কিতাবুস সুনান- ইমাম ইবনে মাজা রহঃ

২৩. হজ্ব - উমরার অধ্যায়

হাদীস নং: ৩০৭৪
আন্তর্জাতিক নং: ৩০৭৪
হজ্ব - উমরার অধ্যায়
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) -এর হজ্জ
৩০৭৪। হিশাম ইব্‌ন আম্মার...... জাফর (সাদিক) ইবন মুহাম্মাদ (বাকের) থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রাযিঃ)-র নিকট উপস্থিত হলাম। আমরা তাঁর নিকট পৌঁছলে তিনি সাক্ষাতপ্রার্থীদের পরিচয় জানতে চান। আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে আমি বলি যে, আমি আলী ইবন হুসাইনের পুত্র মুহাম্মাদ। অতএব তিনি (স্নেহভরে) আমার দিকে হাত বাড়ালেন এবং তা আমার মাথার উপর রাখলেন। তিনি প্রথমে আমার পরিচ্ছদের উপর দিকের বোতাম, পরে নীচের বোতাম খুললেন, অতঃপর তাঁর হাত আমার বুকের উপর রাখলেন। আমি তখন উঠতি বয়সের যুবক ছিলাম। তিনি বললেনঃ তোমাকে মোবারকবাদ জানাই। তুমি যা জানতে চাও জিজ্ঞাসা কর। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ সময় তিনি (বার্ধক্য জনিত কারণে) দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। ইতিমধ্যে সালাতের ওয়াক্ত হলো। তিনি নিজেকে একটি চাদরে আবৃত করে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যখনই চাদরের প্রান্ত নিজ কাঁধের উপর রাখতেন, তা (আকারে) ছোট হওয়ার কারণে নীচে পড়ে যেত। তাঁর আরেকটি বড় চাদর তাঁর পাশেই আলনায় রাখা ছিল। তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। তখন আমি বললাম, আপনি আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) -এর (বিদায়) হজ্জ সম্পর্কে অবহিত করুন। জাবির (রাযিঃ) স্বহস্তে নয় সংখ্যার প্রতি ইংগিত করে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) নয় বছর (মদীনায়) অবস্থান করেন এবং (এ সময়কালের মধ্যে) হজ্জ করেননি। অতঃপর ১০শ বর্ষে লোকদের মধ্যে ঘোষণা করলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) (এ বছর) হজ্জে যাবেন। সুতরাং মদীনায় অসংখ্য লোকের সমাগম হলো। তাদের প্রত্যেকে রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) -এর অনুসরণ করতে এবং তাঁর অনুরূপ আমল করতে আগ্রহী। অতএব তিনি রওয়ানা হলেন এবং আমরাও তাঁর সাথে রওয়ানা হলাম। আমরা যখন যুল হুলাইফা নামক স্থানে পৌঁছলাম আসমা বিনতে উসাইফ (রাযিঃ) মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবু বাকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) -এর নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চাইলেন এখন আমি কি করব? তিনি বললেনঃ তুমি গোসল কর, এক খণ্ড কাপড় দিয়ে পানি বেঁধে যাও এবং ইহরামের পোশাক পরিধান কর।

রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) মসজিদে (ইহরামের দুই রাক'আত) সালাত আদায় করবেন। অতঃপর 'কাসওয়া' নামক উষ্ট্রীতে আরোহণ করলেন। অবশেষে 'বাইদা' নামক স্থানে তাঁর উষ্ট্রী যখন তাঁকে নিয়ে দাঁড়ালো তখন আমি (জাবির) সামনের দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় তাকিয়ে দেখলাম লোকে লোকারণ্য, কতেকে সাওয়ারীতে এবং কতেকে পদব্রজে অগ্রসর হচ্ছে। ডান দিকে, বাঁ দিকে এবং পেছনেও একই দৃশ্য। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আমাদের মাঝখানে ছিলেন এবং তাঁর উপর কুরআন নাযিল হচ্ছিল। একমাত্র তিনিই এর আসল তাৎপর্য জানেন এবং তিনি যা করতেন আমরাও তাই করতাম। তিনি আল্লাহর তাওহীদ সম্বলিত তালবিয়া পাঠ করলেনঃ

“আমি তোমার দরবারে হাযির আছি হে আল্লাহ, আমি তোমার দরবারে হাযির, আমি তোমার দরবারে হাযির। তোমার কোন শরীক নাই, আমি তোমার দরবারে উপস্থিত। নিশ্চিত সমস্ত প্রশংসা, সমস্ত নি'আমত তোমারই এবং রাজত্বও তোমার কোন শরীক নাই।”

লোকেরাও উপরোক্ত তালবিয়া পাঠ করল- যা (আজকাল) পাঠ করা হয়। লোকেরা তাঁর তালবিয়ার সাথে কিছু শব্দ বাড়িয়ে বলে, কিন্তু তাদের বাধা দেননি। আর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) উপরোক্ত তালবিয়াই পাঠ করেন।

জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমরা হজ্জ ছাড়া অন্য কিছুর নিয়্যত করিনি, আমরা উমরার কথা জানতাম না। অবশেষে আমরা যখন তাঁর সাথে বায়তুল্লাহ শরীফে পৌছলাম তিনি রুকন (হাজারে আসওয়াদ) চুম্বন করলেন, অতঃপর সাতবার এবং চারবার স্বাভাবিক গতিতে। এরপর তিনি মাকামে ইবরাহীমে পৌঁছে তিলাওয়াত করলেনঃ “তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর" (সূরা বাকারাঃ ১২৫)।

তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তাঁর ও বায়তুল্লাহর মাঝখানে রেখে (দুই রাক'আত নামায পড়লেন)। (জা'ফর বলেন) আমি যতদূর জানি, তিনি (জাবির) বরং রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি দুই রাক'আত নামাযে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাস পাঠ করেছেন।

অতঃপর তিনি বায়তুল্লায় ফিরে এলেন এবং হাজারে আসওয়াদেও চুমা খেলেন। এরপর তিনি দরজা দিয়ে সাফা পাহাড়ের দিকে বের হলেন এবং সাফার নিকটবর্তী হয়ে তিলাওয়াত করলেন। “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয় আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম” (সূরা বাকারাঃ ১৫৮) এবং (আরও বললেন) আল্লাহ তা'আলা যা দিয়ে আরম্ভ করেছেন আমরাও তা দিয়ে আরম্ভ করব। তখন তিনি সাফা পাহাড় থেকে শুরু করলেন এবং তার এতটা উপরে আরোহণ করলেন যে, বায়তুল্লাহ শরীফ দেখতে পেলেন। তিনি (কিবলামুখী হয়ে) আল্লাহর এক ও মহত্ত ঘোষণা করেন এবং এই দু'আ পড়েন।

“আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বূদ নাই, তিনি এক তাঁর কোন শরীক নাই, তাঁর জন্য রাজত্ব এবং তাঁর জন্য সমস্ত প্রশংসা, তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তিনি এক, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, নিজের বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সমস্ত সম্মিলিত শক্তিকে পরাভূত করেছেন।"

তিনি এ দু'আ তিনবার পড়লেন এবং মাঝখানে অনুরূপ আরো কিছু দু'আ পড়লেন। অতঃপর তিনি নেমে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলেন, যাবত না তাঁর পা মোবারক উপত্যকার সমতল ভূমিতে গিয়ে ঠেকল। তিনি দৌড়ে চললেন, যাবত না উপত্যকা অতিক্রম করলেন। মারওয়া পাহাড়ে উঠার সময় হেঁটে উঠলেন, অতঃপর এখানেও তাই করলেন, যা তিনি সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। শেষে তাওয়াফে যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে পৌছলেন, (লোকদের সম্বোধন করে) বললেনঃ যদি আমি আগেই বুঝতে পারতাম যে, আমার কি করা উচিৎ তাহলে আমি সাথে করে কুরবানীর পশু আনতাম না এবং (হজ্জের) ইহরামকে উমরায় পরিবর্তন করতাম। অতএব তোমাদের মধ্যে যার সাথে কুরবানীর পশু নাই, সে যেন ইহরাম খুলে ফেলে এবং একে উমরায় পরিণত করে। তখন নবী (ﷺ) এবং যাদের সাথে কুরবানীর পশু ছিল তারা ব্যতীত সকলেই ইহরাম খুলে ফেললে এবং চুল ছোট করল। এ সময় সুরাকা ইব্‌ন মালিক, ইব্‌ন জু'শুম (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই ব্যবস্থা কি আমাদের এ বছরের জন্য, না সর্বকালের জন্য? রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) নিজ হাতের আংগুলগুলো পরস্পরের ফাঁকে ঢুকিয়ে দুইবার বললেনঃ উমরা হজ্জের মধ্যে প্রবেশ করলো না, বরং সর্বকালের জন্য।

এ সময় আলী (রাযিঃ) নবী (ﷺ) র জন্য কুরবানীর পশু নিয়ে এলেন এবং যারা ইহরাম খুলে ফেলেছে ফাতিমা (রাযিঃ)-কে তাদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পেলেন। তিনি রং্গীন কাপড় পরিধান করছিলেন এবং চোখে সুরমা লাগিয়ে ছিলেন। আলী (রাযিঃ) তা অপছন্দ করলেন। ফাতিমা (রাযিঃ) বললেন, আমার পিতা আমাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (রাবী বলেন) এরপর আলী (রাযিঃ) ইরাকে অবস্থানকালে বলতেন; তখন আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম ফাতিমার উপর অসন্তুষ্ট অবস্থায় যে, সে যা করেছে সে সম্পর্কে মাসআলা জানার জন্য। আমি তাঁকে বললাম যে, আমি তার এই কাজ অপছন্দ করেছি। তখন তিনি বললেনঃ ফাতিমা ঠিকই করেছে ঠিকই বলেছে। তুমি হজ্জের ইহরাম বাঁধার সময় কি বলেছিলে? আলী (রাযিঃ) বলেন, আমি বলেছিলামঃ হে আল্লাহ! আমি ইহরাম বাঁধলাম, যে নিয়্যতে ইরাম বেঁধেছেন আপনার রাসূল। তিনি বললেনঃ আমার সাথে কুরবানীর পশু আছে, অতএব তুমি (আলী) ইহরাম খুল না ।

জাবির (রাযিঃ) বলেন, আলী (রাযিঃ) ইয়ামান থেকে যে পশুপাল নিয়ে আসেন এবং নবী (ﷺ) নিজের সাথে করে যে পশুগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন- এর সর্বমোট সংখ্যা দাঁড়ায় একশত। অতএব নবী (ﷺ) এবং যাদের সাথে কুরবানীর পশু ছিল তারা ব্যতীত আর সকলেই ইহরাম খুলে ফেলেন এবং চুল ছোট করে ফেলে। অতঃপর যখন তারবিয়ার দিন (৮ যিলহজ্জ) হলো তখন লোকেরা পুনরায় ইহরাম বাঁধল এবং মিনার দিকে রওয়ানা হল। আর নবী (ﷺ) সাওয়ার হয়ে গেলেন এবং তথায় যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের সালাত আদায় করলেন। আর তিনি সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত তথায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন এবং তাঁর জন্য নামিরা নামক স্থানে গিয়ে একটি তাঁবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন। অতঃপর নিজেও রওয়ানা হয়ে গেলেন।

কুরাইশগণ নিশ্চিত ছিল যে, নবী (ﷺ) মাশআরুল-হারাম অথবা মুযদালাফা নামক স্থানে অবস্থান করলেন, যেমন কুরাইশগণ জাহিলী যুগে এখানে অবস্থান করত মানহানী হওয়ার আশংকায় তারা রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) সামনে অগ্রসর হতে থাকলেন- যাবত না আরাফাতে পৌঁছলেন। তিনি দেখতে পেলেন, নামিরায় তাঁর জন্য তাঁবু খাটানো হয়েছে। তিনি এখানে অবতরণ করলেন। অবশেষে সূর্য (পশ্চিমাকাশে) ঢলে পড়লে তিনি তাঁর কাসওয়া নামক উষ্ট্রী সাজানোর নির্দেশ দিলে তাই করা হল। অতঃপর তিনি উপত্যকার মাঝখানে আসেন এবং লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেনঃ

“তোমাদের জীবন ও সম্পদ তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম-যেভাবে এই দিন এই মাস এবং এই শহর হারাম।"

“সাবধান! জাহিলী যুগের সকল জিনিস (অপ-সংস্কৃতি) আমার পদতলে সম্পূর্ণ রহিত করা হল।"

“জাহিলী যুগের রক্তের দাবীও (হত্যার প্রতিশোধ) রহিত হল। আমাদের (বংশের) রক্তের দাবীর মধ্যে সর্বপ্রথম আমি রবী'আ ইবন হারিসের রক্তের দাবী রহিত করলাম।" সে বনু সা'দ-এ শিশু অবস্থায় লালিত-পালিত হওয়াকালীন হুযাইল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে।

“জাহিলী যুগের সুদও রহিত করা হল। আমাদের বংশের প্রাপ্য সুদের মধ্যে সর্বপ্রথম আমি আব্দুল মুত্তালিব-পুত্র আব্বাস (রাযিঃ)-র প্রাপ্য সমুদয় সুদ রহিত করলাম।"

“তোমরা স্ত্রীলোকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর জামানতে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালামের মাধ্যমে তাদের লজ্জাস্থান নিজেদের জন্য হালাল করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা যেন তোমাদের অন্দর মহলে এমন কোন লোককে যেতে না দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা অনুরূপ কাজ করে তবে তাদেরকে হাল্কাভাবে মারপিট করবে। আর তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তোমরা ন্যায়সংগতভাবে তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে।"

