুরফাবাসীদেরকে তাদের উপরদিকে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশের পূর্ব বা পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখে থাক। এটা তাদের মধ্যকার মর্যাদাগত পার্থক্যের কারণে। (সহীহ বুখারী: ৩২৫৬; সহীহ মুসলিম: ২৮৩১)
অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ أَهْلَ الدَّرَجَاتِ العُلَى لَيَرَاهُمْ مَنْ تَحْتَهُمْ كَمَا تَرَوْنَ النَّجْمَ الطَّالِعَ فِي أُفُقِ السَّمَاءِ
'নিশ্চয়ই উচ্চস্তরের ব্যক্তিবর্গকে তাদের নিম্নস্তরের ব্যক্তিগণ ঠিক সেইরকম দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশ-দিগন্তে উদিত নক্ষত্র দেখতে পাও।' (জামে' তিরমিযী: ৩৬৫৮; সুনানে আবু দাউদ: ৩৯৮৭; সুনানে ইবন মাজাহ ৯৬)
পৃথিবী থেকে একেকটা নক্ষত্রের দূরত্ব কোটি কোটি মাইল। যেমন পৃথিবী থেকে সূর্য আনুমানিক ১৪.৯৬ কোটি কি.মি. দূরে। পৃথিবী থেকে চাঁদ আনুমানিক ৩৮৪,৪০০ কি.মি. দূরে। নিকটতম নক্ষত্র প্রোক্সিমা সেন্টাউরি ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। এক আলোকবর্ষের দূরত্ব ৯.৪৪ ট্রিলিয়ন কি.মি.। এসব দূরত্ব আমাদের কল্পনারও অতীত। হাদীছে বলা হয়েছে, সাধারণ স্তরের জান্নাতবাসী থেকে উচ্চস্তরের জান্নাতবাসীর মধ্যে যে দূরত্ব থাকবে, তা নক্ষত্রের দূরত্বতুল্য। উচ্চস্তরের জান্নাতবাসীগণ অতটা উচ্চতায় কীভাবে পৌঁছবে এবং কী গতিতেই বা পৌঁছবে? এটা কি বৈদ্যুতিক সিঁড়ি বা লিফট দিয়ে ওঠার বিষয়? নিশ্চয়ই এর জন্য বিশেষ কোনও জান্নাতী বাহন থাকবে, যার গতি হবে আলোর গতির মতো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজের সফরে বুরাক নামের যে বাহনে চড়ে ভ্রমণ করেছিলেন, তার গতি ছিল আলোর গতির মতোই। তাই তার নাম 'বুরাক'। শব্দটির উৎপত্তি بَرْقٌ থেকে, যার অর্থ বিদ্যুৎ। হয়তো জান্নাতেও এরকম কোনও বাহন থাকবে। কুরআনের হাফেজ বা কুরআনওয়ালা ব্যক্তি তাতে চড়ে কুরআন পড়তে থাকবে আর উপরের দিকে উঠতে থাকবে। এভাবে সে পৌঁছে যাবে তার অনন্ত জীবনের পরম ঠিকানায়। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
কুরআন যেভাবে পড়তে হয়
وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا (এবং দুনিয়ায় যেমন ধীরে ধীরে পড়তে, তেমনি ধীরে ধীরে পড়ো)। কুরআন মাজীদ তাজবীদের সাথে প্রতিটি হরফ ও শব্দ সুস্পষ্ট উচ্চারণে এবং ধীরে ধীরে পড়াই নিয়ম। সেইসঙ্গে অন্তরে ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকা ও সুর দিয়ে পড়াও জরুরি। কান্না না আসলে কান্নার ভাব-ভঙ্গিতে পড়া চাই। অর্থ জানা থাকলে চিন্তাফিকিরের সঙ্গে পড়া বাঞ্ছনীয়। এভাবে পড়াকে তারতীল বলে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
এবং ধীর-স্থিরভাবে স্পষ্টরূপে কুরআন তিলাওয়াত করো। (সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত ৪)
তাজবীদ হলো প্রতিটি হরফ আপন আপন উচ্চারণস্থান বা মাখরাজ থেকে আপন আপন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উচ্চারণ করা এবং শব্দ ও বাক্য পাঠের ক্ষেত্রে মাদ্দ-গুন্নাহ, ওয়াক্ফ ইত্যাদির নিয়মাবলি অনুসরণ করা। তাজবীদ একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র। এতে কুরআন পাঠের বিস্তারিত নিয়মনীতি বর্ণিত আছে। সেসব নীতির মূল ভিত্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাঠ-পদ্ধতির উপর। তিনি স্বয়ং কুরআন মাজীদের পাঠ-পদ্ধতি সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম সে