আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ
৪৪. কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব
হাদীস নং: ২৮৯৫
আন্তর্জাতিক নং: ২৮৯৫
কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব
ইযা যুলযিলাত
২৮৯৫. উকবা ইবনে মুকাররাম আম্মী বসরী (রাহঃ) .... আনাস ইবনে মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) তাঁর এক সাহাবী বললেনঃ হে অমুক, তুমি কি বিয়ে করেছ? লোকটি বললঃ না, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহর কসম, আমার কাছে বিয়ে করার মত কিছু নেই। তিনি বললেনঃ তোমার সাথে কি কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ নেই? লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ।
তোমার সঙ্গে কি ইযা জা-আ নসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহ্ সূরাটি নেই? লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।
তোমার সঙ্গে কি কুল ইয়া আয়্যূহাল কাফিরূন সূরাটি নেই?
লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।
তোমার সঙ্গে কি ইযা যুল যিলাতিল আরদু সূরাটি নেই?
লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।
বিয়ে করে নাও। বিয়ে করে নাও।
(আবু ঈসা বলেন)হাদীসটি হাসান।
তোমার সঙ্গে কি ইযা জা-আ নসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহ্ সূরাটি নেই? লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।
তোমার সঙ্গে কি কুল ইয়া আয়্যূহাল কাফিরূন সূরাটি নেই?
লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।
তোমার সঙ্গে কি ইযা যুল যিলাতিল আরদু সূরাটি নেই?
লোকটি বললঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।
বিয়ে করে নাও। বিয়ে করে নাও।
(আবু ঈসা বলেন)হাদীসটি হাসান।
أبواب فضائل القرآن عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
بَابُ مَا جَاءَ فِي إِذَا زُلْزِلَتْ
حَدَّثَنَا عُقْبَةُ بْنُ مُكْرَمٍ الْعَمِّيُّ الْبَصْرِيُّ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي فُدَيْكٍ، أَخْبَرَنَا سَلَمَةُ بْنُ وَرْدَانَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لِرَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِهِ " هَلْ تَزَوَّجْتَ يَا فُلاَنُ " . قَالَ لاَ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلاَ عِنْدِي مَا أَتَزَوَّجُ بِهِ . قَالَ " أَلَيْسَ مَعَكَ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ) " . قَالَ بَلَى . قَالَ " ثُلُثُ الْقُرْآنِ " . قَالَ " أَلَيْسَ مَعَكَ ( إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ) " . قَالَ بَلَى . قَالَ " رُبُعُ الْقُرْآنِ " . قَالَ " أَلَيْسَ مَعَكَ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ " . قَالَ بَلَى قَالَ " رُبُعُ الْقُرْآنِ " . قَالَ " أَلَيْسَ مَعَكَ (إِذَا زُلْزِلَتِ الأَرْضُ ) " . قَالَ بَلَى . قَالَ " رُبُعُ الْقُرْآنِ " . قَالَ " تَزَوَّجْ تَزَوَّجْ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
সূরা ইখলাস অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি সূরা। এ সূরায় মহান আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। সূরাটির রয়েছে বিশেষ ফযীলত। বিভিন্ন হাদীছে এর এক ফযীলত তো বলা হয়েছে এই যে, এটি কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশের সমান। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার নামে কসম করে বলেন যে, এ সূরাটি কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগের সমান। এই বলে তিনি সূরাটি পড়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। কোনও সৎকর্মের প্রতি উৎসাহ দেওয়ার জন্য কসম করার অবকাশ আছে; বরং এরূপ ক্ষেত্রে করাটাই উত্তম। তিনি উৎসাহদানের উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কেরামকে বলেছেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে, যে এক রাতের মধ্যে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ পড়ে ফেলবে? সাহাবায়ে কেরামের কাছে বিষয়টা কঠিন মনে হলো। তারা বললেন-
أَيُّنَا يُطِيقُ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে কে এটা পারবে?) তাদের কাছে এটা কঠিন মনে হয়েছিল এ কারণে যে, এক তো কুরআন মাজীদ তারতীলের সঙ্গে পড়তে হয়। অর্থাৎ প্রত্যেকটি হরফ তার মাখরাজ থেকে, প্রতিটি হরফ সুস্পষ্টভাবে এবং কিরাআত বিষয়ক নিয়মীতি অনুসরণ করে ধীরস্থিরভাবে পড়তে হয়। দ্বিতীয়ত কুরআন ও হাদীছে বারবার তাদাব্বুরের সঙ্গে তিলাওয়াত করতে বলা হয়েছে। তিলাওয়াত করার সময় অর্থের দিকে লক্ষ করা, কোন আয়াতে কী বিধান দেওয়া হয়েছে বা কী উপদেশ রয়েছে, সরাসরি কী বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে, ইশারা-ইঙ্গিতে কোন কোন দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ইত্যাদি আরও যা-কিছুর সমাহার একেকটি আয়াতের মধ্যে রয়েছে, সেদিকে লক্ষ করে চিন্তাভাবনার সঙ্গে তিলাওয়াত করাকে তাদাব্বুর বলা হয়। তো তারতীল ও তাদাব্বুরের সঙ্গে তিলাওয়াত করলে এক রাতের মধ্যে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ দশ পারা পড়ে ফেলা সহজ কথা নয়। তাই সাহাবায়ে কেরাম কামনা করছিলেন যেন বিষয়টা সহজ করে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন আল্লাহ তা‘আলার কাছে সুপারিশ করে পরিমাণটা আরও হালকা করে দেন। তাদের জিজ্ঞাসাটা ছিল সে উদ্দেশ্যেই।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অবাক করে দিয়ে বললেন- قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ সূরা ইখলাস কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগের সমতুল্য। তার মানে কেউ সংক্ষিপ্ত এই ছোট্ট সূরাটি পড়লে সে যেন কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ পড়ে ফেলল। আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তা‘আলা কত বড়ই না মেহেরবান! অতি সহজ ও অতি হালকা কাজ করার দ্বারা তাঁর পক্ষ হতে কী বিপুল ও ভারী ছাওয়াব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে!
