আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ

২৩. জিহাদের বিবিধ বিধানাবলী ও নবীজীর যুদ্ধাভিযানসমূহ

হাদীস নং: ১৬৭৪
আন্তর্জাতিক নং: ১৬৭৪
জিহাদের বিবিধ বিধানাবলী ও নবীজীর যুদ্ধাভিযানসমূহ
একা সফর করা মাকরূহ।
১৬৮০। ইসহাক ইবনে মুসা আনসারী (রাহঃ) ......... আমর ইবনে শুআয়ব তার পিতা থেকে তিনি তাঁর পিতামহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, একজন আরোহী (যাত্রী) শয়তান, দুই জন আরোহী দুই শয়তান আর তিনজন হলো একটি কাফেলা। আবু দাউদ ২৩৪৬

ইবনে উমর (রাযিঃ) বর্ণিত হাদীসটি (১৬৭৯ নং) হাসান-সহীহ। আসিম (রাহঃ) এর রিওয়ায়াত হিসাবে এই সূত্র ছাড়া এটি সম্পর্কে আমরা অবহিত নই। আসিম হলেন ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে যায়দ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ)। মুহাম্মাদ [ইমাম বুখারী (রাহঃ)] বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য, সত্যবাদী। আসিম ইবনে উমর উমরী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে যঈফ। আমি তার থেকে কোন হাদীস রিওয়ায়াত করি না। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিঃ) বর্ণিত হাদীসটি (১৬৮০ নং) হাসান।
أبواب الجهاد عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
باب مَا جَاءَ فِي كَرَاهِيَةِ أَنْ يُسَافِرَ الرَّجُلُ وَحْدَهُ
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ مُوسَى الأَنْصَارِيُّ، حَدَّثَنَا مَعْنٌ، حَدَّثَنَا مَالِكٌ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ حَرْمَلَةَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ وَالثَّلاَثَةُ رَكْبٌ " . قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ ابْنِ عُمَرَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ مِنْ حَدِيثِ عَاصِمٍ وَهُوَ ابْنُ مُحَمَّدِ بْنِ زَيْدِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ وَحَدِيثُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو حَدِيثٌ حَسَنٌ . قَالَ مُحَمَّدٌ هُوَ ثِقَةٌ صَدُوقٌ وَعَاصِمُ بْنُ عُمَرَ الْعُمَرِيُّ ضَعِيفٌ فِي الْحَدِيثِ لاَ أَرْوِي عَنْهُ شَيْئًا .
وَحَدِيثُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو حَدِيثٌ حَسَنٌ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটি এক ব্যক্তির একাকী সফর করার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে। বলা হয়েছে- الرَّاكِبُ شَيْطَانُ (একজন আরোহী একটি শয়তান)। হাদীছটিতে 'আরোহী' বলে সুনির্দিষ্টভাবে যানবাহনে সফরকারীকেই বোঝানো হয়নি; বরং পায়ে হেঁটে সফর করলেও একই কথা। তার ক্ষেত্রেও এ হাদীছ প্রযোজ্য। বোঝানো উদ্দেশ্য সফরে যেভাবেই যাক, যানবাহনে হোক বা পায়ে হেঁটে, কোনও অবস্থায়ই একাকী যাওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা তা নানাবিধ ক্ষতির কারণ। সে ক্ষতির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য 'শয়তান' শব্দের মতো একটি কঠিন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, 'একাকী সফরকারী শয়তান' এ কথার অর্থ কী?

আসলে শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। শব্দটির মূল অর্থ দূরবর্তী, বঞ্চিত ও বিতাড়িত। শয়তান আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে দূরে। তাই তাকে শয়তান বলা হয়। যে ব্যক্তি একা সফর করে, সেও আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকে। কেননা সে নিজেই নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। সঙ্গী না রেখে সে নিজেকে নানা কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন করেছে। যেমন একা অবস্থায় ওযু-ইস্তিঞ্জার পেরেশানি, চোর-ডাকাতের কবলে পড়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও সেবা-যত্নজনিত সমস্যা, মারা গেলে লাশের হেফাজত ও দাফন-কাফনের পেরেশানি ইত্যাদি। যে ব্যক্তি কৃতকর্ম দ্বারা নিজের জন্য এসব বিপদ ডেকে আনে, আল্লাহ তা'আলাও তার প্রতি রহমত ও দয়া করেন না। এভাবে একাকী সফরকারী রহমত থেকে দূরে থাকে বলে তাকে শয়তান বলা হয়েছে।