পদ্ধতিতেই নিজেরা কুরআন পড়তেন ও অন্যদেরকে শিক্ষা দিতেন। তাদের সে শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই তাজবীদ শাস্ত্র গড়ে উঠেছে। এটা কুরআন মাজীদের এক বিশেষত্ব যে, তার কেবল পাঠ-পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে তাজবীদ, নাহব প্রভৃতি শাস্ত্র গড়ে উঠেছে এবং এসব শাস্ত্রে বিপুল গবেষণা হয়েছে ও শত শত বই-পুস্তক রচিত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার হুকুম হলো- কুরআন তারতীলের সঙ্গে অর্থাৎ ধীর-শান্তভাবে ও সুস্পষ্টরূপে পাঠ করো। এভাবে পাঠ করতে হলে তাজবীদের নিয়মাবলি অনুসরণ করা জরুরি। এর জন্য অবশ্যই এ শাস্ত্রে অবগত কোনও ব্যক্তির কাছে মশক করতে হবে। এভাবে মশক করা ছাড়া নিজে নিজে সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন পড়া সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহ তা'আলার এ হুকুম পালনের জন্য প্রত্যেককে অবশ্যই কোনও সুদক্ষ কারীর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।
হাদীছটিতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনওয়ালাকে বলবেন, তুমি দুনিয়ায় যেভাবে তারতীলের সঙ্গে কুরআন পড়তে, সেভাবে কুরআন পড়তে থাকো। বলাবাহুল্য, এভাবে কুরআন পড়লে সম্পূর্ণ কুরআন পড়তে সুদীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। এমনকি কারও যদি অল্প পরিমাণও জানা থাকে, তাও পড়তে যথেষ্ট পরিমাণ সময় লেগে যাবে। এভাবে ধীর-শান্তভাবে পড়তে থাকলে এবং বিদ্যুতের গতিতে ছুটে চললে জান্নাতী ব্যক্তি কত উচ্চতায় পৌঁছে যাবে, তা কল্পনা করা যায়? আল্লাহু আকবার! আখিরাতে এমনই উচ্চ হবে কুরআনওয়ালার শান। এমনই উচ্চতায় হবে তার ঠিকানা।
فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا (কেননা তোমার স্থান তুমি সর্বশেষ যে আয়াত পড়বে সেখানে)। সুতরাং যে ব্যক্তি পূর্ণ কুরআনের হাফেজ তার স্থান হবে সেখানে, যেখানে তার পূর্ণ কুরআন পড়া শেষ হবে। যারা পূর্ণ কুরআনের হাফেজ নয়, তাদের যার যতটুকু জানা ততটুকু পড়া যেখানে শেষ হবে, সেখানে হবে তার ঠিকানা।
ধারণা করা যায়, যারা কুরআনের হাফেজ নয় কিন্তু দুনিয়ার জীবনে নিয়মিত কুরআন পড়ত এবং কুরআনের অনুসরণও করত, তারাও ওই ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত হবে। সম্ভবত সেদিন তাদের স্মৃতিশক্তিতে কুরআন বসিয়ে দেওয়া হবে। ফলে তারাও হাফেজদের মতো সেদিন কুরআন মুখস্থ পড়তে পারবে। কাজেই যারা হাফেজ নয় তাদেরও নিয়মিত কুরআন পড়া উচিত। আর যারা হাফেজ তাদেরও উচিত কুরআন তিলাওয়াতকে নিয়মিত আমল বানিয়ে নেওয়া। খুব সতর্ক থাকা উচিত যাতে কুরআন ভুলে না যায়। কুরআনের হাফেজ হওয়াটা আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। তাদেরকে অবশ্যই এ মহামূল্যবান নি'আমতের শোকর আদায় করতে হবে। এর দাবি হলো নিয়মিত তিলাওয়াত করতে থাকা। বস্তুত কোনও মুসলিমেরই কুরআনের প্রতি অমনোযোগী থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যারা কুরআনের প্রতি উদাসীন, তাদের বিরুদ্ধে আখিরাতে স্বয়ং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার সমীপে নালিশ করবেন। ইরশাদ হয়েছে-
وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এ কুরআনকে বিলকুল পরিত্যাগ করেছিল। (সূরা ফুরকান, আয়াত ৩০)
এটা কতইনা ভয়ের কথা! আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কুরআনের আশেক বানিয়ে দিন এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের তাওফীক দান করুন। আমীন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. কুরআন মাজীদের যারা হাফেজ, আখিরাতে তাদের মর্যাদা হবে অনেক উপরে।
খ. পূর্ণ কুরআনের হাফেজ হতে না পারলেও কুরআনের কিছু না কিছু অংশ তো অবশ্যই মুখস্থ করা উচিত।
গ. প্রত্যেক মুসলিমকে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগী থাকতে হবে। বিশেষ বিশেষ ফযীলতের সূরা, যেমন সূরা ইয়াসীন, সূরা মুল্ক প্রভৃতি সূরার তিলাওয়াতেই ক্ষান্ত না থেকে নিয়মিত একটু একটু করে ধারাবাহিক তিলাওয়াত করা উচিত, যাতে প্রতি মাসে বা কয়েক মাসে হলেও পূর্ণ কুরআন খতম করা যায়।
ঘ. কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে ধীর-শান্তভাবে।
ঙ. কুরআন অবশ্যই সহীহ-শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে হবে। এজন্য কোনও সুদক্ষ কারীর কাছে মশক করা উচিত।
চ. কুরআন মাজীদের অর্থ বোঝার প্রতিও গভীর আগ্রহ থাকা দরকার, যাতে চিন্তাফিকিরের সঙ্গে তিলাওয়াত করা সম্ভব নয়।
ছ. জান্নাতের বহু স্তর আছে। কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত ও অনুসরণের তারতম্য অনুযায়ী জান্নাতবাসীগণ জান্নাতের বিভিন্ন স্তর লাভ করবে।
জ. কুরআন মাজীদের সঙ্গে এমন গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত, যাতে সত্যিকারের কুরআনওয়ালারূপে হাদীছে বর্ণিত ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায়।
يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ : اقْرَأْ وَارْتَقِ ،(কিয়ামতের দিন) কুরআনওয়ালাকে বলা হবে, পড়ো ও চড়ো। হাদীছটির শব্দ হলো صَاحِب الْقُرْآنِ (সাহিবুল কুরআন)। صاحب শব্দটির উৎপত্তি صُحْبَةٌ থেকে। صُحْبَةٌ এর অর্থ সঙ্গ, সাহচর্য। অর্থাৎ কোনওকিছুর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকা। কোনও ব্যক্তির সুহবাতে থাকার অর্থ নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তার সঙ্গে সময় কাটানো এবং তার আদর্শ, চিন্তাভাবনা ও রুচি-অভিরুচি আত্মস্থ করার চেষ্টা করা। সুতরাং সাহিবুল কুরআন বা কুরআনওয়ালা বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করার পর তা নিয়মিত তিলাওয়াত করে ও তার হিদায়াত অনুযায়ী চলতে সচেষ্ট থাকে। এর বহু ধাপ হতে পারে। এক তো হলো কুরআন সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়া। যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন পড়ে, তা বিশেষ কোনও সূরা হোক, যেমন সূরা মুলক, সূরা ইয়াসীন ইত্যাদি, সেও এক পর্যায়ের কুরআনওয়ালা। আবার যে ব্যক্তি ধারাবাহিক তিলাওয়াতের মাধ্যমে কুরআন খতম করে, সেও কুরআনওয়ালা। বলাবাহুল্য, প্রথম ব্যক্তি অপেক্ষা দ্বিতীয় ব্যক্তির স্তর উপরে। যে ব্যক্তি কুরআনের হাফেজ এবং নিয়মিত তিলাওয়াতও করে, সে আরও উচ্চস্তরের কুরআনওয়ালা। যে ব্যক্তি কুরআন বুঝে বুঝে পড়ে, তার স্তর আরও উপরে। যার বুঝ ও জ্ঞানের স্তর যত গভীর হবে, সে ততটাই উচ্চস্তরের কুরআনওয়ালা হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে স্তরভেদ হবে অনেক বেশি। উল্লিখিত সকল স্তরেই কুরআনের হিদায়াত অনুযায়ী আমল করা শর্ত। যে ব্যক্তির মোটেই আমল নেই, উল্টো কুরআনের আদেশ-নিষেধ অগ্রাহ্য করতে অভ্যস্ত, সে যতই কুরআন পড়ুক না কেন, বাস্তবিকপক্ষে সে মোটেই কুরআনওয়ালা নয়; বরং সে করআনবিরোধী আখিরাতে কুরআন তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ.
