কিতাবুস সুনান- ইমাম ইবনে মাজা রহঃ

৫. নামাযের আদ্যোপান্ত বর্ণনা এবং সুন্নাতসমূহ

হাদীস নং: ৯০৬
আন্তর্জাতিক নং: ৯০৬
নামাযের আদ্যোপান্ত বর্ণনা এবং সুন্নাতসমূহ
নবী (ﷺ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ
১৯০৬। হুসায়ন ইবন বায়ান (রাহঃ) ……. আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করবে, তখন তোমরা তাঁর প্রতি উত্তমরূপে দরূদ পাঠ করবে। কেননা তোমাদের জানা নেই যে, সম্ভবতঃ তা তাঁর সামনে পেশ করা হয়। রাবী বলেনঃ তখন সাহাবীগণ তাঁকে বললোঃ আপনি আমাদের শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, তোমরা বলবেঃ

اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلاَتَكَ وَرَحْمَتَكَ وَبَرَكَاتِكَ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ وَإِمَامِ الْمُتَّقِينَ وَخَاتَمِ النَّبِيِّينَ مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ إِمَامِ الْخَيْرِ وَقَائِدِ الْخَيْرِ وَرَسُولِ الرَّحْمَةِ اللَّهُمَّ ابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا يَغْبِطُهُ بِهِ الأَوَّلُونَ وَالآخِرُونَ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

“হে আল্লাহ! আপনি আপনার প্রশান্তি আপনার রহমত ও বরকত আপনার বান্দা ও রাসূল, রাসূলকুল শিরোমণি, মুত্তাকীগণের ইমাম, সর্বশেষ নবী, কল্যাণ ও মঙ্গলের ইমাম, রহমতের রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি নাযিল করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে মাকামে মাহমুদে (জান্নাতের চরম প্রশংসিত স্থানে) পৌঁছে দিন, যার জন্য পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ আকাঙ্ক্ষা করে থাকেন। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর বংশধরদের উপর রহমত নাযিল করুন, যেরূপ আপনি রহমত নাযিল করেছেন ইবরাহীম (আ) ও তাঁর বংশধরদের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তাঁর বংশধরদের উপর বরকত দান করুন, যেরূপ আপনিই তো বরকত দান করেছেন ইবরাহীম (আ) ও তাঁর বংশধরদের প্রতি। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, গৌরবান্বিত।
أبواب إقامة الصلوات والسنة فيها
بَاب الصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ
حَدَّثَنَا الْحُسَيْنُ بْنُ بَيَانٍ، حَدَّثَنَا زِيَادُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا الْمَسْعُودِيُّ، عَنْ عَوْنِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ أَبِي فَاخِتَةَ، عَنِ الأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَأَحْسِنُوا الصَّلاَةَ عَلَيْهِ فَإِنَّكُمْ لاَ تَدْرُونَ لَعَلَّ ذَلِكَ يُعْرَضُ عَلَيْهِ ‏.‏ قَالَ فَقَالُوا لَهُ فَعَلِّمْنَا ‏.‏ قَالَ قُولُوا اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلاَتَكَ وَرَحْمَتَكَ وَبَرَكَاتِكَ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ وَإِمَامِ الْمُتَّقِينَ وَخَاتَمِ النَّبِيِّينَ مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ إِمَامِ الْخَيْرِ وَقَائِدِ الْخَيْرِ وَرَسُولِ الرَّحْمَةِ اللَّهُمَّ ابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا يَغْبِطُهُ بِهِ الأَوَّلُونَ وَالآخِرُونَ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ‏.‏

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এতদ্বারা জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আমাদের সালাত প্রেরণের তরীকা হচ্ছে আমরা তাঁর কাছে এ প্রার্থনা জানাবো যে, তিনি যেন তাঁর নবীর প্রতি সালাত ও বরকতরাশি অবতীর্ণ করেন। তা এ জন্যে যে, আমরা যেহেতু দীন ভিখারী রিক্তহস্ত, আমাদের আদৌ এ যোগ্যতা নেই যে, আমাদের পরম হিতৈষী এবং আল্লাহর সম্মানিত বরণীয় নবীর দরবারে কোন উপঢৌকন পেশ করতে পারি, এ জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারেই আমাদের আকূল ফরিয়াদ, তিনি নিজে যেন সালাত ও বরকত নাযিল করেন অর্থাৎ তাঁর প্রদত্ত দানে সম্মানে রহমতে সোহাগে বাৎসল্যে মকবুলিয়তের স্তর অধিক থেকে অধিকতর উন্নীত করে তাঁর খাস রহমতের দ্বারা ধন্য করেন। উপরন্তু তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতিও যেন তিনি অনুরূপ আচরণ করেন।


