আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ
২১. নবীজী ﷺ থেকে বর্ণিত জিহাদের বিধানাবলী
হাদীস নং: ১৫৫৫
আন্তর্জাতিক নং: ১৫৫৫
নবীজী ﷺ থেকে বর্ণিত জিহাদের বিধানাবলী
সারিয়্যা বা খণ্ড অভিযান।
১৫৬১। মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহয়া আযদী, বসরী, আবু আম্মার প্রমুখ (রাহঃ) ......... ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সর্বোত্তম সঙ্গী সংখ্যা হল চার। সর্বোত্তম খণ্ড বাহিনী হল চার শতের। সর্বোত্তম পূর্ণ বাহিনী হল চার হাজারের আর বার হাজার সদস্যের বাহিনী কখনো সংখ্যাল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না।
এ হাদীসটি হাসান-গারীব। জারীর ইবনে হাজিম ছাড়া বড় কেউ এটিকে মুসনাদ হিসাবে রিওয়ায়াত করেন নি। যুহরী (রাহঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে এটি মুরসাল রূপে বর্ণিত আছে। হাব্বান ইবনে আলী আনাযী (রাহঃ) এটিকে উকায়ল-যুহরী-উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দিল্লাহ-ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। লায়ছ ইবনে সা‘দ (রাহঃ) এটিকে উকায়ল-যুহরী সূত্রে-নবী (ﷺ) থেকে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন।
এ হাদীসটি হাসান-গারীব। জারীর ইবনে হাজিম ছাড়া বড় কেউ এটিকে মুসনাদ হিসাবে রিওয়ায়াত করেন নি। যুহরী (রাহঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে এটি মুরসাল রূপে বর্ণিত আছে। হাব্বান ইবনে আলী আনাযী (রাহঃ) এটিকে উকায়ল-যুহরী-উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্দিল্লাহ-ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। লায়ছ ইবনে সা‘দ (রাহঃ) এটিকে উকায়ল-যুহরী সূত্রে-নবী (ﷺ) থেকে মুরসালরূপে বর্ণনা করেছেন।
أبواب السير عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
باب مَا جَاءَ فِي السَّرَايَا
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى الأَزْدِيُّ الْبَصْرِيُّ، وَأَبُو عَمَّارٍ وَغَيْرُ وَاحِدٍ قَالُوا حَدَّثَنَا وَهْبُ بْنُ جَرِيرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ يُونُسَ بْنِ يَزِيدَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " خَيْرُ الصَّحَابَةِ أَرْبَعَةٌ وَخَيْرُ السَّرَايَا أَرْبَعُمِائَةٍ وَخَيْرُ الْجُيُوشِ أَرْبَعَةُ آلاَفٍ وَلاَ يُغْلَبُ اثْنَا عَشَرَ أَلْفًا مِنْ قِلَّةٍ " . هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ يُسْنِدُهُ كَبِيرُ أَحَدٍ غَيْرُ جَرِيرِ بْنِ حَازِمٍ وَإِنَّمَا رُوِيَ هَذَا الْحَدِيثُ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مُرْسَلاً . وَقَدْ رَوَاهُ حِبَّانُ بْنُ عَلِيٍّ الْعَنَزِيُّ عَنْ عُقَيْلٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم . وَرَوَاهُ اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ عَنْ عُقَيْلٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مُرْسَلاً .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি কথা বলেছেন। সর্বপ্রথম বলেন-