কুরআন তোমার পক্ষে প্রমাণ হবে অথবা তোমার বিপক্ষে। (সহীহ মুসলিম: ২২৩; জামে তিরমিযী: ৩৫৭১; সুনানে নাসাঈ: ২৪৩৭; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮১; সুনানে দারিমী: ৬৭৯; সহীহ ইবন হিব্বান: ৮৪৪; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৩৪২৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৮৫; শু'আবুল ঈমান: ২৪৫৩; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ১৪৮)
হাঁ, যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন পড়ে এবং কিছু না কিছু আমলও করে, কোনও তাকে কুরআনওয়ালা বলা যেতে পারে। কিন্তু আমলে গাফিলতির কারণে তার স্তর থাকবে অনেক নিচে। মনে রাখতে হবে আমল করাই মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের নির্দেশনা অনুযায়ী কুরআনের আদেশ-নিষেধ ভালোভাবে মেনে চলতে সচেষ্ট থাকে, কুরআনের তিলাওয়াতে তার দুর্বলতা থাকলেও আমলের উচ্চতার কারণে সে তুলনামূলক উচ্চস্তরের কুরআনওয়ালা সাব্যস্ত হবে। যে ব্যক্তি সহীহ-শুদ্ধভাবে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, সেইসঙ্গে কুরআনের আদেশ-নিষেধ পালনেও যত্নবান থাকে, সে অধিকতর উচ্চপর্যায়ের কুরআনওয়ালা। সে যদি হাফেজও হয়, কুরআনের ইলমেও পারদর্শী হয়, তবে তার স্তর ও মর্যাদা তো অনেক উপরে।
অবশ্য আলোচ্য হাদীছটির সম্পর্ক কুরআন পাঠের সঙ্গে। এর দ্বারা কুরআন পাঠের ফযীলত বোঝানো উদ্দেশ্য। কাজেই যে ব্যক্তির কুরআনের উপর আমল আছে, কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত করে না, সে এ হাদীছটিতে বর্ণিত ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। হাঁ, অন্য কোনও আমলের বদৌলতে সে জান্নাতের উচ্চমর্যাদা লাভ করতে পারে। এমনও হতে পারে যে, অন্যান্য আমলের দ্বারা সে কোনও কোনও কুরআন তিলাওয়াতকারীকেও ছাড়িয়ে যাবে।
সাধারণ স্তর অপেক্ষা উচ্চস্তরের জান্নাত কতটা উঁচুতে
কুরআনওয়ালাকে বলা হবে- اقرأ وَارْتَقِ (পড়ো ও চড়ো)। অর্থাৎ জান্নাতবাসীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদেরকে তাদের আপন আপন স্তরে যাওয়ার নির্দেশ হবে, তখন কুরআনওয়ালাকে বলা হবে, তুমি কুরআন পড়তে থাকো ও উপরের দিকে আরোহণ করতে থাকো।
বাহ্যদৃষ্টিতে মনে হয় জান্নাত বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের মতো, যার একেক তলায় একেকজন বাস করে আর প্রত্যেককে আপন আপন তলায় উঠতে হয় সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা এমন নয়। জান্নাত এমন সংকীর্ণ স্থান নয়, যার একেকটি ইমারতে বহু লোককে বাস করতে হবে। বিভিন্ন হাদীছ দ্বারা জানা যায়, সর্বনিম্ন স্তরের জান্নাতবাসীর জান্নাতও এ পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়। তাহলে 'পড়তে থাকো ও চড়তে থাকো' এ কথার অর্থ কী?
এর প্রকৃত অর্থ ও জান্নাতের বাস্তব অবস্থা দুনিয়ায় বসে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। জান্নাতের বিশালতা ও তার আরাম-আয়েশের বন্দোবস্ত কল্পনারও অতীত। যতদূর ধারণা লাভ হয়, তা হচ্ছে প্রত্যেক জান্নাতবাসী হবে বিস্তীর্ণ এক ভুবনের অধিকর্তা। সেখানে তার জন্য আরাম-আয়েশের অজস্র উপকরণ থাকবে এবং তার হুকুম পালন ও ইচ্ছা পূরণের জন্য থাকবে অসংখ্য সেবক-সেবিকা।
ঈমান-আমলের প্রভেদ অনুযায়ী জান্নাতবাসীদের মধ্যে থাকবে অগণিত স্তর। যার স্তর যত উঁচু হবে, তার জান্নাত হবে তত উপরে। জান্নাতের উচ্চতর এক স্থানের নাম গুরফাহ। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-
أُولَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلْمَا
'এরাই তারা, যাদেরকে তাদের সবরের প্রতিদানে দেওয়া হবে গুরফাহ এবং সেখানে শুভেচ্ছা ও সালামের সাথে তাদের অভ্যর্থনা করা হবে।' (সূরা ফুরকান, আয়াত ৭৫)
গুরফাবাসীদের সম্পর্কে হাদীছে বলা হয়েছে-
إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الْغُرَفِ مِنْ فَوْقِهِمْ كَمَا تَتَرَاءَوْنَ الْكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ الْغَابِرَ فِي الْأُفُقِ مِنَ الْمَشْرِقِ أَو الْمَغْرِبِ لِتَفَاضُلِ مَا بَيْنَهُم
নিশ্চয়ই জান্নাতবাসীগণ গুরফাবাসীদেরকে তাদের উপরদিকে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশের পূর্ব বা পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখে থাক। এটা তাদের মধ্যকার মর্যাদাগত পার্থক্যের কারণে। (সহীহ বুখারী: ৩২৫৬; সহীহ মুসলিম: ২৮৩১)
অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ أَهْلَ الدَّرَجَاتِ العُلَى لَيَرَاهُمْ مَنْ تَحْتَهُمْ كَمَا تَرَوْنَ النَّجْمَ الطَّالِعَ فِي أُفُقِ السَّمَاءِ
'নিশ্চয়ই উচ্চস্তরের ব্যক্তিবর্গকে তাদের নিম্নস্তরের ব্যক্তিগণ ঠিক সেইরকম দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশ-দিগন্তে উদিত নক্ষত্র দেখতে পাও।' (জামে' তিরমিযী: ৩৬৫৮; সুনানে আবু দাউদ: ৩৯৮৭; সুনানে ইবন মাজাহ ৯৬)
পৃথিবী থেকে একেকটা নক্ষত্রের দূরত্ব কোটি কোটি মাইল। যেমন পৃথিবী থেকে সূর্য আনুমানিক ১৪.৯৬ কোটি কি.মি. দূরে। পৃথিবী থেকে চাঁদ আনুমানিক ৩৮৪,৪০০ কি.মি. দূরে। নিকটতম নক্ষত্র প্রোক্সিমা সেন্টাউরি ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। এক আলোকবর্ষের দূরত্ব ৯.৪৪ ট্রিলিয়ন কি.মি.। এসব দূরত্ব আমাদের কল্পনারও অতীত। হাদীছে বলা হয়েছে, সাধারণ স্তরের জান্নাতবাসী থেকে উচ্চস্তরের জান্নাতবাসীর মধ্যে যে দূরত্ব থাকবে, তা নক্ষত্রের দূরত্বতুল্য। উচ্চস্তরের জান্নাতবাসীগণ অতটা উচ্চতায় কীভাবে পৌঁছবে এবং কী গতিতেই বা পৌঁছবে? এটা কি বৈদ্যুতিক সিঁড়ি বা লিফট দিয়ে ওঠার বিষয়? নিশ্চয়ই এর জন্য বিশেষ কোনও জান্নাতী বাহন থাকবে, যার গতি হবে আলোর গতির মতো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজের সফরে বুরাক নামের যে বাহনে চড়ে ভ্রমণ করেছিলেন, তার গতি ছিল আলোর গতির মতোই। তাই তার নাম 'বুরাক'। শব্দটির উৎপত্তি بَرْقٌ থেকে, যার অর্থ বিদ্যুৎ। হয়তো জান্নাতেও এরকম কোনও বাহন থাকবে। কুরআনের হাফেজ বা কুরআনওয়ালা ব্যক্তি তাতে চড়ে কুরআন পড়তে থাকবে আর উপরের দিকে উঠতে থাকবে। এভাবে সে পৌঁছে যাবে তার অনন্ত জীবনের পরম ঠিকানায়। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