‘সূরা ইখলাস কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশ’-এর অর্থ
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে পূর্ণ কুরআন পড়ার কী প্রয়োজন? কেউ যদি এ সূরাটি তিনবার পড়ে, তবে তো ত্রিশ পারা পড়ার মতো হয়ে যাবে। কষ্ট করে ত্রিশ পারা পড়তে হবে কেন?
উত্তর হলো, উলামায়ে কেরাম হাদীছটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ বলেন, হাদীছটির অর্থ হলো, দশ পারা কুরআন পড়লে যে ছাওয়াব পাওয়া যায়, শুধু সূরা ইখলাস পড়লেই সেই পরিমাণ ছাওয়াব অর্জিত হবে। তার মানে দশ পারার সমান হলো কেবলই ছাওয়াবের দিক থেকে, অন্য কোনও দিক থেকে নয়। কুরআন পাঠের উদ্দেশ্য মৌলিকভাবে দু’টি। এক হলো কুরআন পাঠ করলে যে ছাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা হাদীছে আছে, সেই ছাওয়াব অর্জন করা। আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো হিদায়াত লাভ করা।
হিদায়াত লাভের বিষয়টা অনেক ব্যাপক। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলি জানার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় লাভ করা এবং তাকওয়া ও আল্লাহভীতির গুণ অর্জন করা, কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, জান্নাতের বিভিন্ন নি‘আমত, জাহান্নামের শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ে অবগতি লাভ করার দ্বারা আখিরাত সম্পর্কিত আকীদা পাকাপোক্ত করা, ইবাদত-বন্দেগী, আখলাক-চরিত্র, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি বিষয়ক বিধি-বিধান জানা ও তার অনুসরণ দ্বারা আখিরাতের নাজাত ও আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের পথ চেনা এবং কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা, অতীত জাতিসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস, নবী-রাসূলগণের দাওয়াতী কার্যক্রম ইত্যাদি বিষয় জানার দ্বারা নসীহত লাভ করা, অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত করা ও শরীআতের পথে চলার অনুপ্রেরণা লাভ করা। তাছাড়া কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা নিজ আত্মা আলোকিত করা, অন্তরে আল্লাহপ্রেম বলিষ্ঠ করা আর এভাবে আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করাও কুরআন তিলাওয়াতের এক উদ্দেশ্য।
সূরা ইখলাস পাঠ করলে কুরআন মাজীদ এক-তৃতীয়াংশ পড়ার সমপরিমাণ ছাওয়াব পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু হিদায়াত ও মা‘রিফাতের যে বিস্তীর্ণ ভুবন, তার কতটুকু লাভ করা যাবে? সেজন্য অবশ্যই সম্পূর্ণ কুরআনই পড়তে হবে। কাজেই সেদিক থেকে এ সূরা কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগ নয় মোটেই। আর তা যেহেতু নয়, তাই কেবল এ সূরা পড়ার দ্বারা বাদবাকি কুরআন পড়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক-
মাসজিদুল হারামে এক রাকাত নামায পড়লে এক লক্ষ নামাযের ছাওয়াব পাওয়া যায়। তাই বলে কি পবিত্র সেই মসজিদে কিছুদিন নামায পড়ে বাদবাকি জীবনের সব নামায থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে?
লায়লাতুল কদরে ইবাদত করার দ্বারা এক হাজার মাসেরও বেশি কাল ইবাদতের ছাওয়াব পাওয়া যায়। তাই বলে সেই এক রাত ইবাদত করলেই হয়ে যাবে আর এর দ্বারা বাকি জীবন ইবাদত-বন্দেগী করার দায়িত্ব থেকে রেহাই পাওয়া যাবে, এমন কথা কেউ বলবে কি?
হাদীছমতে হাসিমুখে মা-বাবার চেহারার দিকে তাকালে মকবুল হজ্জের ছাওয়াব পাওয়া যায়। এখন কেউ কি বলবে, হাসিমুখে মা-বাবার চেহারার দিকে তাকালে তার আর হজ্জ করতে হবে না? নিশ্চয়ই কেউ তা বলবে না। কেননা এর দ্বারা মকবুল হজ্জের সমান ছাওয়াব পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু হজ্জের ফারযিয়াত তো আদায় হবে না। কারও উপর যদি হজ্জ ফরয হয়ে থাকে, তবে হাজার বারও সে হাসিমুখে বাবা-মায়ের চেহারার দিকে তাকালে সে ফরয আদায় হয়ে যাবে না। সে ফরয আদায়ের জন্য তাকে অবশ্যই মক্কা মুকাররামায় যেতে হবে এবং যথারীতি হজ্জ আদায় করতে হবে।
বস্তুত হাদীছটির উদ্দেশ্য মানুষকে সূরা ইখলাস পড়ার প্রতি উৎসাহিত করা। এর উদ্দেশ্য বাদবাকি কুরআন পড়া থেকে বিমুখ করা নয় মোটেই।
কেউ বলেন, এর অর্থ সূরা ইখলাস কুরআনের বিষয়বস্তুসমূহের তিন ভাগের এক ভাগ। কুরআনের আলোচ্য বিষয় তিন প্রকার। (ক) অতীতের ঘটনাবলি; (খ) বিধি-বিধান ও (গ) আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলি। সূরা ইখলাসের সবটা আলোচনাই আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলি সম্পর্কে। সে হিসেবে সূরাটি কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ।
কেউ বলেন, কুরআন মাজীদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তিনটি বিষয়ে। (ক) তাওহীদ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ; (খ) সিরাতুল মুস্তাকীম বা আল্লাহপ্রদত্ত সরল পথ এবং (গ) আখিরাত। সূরা ইখলাসের আলোচ্য বিষয় হলো তাওহীদ। সুতরাং এ সূরা কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ। এছাড়াও আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। তবে সঠিক কথা হলো ছাওয়াবের দিক থেকে এ সূরাটি কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ।
সূরাটির প্রসিদ্ধ নাম সূরা ইখলাস। এ নামের কারণ সূরাটির বিষয়বস্তু খালেস আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কেই।
কোনও বিধি-বিধান বা অন্য কোনও বিষয়ে এতে আলোচনা করা হয়নি। কিংবা বলা যায়, এ সূরার আলোচনা খালেস তাওহীদ সম্পর্কে। জানানো হয়েছে যে, সব রকম শিরক ও অংশীদারত্ব থেকে তিনি পবিত্র। এমনও বলা যেতে পারে যে, এ সূরার দ্বারা বান্দা নিজেকে খালেস তাওহীদে বিশ্বাসী এবং সর্বপ্রকার শিরক থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা দেয়। কেউ বলেন, এ সূরাটির বিষয়বস্তুতে বিশ্বাস রাখার দ্বারা জাহান্নাম থেকে খালাস পাওয়া যায়। তাই এর নাম সূরা ইখলাস।
সূরা ইখলাসের শানে নুযূল
সূরাটি নাযিল হয়েছিল আরব মুশরিক ও ইহুদিদের একটি প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে। হযরত উবাই ইবন কা‘ব রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল, আপনি আমাদের কাছে আপনার রব্বের পরিচয় দিন। হযরত জাবির রাযি. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, ইহুদিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলেছিল, আপনি আমাদের কাছে আপনার সেই রব্বের পরিচয় দিন, যিনি আপনাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। এসব জিজ্ঞাসার উত্তরেই আল্লাহ তা‘আলা এ সূরাটি নাযিল করেছেন।
সূরাটিতে চারটি আয়াত আছে। প্রতিটি আয়াতেই আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ ও একত্ববাদের ঘোষণা রয়েছে। আমরা নিচে আয়াতগুলোর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পেশ করছি।
সূরা ইখলাসের তাফসীর
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ (বলে দাও, কথা হলো- আল্লাহ সব দিক থেকে এক)। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সত্তা ও গুণাবলিতে এক ও একক। কোনও দিক থেকেই তাঁর কোনও শরীক নেই। তাঁর হায়াত, তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা, তাঁর জ্ঞান ও হিকমত, তাঁর দয়া ও কঠোরতা মোটকথা তাঁর প্রতিটি গুণ পরিপূর্ণ। তাঁর কোনও গুণেই কোনওরকম ত্রুটি ও কমতি নেই। কোনও গুণেই কোনও মাখলুক তাঁর সমপর্যায়ের নয়। কারও মধ্যে কোনও গুণ যত বেশি পরিমাণেই থাকুক, তা পরিপূর্ণ নয় মোটেই। কিছু না কিছু ত্রুটি তার মধ্যে থাকেই। অন্ততপক্ষে সীমাবদ্ধতার যে কমতি, তা অবশ্যই থাকে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার প্রতিটি গুণ অসীম আর মাখলুকের প্রতিটি গুণ সসীম।
أَحَدٌ আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণবাচক নাম। এর পাশাপাশি তাঁর আরেকটি গুণবাচক নাম হলো اَلْوَاحِدُ। এর অর্থও এক। তবে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো- الْوَاحِدُ দ্বারা কেবল সত্তাগত একত্ব বোঝানো হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা এমন এক একক সত্তা, যাঁর অনুরূপ সত্তা অন্য কারও নেই। আর أَحَدٌ দ্বারা সত্তা ও গুণ উভয়ের একত্ব বোঝানো হয়। অর্থাৎ সত্তাগতভাবেও তিনি এক এবং অনন্ত অসীম গুণাবলির দিক থেকেও তিনি এক। তাঁর মতো সত্তা যেমন কারও নেই, তেমনি তাঁর গুণের মতো অসীম গুণও কারও নেই। কেউ কেউ বলেছেন, أَحَدٌ দ্বারা কেবল গুণগত একত্ব বোঝানো হয়, যেমন اَلْوَاحِدُ দ্বারা কেবল সত্তাগত একত্ব বোঝানো হয়।
اَللَّهُ الصَّمَدُ (আল্লাহই এমন যে, সকলে তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন)। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা এমন এক সত্তা, যিনি অনাদিকাল থেকে আছেন, অনন্তকাল থাকবেন। তিনি যা চান তাই করেন, করতে পারেন। তিনি কোনওকিছুতেই কারও মুখাপেক্ষী নন। না নিজ অস্তিত্ব রক্ষায়, না নিজ ইচ্ছা পূরণে, না নিজ হুকুম বাস্তবায়নে। তিনি তো কোনও দিক থেকেই কারও মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু অন্য সকলেই সবদিক থেকে তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি অস্তিত্বদান না করলে কেউ অস্তিত্ব পেতে পারে না। তিনি রক্ষা না করলে কেউ আত্মরক্ষা করতে পারে না। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কেউ নিজ ইচ্ছা পূরণ করতে পারে না। মোটকথা সমস্ত মাখলুক সর্বতোভাবে তাঁর মুখাপেক্ষী।
ইবন কাছীর রহ. বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি الصَّمَدُ এর ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহ এমন প্রভু, যিনি তাঁর প্রভুত্বগুণে পরিপূর্ণ। এমন শারীফ ও মহানুভব, যিনি নিজ মহানুভবতায় পরিপূর্ণ। এমন মহীয়ান, যিনি নিজ মহত্ত্বে পরিপূর্ণ। এমন সহিষ্ণু, যিনি নিজ সহনশীলতায় পরিপূর্ণ। এমন জ্ঞানী, যিনি নিজ জ্ঞানে পরিপূর্ণ। এমন প্রজ্ঞাময়, যিনি নিজ প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। তিনি এমন এক সত্তা, যিনি সর্বপ্রকার মর্যাদা-মহিমায় পরিপূর্ণ। তিনিই আল্লাহ। তিনিই মহান, পবিত্র। তাঁর এ গুণ কেবল তাঁরই জন্য সাজে। অন্য কেউ এর উপযুক্ত নয়।
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (তাঁর কোনও সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন)। এর দ্বারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই ভ্রান্ত ধারণা রদ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলার সন্তান-সন্ততি আছে। আরব মুশরিকরা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যাসন্তান বলত। খ্রিষ্টানদের দাবি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা‘আলার পুত্র। ইহুদিদের অনেকে হযরত উযায়র আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা‘আলার পুত্র বলত। এ আয়াত বলছে, আল্লাহ তা‘আলা কাউকে জন্ম দেননি। তাঁর কোনও সন্তান-সন্ততি নেই। এ ভ্রান্ত ধারণাটি এর আগের আয়াত দ্বারাও রদ হয়ে যায়। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
أَلَا إِنَّهُمْ مِنْ إِفْكِهِمْ لَيَقُولُونَ وَلَدَ اللَّهُ ۙ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
‘মনে রেখো, তারা তাদের মনগড়া কথার কারণে বলে, আল্লাহর কোনও সন্তান আছে। বস্তুত তারা নিশ্চিতভাবেই মিথ্যাবাদী।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১৫১, ১৫২ )
কেননা যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তাঁর কোনও পুত্র-কন্যার দরকার পড়ে না। কাজেই যারা তাঁর পুত্র-কন্যা থাকার দাবি করছে, তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবাস্তব কথাই বলছে।
এমনিভাবে যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তাঁর কোনও জন্মদাতাও থাকতে পারে না। কারও জন্মদান বা অস্তিত্বদান ছাড়াই তিনি অস্তিত্ববান। তিনি সদাজীবন্ত সত্তা। সবসময় থেকেই আছেন। যিনি সবসময় থেকেই আছেন, তাঁর কোনও অস্তিত্বদাতার প্রয়োজন হবে কেন?