خَيْرُ الصَّحَابَةِ أَرْبَعَةٌ (উত্তম সঙ্গীদল চারজন)। اَلصَّحَابةُ শব্দটি صَاحِب এর বহুবচন। অর্থ সঙ্গী। হাদীছে সফরসঙ্গী বোঝানো উদ্দেশ্য। এ হাদীছে বলা হয়েছে উত্তম হলো চারজন হওয়া। কেননা সফরের বিভিন্ন প্রয়োজন চারজন দ্বারাই ভালোভাবে পূরণ হয়ে থাকে। এর কম হলে কিছু না কিছু সমস্যা থেকে যায়। ইমাম গাযালী রহ. বলেন, 'চার' সংখ্যা নির্দিষ্ট করার কারণ হলো সফরে মুসাফিরের জন্য এমন একজনের প্রয়োজন, যে তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। সফর অবস্থায় নানা প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজন সমাধার জন্য একজনকে পাঠানো হলে বাকি থাকে দু'জন। সে দু'জন পরস্পর কথাবার্তা বলে কিংবা কেবলই সঙ্গ ও সাহচর্যের মাধ্যমে একাকিত্বের অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে। পক্ষান্তরে লোক যদি তিনজন হয়, তবে তাদের একজন হবে রক্ষী। আরেকজন প্রয়োজনীয় কাজ সমাধার জন্য যাবে। বাকি থাকবে মাত্র একজন, যা তার জন্য অস্বস্তির কারণ হবে।
অনেক সময় প্রয়োজন সমাধার জন্য দু'জনকে পাঠাতে হয়। সে ক্ষেত্রে তিনজনের বেলায় কোনও রক্ষীও থাকে না। একাকী এক ব্যক্তির বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। লোক চারজন হলে এ সমস্যা থাকে না।
আবার সফরকালে অনেক সময় কোনও সঙ্গীর মৃত্যুও হয়ে যায়। মৃত্যুর আগে আগে সে যদি অসিয়ত করতে চায়, তবে তিনজন লোকের দরকার হয়। একজন ওয়াসী, দু'জন সাক্ষী। সফরসঙ্গী চারজন হওয়ার বেলায় এটা তো সম্ভব। পক্ষান্তরে লোক যদি হয় তিনজন, তবে মায়্যিত ছাড়া বাকি থাকে দু'জন। তখন অসিয়তের শর্তপূরণ সম্ভব হয় না।
যাই হোক, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনও কথাই ওহীর নির্দেশনা ছাড়া বলতেন না। কাজেই চারজনের সংখ্যার ভেতর কী হিকমত নিহিত, তা তিনিই ভালো জানতেন। আমাদের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তিনি দ্বিতীয়ত ইরশাদ করেন-
وَخَيْرُ السَّرَايَا أَرْبَعُ مِئَةٍ উত্তম সারিয়্যা (ছোট সেনাদল) চারশ' সদস্যের বাহিনী'। السرايا শব্দটি سَرِيةٌ -এর বহুবচন। سرية শব্দটির উৎপত্তি السَّرِي থেকে। এর শাব্দিক অর্থ উৎকৃষ্ট। الشَّيْءُ السَّرِي মানে উৎকৃষ্ট বস্তু। এর মূলধাতু سري। এর অর্থ রাতের বেলা যাত্রা করা। যেমন কুরআন মাজীদে আছে-
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ
'পবিত্র সেই সত্তা, যিনি নিজ বান্দাকে রাতের বেলা পরিভ্রমণ করান। (সূরা ইসরা, আয়াত ১)
পরিভাষায় السرية বলা হয় শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাবাহিনীর একটি দলকে। সাধারণত যাদের সংখ্যা হয় সর্বোচ্চ চারশ'জন। ইমাম ইবনুল আসীর রহ. আন-নিহায়া গ্রন্থে বলেন, বলা হলো শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাবাহিনীর এমন একটি দল, যার সর্বোচ্চ সংখ্যা হয় চারশ'জন। এর বহুবচন السرايا। এ দলটির নাম السرية হওয়ার কারণ তারা সেনাবাহিনীর উৎকৃষ্ট ও বাছাইকৃত লোক হয়ে থাকে।
ধাতুগত অর্থের সঙ্গে এর মিল হলো এরূপ বাহিনীকে রাতের বেলা পাঠানো হয়ে থাকে, যাতে শত্রুপক্ষ তাদের অভিযান সম্পর্কে সহজে অবহিত না হতে পারে।
সীরাতের পরিভাষায় السرية বলা হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত সেনাদলকে, যে দলে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করতেন না। তিনি নিজে যে বাহিনীতে অংশগ্রহণ করতেন, সেটিকে বলা হয় গাযওয়া। তাঁর প্রেরিত সর্ববৃহৎ السرية হলো মূতার যুদ্ধে প্রেরিত বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। দলটি বড় হওয়ায় সীরাত ও হাদীছ গ্রন্থসমূহে সেটিকে গাযওয়া নামে উল্লেখ করা হয়ে থাকে, যদিও সে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অংশগ্রহণ করেননি। ইমাম ইবন হাজার আসকালানী রহ., ইবন মানযূর রহ., ফায়রূযাবাদী রহ. প্রমুখের মতে সারিয়্যার সদস্য সংখ্যা হয়ে থাকে একশ থেকে পাঁচশ পর্যন্ত। তবে সারিয়্যার সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন কতজন, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কেননা কোনও কোনও বর্ণনায় দেখা যায়, একজনের বেলায়ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কোনও কোনও সারিয়্যার সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশজন।