তাছাড়া শয়তান অর্থ দুষ্টু জিন। নিজেও এরকমই। দুষ্টু জিনেরা বনে-জঙ্গলে, মাঠে-ময়দানে ও নিভৃত স্থানে একা একা ঘুরে বেড়ায় আর মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। কোনও ব্যক্তির একা সফর করাটাও শয়তানের মতোই কাজ। শয়তানও একা চলে, সেও একা সফর করছে। তাই তাকে শয়তান সাব্যস্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সে শয়তানের মতো, তার কাজটি শয়তানের কাজের মতো।

একাকী সফরকারী শয়তানের লক্ষ্যবস্তুও বটে। যে একা থাকে, শয়তান তার মনে নানা ওয়াসওয়াসা দেয়। তাকে পাপকাজের প্ররোচনা দেয়। সফরে অনেক কিছুই চোখে পড়ে। শয়তানও তার সুযোগ গ্রহণ করে। একেকটা জিনিস দেখায় আর তা নিয়ে তার অন্তরে কুচাহিদার জন্ম দেয়। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী নানা কুচিন্তা সরবরাহ করে। সঙ্গী-সাথি থাকলে সেই সুযোগ শয়তান পায় না। তাই হাদীছটিতে বলা হয়েছে, একাকী সফরকারী শয়তান। অর্থাৎ সে শয়তানের লক্ষ্যবস্তু। এটা বলা হয়েছে আরবী অলংকার শাস্ত্রের নিয়মে। কোনও একটা শব্দ ব্যবহার করে তা দ্বারা তার প্রকৃত অর্থ না বুঝিয়ে বরং সে শব্দের সঙ্গে যে-কোনওভাবে সম্পর্কযুক্ত কোনও অর্থ বোঝানো আরবী ভাষার এক বহুল ব্যবহৃত নিয়ম। সে নিয়ম অনুসারেই একা সফরকারী ব্যক্তিকে শয়তান বলা হয়েছে, যেহেতু একাকিত্বের কারণে সে শয়তানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যায়।

দুই ব্যক্তির বেলায়ও বলা হয়েছে- وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ (দু'জন আরোহী দু'টি শয়তান)। অর্থাৎ সফরকারী যদি দু'জন হয়, সে ক্ষেত্রেও উপরে বর্ণিত ক্ষতিসমূহের আশঙ্কা থেকে যায়, যদিও একাকী সফরকারীর তুলনায় কম। সফর অবস্থায় মানুষকে নানা ঝক্কিঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়। সফরসঙ্গী বেশি হলে তার মোকাবিলা করা সহজ হয়। কেবল দু'জনের পক্ষে তা মোকাবিলা করা কঠিন। এর জন্য আরও বেশি সঙ্গী দরকার। তাই সবশেষে বলা হয়েছে-
وَالثَّلَاثَةُ رَكْبٌ (আর তিনজন আরোহী একটি যাত্রীদল)। অর্থাৎ তিনজন দ্বারা একটি জামাত বা দল হয়। সফরকারী দল হিসেবে সর্বনিম্ন তিনজনই উপযুক্ত, এর কম নয়। যত বেশি হবে ততই ভালো। তবে সর্বনিম্ন তিনজন হলেও তারা একে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে। তাদের পক্ষে সম্মিলিতভাবে বিপদ-আপদ, অনিষ্ট ও ক্ষতির মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। শয়তানকে প্রতিরোধ করাও আসান হয়। এক-দু'জনকে ওয়াসওয়াসা দিয়ে পাপকর্মে লিপ্ত করা যত সহজ, তিনজনের বেলায় তা সহজ নয়। ফলে সফরসঙ্গী অন্ততপক্ষে তিনজন হলে বিভিন্ন রকম গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। তাই এ হাদীছটিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যে, সফর করতে চাইলে অন্ততপক্ষে তিনজনে মিলে করো। তাহলে দীনী ও দুনিয়াবী বিপদ-আপদ থেকে সহজে বাঁচতে পারবে।

উল্লেখ্য, এ হুকুম সাধারণ অবস্থার জন্য। ওজরের ব্যাপারটি আলাদা। যদি সফরসঙ্গী পাওয়া না যায় বা বিশেষ কারণে একাকী সফর করার প্রয়োজন হয়, তবে একাকী সফর করতে নিষেধ নেই। সে ক্ষেত্রে হাদীছের হুকুম অমান্য করেছে বলে দোষ দেওয়া যাবে না।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. বিনা ওজরে একাকী সফর করতে নেই।

খ. সফরসঙ্গী অন্ততপক্ষে তিনজন হওয়া চাই।

গ. ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাবশে নিজেকে বিপদের মধ্যে ফেলতে নেই।

ঘ. শয়তান সর্বদা মানুষের ক্ষতি করার জন্য ওত পেতে থাকে। তাই তার থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

ঙ. কখনও এমন কোনও কাজ করতে নেই, যা শয়তানের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)