আয়াতটির মধ্যে ইশারা রয়েছে যে, যে-কেউ অন্যের সন্তান হয় বা যে জন্মগ্রহণ করে, সে কখনও ঈশ্বর ও উপাস্য হতে পারে না। কাজেই খ্রিষ্টানদের এ বিশ্বাস সম্পূর্ণই ভ্রান্ত যে, ঈসা আলাইহিস সালাম নিজে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের ত্রি-সত্তার একজন।
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ (এবং তার সমকক্ষ নয় কেউ)। তিনি সৃষ্টিকর্তা। বাকি সবকিছুই মাখলুক। তাঁরই সৃষ্টি। মাখলুক কখনও খালেকের মতো হতে পারে না। তিনি অসীম সত্তা। সমস্ত মাখলুক সবদিক থেকে সসীম। সুতরাং তিনি সকল দিক থেকে অনন্য, অতুলনীয়। তাঁর জ্ঞান, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর সহনশীলতা, তাঁর দয়া, তাঁর ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি প্রত্যেকটি গুণ সকল তুলনার ঊর্ধ্বে। কাউকে কোনও দিক থেকে তাঁর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট বলেছেন-
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ‘কোনও জিনিস নয় তাঁর অনুরূপ। তিনিই সব কথা শোনেন, সবকিছু দেখেন।’ (সূরা শূরা, আয়াত ১১)
কেউ যখন তাঁর সঙ্গে তুলনীয় নয়, তখন কাউকে তাঁর স্ত্রী, তাঁর পুত্র-কন্যা সাব্যস্ত করারও কোনও অবকাশ নেই। তা করাটা শিরক। পৌত্তলিক সম্প্রদায় ও খ্রিষ্ট সম্প্রদায়সহ বহু জাতি এরূপ শিরকে লিপ্ত।
সূরা ইখলাস পড়ে দুআ করা
সূরা ইখলাসের এক ফযীলত তো বলা হয়েছে এই যে, এটি কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশের সমান। বিভিন্ন হাদীছে সূরাটির আরও বিভিন্ন ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন এর এক ফযীলত হলো এ সূরাটি দ্বারা দুআ করলে আল্লাহ তা‘আলা সে দুআ অবশ্যই কবুল করেন। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন এক ব্যক্তি নামায শেষে দুআ করছে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ يَا اللَّهُ بِأَنَّكَ الْوَاحِدُ الأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيم
(হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি এই সাক্ষ্যদানের সঙ্গে যে, হে আল্লাহ! আপনি এক ও অদ্বিতীয়। আপনি কারও মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু সকলেই আপনার মুখাপেক্ষী। আপনি এমন সত্তা, যে কাউকে জন্ম দেয়নি এবং যাকে কেউ জন্ম দেয়নি। এবং যাঁর সমকক্ষ নয় কেউ। আপনি আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি মহা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- قَدْ غُفِرَ لَهُ، ثَلَاثًا (তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে)। (সুনানে নাসাঈ : ১৩০১; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ১২৫৯)
এ সূরাটি পড়লে সবরকম অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ হয়। সেজন্য নিয়ম হলো সূরা ফালাক ও সূরা নাসের সঙ্গে এ সূরাটি পড়ে দুই হাতে দম করা, তারপর সে হাত দিয়ে সারা শরীর মোছা। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শয্যাগ্রহণ করতেন, তখন সূরা ফালাক ও সূরা নাসের সঙ্গে এ সূরাটিও পড়তেন, তারপর দুই হাতে দম করে তা দিয়ে শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছতেন। (সহীহ বুখারী : ৫০১৭; সুনানে আবূ দাউদ : ৫০৫৬; জামে‘ তিরমিযী : ৩৪০২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ১০৫৫৬; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৫৪৪; তাবারানী, আল মু‘জামুল আওসাত : ৫০৭৯; বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান : ২৩৩৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ১২১২)
হযরত উকবা ইবন আমির রাযি. বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে তাওরাত, ইনজীল, যাবূর ও কুরআনে যা নাযিল হয়েছে তার মধ্যে সর্বোত্তম তিনটি সূরা শেখাব না? আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি আমাকে সূরা কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, কুল আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক ও কুল আ‘উযু বিরাব্বিন্নাস এ তিনটি সূরা শেখালেন। তারপর বললেন-
يَا عُقْبَةُ، لَا تَنْسَاهُنَّ، وَلَا تَبِتْ لَيْلَةً حَتَّى تَقْرَأَهُنَّ.