এ হাদীছের ভাষ্য অনুযায়ী যে বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা চারশ', সারিয়্যা হিসেবে সেটিই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয়ত বলেন-
وَخَيْرُ الْجُيُوْشِ أَرْبَعَةُ آلَافٍ 'উত্তম জায়শ (বড় সেনাদল) চার হাজার সদস্যের বাহিনী। الجيوش শব্দটি جيش -এর বহুবচন। এর ধাতুগত অর্থ উত্তেজিত হওয়া, টগবগ করা, প্রচণ্ড আকার ধারণ করা। পরিভাষায় সেনাবাহিনীর বড় দলকে جيش বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে পাঁচটি ভাগ বা বাহু সংবলিত পূর্ণাঙ্গ সেনাদলকে جيش (জায়শ) বলা হতো। ভাগগুলো হলো- মুকাদ্দিমাতুল জায়শ (অগ্রবর্তী দল), মায়মানা (ডান বাহু), মায়সারা (বাম বাহু), কাল্ব (মধ্যবর্তী মূল দল) ও সাকাঃ (পশ্চাদ্বাহু)। পাঁচ ভাগ বিশিষ্ট হওয়ায় এরূপ বাহিনীকে خميس (খামীস)-ও বলা হতো।
যা হোক, এ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার হাজার সৈন্যের বাহিনীকে উত্তম জায়শ বলেছেন। সবশেষে তিনি বলেন-
وَلَنْ يُغْلَبَ اثْنَا عَشَرَ أَلْفًا مِنْ قِلَّةٍ (বারো হাজার সদস্যের সেনাদল কখনও সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না)। অর্থাৎ কোনও বাহিনীর জন্য এ সংখ্যাটিকে কম বলা যায় না। বরং এটি একটি বড় সেনাদল। এরূপ সেনাদল যদি পরাজিত হয়, তবে সে পরাজয়ের কারণ সংখ্যাস্বল্পতা নয়; বরং তা হবে অন্য কিছু।
যেমন বড় সেনাদল হওয়ায় অহমিকার শিকার হওয়া বা আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসায় ঘাটতি থাকা কিংবা বাহিনী পরিচালনায় অদক্ষতা থাকা। সেনাপতির প্রতি সৈন্যদের আনুগত্যের অভাব ও শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যকলাপও পরাজয়ের একটি কারণ হতে পারে। হাদীছটিতে পরোক্ষভাবে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, বারো হাজার সংখ্যক সৈন্যের বাহিনী যদি আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল থাকে এবং শৃঙ্খলা ও দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তাদের পরাজয় বরণ করতে হবে না।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সফর একাকী না করে দলবদ্ধভাবে করা চাই। আর সে দলের সদস্য চারজন হওয়া উত্তম।
খ. রাষ্ট্রের পক্ষ হতে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে কোনও ছোট সেনাদল পাঠানো হলে তার সদস্য সংখ্যা চারশ' হওয়া ভালো।
গ. শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাদল পাঠানো উচিত এবং তার সদস্য সংখ্যা চার হাজার হওয়া উত্তম।
ঘ. যে সেনাদল বারো হাজার সদস্য দ্বারা গঠিত হয়, তাদের সেনাস্বল্পতার অভিযোগ করা উচিত নয়। তাদের কর্তব্য আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা রেখে দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। তাতে আশা রাখা যায় তাদেরকে পরাস্ত হতে হবে না।
ঙ . হাদীছটি দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামরিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
চ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের প্রতি কতইনা দরদি ছিলেন, যে কারণে নিরাপদ সফর কীভাবে হতে পারে সে বিষয়েও তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন।