“আমি তোমাদের মাঝে এমন এক জিনিস রেখে যাচ্ছি- যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।"

“তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে- তখন তোমরা কি বলবে? উপস্থিত জনতা বলল, আমরা সাক্ষ্য দেব আপনি (আল্লাহর বাণী) পৌঁছে দিয়েছেন, আপনার কর্তব্য পালন করেছেন এবং সদোপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি নিজের তর্জনী (শাহাদত আংগুল) আকাশের দিকে উত্তোলন করে এবং জনতার প্রতি ইংগিত করে বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন (তিনবার)।

অতঃপর বিলাল (রাযিঃ) আযান দিলেন, অতঃপর ইকামত দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) যুহরের সালাত আদায় করলেন। বিলাল (রাযিঃ) পুনরায় ইকামত দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করলেন। তিনি এই দুই সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করেননি।

অতপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কাসওয়ার উপর সওয়ার হয়ে আল-মাওকিফ (অবস্থান-স্থল)-এ এলেন, নিজের কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর পেট পাথরের স্তুপের দিকে করে দিলেন এবং পায়ে হ্যাঁটার পথ নিজের সামনে রেখে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি এভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। পীত আভা কিছুটা দূরীভূত হল, এমন কি সূর্য-গোলক সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি উসামা (রাযিঃ)-কে তাঁর বাহনে পেছন দিকে বসালেন এবং কাসওয়ার নাসারন্দ্রের দড়ি সজোরে টান দিলেন- ফলে এর মাথা জিন স্পর্শ করল (এবং তা অগ্রযাত্রা শুরু করল)। তিনি ডান হাতের ইশারায় বললেনঃ “হে জনমণ্ডলী! শান্তভাবে, শান্তভাবে (ধীরেসুস্থে মধ্যম গতিতে) অগ্রসর হও।" যখনই তিনি বালুর স্তূপের নিকট পৌঁছতেন কাসওয়ার নাসারন্দ্রের রশি কিছুটা ঢিল দিতেন, যাতে তা উপর দিকে উঠতে পারে।

এভাবে তিনি মুযদালিফায় পৌঁছলেন এবং এখানে একই আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও এশার সালাত আদায় করলেন। এই দুই সালাতের মাঝখানে অন্য কোন সালাত আদায় করলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) শুয়ে ঘুমালেন যাবত না ফজরের ওয়াক্ত হল। অতঃপর উষা পরিষ্কার হয়ে গেলে তিনি আযান ও ইকামতসহ ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর কাসওয়ার পিঠে আরোহণ করে 'মাশআরুল হারাম' নামক স্থানে এলেন। এখানে তিনি (কিবলামুখী হয়ে) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তাঁর মহত্ত বর্ণনা করলেন, কলেমা তাওহীদ পড়লেন এবং তাঁর একত্ব ঘোষণা করলেন। আকাশ যথেষ্ট পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে এরূপ করতে থাকলেন।

