কিতাবুস সুনান- ইমাম ইবনে মাজা রহঃ
৩৫. যুহদ-দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির বর্ণনা
হাদীস নং: ৪৩০৩
আন্তর্জাতিক নং: ৪৩০৩
যুহদ-দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির বর্ণনা
হাওযে কাওসারের আলোচনা
৪৩০৩। মাহমুদ ইবন খালিদ দিমাশকী (রাহঃ) …. আবু সাল্লাম হাবশী (রাহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন একদা উমার ইব্ন আব্দুল আযীয (রাহঃ) আমাকে ডেকে পাঠান। তখন আমি অতি দ্রুত তাঁর কাছে উপস্থিত হই । আমি যখন তাঁর কাছে এসে পৌছি, তিনি বলেনঃ আমি আপনাকে তাকলীফ দিলাম, হে আবু সাল্লাম। আপনার সাওয়ারীকে ও তাকলীফ দিয়েছি। তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহ্ শপথ। হে আমীরুল মু'মিনীন। তিনি বললেনঃ আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে, একখানা হাদীস শোনার জন্যই, এই কষ্ট দিয়েছি। আমি জানতে পেরেছি, আপনি তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর আযাদকৃত গেলাম সাওবান (রাযিঃ) থেকে হাউয সম্পর্কে বর্ণনা করছেন। আমি এ হাদীসখানি আপনার মুখ থেকে শুনতে আগ্রহী। তিনি বলেন, তখন আমি বললামঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আযাদকৃত গোলাম সাওবান (রাযিঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমার হাউয আদন (এডেন) থেকে আইলা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যার পানি দুধের চেয়েও সাদা, এবং মধুর চেয়েও সুমিষ্ট। এর পাত্র সংখ্যা আকাশের তারকারাজির সমান। যে কেউ এ হাউয থেকে এক ঢোক (চুমুক বা ফোঁটা) পানি পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। সর্বপ্রথম যে সব লোক এ হাউযের পানি পান করার জন্য আমার নিকট আসবে, তারা হবে ফকীর মুহাজিরগণ। এদের পরিধানে ছিল ছিড়াফাঁটা ময়লা কাপড়, মাথার চুল ছিল উশকো-খুশকো, তারা অভিজাত সম্পদশালী মেয়েদের বিবাহ করতে পারতো না এবং তাদের (আপ্যায়নের জন্য) ঘরের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হতো না। রাবী বলেনঃ হাদীস শুনে উমার (রাযিঃ) কেঁদে ফেলেন এমনকি তাঁর দাঁড়ি অশ্রুসিক্ত হয়ে যা। এরপর তিনি বললেনঃ আমি তো সম্পদশালী মহিলা বিয়ে করেছি এবং আমার জন্য সব দরজাই তো উন্মুক্ত। এখন থেকে আমি আমার পরিধেয় বস্ত্রাদি ময়লা না হওয়া পর্যন্ত ধোব না এবং মাথার চুল উশকো-খুশকো না হওয়া পর্যন্ত তেল লাগাব না।
كتاب الزهد
بَابُ ذِكْرِ الْحَوْضِ
حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ خَالِدٍ الدِّمَشْقِيُّ، حَدَّثَنَا مَرْوَانُ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُهَاجِرٍ، حَدَّثَنِي الْعَبَّاسُ بْنُ سَالِمٍ الدِّمَشْقِيُّ، نُبِّئْتُ عَنْ أَبِي سَلاَّمٍ الْحَبَشِيِّ، قَالَ بَعَثَ إِلَىَّ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَأَتَيْتُهُ عَلَى بَرِيدٍ فَلَمَّا قَدِمْتُ عَلَيْهِ قَالَ لَقَدْ شَقَقْنَا عَلَيْكَ يَا أَبَا سَلاَّمٍ فِي مَرْكَبِكَ . قَالَ أَجَلْ وَاللَّهِ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ . قَالَ وَاللَّهِ مَا أَرَدْتُ الْمَشَقَّةَ عَلَيْكَ وَلَكِنْ حَدِيثٌ بَلَغَنِي أَنَّكَ تُحَدِّثُ بِهِ عَنْ ثَوْبَانَ مَوْلَى رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فِي الْحَوْضِ فَأَحْبَبْتُ أَنْ تُشَافِهَنِي بِهِ . قَالَ فَقُلْتُ حَدَّثَنِي ثَوْبَانُ مَوْلَى رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ " إِنَّ حَوْضِي مَا بَيْنَ عَدَنَ إِلَى أَيْلَةَ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ أَوَانِيهِ كَعَدَدِ نُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ شَرِبَ مِنْهُ شَرْبَةً لَمْ يَظْمَأْ بَعْدَهَا أَبَدًا وَأَوَّلُ مَنْ يَرِدُهُ عَلَىَّ فُقَرَاءُ الْمُهَاجِرِينَ الدُّنْسُ ثِيَابًا وَالشُّعْثُ رُءُوسًا الَّذِينَ لاَ يَنْكِحُونَ الْمُنَعَّمَاتِ وَلاَ يُفْتَحُ لَهُمُ السُّدَدُ " . قَالَ فَبَكَى عُمَرُ حَتَّى اخْضَلَّتْ لِحْيَتُهُ ثُمَّ قَالَ لَكِنِّي قَدْ نَكَحْتُ الْمُنَعَّمَاتِ وَفُتِحَتْ لِيَ السُّدَدُ لاَ جَرَمَ أَنِّي لاَ أَغْسِلُ ثَوْبِي الَّذِي عَلَى جَسَدِي حَتَّى يَتَّسِخَ وَلاَ أَدْهُنُ رَأْسِي حَتَّى يَشْعَثَ .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আদন (এডেন) ইয়েমেনের একটি মশহুর শহর। আম্মানও (আম্মান বর্তমানে জর্দানের রাজধানী) সিরিয়ার অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ শহর। বালাকাআ আম্মানের নিকটবর্তী একটি জনপদ। বৈশিষ্ট এবং নিশানী হিসেবে আম্মানের বলাকাআ এর উল্লেখ করা হয়েছে। তার অর্থ হল আমাদের দুনিয়াতে আদন এবং বলাকাআ-এর নিকটবর্তী আম্মানের দূরত্ব যতটুকু আখিরাতে হাওযে কাওসারের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত দূরত্ব ততটুকু হবে। বলাবাহুল্য মাপতোল করে এ দূরত্ব নির্ণয় করে বলা হয়নি যে, এটা এত মাইল বা এত ফার্লং বা এত ফুটের ব্যবধান হবে। বরং তার প্রশস্ততা বুঝানোর জন্য আনুমানিক ভাবে বলা হয়েছে বস্তুতঃ অসংখ্য মাইলব্যাপী প্রশস্ত হবে হাওযে কাওসার।
অবশেষে বলা হয়েছে, হাওযে যারা সর্বপ্রথম পৌঁছবেন এবং পানি পান করার সৌভাগ্য হাসিল করবেন তারা হবেন গরীব মুহাজির যারা নিজেদের দৈন্যতা এবং দুনিয়া বিমুখতার কারণে চুল পরিপাটি করতেন না বরং চুল এলোমেলো থাকত। তারা পেরেশান থাকবেন, জামা কাপড় ময়লা থাকত, যাদেরকে কোন বিত্তবান নিজের মেয়ে বিয়ে দিত না এবং অগত্যা কোন স্থানে গমন করলে জামাকাপড়ের দৈন্যতার কারণে যাদেরকে স্বাগতম জানান হত না।