خَيْرُ الصَّحَابَةِ أَرْبَعَةٌ (উত্তম সঙ্গীদল চারজন)। اَلصَّحَابةُ শব্দটি صَاحِب এর বহুবচন। অর্থ সঙ্গী। হাদীছে সফরসঙ্গী বোঝানো উদ্দেশ্য। এ হাদীছে বলা হয়েছে উত্তম হলো চারজন হওয়া। কেননা সফরের বিভিন্ন প্রয়োজন চারজন দ্বারাই ভালোভাবে পূরণ হয়ে থাকে। এর কম হলে কিছু না কিছু সমস্যা থেকে যায়। ইমাম গাযালী রহ. বলেন, 'চার' সংখ্যা নির্দিষ্ট করার কারণ হলো সফরে মুসাফিরের জন্য এমন একজনের প্রয়োজন, যে তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। সফর অবস্থায় নানা প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজন সমাধার জন্য একজনকে পাঠানো হলে বাকি থাকে দু'জন। সে দু'জন পরস্পর কথাবার্তা বলে কিংবা কেবলই সঙ্গ ও সাহচর্যের মাধ্যমে একাকিত্বের অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে। পক্ষান্তরে লোক যদি তিনজন হয়, তবে তাদের একজন হবে রক্ষী। আরেকজন প্রয়োজনীয় কাজ সমাধার জন্য যাবে। বাকি থাকবে মাত্র একজন, যা তার জন্য অস্বস্তির কারণ হবে।
অনেক সময় প্রয়োজন সমাধার জন্য দু'জনকে পাঠাতে হয়। সে ক্ষেত্রে তিনজনের বেলায় কোনও রক্ষীও থাকে না। একাকী এক ব্যক্তির বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। লোক চারজন হলে এ সমস্যা থাকে না।
আবার সফরকালে অনেক সময় কোনও সঙ্গীর মৃত্যুও হয়ে যায়। মৃত্যুর আগে আগে সে যদি অসিয়ত করতে চায়, তবে তিনজন লোকের দরকার হয়। একজন ওয়াসী, দু'জন সাক্ষী। সফরসঙ্গী চারজন হওয়ার বেলায় এটা তো সম্ভব। পক্ষান্তরে লোক যদি হয় তিনজন, তবে মায়্যিত ছাড়া বাকি থাকে দু'জন। তখন অসিয়তের শর্তপূরণ সম্ভব হয় না।
যাই হোক, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনও কথাই ওহীর নির্দেশনা ছাড়া বলতেন না। কাজেই চারজনের সংখ্যার ভেতর কী হিকমত নিহিত, তা তিনিই ভালো জানতেন। আমাদের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তিনি দ্বিতীয়ত ইরশাদ করেন-
وَخَيْرُ السَّرَايَا أَرْبَعُ مِئَةٍ উত্তম সারিয়্যা (ছোট সেনাদল) চারশ' সদস্যের বাহিনী'। السرايا শব্দটি سَرِيةٌ -এর বহুবচন। سرية শব্দটির উৎপত্তি السَّرِي থেকে। এর শাব্দিক অর্থ উৎকৃষ্ট। الشَّيْءُ السَّرِي মানে উৎকৃষ্ট বস্তু। এর মূলধাতু سري। এর অর্থ রাতের বেলা যাত্রা করা। যেমন কুরআন মাজীদে আছে-
سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ
'পবিত্র সেই সত্তা, যিনি নিজ বান্দাকে রাতের বেলা পরিভ্রমণ করান। (সূরা ইসরা, আয়াত ১)
পরিভাষায় السرية বলা হয় শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাবাহিনীর একটি দলকে। সাধারণত যাদের সংখ্যা হয় সর্বোচ্চ চারশ'জন। ইমাম ইবনুল আসীর রহ. আন-নিহায়া গ্রন্থে বলেন, বলা হলো শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাবাহিনীর এমন একটি দল, যার সর্বোচ্চ সংখ্যা হয় চারশ'জন। এর বহুবচন السرايا। এ দলটির নাম السرية হওয়ার কারণ তারা সেনাবাহিনীর উৎকৃষ্ট ও বাছাইকৃত লোক হয়ে থাকে।
ধাতুগত অর্থের সঙ্গে এর মিল হলো এরূপ বাহিনীকে রাতের বেলা পাঠানো হয়ে থাকে, যাতে শত্রুপক্ষ তাদের অভিযান সম্পর্কে সহজে অবহিত না হতে পারে।
সীরাতের পরিভাষায় السرية বলা হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত সেনাদলকে, যে দলে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করতেন না। তিনি নিজে যে বাহিনীতে অংশগ্রহণ করতেন, সেটিকে বলা হয় গাযওয়া। তাঁর প্রেরিত সর্ববৃহৎ السرية হলো মূতার যুদ্ধে প্রেরিত বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। দলটি বড় হওয়ায় সীরাত ও হাদীছ গ্রন্থসমূহে সেটিকে গাযওয়া নামে উল্লেখ করা হয়ে থাকে, যদিও সে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অংশগ্রহণ করেননি। ইমাম ইবন হাজার আসকালানী রহ., ইবন মানযূর রহ., ফায়রূযাবাদী রহ. প্রমুখের মতে সারিয়্যার সদস্য সংখ্যা হয়ে থাকে একশ থেকে পাঁচশ পর্যন্ত। তবে সারিয়্যার সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন কতজন, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কেননা কোনও কোনও বর্ণনায় দেখা যায়, একজনের বেলায়ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কোনও কোনও সারিয়্যার সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশজন।