সূর্য উদয়ের পূর্বে তিনি আবার রওয়ানা হলেন এবং ফাদল ইব্‌ন আব্বাসকে সাওয়ারীতে তাঁর পেছনে বসালেন। সে ছিল সুদর্শন যুবক এবং তার মাথার চুল ছিল অত্যন্ত সুন্দর। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) যখন অগ্রসর হলেন- তখন (পাশাপাশি) একদল মহিলাও যাচ্ছিল। ফাদল তাদের দিকে তাকাতে লাগল। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) নিজের হাত ফাদলের চেহারার উপর রাখলেন এবং সে তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে দেখতে লাগল। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) পুনরায় অন্য দিক থেকে। ফাদল-এর মুখমণ্ডলে হাত রাখলেন। সে আবার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। এভাবে তিনি 'বাতনে মুহাসসার' নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং সাওয়ারীর গতি কিছুটা দ্রুত করলেন। তিনি মধ্যপথ দিয়ে অগ্রসর হলেন- যা জামরাতুল কুবরায় গিয়ে পৌঁছেছে। তিনি বৃক্ষের নিকটের জামরায় এলেন এবং নীচের খালি জায়গায় দাঁড়িয়ে এখানে সাতটি কাঁকর নিক্ষেপ করলেন এবং প্রত্যেকবার 'আল্লাহু আকবার' বললেন। অতঃপর সেখান থেকে কুরবানীর স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি পশু যবেহ করলেন। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকল তা আলী (রাযিঃ)-কে যবেহ্ করতে বললেন এবং তিনি তা কুরবানী করলেন। তিনি নিজ পশুতে আলীকেও শরীক করলেন। অতঃপর তিনি প্রতিটি পশুর কিছু অংশ নিয়ে একত্রে রান্না করার নির্দেশ দিলেন। অতএব তাই করা হল। তাঁরা উভয়ে এই গোশ্ত থেকে খেলেন এবং ঝোল পান করলেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) সাওয়ার হয়ে বায়তুল্লার দিকে রওয়ানা হলেন এবং মক্কায় পৌঁছে যুহরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর তিনি (নিজ গোত্র) বনু আব্দুল মুত্তালিব-এ এলেন। তারা লোকদের যমযমের পানি পান করাচ্ছিল। তিনি বললেনঃ হে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! পানি তোল। আমি যদি আশংকা না করতাম যে, পানি পান করানোর ব্যাপারে লোকেরা তোমাদের পরাভূত করে দেবে- তবে আমি নিজেও তোমাদের সাথে পানি তুলতাম। তখন তারা তাঁকে এক বালতি পানি দিল এবং তিনি তা থেকে কিছু পান করলেন।
كتاب المناسك
بَاب حَجَّةِ رَسُولِ اللهِ ﷺ
حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ حَدَّثَنَا حَاتِمُ بْنُ إِسْمَعِيلَ حَدَّثَنَا جَعْفَرُ بْنُ مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ فَلَمَّا انْتَهَيْنَا إِلَيْهِ سَأَلَ عَنْ الْقَوْمِ حَتّٰى انْتَهَى إِلَيَّ فَقُلْتُ أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ الْحُسَيْنِ فَأَهْوَى بِيَدِهِ إِلَى رَأْسِي فَحَلَّ زِرِّي الْأَعْلَى ثُمَّ حَلَّ زِرِّي الْأَسْفَلَ ثُمَّ وَضَعَ كَفَّهُ بَيْنَ ثَدْيَيَّ وَأَنَا يَوْمَئِذٍ غُلَامٌ شَابٌّ فَقَالَ مَرْحَبًا بِكَ سَلْ عَمَّا شِئْتَ فَسَأَلْتُهُ وَهُوَ أَعْمَى فَجَاءَ وَقْتُ الصَّلَاةِ فَقَامَ فِي نِسَاجَةٍ مُلْتَحِفًا بِهَا كُلَّمَا وَضَعَهَا عَلَى مَنْكِبَيْهِ رَجَعَ طَرَفَاهَا إِلَيْهِ مِنْ صِغَرِهَا وَرِدَاؤُهُ إِلَى جَانِبِهِ عَلَى الْمِشْجَبِ فَصَلَّى بِنَا فَقُلْتُ أَخْبِرْنَا عَنْ حَجَّةِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ بِيَدِهِ فَعَقَدَ تِسْعًا وَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَكَثَ تِسْعَ سِنِينَ لَمْ يَحُجَّ فَأَذَّنَ فِي النَّاسِ فِي الْعَاشِرَةِ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم حَاجٌّ فَقَدِمَ الْمَدِينَةَ بَشَرٌ كَثِيرٌ كُلُّهُمْ يَلْتَمِسُ أَنْ يَأْتَمَّ بِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَيَعْمَلَ بِمِثْلِ عَمَلِهِ فَخَرَجَ وَخَرَجْنَا مَعَهُ فَأَتَيْنَا ذَا الْحُلَيْفَةِ فَوَلَدَتْ أَسْمَاءُ بِنْتُ عُمَيْسٍ مُحَمَّدَ بْنَ أَبِي بَكْرٍ فَأَرْسَلَتْ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَيْفَ أَصْنَعُ قَالَ اغْتَسِلِي وَاسْتَثْفِرِي بِثَوْبٍ وَأَحْرِمِي فَصَلَّى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْمَسْجِدِ ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ حَتّٰى إِذَا اسْتَوَتْ بِهِ نَاقَتُهُ عَلَى الْبَيْدَاءِ قَالَ جَابِرٌ نَظَرْتُ إِلَى مَدِّ بَصَرِي مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ بَيْنَ رَاكِبٍ وَمَاشٍ وَعَنْ يَمِينِهِ مِثْلُ ذَلِكَ وَعَنْ يَسَارِهِ مِثْلُ ذَلِك وَمِنْ خَلْفِهِ مِثْلُ ذَلِكَ وَرَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ أَظْهُرِنَا وَعَلَيْهِ يَنْزِلُ الْقُرْآنُ وَهُوَ يَعْرِفُ تَأْوِيلَهُ مَا عَمِلَ بِهِ مِنْ شَيْءٍ عَمِلْنَا بِهِ فَأَهَلَّ بِالتَّوْحِيدِ لَبَّيْكَ اللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ وَأَهَلَّ النَّاسُ بِهَذَا الَّذِي يُهِلُّونَ بِهِ فَلَمْ يَرُدَّ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَيْهِمْ شَيْئًا مِنْهُ وَلَزِمَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم تَلْبِيَتَهُ قَالَ جَابِرٌ لَسْنَا نَنْوِي إِلَّا الْحَجَّ لَسْنَا نَعْرِفُ الْعُمْرَةَ حَتّٰى إِذَا أَتَيْنَا الْبَيْتَ مَعَهُ اسْتَلَمَ الرُّكْنَ فَرَمَلَ ثَلَاثًا وَمَشَى أَرْبَعًا ثُمَّ قَامَ إِلَى مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ فَقَالَ ( وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ).
فَجَعَلَ الْمَقَامَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْبَيْتِ فَكَانَ أَبِي يَقُولُ وَلَا أَعْلَمُهُ إِلَّا ذَكَرَهُ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم إِنَّهُ كَانَ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ وَ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى الْبَيْتِ فَاسْتَلَمَ الرُّكْنَ ثُمَّ خَرَجَ مِنْ الْبَابِ إِلَى الصَّفَا حَتّٰى إِذَا دَنَا مِنْ الصَّفَا قَرَأَ ( إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ ).
نَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللهُ بِهِ فَبَدَأَ بِالصَّفَا فَرَقِيَ عَلَيْهِ حَتّٰى رَأَى الْبَيْتَ فَكَبَّرَ اللهَ وَهَلَّلَهُ وَحَمِدَهُ وَقَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ ثُمَّ دَعَا بَيْنَ ذَلِكَ وَقَالَ مِثْلَ هَذَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ نَزَلَ إِلَى الْمَرْوَةِ فَمَشَى حَتّٰى إِذَا انْصَبَّتْ قَدَمَاهُ رَمَلَ فِي بَطْنِ الْوَادِي حَتّٰى إِذَا صَعِدَتَا يَعْنِي قَدَمَاهُ مَشَى حَتّٰى أَتَى الْمَرْوَةَ فَفَعَلَ عَلَى الْمَرْوَةِ كَمَا فَعَلَ عَلَى الصَّفَا فَلَمَّا كَانَ آخِرُ طَوَافِهِ عَلَى الْمَرْوَةِ قَالَ لَوْ أَنِّي اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقْ الْهَدْيَ وَجَعَلْتُهَا عُمْرَةً فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ لَيْسَ مَعَهُ هَدْيٌ فَلْيَحْلِلْ وَلْيَجْعَلْهَا عُمْرَةً فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوا إِلَّا النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَمَنْ كَانَ مَعَهُ الْهَدْيُ فَقَامَ سُرَاقَةُ بْنُ مَالِكِ بْنِ جُعْشُمٍ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَلِعَامِنَا هَذَا أَمْ لِأَبَدِ الْأَبَدِ قَالَ فَشَبَّكَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَصَابِعَهُ فِي الْأُخْرَى وَقَالَ دَخَلَتْ الْعُمْرَةُ فِي الْحَجِّ هَكَذَا مَرَّتَيْنِ لَا بَلْ لِأَبَدِ الْأَبَدِ قَالَ وَقَدِمَ عَلِيٌّ بِبُدْنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَوَجَدَ فَاطِمَةَ مِمَّنْ حَلَّ وَلَبِسَتْ ثِيَابًا صَبِيغًا وَاكْتَحَلَتْ فَأَنْكَرَ ذَلِكَ عَلَيْهَا عَلِيٌّ فَقَالَتْ أَمَرَنِي أَبِي بِهَذَا فَكَانَ عَلِيٌّ يَقُولُ بِالْعِرَاقِ فَذَهَبْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم مُحَرِّشًا عَلَى فَاطِمَةَ فِي الَّذِي صَنَعَتْهُ مُسْتَفْتِيًا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فِي الَّذِي ذَكَرَتْ عَنْهُ وَأَنْكَرْتُ ذَلِكَ عَلَيْهَا فَقَالَ صَدَقَتْ صَدَقَتْ مَاذَا قُلْتُ حِينَ فَرَضْتَ الْحَجَّ قَالَ قُلْتُ اللّٰهُمَّ إِنِّي أُهِلُّ بِمَا أَهَلَّ بِهِ رَسُولُكَ صلى الله عليه وسلم قَالَ فَإِنَّ مَعِي الْهَدْيَ فَلَا تَحِلَّ قَالَ فَكَانَ جَمَاعَةُ الْهَدْيِ الَّذِي جَاءَ بِهِ عَلِيٌّ مِنْ الْيَمَنِ وَالَّذِي أَتَى بِهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مِنْ الْمَدِينَةِ مِائَةً ثُمَّ حَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوا إِلَّا النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَمَنْ كَانَ مَعَهُ هَدْيٌ فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ وَتَوَجَّهُوا إِلَى مِنًى أَهَلُّوا بِالْحَجِّ فَرَكِبَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَصَلَّى بِمِنًى الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ وَالْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ وَالصُّبْحَ ثُمَّ مَكَثَ قَلِيلًا حَتّٰى طَلَعَتْ الشَّمْسُ وَأَمَرَ بِقُبَّةٍ مِنْ شَعَرٍ فَضُرِبَتْ لَهُ بِنَمِرَةَ فَسَارَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَا تَشُكُّ قُرَيْشٌ إِلَّا أَنَّهُ وَاقِفٌ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ أَوْ الْمُزْدَلِفَةِ كَمَا كَانَتْ قُرَيْشٌ تَصْنَعُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَأَجَازَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم حَتّٰى أَتَى عَرَفَةَ فَوَجَدَ الْقُبَّةَ قَدْ ضُرِبَتْ لَهُ بِنَمِرَةَ فَنَزَلَ بِهَا حَتّٰى إِذَا زَاغَتْ الشَّمْسُ أَمَرَ بِالْقَصْوَاءِ فَرُحِلَتْ لَهُ فَرَكِبَ حَتّٰى أَتَى بَطْنَ الْوَادِي فَخَطَبَ النَّاسَ فَقَالَ إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا أَلَا وَإِنَّ كُلَّ شَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ تَحْتَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ وَأَوَّلُ دَمٍ أَضَعُهُ دَمُ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ كَانَ مُسْتَرْضِعًا فِي بَنِي سَعْدٍ فَقَتَلَتْهُ هُذَيْلٌ وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُهُ رِبَانَا رِبَا الْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ فَاتَّقُوا اللهَ فِي النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانَةِ اللهِ وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللهِ وَإِنَّ لَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ فَإِنْ فَعَلْنَ ذَلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَقَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَمْ تَضِلُّوا إِنْ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللهِ وَأَنْتُمْ مَسْئُولُونَ عَنِّي فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُونَ قَالُوا نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ فَقَالَ بِإِصْبَعِهِ السَّبَابَةِ إِلَى السَّمَاءِ وَيَنْكُبُهَا إِلَى النَّاسِ اللّٰهُمَّ اشْهَدْ اللّٰهُمَّ اشْهَدْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ أَذَّنَ بِلَالٌ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الظُّهْرَ ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الْعَصْرَ وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ثُمَّ رَكِبَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم حَتّٰى أَتَى الْمَوْقِفَ فَجَعَلَ بَطْنَ نَاقَتِهِ إِلَى الصَّخَرَاتِ وَجَعَلَ حَبْلَ الْمُشَاةِ بَيْنَ يَدَيْهِ وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتّٰى غَرَبَتْ الشَّمْسُ وَذَهَبَتْ الصُّفْرَةُ قَلِيلًا حَتّٰى غَابَ الْقُرْصُ وَأَرْدَفَ أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ خَلْفَهُ فَدَفَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ شَنَقَ الْقَصْوَاءَ بِالزِّمَامِ حَتّٰى إِنَّ رَأْسَهَا لَيُصِيبُ مَوْرِكَ رَحْلِهِ وَيَقُولُ بِيَدِهِ الْيُمْنَى أَيُّهَا النَّاسُ السَّكِينَةَ السَّكِينَةَ’ كُلَّمَا أَتَى حَبْلًا مِنْ الْحِبَالِ أَرْخَى لَهَا قَلِيلًا حَتّٰى تَصْعَدَ ثُمَّ أَتَى الْمُزْدَلِفَةَ فَصَلَّى بِهَا الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ بِأَذَانٍ وَاحِدٍ وَإِقَامَتَيْنِ وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ثُمَّ اضْطَجَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم حَتّٰى طَلَعَ الْفَجْرُ فَصَلَّى الْفَجْرَ حِينَ تَبَيَّنَ لَهُ الصُّبْحُ بِأَذَانٍ وَإِقَامَةٍ ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ حَتّٰى أَتَى الْمَشْعَرَ الْحَرَامَ فَرَقِيَ عَلَيْهِ فَحَمِدَ اللهَ وَكَبَّرَهُ وَهَلَّلَهُ فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتّٰى أَسْفَرَ جِدًّا ثُمَّ دَفَعَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ وَأَرْدَفَ الْفَضْلَ بْنَ الْعَبَّاسِ وَكَانَ رَجُلًا حَسَنَ الشَّعَرِ أَبْيَضَ وَسِيمًا فَلَمَّا دَفَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَرَّ الظُّعُنُ يَجْرِينَ فَطَفِقَ يَنْظُرُ إِلَيْهِنَّ فَوَضَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَدَهُ مِنْ الشِّقِّ الْآخَرِ فَصَرَفَ الْفَضْلُ وَجْهَهُ مِنْ الشِّقِّ الْآخَرِ يَنْظُرُ حَتّٰى أَتَى مُحَسِّرًا حَرَّكَ قَلِيلًا ثُمَّ سَلَكَ الطَّرِيقَ الْوُسْطَى الَّتِي تُخْرِجُكَ إِلَى الْجَمْرَةِ الْكُبْرَى حَتّٰى أَتَى الْجَمْرَةَ الَّتِي عِنْدَ الشَّجَرَةِ فَرَمَى بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ مِنْهَا مِثْلِ حَصَى الْخَذْفِ وَرَمَى مِنْ بَطْنِ الْوَادِي ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى الْمَنْحَرِ فَنَحَرَ ثَلَاثًا وَسِتِّينَ بَدَنَةً بِيَدِهِ وَأَعْطَى عَلِيًّا فَنَحَرَ مَا غَبَرَ وَأَشْرَكَهُ فِي هَدْيِهِ ثُمَّ أَمَرَ مِنْ كُلِّ بَدَنَةٍ بِبَضْعَةٍ فَجُعِلَتْ فِي قِدْرٍ فَطُبِخَتْ فَأَكَلَا مِنْ لَحْمِهَا وَشَرِبَا مِنْ مَرَقِهَا ثُمَّ أَفَاضَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْبَيْتِ فَصَلَّى بِمَكَّةَ الظُّهْرَ فَأَتَى بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ وَهُمْ يَسْقُونَ عَلَى زَمْزَمَ فَقَالَ انْزَعُوا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لَوْلَا أَنْ يَغْلِبَكُمْ النَّاسُ عَلَى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ فَنَاوَلُوهُ دَلْوًا فَشَرِبَ مِنْهُ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হুযুর (ﷺ) মারওয়ায় সায়ী শেষ করে এই যে কথাটি বলেছিলেন, "যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেনি, তারা যেন নিজেদের তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয়। আর আমিও যদি কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে না আসতাম, তাহলে আমিও এমনই করতাম।" এর মর্ম ও স্বরূপ বুঝার আগে একথাটি জেনে নিতে হবে যে, জাহিলিয়্যাত যুগে হজ্ব ও উমরার ক্ষেত্রে যেসব বিশ্বাসগত ও কর্মগত ভ্রান্তি প্রচলিত হয়ে অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, এগুলোর মধ্যে একটি ভ্রান্তি এও ছিল যে, শাওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্ব যেগুলোকে হজ্বের মাস বলা হয়, (কেননা, হজ্বের সফর এ মাসগুলোতেই হয়ে থাকে।) এসব মাসে উমরা পালন করাকে কঠিন গুনাহ্ মনে করা হত। অথচ এ বিষয়টি ভুল ও মনগড়া ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সফরের শুরুতেই স্পষ্টভাবে লোকদেরকে এ কথা বলে দিয়েছিলেন যে, যার মন চায় সে কেবল হজ্বের ইহরাম বাঁধতে পারে, (যাকে পরিভাষায় ইফরাদ বলা হয়।) আর যার মন চায় সে শুরুতে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধতে পারে এবং মক্কা শরীফ গিয়ে উমরা থেকে ফারেগ হয়ে হজ্বের জন্য আরেকটি ইহরাম বাঁধবে। (যাকে তামাত্তু বলা হয়।) আর যার মন চায় সে হজ্ব ও উমরার একই সঙ্গে ইহরাম বাঁধবে এবং একই ইহরামে উভয়টি আদায় করার নিয়ত করবে, (যাকে কেরান বলা হয়।)
হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শোনার পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে অল্প সংখ্যক লোকই নিজেদের বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তামাত্তু হজ্বের ইচ্ছা করলেন এবং যুল হুলায়ফায় গিয়ে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধলেন। তাদের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.ও ছিলেন। অপর দিকে অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম শুধু হজ্বের অথবা এক সাথে হজ্ব ও উমরার ইহরাম বাঁধলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উভয়টির ইহরাম বাঁধলেন, অর্থাৎ, কেরান পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। তাছাড়া নিজের কুরবানীর পশু (উট) ও তিনি মদীনা শরীফ থেকেই সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন। আর শরী‘আতের বিধান হচ্ছে, যে হাজী কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে হজ্ব করতে যায়, সে ঐ পর্যন্ত ইহরাম শেষ করতে পারে না, যে পর্যন্ত সে ১০ই যিলহজ্ব কুরবানী করে না নেয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং ঐসব সাহাবায়ে কেরাম যারা তাঁর মতই কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হজ্বের পূর্বে (অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর আগে) ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। কিন্তু যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেননি, তাদের জন্য এ ধরনের কোন অপারগতা ছিল না।