(হে উকবা! তুমি এগুলো ভুলে যেয়ো না এবং এগুলো না পড়ে কোনও রাত কাটিয়ো না)। (তাবারানী, আল মু’জামুল কাবীর : ৭৪২; মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩৩৪)
এ সূরাটির প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে জান্নাত লাভ করা যায়, যেমন বিভিন্ন হাদীছে এসেছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সূরা ইখলাস পড়ার দ্বারা কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশ পড়ার ছাওয়াব পাওয়া যায়।
খ. হাদীছগুলো দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার অসীম দয়ার পরিচয় পাওয়া যায়। সংক্ষিপ্ত একটি সূরা পাঠ করার দ্বারা কী বিপুল ছাওয়াব অর্জনের সুযোগ তিনি করে দিয়েছেন!
গ. রাতের বেলা ঘুমের আগে এ সূরাটি পড়া উচিত।
ঘ. কারও কোনও সংক্ষিপ্ত সৎকর্মকে তুচ্ছ মনে করতে নেই। কেননা না জানি সেই সংক্ষিপ্ত কাজের ভেতর কী বিপুল কল্যাণ নিহিত আছে।
ঙ. কাউকে কোনও সৎকর্মে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আল্লাহর নামে কসম করা যেতে পারে; বরং তা করাটাই উত্তম।
চ. কারও কোনও কাজে মনে খটকা দেখা দিলে কোনও বিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে তা উল্লেখ করে সে খটকা নিরসন করে নেওয়া উচিত।
أَيُّنَا يُطِيقُ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ (ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে কে এটা পারবে?) তাদের কাছে এটা কঠিন মনে হয়েছিল এ কারণে যে, এক তো কুরআন মাজীদ তারতীলের সঙ্গে পড়তে হয়। অর্থাৎ প্রত্যেকটি হরফ তার মাখরাজ থেকে, প্রতিটি হরফ সুস্পষ্টভাবে এবং কিরাআত বিষয়ক নিয়মীতি অনুসরণ করে ধীরস্থিরভাবে পড়তে হয়। দ্বিতীয়ত কুরআন ও হাদীছে বারবার তাদাব্বুরের সঙ্গে তিলাওয়াত করতে বলা হয়েছে। তিলাওয়াত করার সময় অর্থের দিকে লক্ষ করা, কোন আয়াতে কী বিধান দেওয়া হয়েছে বা কী উপদেশ রয়েছে, সরাসরি কী বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে, ইশারা-ইঙ্গিতে কোন কোন দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ইত্যাদি আরও যা-কিছুর সমাহার একেকটি আয়াতের মধ্যে রয়েছে, সেদিকে লক্ষ করে চিন্তাভাবনার সঙ্গে তিলাওয়াত করাকে তাদাব্বুর বলা হয়। তো তারতীল ও তাদাব্বুরের সঙ্গে তিলাওয়াত করলে এক রাতের মধ্যে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ দশ পারা পড়ে ফেলা সহজ কথা নয়। তাই সাহাবায়ে কেরাম কামনা করছিলেন যেন বিষয়টা সহজ করে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন আল্লাহ তা‘আলার কাছে সুপারিশ করে পরিমাণটা আরও হালকা করে দেন। তাদের জিজ্ঞাসাটা ছিল সে উদ্দেশ্যেই।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অবাক করে দিয়ে বললেন- قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ সূরা ইখলাস কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগের সমতুল্য। তার মানে কেউ সংক্ষিপ্ত এই ছোট্ট সূরাটি পড়লে সে যেন কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ পড়ে ফেলল। আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তা‘আলা কত বড়ই না মেহেরবান! অতি সহজ ও অতি হালকা কাজ করার দ্বারা তাঁর পক্ষ হতে কী বিপুল ও ভারী ছাওয়াব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে!
‘সূরা ইখলাস কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশ’-এর অর্থ
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে পূর্ণ কুরআন পড়ার কী প্রয়োজন? কেউ যদি এ সূরাটি তিনবার পড়ে, তবে তো ত্রিশ পারা পড়ার মতো হয়ে যাবে। কষ্ট করে ত্রিশ পারা পড়তে হবে কেন?
উত্তর হলো, উলামায়ে কেরাম হাদীছটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ বলেন, হাদীছটির অর্থ হলো, দশ পারা কুরআন পড়লে যে ছাওয়াব পাওয়া যায়, শুধু সূরা ইখলাস পড়লেই সেই পরিমাণ ছাওয়াব অর্জিত হবে। তার মানে দশ পারার সমান হলো কেবলই ছাওয়াবের দিক থেকে, অন্য কোনও দিক থেকে নয়। কুরআন পাঠের উদ্দেশ্য মৌলিকভাবে দু’টি। এক হলো কুরআন পাঠ করলে যে ছাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা হাদীছে আছে, সেই ছাওয়াব অর্জন করা। আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো হিদায়াত লাভ করা।
হিদায়াত লাভের বিষয়টা অনেক ব্যাপক। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলি জানার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় লাভ করা এবং তাকওয়া ও আল্লাহভীতির গুণ অর্জন করা, কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, জান্নাতের বিভিন্ন নি‘আমত, জাহান্নামের শাস্তি ইত্যাদি বিষয়ে অবগতি লাভ করার দ্বারা আখিরাত সম্পর্কিত আকীদা পাকাপোক্ত করা, ইবাদত-বন্দেগী, আখলাক-চরিত্র, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি বিষয়ক বিধি-বিধান জানা ও তার অনুসরণ দ্বারা আখিরাতের নাজাত ও আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের পথ চেনা এবং কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা, অতীত জাতিসমূহের উত্থান-পতনের ইতিহাস, নবী-রাসূলগণের দাওয়াতী কার্যক্রম ইত্যাদি বিষয় জানার দ্বারা নসীহত লাভ করা, অন্তরে আল্লাহভীতি জাগ্রত করা ও শরীআতের পথে চলার অনুপ্রেরণা লাভ করা। তাছাড়া কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা নিজ আত্মা আলোকিত করা, অন্তরে আল্লাহপ্রেম বলিষ্ঠ করা আর এভাবে আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করাও কুরআন তিলাওয়াতের এক উদ্দেশ্য।
সূরা ইখলাস পাঠ করলে কুরআন মাজীদ এক-তৃতীয়াংশ পড়ার সমপরিমাণ ছাওয়াব পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু হিদায়াত ও মা‘রিফাতের যে বিস্তীর্ণ ভুবন, তার কতটুকু লাভ করা যাবে? সেজন্য অবশ্যই সম্পূর্ণ কুরআনই পড়তে হবে। কাজেই সেদিক থেকে এ সূরা কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগ নয় মোটেই। আর তা যেহেতু নয়, তাই কেবল এ সূরা পড়ার দ্বারা বাদবাকি কুরআন পড়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক-
মাসজিদুল হারামে এক রাকাত নামায পড়লে এক লক্ষ নামাযের ছাওয়াব পাওয়া যায়। তাই বলে কি পবিত্র সেই মসজিদে কিছুদিন নামায পড়ে বাদবাকি জীবনের সব নামায থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে?
লায়লাতুল কদরে ইবাদত করার দ্বারা এক হাজার মাসেরও বেশি কাল ইবাদতের ছাওয়াব পাওয়া যায়। তাই বলে সেই এক রাত ইবাদত করলেই হয়ে যাবে আর এর দ্বারা বাকি জীবন ইবাদত-বন্দেগী করার দায়িত্ব থেকে রেহাই পাওয়া যাবে, এমন কথা কেউ বলবে কি?
হাদীছমতে হাসিমুখে মা-বাবার চেহারার দিকে তাকালে মকবুল হজ্জের ছাওয়াব পাওয়া যায়। এখন কেউ কি বলবে, হাসিমুখে মা-বাবার চেহারার দিকে তাকালে তার আর হজ্জ করতে হবে না? নিশ্চয়ই কেউ তা বলবে না। কেননা এর দ্বারা মকবুল হজ্জের সমান ছাওয়াব পাওয়া যাবে বটে, কিন্তু হজ্জের ফারযিয়াত তো আদায় হবে না। কারও উপর যদি হজ্জ ফরয হয়ে থাকে, তবে হাজার বারও সে হাসিমুখে বাবা-মায়ের চেহারার দিকে তাকালে সে ফরয আদায় হয়ে যাবে না। সে ফরয আদায়ের জন্য তাকে অবশ্যই মক্কা মুকাররামায় যেতে হবে এবং যথারীতি হজ্জ আদায় করতে হবে।
বস্তুত হাদীছটির উদ্দেশ্য মানুষকে সূরা ইখলাস পড়ার প্রতি উৎসাহিত করা। এর উদ্দেশ্য বাদবাকি কুরআন পড়া থেকে বিমুখ করা নয় মোটেই।
কেউ বলেন, এর অর্থ সূরা ইখলাস কুরআনের বিষয়বস্তুসমূহের তিন ভাগের এক ভাগ। কুরআনের আলোচ্য বিষয় তিন প্রকার। (ক) অতীতের ঘটনাবলি; (খ) বিধি-বিধান ও (গ) আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলি। সূরা ইখলাসের সবটা আলোচনাই আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলি সম্পর্কে। সে হিসেবে সূরাটি কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ।
কেউ বলেন, কুরআন মাজীদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তিনটি বিষয়ে। (ক) তাওহীদ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ; (খ) সিরাতুল মুস্তাকীম বা আল্লাহপ্রদত্ত সরল পথ এবং (গ) আখিরাত। সূরা ইখলাসের আলোচ্য বিষয় হলো তাওহীদ। সুতরাং এ সূরা কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ। এছাড়াও আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। তবে সঠিক কথা হলো ছাওয়াবের দিক থেকে এ সূরাটি কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ।
সূরাটির প্রসিদ্ধ নাম সূরা ইখলাস। এ নামের কারণ সূরাটির বিষয়বস্তু খালেস আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কেই।
কোনও বিধি-বিধান বা অন্য কোনও বিষয়ে এতে আলোচনা করা হয়নি। কিংবা বলা যায়, এ সূরার আলোচনা খালেস তাওহীদ সম্পর্কে। জানানো হয়েছে যে, সব রকম শিরক ও অংশীদারত্ব থেকে তিনি পবিত্র। এমনও বলা যেতে পারে যে, এ সূরার দ্বারা বান্দা নিজেকে খালেস তাওহীদে বিশ্বাসী এবং সর্বপ্রকার শিরক থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা দেয়। কেউ বলেন, এ সূরাটির বিষয়বস্তুতে বিশ্বাস রাখার দ্বারা জাহান্নাম থেকে খালাস পাওয়া যায়। তাই এর নাম সূরা ইখলাস।
সূরা ইখলাসের শানে নুযূল
সূরাটি নাযিল হয়েছিল আরব মুশরিক ও ইহুদিদের একটি প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে। হযরত উবাই ইবন কা‘ব রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিল, আপনি আমাদের কাছে আপনার রব্বের পরিচয় দিন। হযরত জাবির রাযি. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, ইহুদিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলেছিল, আপনি আমাদের কাছে আপনার সেই রব্বের পরিচয় দিন, যিনি আপনাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। এসব জিজ্ঞাসার উত্তরেই আল্লাহ তা‘আলা এ সূরাটি নাযিল করেছেন।
সূরাটিতে চারটি আয়াত আছে। প্রতিটি আয়াতেই আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ ও একত্ববাদের ঘোষণা রয়েছে। আমরা নিচে আয়াতগুলোর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পেশ করছি।
সূরা ইখলাসের তাফসীর
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ (বলে দাও, কথা হলো- আল্লাহ সব দিক থেকে এক)। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সত্তা ও গুণাবলিতে এক ও একক। কোনও দিক থেকেই তাঁর কোনও শরীক নেই। তাঁর হায়াত, তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা, তাঁর জ্ঞান ও হিকমত, তাঁর দয়া ও কঠোরতা মোটকথা তাঁর প্রতিটি গুণ পরিপূর্ণ। তাঁর কোনও গুণেই কোনওরকম ত্রুটি ও কমতি নেই। কোনও গুণেই কোনও মাখলুক তাঁর সমপর্যায়ের নয়। কারও মধ্যে কোনও গুণ যত বেশি পরিমাণেই থাকুক, তা পরিপূর্ণ নয় মোটেই। কিছু না কিছু ত্রুটি তার মধ্যে থাকেই। অন্ততপক্ষে সীমাবদ্ধতার যে কমতি, তা অবশ্যই থাকে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার প্রতিটি গুণ অসীম আর মাখলুকের প্রতিটি গুণ সসীম।