কুরআন যেভাবে পড়তে হয়
وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا (এবং দুনিয়ায় যেমন ধীরে ধীরে পড়তে, তেমনি ধীরে ধীরে পড়ো)। কুরআন মাজীদ তাজবীদের সাথে প্রতিটি হরফ ও শব্দ সুস্পষ্ট উচ্চারণে এবং ধীরে ধীরে পড়াই নিয়ম। সেইসঙ্গে অন্তরে ভক্তি-শ্রদ্ধা থাকা ও সুর দিয়ে পড়াও জরুরি। কান্না না আসলে কান্নার ভাব-ভঙ্গিতে পড়া চাই। অর্থ জানা থাকলে চিন্তাফিকিরের সঙ্গে পড়া বাঞ্ছনীয়। এভাবে পড়াকে তারতীল বলে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
এবং ধীর-স্থিরভাবে স্পষ্টরূপে কুরআন তিলাওয়াত করো। (সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত ৪)
তাজবীদ হলো প্রতিটি হরফ আপন আপন উচ্চারণস্থান বা মাখরাজ থেকে আপন আপন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে উচ্চারণ করা এবং শব্দ ও বাক্য পাঠের ক্ষেত্রে মাদ্দ-গুন্নাহ, ওয়াক্ফ ইত্যাদির নিয়মাবলি অনুসরণ করা। তাজবীদ একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র। এতে কুরআন পাঠের বিস্তারিত নিয়মনীতি বর্ণিত আছে। সেসব নীতির মূল ভিত্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাঠ-পদ্ধতির উপর। তিনি স্বয়ং কুরআন মাজীদের পাঠ-পদ্ধতি সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম সে পদ্ধতিতেই নিজেরা কুরআন পড়তেন ও অন্যদেরকে শিক্ষা দিতেন। তাদের সে শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই তাজবীদ শাস্ত্র গড়ে উঠেছে। এটা কুরআন মাজীদের এক বিশেষত্ব যে, তার কেবল পাঠ-পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে তাজবীদ, নাহব প্রভৃতি শাস্ত্র গড়ে উঠেছে এবং এসব শাস্ত্রে বিপুল গবেষণা হয়েছে ও শত শত বই-পুস্তক রচিত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার হুকুম হলো- কুরআন তারতীলের সঙ্গে অর্থাৎ ধীর-শান্তভাবে ও সুস্পষ্টরূপে পাঠ করো। এভাবে পাঠ করতে হলে তাজবীদের নিয়মাবলি অনুসরণ করা জরুরি। এর জন্য অবশ্যই এ শাস্ত্রে অবগত কোনও ব্যক্তির কাছে মশক করতে হবে। এভাবে মশক করা ছাড়া নিজে নিজে সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন পড়া সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহ তা'আলার এ হুকুম পালনের জন্য প্রত্যেককে অবশ্যই কোনও সুদক্ষ কারীর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।
হাদীছটিতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনওয়ালাকে বলবেন, তুমি দুনিয়ায় যেভাবে তারতীলের সঙ্গে কুরআন পড়তে, সেভাবে কুরআন পড়তে থাকো। বলাবাহুল্য, এভাবে কুরআন পড়লে সম্পূর্ণ কুরআন পড়তে সুদীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। এমনকি কারও যদি অল্প পরিমাণও জানা থাকে, তাও পড়তে যথেষ্ট পরিমাণ সময় লেগে যাবে। এভাবে ধীর-শান্তভাবে পড়তে থাকলে এবং বিদ্যুতের গতিতে ছুটে চললে জান্নাতী ব্যক্তি কত উচ্চতায় পৌঁছে যাবে, তা কল্পনা করা যায়? আল্লাহু আকবার! আখিরাতে এমনই উচ্চ হবে কুরআনওয়ালার শান। এমনই উচ্চতায় হবে তার ঠিকানা।
فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا (কেননা তোমার স্থান তুমি সর্বশেষ যে আয়াত পড়বে সেখানে)। সুতরাং যে ব্যক্তি পূর্ণ কুরআনের হাফেজ তার স্থান হবে সেখানে, যেখানে তার পূর্ণ কুরআন পড়া শেষ হবে। যারা পূর্ণ কুরআনের হাফেজ নয়, তাদের যার যতটুকু জানা ততটুকু পড়া যেখানে শেষ হবে, সেখানে হবে তার ঠিকানা।
ধারণা করা যায়, যারা কুরআনের হাফেজ নয় কিন্তু দুনিয়ার জীবনে নিয়মিত কুরআন পড়ত এবং কুরআনের অনুসরণও করত, তারাও ওই ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত হবে। সম্ভবত সেদিন তাদের স্মৃতিশক্তিতে কুরআন বসিয়ে দেওয়া হবে। ফলে তারাও হাফেজদের মতো সেদিন কুরআন মুখস্থ পড়তে পারবে। কাজেই যারা হাফেজ নয় তাদেরও নিয়মিত কুরআন পড়া উচিত। আর যারা হাফেজ তাদেরও উচিত কুরআন তিলাওয়াতকে নিয়মিত আমল বানিয়ে নেওয়া। খুব সতর্ক থাকা উচিত যাতে কুরআন ভুলে না যায়। কুরআনের হাফেজ হওয়াটা আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত। তাদেরকে অবশ্যই এ মহামূল্যবান নি'আমতের শোকর আদায় করতে হবে। এর দাবি হলো নিয়মিত তিলাওয়াত করতে থাকা। বস্তুত কোনও মুসলিমেরই কুরআনের প্রতি অমনোযোগী থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যারা কুরআনের প্রতি উদাসীন, তাদের বিরুদ্ধে আখিরাতে স্বয়ং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার সমীপে নালিশ করবেন। ইরশাদ হয়েছে-
وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় এ কুরআনকে বিলকুল পরিত্যাগ করেছিল। (সূরা ফুরকান, আয়াত ৩০)
এটা কতইনা ভয়ের কথা! আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কুরআনের আশেক বানিয়ে দিন এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের তাওফীক দান করুন। আমীন।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. কুরআন মাজীদের যারা হাফেজ, আখিরাতে তাদের মর্যাদা হবে অনেক উপরে।
খ. পূর্ণ কুরআনের হাফেজ হতে না পারলেও কুরআনের কিছু না কিছু অংশ তো অবশ্যই মুখস্থ করা উচিত।
গ. প্রত্যেক মুসলিমকে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগী থাকতে হবে। বিশেষ বিশেষ ফযীলতের সূরা, যেমন সূরা ইয়াসীন, সূরা মুল্ক প্রভৃতি সূরার তিলাওয়াতেই ক্ষান্ত না থেকে নিয়মিত একটু একটু করে ধারাবাহিক তিলাওয়াত করা উচিত, যাতে প্রতি মাসে বা কয়েক মাসে হলেও পূর্ণ কুরআন খতম করা যায়।
ঘ. কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে ধীর-শান্তভাবে।
ঙ. কুরআন অবশ্যই সহীহ-শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে হবে। এজন্য কোনও সুদক্ষ কারীর কাছে মশক করা উচিত।
চ. কুরআন মাজীদের অর্থ বোঝার প্রতিও গভীর আগ্রহ থাকা দরকার, যাতে চিন্তাফিকিরের সঙ্গে তিলাওয়াত করা সম্ভব নয়।
ছ. জান্নাতের বহু স্তর আছে। কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত ও অনুসরণের তারতম্য অনুযায়ী জান্নাতবাসীগণ জান্নাতের বিভিন্ন স্তর লাভ করবে।
জ. কুরআন মাজীদের সঙ্গে এমন গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত, যাতে সত্যিকারের কুরআনওয়ালারূপে হাদীছে বর্ণিত ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)