এ হাদীছের ভাষ্য অনুযায়ী যে বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা চারশ', সারিয়্যা হিসেবে সেটিই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয়ত বলেন-
وَخَيْرُ الْجُيُوْشِ أَرْبَعَةُ آلَافٍ 'উত্তম জায়শ (বড় সেনাদল) চার হাজার সদস্যের বাহিনী। الجيوش শব্দটি جيش -এর বহুবচন। এর ধাতুগত অর্থ উত্তেজিত হওয়া, টগবগ করা, প্রচণ্ড আকার ধারণ করা। পরিভাষায় সেনাবাহিনীর বড় দলকে جيش বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে পাঁচটি ভাগ বা বাহু সংবলিত পূর্ণাঙ্গ সেনাদলকে جيش (জায়শ) বলা হতো। ভাগগুলো হলো- মুকাদ্দিমাতুল জায়শ (অগ্রবর্তী দল), মায়মানা (ডান বাহু), মায়সারা (বাম বাহু), কাল্ব (মধ্যবর্তী মূল দল) ও সাকাঃ (পশ্চাদ্বাহু)। পাঁচ ভাগ বিশিষ্ট হওয়ায় এরূপ বাহিনীকে خميس (খামীস)-ও বলা হতো।
যা হোক, এ হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার হাজার সৈন্যের বাহিনীকে উত্তম জায়শ বলেছেন। সবশেষে তিনি বলেন-
وَلَنْ يُغْلَبَ اثْنَا عَشَرَ أَلْفًا مِنْ قِلَّةٍ (বারো হাজার সদস্যের সেনাদল কখনও সংখ্যাস্বল্পতার কারণে পরাজিত হতে পারে না)। অর্থাৎ কোনও বাহিনীর জন্য এ সংখ্যাটিকে কম বলা যায় না। বরং এটি একটি বড় সেনাদল। এরূপ সেনাদল যদি পরাজিত হয়, তবে সে পরাজয়ের কারণ সংখ্যাস্বল্পতা নয়; বরং তা হবে অন্য কিছু।
যেমন বড় সেনাদল হওয়ায় অহমিকার শিকার হওয়া বা আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসায় ঘাটতি থাকা কিংবা বাহিনী পরিচালনায় অদক্ষতা থাকা। সেনাপতির প্রতি সৈন্যদের আনুগত্যের অভাব ও শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যকলাপও পরাজয়ের একটি কারণ হতে পারে। হাদীছটিতে পরোক্ষভাবে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, বারো হাজার সংখ্যক সৈন্যের বাহিনী যদি আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল থাকে এবং শৃঙ্খলা ও দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় তাদের পরাজয় বরণ করতে হবে না।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সফর একাকী না করে দলবদ্ধভাবে করা চাই। আর সে দলের সদস্য চারজন হওয়া উত্তম।
খ. রাষ্ট্রের পক্ষ হতে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে কোনও ছোট সেনাদল পাঠানো হলে তার সদস্য সংখ্যা চারশ' হওয়া ভালো।
গ. শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাদল পাঠানো উচিত এবং তার সদস্য সংখ্যা চার হাজার হওয়া উত্তম।
ঘ. যে সেনাদল বারো হাজার সদস্য দ্বারা গঠিত হয়, তাদের সেনাস্বল্পতার অভিযোগ করা উচিত নয়। তাদের কর্তব্য আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা রেখে দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। তাতে আশা রাখা যায় তাদেরকে পরাস্ত হতে হবে না।
ঙ . হাদীছটি দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামরিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
চ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের প্রতি কতইনা দরদি ছিলেন, যে কারণে নিরাপদ সফর কীভাবে হতে পারে সে বিষয়েও তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)