মক্কা শরীফে পৌঁছে হুযুর (ﷺ) তীব্রভাবে অনুভব করলেন যে, এই যে জাহিলিয়্যাত সুলভ একটি কথা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ- এর প্রতিবাদ ও মূলোৎপাটনের জন্য এবং মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে এর সূক্ষ্ম জীবাণু দূর করার জন্য এটা খুবই জরুরী যে, ব্যাপকভাবে এর বিপরীত কাজ করে দেখানো হোক। আর এর সম্ভাব্য পন্থা এটাই ছিল যে, তাঁর সাথীদের মধ্যে থেকে বেশী সংখ্যক লোক যারা তাঁর সাথে তাওয়াফ ও সায়ী করে নিয়েছিল, তারা এ তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরায় রূপান্তরিত করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাবে এবং হজ্বের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবার ইহরাম বেঁধে নিবে। আর তিনি নিজে যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, এজন্য তাঁর বেলায় এর অবকাশ ও সুযোগ ছিল না। এজন্যই তিনি বললেনঃ "যদি প্রথমেই আমি ঐ বিষয়টি অনুভব করতাম, যা পরে অনুভব করেছি, তাহলে আমি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে দিয়ে ইহরাম শেষ করে দিতাম। (কিন্তু আমি যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে আনার কারণে এমন করতে অপারগ, তাই তোমাদেরকে বলছি যে.) তোমাদের মধ্য থেকে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি, তারা যেন এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয় এবং নিজেদের ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যায়।" হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শুনে সুরাকা ইবনে মালেক দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তিনি যেহেতু এখন পর্যন্ত এ কথাই জানতেন যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ, এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এ দিনগুলোতে পৃথক উমরা করার এ বিধান কি কেবল এ বছরের জন্য, না এখন থেকে সবসময়ই হজ্বের মাসগুলোতে এমন করা যাবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ভালভাবে বুঝানোর জন্য নিজের এক হাতের আঙ্গুলগুলো অপর হাতের আঙ্গুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে বললেন: دخلت العمرة في الحج হজ্বের মধ্যে উমরা এভাবে দাখিল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, হজ্বের মাসগুলোতে এবং হজ্বের একেবারে নিকটবর্তী দিনগুলোতেও উমরা করা যায়। এটাকে গুনাহ্ মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও জাহেলী বিশ্বাস, আর এ বিধানটি সব সময়ের জন্য।