এটা অনুমিত হয় যে, দুনিয়া বিমুখতা, দীনের প্রতি ঐকান্তিকতা এবং আখিরাতের চিন্তার আধিক্যের কারণে যারা দুনিয়ার যিন্দেগীতে নিজেদের আরাম-আয়েশ কুরবান করেছেন এবং নিজেদের চুল পরিপাটি করতে পারেন নি এবং লেবাস-পোশাক সুন্দর রাখতে পারেন নি কিয়ামতের দিন তারা আখিরাতের পুরস্কার লাভ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হাসিল করবেন। যারা হাল যামানায় এ অবস্থাকে 'তাকাস্বাফ' বা 'রুহবানিয়াত' বা 'দীনের গলদ ধারণার পরিণতি' জ্ঞান করেন তাদের এ সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা উচিত।
প্রত্যেক যুগের বিশেষ ব্যধি থাকে। যেরূপ এককালে রুহবানিয়াত এবং 'তরকে দুনিয়ার' অনৈসলামী চিন্তাধারা এবং আচরণকে অনেক লোক খালেস ইসলামী চেষ্টা সাধনা মনে করতেন ঠিক সেরূপ অনেকে হাল যামানার বিত্ত ও নফস পরস্তির দাবির সাথে ইসলামী চিন্তা ও তালিমের সামঞ্জস্য বিধান করার উপর মাত্রাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।
وَاللّٰہُ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ
যখন পিপাসা পিপাসা বলে চিৎকার শোনা যাবে, তখন এক ধরনের লোককে হাওযে কাওসারের পানি সর্বাগ্রে পান করান হবে। তারা অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে এবং এই পানি পান করার পর পিপাসা তাদের কখনো স্পর্শ করবে না।
অবশেষে বলা হয়েছে, হাওযে যারা সর্বপ্রথম পৌঁছবেন এবং পানি পান করার সৌভাগ্য হাসিল করবেন তারা হবেন গরীব মুহাজির যারা নিজেদের দৈন্যতা এবং দুনিয়া বিমুখতার কারণে চুল পরিপাটি করতেন না বরং চুল এলোমেলো থাকত। তারা পেরেশান থাকবেন, জামা কাপড় ময়লা থাকত, যাদেরকে কোন বিত্তবান নিজের মেয়ে বিয়ে দিত না এবং অগত্যা কোন স্থানে গমন করলে জামাকাপড়ের দৈন্যতার কারণে যাদেরকে স্বাগতম জানান হত না।
এটা অনুমিত হয় যে, দুনিয়া বিমুখতা, দীনের প্রতি ঐকান্তিকতা এবং আখিরাতের চিন্তার আধিক্যের কারণে যারা দুনিয়ার যিন্দেগীতে নিজেদের আরাম-আয়েশ কুরবান করেছেন এবং নিজেদের চুল পরিপাটি করতে পারেন নি এবং লেবাস-পোশাক সুন্দর রাখতে পারেন নি কিয়ামতের দিন তারা আখিরাতের পুরস্কার লাভ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হাসিল করবেন। যারা হাল যামানায় এ অবস্থাকে 'তাকাস্বাফ' বা 'রুহবানিয়াত' বা 'দীনের গলদ ধারণার পরিণতি' জ্ঞান করেন তাদের এ সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা উচিত।
প্রত্যেক যুগের বিশেষ ব্যধি থাকে। যেরূপ এককালে রুহবানিয়াত এবং 'তরকে দুনিয়ার' অনৈসলামী চিন্তাধারা এবং আচরণকে অনেক লোক খালেস ইসলামী চেষ্টা সাধনা মনে করতেন ঠিক সেরূপ অনেকে হাল যামানার বিত্ত ও নফস পরস্তির দাবির সাথে ইসলামী চিন্তা ও তালিমের সামঞ্জস্য বিধান করার উপর মাত্রাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।
وَاللّٰہُ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ
যখন পিপাসা পিপাসা বলে চিৎকার শোনা যাবে, তখন এক ধরনের লোককে হাওযে কাওসারের পানি সর্বাগ্রে পান করান হবে। তারা অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে এবং এই পানি পান করার পর পিপাসা তাদের কখনো স্পর্শ করবে না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
বর্ণনাকারী: