আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৪৬- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়

হাদীস নং: ২৭৮৫
আন্তর্জাতিক নং: ২৯৯৩
- জিহাদের বিধানাবলী অধ্যায়
১৮৭৩. কোন উপত্যকায় অবতরণ করা কালে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) পড়া
২৭৮৫। মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ (রাহঃ) .... জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন কোন উঁচু স্থানে আরোহণ করতাম, তখন আল্লাহু আকবার বলতাম আর যখন কোন উপত্যকায় অবতরণ করতাম, তখন সুবহানাল্লাহ্ বলতাম।
كتاب الجهاد والسير
باب التَّسْبِيحِ إِذَا هَبَطَ وَادِيًا
2993 - حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ حُصَيْنِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ سَالِمِ بْنِ أَبِي الجَعْدِ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: «كُنَّا إِذَا صَعِدْنَا كَبَّرْنَا، وَإِذَا نَزَلْنَا سَبَّحْنَا»

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছ দ্বারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের আমল জানা যাচ্ছে যে, তাঁরা যখন টিলা বা অনুরূপ কোনও উচ্চস্থানে আরোহণ করতেন, তখন তাকবীর বলতেন। অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলতেন। আর যখন নিচে নামতেন, তখন তাসবীহ পড়তেন। অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ বলতেন।

উচ্চস্থানে আরোহণের সঙ্গে اللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহু আকবার) বলাটা খুবই সংগতিপূর্ণ। দৃশ্যমান উচ্চতা মুমিনকে অদৃশ্য উচ্চতা তথা আল্লাহ তা'আলার গৌরব-গরিমা স্মরণ করিয়ে দেবে বৈ কি। মুমিন ব্যক্তি যখনই কোনও উচ্চস্থানে আরোহণ করে, তার মনে পড়ে যায় মহান আল্লাহ সকল উচ্চতার উচ্চে। তিনি সকল বড়র বড়। এভাবে মুমিন ব্যক্তির অন্তর জাহিরী উচ্চতা থেকে বাতেনী উচ্চতায় আরোহণ করে। তার হৃদয় প্রকাশ্য বড়ত্ব থেকে গুপ্ত বড়ত্বে হারিয়ে যায়। তখন অবচেতনমনে সে ধ্বনি দিয়ে ওঠে 'আল্লাহু আকবার'।

তাছাড়া অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকেও এ অবস্থায় আল্লাহু আকবার বলাটা খুবই সমীচীন। এটা রূহানী রোগের এলাজ। মানুষ যখন কোনও উচ্চতায় ওঠে, তখন অন্তরে ওত পেতে থাকা নফস তার উপর হামলা চালায়। তাকে অহমিকায় লিপ্ত করে দেয়। আমি এখন উপরে অবস্থান করছি, আমার স্থান অন্যদের তুলনায় উঁচুতে-এরকম একটা ভাব অন্তরে জন্মিয়ে দেয়। এর চিকিৎসা জরুরি। আল্লাহু আকবার যিকির করাটাই সে চিকিৎসা। এর দ্বারা যেন নিজেকে হুঁশিয়ার করা হয় যে, নিজ সম্পর্কে কীভাবে তুমি এমন উঁচু ধারণা করছ? তুমি আর কত বড়? তোমার রয়েছে হাজারও ত্রুটিবিচ্যুতি। মানুষ যত বড়ই হোক না কেন, সর্বাবস্থায় সে আল্লাহ তা'আলার এক মাখলুকই তো! আল্লাহ তা'আলা সকলের স্রষ্টা। তিনি সকল বড়র বড়। তাঁর সামনে নিজেকে বড় ভাবার স্পর্ধা তোমার কী করে হয়? আল্লাহর মহিমা ও গৌরবের সামনে নিজেকে এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৃষ্টিরূপে দেখতে শেখো। অন্তরে এই শিক্ষা ও এই চেতনা বদ্ধমূল করে দেওয়ার জন্য উচ্চস্থানে উঠতে 'আল্লাহু আকবার'-এর যিকির অতি উত্তম এক ব্যবস্থা।