যেসব সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছিলেন, তারা এ ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডন করেননি; বরং কেবল ছেঁটে নিয়েছিলেন। এরূপ তারা সম্ভবত এ কারণে করেছিলেন, যাতে মাথা মুন্ডানোর ফযীলতটি হজ্বের ইহরাম খোলার সময় লাভ করতে পারেন।

হজ্বের বিশেষ কার্যক্রম ৮ই যিলহজ্ব থেকে শুরু হয়- যাকে "তারবিয়ার দিন" বলা হয়। এ দিন প্রভাতে হাজী সাহেবান মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ইফরাদ অথবা কেরানকারীগণ তো আগে থেকেই ইহরাম অবস্থায় থাকেন। তাদের ছাড়া অন্য হাজীগণ এ দিনই অর্থাৎ, ৮ই যিলহজ্ব ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে যান এবং ৯ই যিলহজ্ব সকাল পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করেন।

রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এবং তাঁর সাথে কিছু সাহাবায়ে কেরাম- যারা নিজেদের কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা তো ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। অবশিষ্ট সাহাবীগণ- যারা উমরা আদায় করে ইহরাম খুলে নিয়েছিলেন, তারা সবাই ৮ তারিখের সকালে হজ্বের ইহরাম বাঁধলেন এবং হজ্বের এ কাফেলা মিনা রওয়ানা হয়ে গেল এবং এ দিন তারা সেখানেই অবস্থান করলেন। তারপর ৯ তারিখ সকালে সূর্যোদয়ের পর আরাফার দিকে যাত্রা শুরু হল। আরাফা মিনা থেকে প্রায় ৬ মাইল এবং মক্কা শরীফ থেকে ১ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটা হরমের সীমানার বাইরে; বরং এ দিকে হারামের সীমানা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আরাফার এলাকা শুরু হয়।

আরবের সাধারণ গোত্রসমূহ- যারা হজ্বের জন্য আসত, তারা সবাই ৯ই যিলহজ্ব হারামের সীমানা থেকে বাইরে গিয়ে আরাফায় অবস্থান গ্রহণ করত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোত্রের লোকেরা অর্থাৎ, কুরাইশগণ যারা নিজেদেরকে কাবার প্রতিবেশী ও মুতাওয়াল্লী এবং আল্লাহর হারামের অধিবাসী বলত, তারা ওকূফের জন্যও হারামের বাইরে যেত না; বরং এর সীমানার ভিতরেই মুযদালিফা অঞ্চলের মাশ'আরুল হারাম পর্বতের কাছে অবস্থান করত এবং এটাকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য মনে করত। নিজেদের এ গোত্রীয় সনাতন প্রথার কারণে কুরাইশদের এ বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও মাশ'আরুল হারামের নিকটই অবস্থান করবেন। কিন্তু যেহেতু তাদের এ রীতিটি ভুল ছিল এবং ওকূফের সঠিক স্থান আরাফাই ছিল, এজন্য তিনি মিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ই লোকদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমার জন্য নামিরায় যেন তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়। এ নির্দেশের ভিত্তিতেই নামিরা উপত্যকায়ই হুযুর (ﷺ)-এর জন্য তাঁবু খাটানো হয়। তিনি সেখানে গিয়েই অবতরণ করেন এবং ঐ তাঁবুতেই অবস্থান গ্রহণ করেন।

এটা জানা কথা যে, ঐ দিনটি অর্থাৎ, ঐ বছরের ওকূফে আরাফার দিনটি শুক্রবার ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেদিন সূর্য চলার পর প্রথমে পূর্বে উল্লেখিত খুতবা প্রদান করলেন। তারপর যুহর ও আসরের উভয় নামায যুহরের ওয়াক্তে একই সাথে পড়লেন। হাদীসে স্পষ্টভাবে যুহরের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি ঐ দিন জুমু'আর নামায পড়েননি; বরং এর স্থলে যুহর পড়েছেন। আর তিনি যে খুতবা দিয়েছিলেন এটা জুমু'আর ছিল না; বরং আরাফা দিবসের খুতবা ছিল। সেখানে জুমু'আ না পড়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, আরাফা কোন জনবসতি নয়; বরং একটি মরুপ্রান্তর। আর জুমু'আ জনবসতিতে পড়া হয়।

আরাফার দিনের এ খুতবায় তিনি যেসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, ঐ সময়ে ও ঐ সমাবেশে এসব জিনিসেরই ঘোষণা ও প্রচার সবচেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুতবার পর তিনি যুহর ও আসরের নামায একসাথে যুহরের ওয়াক্তেই আদায় করেছেন এবং মাঝে কোন সুন্নত অথবা নফলের দু'রাকআতও আদায় করেননি। উম্মত এ কথায় একমত যে, ওকূফে আরাফার এ দিনে এ দু'টি নামায এভাবেই পড়তে হবে। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার নামাযও এ দিন মুযদালিফায় পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক সাথে পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এমনই করেছিলেন- যেমন সামনে গিয়ে জানা যাবে। ঐ দিন এ নামাযগুলোর সঠিক নিয়ম ও সঠিক সময় এটাই। এর একটি রহস্যপূর্ণ কারণ তো এই হতে পারে যে, ঐ দিনটির এ বৈশিষ্ট্য সবার সামনে যেন ফুটে উঠে যে, আজকের এ দিনে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নামাযের ওয়াক্তগুলোতেও এ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ এটাও হতে পারে যে, এ দিনের মূল ওযীফা ও কাজ হচ্ছে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ। তাই আল্লাহর বান্দারা যাতে একাগ্রচিত্তে এতে লিপ্ত থাকতে পারে এবং যুহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত; বরং ইশা পর্যন্ত যেন কোন নামাযের চিন্তাও করতে না হয়, এজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হুযুর (ﷺ) আরাফার দিনের এ খুতবায় যাকে নিজের ক্ষেত্র ও স্থান বিবেচনায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা ও ভাষণ বলা যায়- তিনি নিজের ওফাত ও বিচ্ছেদের সময় নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে শেষ কথাটি এই বলেছিলেন: "আমি তোমাদের জন্য হেদায়াত ও আলোর ঐ পরিপূর্ণ উপকরণ রেখে যাচ্ছি, যার পর তোমরা কখনও বিপথগামী হবে না- যদি তোমরা একে আঁকড়ে থাক এবং এর আলোতে পথ চল। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর পবিত্র কিতাব কুরআন মজীদ।" এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মৃত্যুশয্যার শেষ দিনগুলোতে যখন প্রচণ্ড রোগের কারণে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল, এ সময় ওসিয়ত হিসাবে তিনি যে কিছু লেখাতে চেয়েছিলেন এবং যার ব্যাপারে বলেছিলেন: "তোমরা এরপর বিপথগামী হবে না", তিনি এতে কি লেখাতে চেয়েছিলেন। বিদায় হজ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে থাকার ও এর অনুসরণ করার ওসিয়ত লিখাতে চেয়েছিলেন। তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণেও বলে দিয়েছিলেন যে, এ মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব কুরআন শরীফের। আর যেহেতু হযরত উমর রাযি. এ বাস্তব কথাটি জানতেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষেত্রমত কথা বলার সাহসও দান করেছিলেন, এজন্য তিনি এ ক্ষেত্রে এ অভিমত প্রকাশ করলেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর সারা জীবনের শিক্ষা দ্বারা আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে যে, এ মর্যাদা আল্লাহর কিতাবেরই। তাই এ কঠিন অবস্থায় ওসিয়ত লেখা ও লেখানোর বিষয়টির তেমন প্রয়োজনও ছিল না।