أَحَدٌ আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণবাচক নাম। এর পাশাপাশি তাঁর আরেকটি গুণবাচক নাম হলো اَلْوَاحِدُ। এর অর্থও এক। তবে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো- الْوَاحِدُ দ্বারা কেবল সত্তাগত একত্ব বোঝানো হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা এমন এক একক সত্তা, যাঁর অনুরূপ সত্তা অন্য কারও নেই। আর أَحَدٌ দ্বারা সত্তা ও গুণ উভয়ের একত্ব বোঝানো হয়। অর্থাৎ সত্তাগতভাবেও তিনি এক এবং অনন্ত অসীম গুণাবলির দিক থেকেও তিনি এক। তাঁর মতো সত্তা যেমন কারও নেই, তেমনি তাঁর গুণের মতো অসীম গুণও কারও নেই। কেউ কেউ বলেছেন, أَحَدٌ দ্বারা কেবল গুণগত একত্ব বোঝানো হয়, যেমন اَلْوَاحِدُ দ্বারা কেবল সত্তাগত একত্ব বোঝানো হয়।
اَللَّهُ الصَّمَدُ (আল্লাহই এমন যে, সকলে তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন)। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা এমন এক সত্তা, যিনি অনাদিকাল থেকে আছেন, অনন্তকাল থাকবেন। তিনি যা চান তাই করেন, করতে পারেন। তিনি কোনওকিছুতেই কারও মুখাপেক্ষী নন। না নিজ অস্তিত্ব রক্ষায়, না নিজ ইচ্ছা পূরণে, না নিজ হুকুম বাস্তবায়নে। তিনি তো কোনও দিক থেকেই কারও মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু অন্য সকলেই সবদিক থেকে তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি অস্তিত্বদান না করলে কেউ অস্তিত্ব পেতে পারে না। তিনি রক্ষা না করলে কেউ আত্মরক্ষা করতে পারে না। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কেউ নিজ ইচ্ছা পূরণ করতে পারে না। মোটকথা সমস্ত মাখলুক সর্বতোভাবে তাঁর মুখাপেক্ষী।
ইবন কাছীর রহ. বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি الصَّمَدُ এর ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহ এমন প্রভু, যিনি তাঁর প্রভুত্বগুণে পরিপূর্ণ। এমন শারীফ ও মহানুভব, যিনি নিজ মহানুভবতায় পরিপূর্ণ। এমন মহীয়ান, যিনি নিজ মহত্ত্বে পরিপূর্ণ। এমন সহিষ্ণু, যিনি নিজ সহনশীলতায় পরিপূর্ণ। এমন জ্ঞানী, যিনি নিজ জ্ঞানে পরিপূর্ণ। এমন প্রজ্ঞাময়, যিনি নিজ প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। তিনি এমন এক সত্তা, যিনি সর্বপ্রকার মর্যাদা-মহিমায় পরিপূর্ণ। তিনিই আল্লাহ। তিনিই মহান, পবিত্র। তাঁর এ গুণ কেবল তাঁরই জন্য সাজে। অন্য কেউ এর উপযুক্ত নয়।
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (তাঁর কোনও সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন)। এর দ্বারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই ভ্রান্ত ধারণা রদ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলার সন্তান-সন্ততি আছে। আরব মুশরিকরা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যাসন্তান বলত। খ্রিষ্টানদের দাবি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা‘আলার পুত্র। ইহুদিদের অনেকে হযরত উযায়র আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা‘আলার পুত্র বলত। এ আয়াত বলছে, আল্লাহ তা‘আলা কাউকে জন্ম দেননি। তাঁর কোনও সন্তান-সন্ততি নেই। এ ভ্রান্ত ধারণাটি এর আগের আয়াত দ্বারাও রদ হয়ে যায়। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
أَلَا إِنَّهُمْ مِنْ إِفْكِهِمْ لَيَقُولُونَ وَلَدَ اللَّهُ ۙ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
‘মনে রেখো, তারা তাদের মনগড়া কথার কারণে বলে, আল্লাহর কোনও সন্তান আছে। বস্তুত তারা নিশ্চিতভাবেই মিথ্যাবাদী।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১৫১, ১৫২ )
কেননা যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তাঁর কোনও পুত্র-কন্যার দরকার পড়ে না। কাজেই যারা তাঁর পুত্র-কন্যা থাকার দাবি করছে, তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবাস্তব কথাই বলছে।
এমনিভাবে যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তাঁর কোনও জন্মদাতাও থাকতে পারে না। কারও জন্মদান বা অস্তিত্বদান ছাড়াই তিনি অস্তিত্ববান। তিনি সদাজীবন্ত সত্তা। সবসময় থেকেই আছেন। যিনি সবসময় থেকেই আছেন, তাঁর কোনও অস্তিত্বদাতার প্রয়োজন হবে কেন?