সালাতের প্রার্থনার সাথে সাথে বরকতের প্রার্থনার হিকমত বা রহস্য

'সালাত' সম্পর্কে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে এ অনেক ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। সম্মান করা, প্রশংসা করা, রহমত, স্নেহ-বাৎসল্য, মর্যাদার স্তরে উন্নীতকরণ মঙ্গল কামনা, কল্যাণ প্রদান, কল্যাণের দু'আ করা-এসব অর্থেই সালাত শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে 'বরকত' হওয়ার মানে হচ্ছে কারো জন্যে পূর্ণ আনুকূল্য, নিয়ামত এবং তার স্থায়িত্ব ও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি সাধিত হওয়ার সপক্ষে ফয়সালা হওয়া। মোটকথা, বরকত এমন কোন ভিন্ন বা স্বতন্ত্র কিছু নয়, যা সালাতের মধ্যে শামিল নেই। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলার দরবারে হুযুর ﷺ-এর জন্যে সালাত-এর দু'আ করার পর নতুন করে বরকত ও রহমতের দু'আ করার কোন প্রয়োজনীয়তা আর অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ করা কালে নানা শব্দ নানা ভঙ্গিতে বারবার তাঁর দরবারে প্রার্থনা ও কাকুতি-মিনতি করাটাই বাঞ্ছনীয় ও শোভনীয়। এতে বান্দার মালিকের প্রতি মুখাপেক্ষিতা, দীনতা ও ভিখারীপনার অভিব্যক্তি ঘটে থাকে। এ জন্যে দরূদ শরীফ পাঠকালেও রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর আল-আওলাদের জন্যে সালাত প্রার্থনার সাথে সাথে বরকতের প্রার্থনা জানানোই বিধেয়। অন্য কোন কোন রিওয়ায়াতে সালাত ও বরকতের সাথে সাথে তাঁদের জন্যে তারাহুম বা দয়া পরবশ হওয়ার প্রার্থনাও এসেছে-যা একটু পরেই বিবৃত হবে।