উচ্চস্থানে ওঠা বলতে পাহাড় ও টিলায় ওঠা, সিঁড়ি ও লিফট দিয়ে উপরে ওঠা, উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ইত্যাদি সবকিছুই বোঝায়। এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই 'আল্লাহু আকবার'-এর যিকির প্রযোজ্য।

নিচে নামার সময় বলতে হয় سُبْحَانَ الله (সুবহানাল্লাহ)। উচ্চতা উত্তম। সে তুলনায় নিম্নতা অধম উচ্চতা উন্নতি। নিম্নতা অবনতি। একজন মুমিন বান্দা যখন নিচে নামে, তখন তার দৃষ্টি বাহ্যিক নিম্নগামিতা থেকে অদৃশ্য নিম্নগামিতার দিকে চলে যায়। ফলে নিজের ভেতর যা-কিছু নিম্নতা ও ক্ষুদ্রতা আছে, তা তার চোখে ভেসে ওঠে। তখন তার দৃষ্টিতে তার নিজ সত্তাকে হাজারও ত্রুটিবিচ্যুতির এক সমষ্টি বলে মনে হয়। এ অবস্থায় তার অন্তরে দেখা দেয় নিজেকে সংশোধন করার আকুলতা। সে নিজেকে সবরকম ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে মুক্ত করে আল্লাহ তা'আলার এক প্রিয় বান্দারূপে গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর জন্য দরকার সকল প্রকার দোষত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। সে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যই 'সুবহানাল্লাহ'-এর যিকির। এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা সকল প্রকার দোষত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র। আমি তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি। এ যিকিরের দ্বারা একদিকে যেমন আল্লাহ তা'আলার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়, তেমনি অন্যদিকে এটা তার অন্তরস্থ রোগ নিরাময়েরও কাজ করে। যত বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে এ যিকির করা যাবে, অন্তরের রোগ ও আখলাকী ব্যাধি নিরাময়ে এটা তত বেশি ভূমিকা রাখবে। কেননা আমল-আখলাকের ত্রুটি ও ব্যাধি বান্দার জন্য একরকম বিপদ। বরং বাহ্যিক বিপদ-আপদের চেয়েও কঠিন বিপদ। তাসবীহ পড়া তথা সুবহানাল্লাহ যিকির করার দ্বারা বাহ্যিক বালা-মসিবত থেকে রেহাই পাওয়া যায়, যেমনটা হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের ঘটনা থেকে আমরা ধারণা পাই। মাছের পেটে চলে যাওয়ার ঘোর বিপদকালে তিনি বলছিলেন-

لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحْنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ

'(হে আল্লাহ!) তুমি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। তুমি সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৭)

দুআ ইউনুস নামে প্রসিদ্ধ এই যে দুআর অসিলায় আল্লাহ তা'আলা হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে মুক্তি দিয়েছিলেন, এর মধ্যেও তাসবীহ অর্থাৎ সুবহানাকা (অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ)-এর যিকির রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি এ তাসবীহ পাঠ করবে, আশা করা যায় আল্লাহ তা'আলা এর অসিলায় তাকে জাহিরী ও বাতেনী, শারীরিক ও আত্মিক সর্বপ্রকার বালা-মসিবত থেকে মুক্তিদান করবেন।

যদিও তাসবীহ পাঠ সবসময়কারই আমল হতে পারে, তবে নিচে নামার সময়টা এর জন্য বিশেষ উপযুক্ত। কাজেই পাহাড় ও টিলা থেকে নিচে নামার বেলায় যেমন সুবহানাল্লাহ পড়া হবে, তেমনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামা ও উড়োজাহাজের নিচে নামাসহ যে-কোনও উচ্চতা হতে নিচে নামার বেলায় সুবহানাল্লাহ'র যিকির করা চাই।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আল্লাহ তা'আলার যিকির ও স্মরণ প্রত্যেকটি হালতের আমল।

খ. সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা ও উড়োজাহাজের উড্ডয়নসহ যে-কোনও রকমের আরোহণকালে আল্লাহু আকবার বলতে হয়।

গ. সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামা ও উড়োজাহাজের অবতরণসহ যে-কোনও রকমের অবতরণকালে সুবহানাল্লাহ বলতে হয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)