আয়াতটির মধ্যে ইশারা রয়েছে যে, যে-কেউ অন্যের সন্তান হয় বা যে জন্মগ্রহণ করে, সে কখনও ঈশ্বর ও উপাস্য হতে পারে না। কাজেই খ্রিষ্টানদের এ বিশ্বাস সম্পূর্ণই ভ্রান্ত যে, ঈসা আলাইহিস সালাম নিজে ঈশ্বর বা ঈশ্বরের ত্রি-সত্তার একজন।
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ (এবং তার সমকক্ষ নয় কেউ)। তিনি সৃষ্টিকর্তা। বাকি সবকিছুই মাখলুক। তাঁরই সৃষ্টি। মাখলুক কখনও খালেকের মতো হতে পারে না। তিনি অসীম সত্তা। সমস্ত মাখলুক সবদিক থেকে সসীম। সুতরাং তিনি সকল দিক থেকে অনন্য, অতুলনীয়। তাঁর জ্ঞান, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর সহনশীলতা, তাঁর দয়া, তাঁর ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি প্রত্যেকটি গুণ সকল তুলনার ঊর্ধ্বে। কাউকে কোনও দিক থেকে তাঁর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট বলেছেন-
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ‘কোনও জিনিস নয় তাঁর অনুরূপ। তিনিই সব কথা শোনেন, সবকিছু দেখেন।’ (সূরা শূরা, আয়াত ১১)
কেউ যখন তাঁর সঙ্গে তুলনীয় নয়, তখন কাউকে তাঁর স্ত্রী, তাঁর পুত্র-কন্যা সাব্যস্ত করারও কোনও অবকাশ নেই। তা করাটা শিরক। পৌত্তলিক সম্প্রদায় ও খ্রিষ্ট সম্প্রদায়সহ বহু জাতি এরূপ শিরকে লিপ্ত।
সূরা ইখলাস পড়ে দুআ করা
সূরা ইখলাসের এক ফযীলত তো বলা হয়েছে এই যে, এটি কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশের সমান। বিভিন্ন হাদীছে সূরাটির আরও বিভিন্ন ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন এর এক ফযীলত হলো এ সূরাটি দ্বারা দুআ করলে আল্লাহ তা‘আলা সে দুআ অবশ্যই কবুল করেন। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন এক ব্যক্তি নামায শেষে দুআ করছে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ يَا اللَّهُ بِأَنَّكَ الْوَاحِدُ الأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيم
(হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি এই সাক্ষ্যদানের সঙ্গে যে, হে আল্লাহ! আপনি এক ও অদ্বিতীয়। আপনি কারও মুখাপেক্ষী নন, কিন্তু সকলেই আপনার মুখাপেক্ষী। আপনি এমন সত্তা, যে কাউকে জন্ম দেয়নি এবং যাকে কেউ জন্ম দেয়নি। এবং যাঁর সমকক্ষ নয় কেউ। আপনি আমার পাপরাশি ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি মহা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- قَدْ غُفِرَ لَهُ، ثَلَاثًا (তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে)। (সুনানে নাসাঈ : ১৩০১; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ১২৫৯)
এ সূরাটি পড়লে সবরকম অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ হয়। সেজন্য নিয়ম হলো সূরা ফালাক ও সূরা নাসের সঙ্গে এ সূরাটি পড়ে দুই হাতে দম করা, তারপর সে হাত দিয়ে সারা শরীর মোছা। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শয্যাগ্রহণ করতেন, তখন সূরা ফালাক ও সূরা নাসের সঙ্গে এ সূরাটিও পড়তেন, তারপর দুই হাতে দম করে তা দিয়ে শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছতেন। (সহীহ বুখারী : ৫০১৭; সুনানে আবূ দাউদ : ৫০৫৬; জামে‘ তিরমিযী : ৩৪০২; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ১০৫৫৬; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৫৪৪; তাবারানী, আল মু‘জামুল আওসাত : ৫০৭৯; বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান : ২৩৩৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ১২১২)
হযরত উকবা ইবন আমির রাযি. বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে তাওরাত, ইনজীল, যাবূর ও কুরআনে যা নাযিল হয়েছে তার মধ্যে সর্বোত্তম তিনটি সূরা শেখাব না? আমি বললাম, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি আমাকে সূরা কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, কুল আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক ও কুল আ‘উযু বিরাব্বিন্নাস এ তিনটি সূরা শেখালেন। তারপর বললেন-
يَا عُقْبَةُ، لَا تَنْسَاهُنَّ، وَلَا تَبِتْ لَيْلَةً حَتَّى تَقْرَأَهُنَّ.
(হে উকবা! তুমি এগুলো ভুলে যেয়ো না এবং এগুলো না পড়ে কোনও রাত কাটিয়ো না)। (তাবারানী, আল মু’জামুল কাবীর : ৭৪২; মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩৩৪)
এ সূরাটির প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে জান্নাত লাভ করা যায়, যেমন বিভিন্ন হাদীছে এসেছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সূরা ইখলাস পড়ার দ্বারা কুরআন মাজীদের এক-তৃতীয়াংশ পড়ার ছাওয়াব পাওয়া যায়।
খ. হাদীছগুলো দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার অসীম দয়ার পরিচয় পাওয়া যায়। সংক্ষিপ্ত একটি সূরা পাঠ করার দ্বারা কী বিপুল ছাওয়াব অর্জনের সুযোগ তিনি করে দিয়েছেন!
গ. রাতের বেলা ঘুমের আগে এ সূরাটি পড়া উচিত।
ঘ. কারও কোনও সংক্ষিপ্ত সৎকর্মকে তুচ্ছ মনে করতে নেই। কেননা না জানি সেই সংক্ষিপ্ত কাজের ভেতর কী বিপুল কল্যাণ নিহিত আছে।
ঙ. কাউকে কোনও সৎকর্মে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আল্লাহর নামে কসম করা যেতে পারে; বরং তা করাটাই উত্তম।
চ. কারও কোনও কাজে মনে খটকা দেখা দিলে কোনও বিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে তা উল্লেখ করে সে খটকা নিরসন করে নেওয়া উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)