দরূদ শরীফে 'আল' শব্দের মর্ম

আরবী ভাষায় বিশেষত কুরআন শরীফের ভাষায় কোন ব্যক্তির আল বলা হয় তার সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকে-চাই তা রক্তের বা আত্মীয়তার বন্ধনের সম্পৃক্ততাই হোক, যেমন তার স্ত্রী পুত্র, চাই তার সাথে বন্ধুত্ব বা তার আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ হিসাবে সম্পৃক্ততাই হোক- যেমন তার বন্ধু-বান্ধব, পার্শ্বচর, ভক্ত-অনুরক্ত এবং মিশনের অনুসারীবৃন্দ।১ এ জন্যে ভাষাগত দিক থেকে ওখানে 'আল' শব্দের দুটি অর্থ হতে পারে, কিন্তু আবু হুমায়দ সায়েদীর যবানীতে বর্ণিত হাদীসে দরূদ শরীফের যে শব্দমালা আছে, তার দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে 'আল' শব্দের দ্বারা ঘরের লোকজন বা অর্থাৎ নবী করীম (স) এর সহধর্মিণীগণ তাঁর পরিবার-পরিজনই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নবী করীম (স)-এর মহধর্মিণীগণ তাঁর আল-আওলাদ এবং তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্তগণ যাঁরা তাঁর জীবন ধারনার সাথে জড়িত হয়ে ধন্য হয়েছেন (মর্যাদার দিক থেকে বড় হয়ে ও অনেকের জীবনে এ সৌভাগ্য ঘটেনি) অনুরূপভাবে এটাও তাঁদের একটি বিশেষ ও অনন্য মর্যাদা যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মতো তাঁদের প্রতিও দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা হয়ে থাকে। আর এজন্যে এটাও কোন জরুরী ব্যাপার নয় যে, উম্মুল মু'মিনীন তথা নবী সহধর্মিণীগণ যাঁরা নিঃসন্দেহে 'আল' গন্ডীভুক্ত ছিলেন- তাঁরাই উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী বলে বিবেচিত হবেন (তাঁদের উপরে কেউ হতে পারেন না) আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম হওয়ার মাপকাঠি হচ্ছে ঈমান এবং ঈমানওয়ালা সৎকর্মাদি এবং ঈমানী উচ্চমানের অবস্থাদি-যাকে এক কথায় تقوى (তাকওয়া) বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
{ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ} [الحجرات: 13]
- "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে তারাই-যারা তাকওয়া-পরহেজগারীতে সর্বাগ্রগামী।"
এর উপমা ঠিক এরূপ, যেমন আমাদের এ প্রাত্যহিক জগতে যখন কোন প্রিয়জন বা অন্তরঙ্গ ব্যক্তি কোন বুযুর্গের জন্যে কোন হাদিয়া-তোহফা প্রেরণ করে, তখন তার উদ্দিষ্ট থাকে, ঐ বুযুর্গ এবং তাঁর সাথে সম্পৃক্ত ঘনিষ্ঠ জনরা এবং তাঁর পরিবার-পরিজনও তা' ব্যবহার করে আনন্দ পাবেন। এটাই উঢৌকনদাতা এবং তার ঘনিষ্ঠ প্রিয় জনদের স্বাভাবিক কামনা হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি দরূদ শরীফও একটি তোহফা ও সওগাত স্বরূপ, যা উক্ত জনেরা নবী করীম ﷺ-এর খিদমতে পাঠিয়ে থাকেন। রাসূলে পাক ﷺ-এর সাথে সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিবার-পরিজনকে এতে শামিল করে নেওয়াটা হচ্ছে তাঁকে প্রাণ ভরে ভালবাসারই নিদর্শন। এবং এতে রাসূলে করীম ﷺ-এর আনন্দিত হওয়াটাও অত্যন্ত স্বাভাবিক। এ জন্যে এসব ব্যাপারে কে অগ্রগণ্য কে পরে গণ্য, এসব কালাম শাস্ত্রীয় বিতর্ক উত্থাপন করা মোটেই সুরুচির পরিচায়ক নয়। সে যাই হোক, এ অধম লেখকের মতে, এ ব্যাপারে অগ্রগণ্য অভিমত হচ্ছে, দরূদ শরীফে 'আলে-মুহম্মদ' বলতে, নবী করীম ﷺ-এর পরিবার-পরিজন-তাঁর সহধর্মিণীগণ তাঁর সন্তান সন্ততিরাই বুঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে আলে ইবরাহীম বলতে ইবরাহীম (আ)-এর পরিবার-পরিজনকেই বুঝানো হয়েছে। কুরআন শরীফে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহধর্মিণীকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছেঃ
{رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ } [هود: 73]
- নিঃসন্দেহে উক্ত আয়াতে বর্ণিত 'আহলে বায়ত' হচ্ছেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আহলে বায়ত তথা পরিবার-পরিজন।

দরূদ শরীফে ব্যবহৃত উপমাটির তাৎপর্য ও ধরন

দরূদ শরীফে আল্লাহ তা'আলার নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর 'আল'-এর প্রতি সালাত ও বরকত নাযিলের দরখাস্ত করতে গিয়ে আরয করা হয়েছে, এমনি সালাত ও বরকত তুমি তাঁদের প্রতি নাযিল কর, যেমনটি ইতিপূর্বে তুমি ইবরাহীম (আ) ও তাঁর 'আল'-এর প্রতি করেছিলে।

এ উপমা সম্পর্কে একটি মশহুর ইলমী আপত্তি উত্থাপন করা হয়ে থাকে এই যে, উপমায় সাধারণত উপমা উপমেয় এর তুলনায় শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে উপমেয় তার তুলনায় কম মর্যাদা সম্পন্ন হয়ে থাকে। যেমন ঠাণ্ডা পানিকে বরফের সাথে উপমা দিয়ে বলা হয়ে থাকে- এ ঠাণ্ডা পানিটুকু বরফের মত ঠাণ্ডা। এতে শৈত্যগুণ যে বরফেই বেশি, তা স্বীকৃত। কেননা, পানি যতই ঠাণ্ডা হোক না কেন, বরফ থেকে তা পানিতে কিছু না কিছু কমই থাকবে। বরফের শৈত্য তার চাইতে অধিক। উক্ত নিয়মানুযায়ী ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর আলের শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিপন্ন হয়। কেননা দরূদ শরীফে মুহম্মদ ﷺ এবং তাঁর 'আলের' প্রতি ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর 'আল'-এর অনুরূপ সালাত ও রহমত-বরকত বর্ষণের দু'আ করা হয়েছে।