হজ্বের সবচেয়ে বড় কাজ ও রুকন হচ্ছে ওকূফে আরাফা। অর্থাৎ, ৯ই যিলহজ্ব দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর যুহর ও আসরের নামায একসাথে আদায় করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। এ হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, হুযুর (ﷺ) এ অবস্থানকে কত দীর্ঘ করেছিলেন। যুহর ও আসরের নামায তিনি যুহরের শুরু ওয়াক্তেই পড়ে নিয়েছিলেন এবং এ সময় থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি ওকূফ করেছিলেন। তারপর সোজা মুযদালিফায় রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং মাগরিব ও ইশার নামায সেখানে পৌঁছে এক সাথে আদায় করলেন। আর উপরে বলা হয়েছে যে, এটাই হচ্ছে এ দিনের জন্য আল্লাহর হুকুম।
মুযদালিফার এ রাতে হুযুর (ﷺ) ইশার নামায শেষ করে ফজর পর্যন্ত আরাম করলেন এবং এ রাতে তাহাজ্জুদের নামায দু'রাকআতও পড়লেন না। (অথচ তাহাজ্জুদের নামায তিনি সফরের অবস্থাতেও বাদ দিতেন না।) এর কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, ৯ই যিলহজ্বের সারাটি দিন তিনি খুবই কর্মব্যস্ত ছিলেন। সকালে মিনা থেকে রওয়ানা হয়ে আরাফায় পৌঁছলেন এবং সেখানে প্রথম ভাষণ দিলেন। তারপর যুহর ও আসরের নামায পড়লেন এবং এরপর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একাধারে ওকূফ করলেন। তারপর এ সময়েই আরাফা থেকে মুযদালিফার পথ অতিক্রম করলেন। মনে হয়, তিনি যেন ফজর থেকে নিয়ে ইশা পর্যন্ত একাধারে বিভিন্ন কর্মব্যস্ততা ও পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তা'ছাড়া পরের দিন অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্বও তাঁকে এমন কর্মব্যস্ত দিন কাটাতে হবে। অর্থাৎ, সকালে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে মিনা পৌঁছা, সেখানে গিয়ে প্রথমে শয়তানকে পাথর মারা, তারপর একটি-দু'টি অথবা দশ-বিশটি নয়; বরং ষাটের অধিক উট নিজ হাতে কুরবানী করা, তারপর তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মিনা থেকে মক্কা যাওয়া এবং সেখান থেকে আবার মিনায় ফিরে আসা। তাই দেখা গেল যে, যেহেতু ৯ই ও ১০ই যিলহজ্বের এ দু'টি দিন খুবই কর্মব্যস্ততার ও পরিশ্রমের দিন ছিল, এজন্য এ দু'দিনের মাঝের রাতটিতে (অর্থাৎ, মুযদালিফার রাতে) পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ করা জরুরী ছিল। দেহ ও দৈহিক শক্তিগুলোরও কিছু দাবী ও হক থাকে এবং এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা এ ধরনের সমাবেশগুলোতে বেশী জরুরী হয়- যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামের সহজীকরণের নীতি এবং বিশেষ অবস্থায় রেয়ায়াতের রীতিটি বুঝে নিতে পারে।
এ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ হাতে তেষট্টিটি উট কুরবানী করে ছিলেন। এগুলো খুব সম্ভব ঐ তেষট্টিটিই, যেগুলো তিনি মদীনা শরীফ থেকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। বাকী সাঁইত্রিশটি যা হযরত আলী ইয়ামান থেকে এনেছিলেন, এগুলো তিনি তার হাতেই কুরবানী করালেন। তেষট্টি সংখ্যাটির হেকমত একেবারে স্পষ্ট যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তেষট্টি বছর ছিল। তাই তিনি যেন জীবনের প্রতিটি বছরের শুকরিয়া হিসাবে একটি করে উট কুরবানী করলেন।

হুযুর (ﷺ) ও আলী রাযি. নিজের কুরবানীর উটের গোশত রান্না করে খেয়েছেন এবং শুরবাও পান করেছেন। এর দ্বারা সবার একথা জানা হয়ে গেল যে, কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর গোশত নিজেও খেতে পারে এবং নিজের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াতে পারে।

১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর কাজ শেষ করে হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মক্কা শরীফ তশরীফ নিয়ে গেলেন। সুন্নত নিয়ম ও উত্তম এটাই যে, তওয়াফে যিয়ারত কুরবানী থেকে অবসর হয়ে ১০ই যিলহজ্বেই করে নেওয়া হবে- যদিও বিলম্বেরও অবকাশ রয়েছে।

যমযমের পানি উঠিয়ে হাজীদেরকে পান করানো-এ খেদমত ও সৌভাগ্যের কাজটি প্রাচীনকাল থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর খান্দান বনী আব্দুল মুত্তালিবের ভাগে ছিল। হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারত শেষ করে যমযমের কাছে আসলেন। সে সময় তাঁর খান্দানের লোকেরা বালতি দিয়ে পানি উঠিয়ে উঠিয়ে লোকদেরকে পান করাচ্ছিল। তাঁর মনেও এ কাজে অংশ গ্রহণ করার বাসনা জাগ্রত হল। কিন্তু তিনি একেবারে সঠিক চিন্তা করলেন যে, আমি যদি এমন করি, তাহলে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে গিয়ে সকল সাথীরাই এ সৌভাগ্যে অংশ গ্রহণ করতে চাইবে। এর ফলে বনী আব্দুল মুত্তালিব তাদের দীর্ঘকালের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এজন্য তিনি নিজের বংশের লোকদের মন রক্ষা করার জন্য এবং তাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য অন্তরের আকাঙ্ক্ষা তো প্রকাশ করলেন, কিন্তু সাথে সাথে ঐ পরিণামদর্শিতার কথাটিও বলে দিলেন, যার কারণে তিনি নিজের এ আন্তরিক বাসনা বিসর্জন দিয়েছিলেন।

শুরুতে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসটি বিদায় হজ্বের বর্ণনায় সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবিস্তার বর্ণনা সমৃদ্ধ হাদীস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেক ঘটনার উল্লেখ এতে বাদ পড়ে গিয়েছে। এমনকি মাথা মুড়ানো এবং দশ তারিখের খুতবার উল্লেখও এতে আসেনি, যা অন্যান্য হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে।

হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসের কোন কোন রাবী এ হাদীসেই এ অতিরিক্ত বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ ঘোষণাও করেছিলেন:

" نَحَرْتُ هَا هُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ فَانْحَرُوا فِي رِحَالِكُمْ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَجَمْعٌ كُلُّهَا مَوْقِفٌ "

অর্থাৎ, আমি কুরবানী এখানে করেছি; কিন্তু মিনার সমস্ত এলাকাই কুরবানীস্থল। তাই তোমরা নিজ নিজ জায়গায় কুরবানী করতে পার। আমি আরাফায় এখানে (বড় বড় পাথরের প্রান্তরে) ওকূফ করেছি; কিন্তু সমস্ত আরাফার ময়দানই ওকূফস্থল। (তাই এর যে কোন অংশেই ওকূফ করা যায়।) আমি মুযদালিফায় এখানে (মাশ'আরুল হারামের নিকটে) অবস্থান করেছি; কিন্তু সারা মুযদালিফাই ওকূফ তথা অবস্থানস্থল। (এর যে কোন অংশেই অবস্থান করা যায়।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)