হাদীসের ভাষ্যকারগণ নানাভাবে এর জবাব দিয়েছেন- যা 'ফতহুল বারী' প্রভৃতি কিতাবে দেখে নেয়া যেতে পারে। এ অধম লেখকের মতে এর সর্বাগ্রগণ্য সন্তোষজনক জবাব হচ্ছে-উপমা অনেক সময় কেবল একটি নির্দিষ্ট ধরন বুঝাবার উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কোন ব্যক্তি এক সুনির্দিষ্ট ধরনের কাপড়ের একটি টুকরো নিয়ে কাপড়ের বড় কোন দোকানে যায় যে, আমার এরূপ কাপড় চাই। অথচ সে যে কাপড়টি চায়, তার হাতে রক্ষিত পুরনো জীর্ণশীর্ণ বিবর্ণ কাপড় খণ্ডের তুলনায় তা উৎকৃষ্টই হয়ে থাকে। এ জাতীয় দোকানে রক্ষিত কাপড়টি নিশ্চয়ই নতুন এবং এর চাইতে মুল্যবান ও চকচকে। নিঃসন্দেহে এ হিসাবে তার বাঞ্ছিত উপমেয় কাপড়টি অধিকতর মূল্যবান। দরূদ শরীফে ব্যবহৃত উপমাটি ঠিক এ ধরনেরই। তার অর্থ এই যে, যে জাতীয় বা যে ধরনের সালাত ও বরকতরাশি ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর 'আল'-এর প্রতি বর্ষণ করে তাঁদেরকে ধন্য করা হয়েছিল, ঠিক সে ধরনের সালাত ও বরকতরাশি মুহম্মদ ﷺ এবং তাঁর 'আল' (পরিজনের) প্রতি বর্ষণ করে তাঁদেরকেও ধন্য কর! হযরত ইবরাহীম (আ) কয়েক দিক দিয়ে সকল নবী-রাসূল বরং গোটা বিশ্বচরাচরের মধ্যে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী
* আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাঁর আপন অন্তরঙ্গ-খলীল বানিয়েছেন:
وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيْلاً
* আল্লাহ তা'আলা তাঁকে 'ইমামতে কুবরা' দানে ধন্য করেছিলেন:
إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا
* তিনি তাঁকে বায়তুল্লাহ্ শরীফের নির্মাতা বানিয়েছেন
* তাঁর পরবর্তী আমলে কিয়ামত পর্যন্ত নবুওয়াতকে তাঁরই পরিবারে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। বাইরের অন্য কেউই আর নবী হননি।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পূর্বে হযরত ইবরাহীম (আ) ছাড়া আর কারো প্রতি আল্লাহ্ এত দান ও করুণা বর্ষিত হয়নি এবং মহবুবিয়ত ও মকবুলিয়তের এত উচ্চ আসনে আর কেউই আসীন হননি। তাই দরূদ শরীফে আল্লাহ তা'আলার দরবারে এ দু'আই করা হয়ে থাকে যে, এ জাতীয় দানসমূহের দ্বারা আপনি আপনার হাবীব মুহম্মদ (স) এবং তাঁর 'আল'-কেও ধন্য করুন!

মোদ্দা কথা, এ উপমা হচ্ছে একান্তই ধরন-ধারণ নির্ধারক, যাতে অনেক সময় উপমার চাইতে উপমেয়ই উত্তম হয়ে যায়। উপরে বর্ণিত কাপড়ের উপমাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

দরূদ শরীফের আদ্যান্ত 'আল্লাহুম্মা' ও 'ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ' প্রসঙ্গে

দরূদ শরীফের সূচনা করা হয়েছে 'আল্লাহুম্মা' শব্দটি দিয়ে আর তার সমাপ্তি টানা হয়েছে إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ বলে আল্লাহর দু'টি বরকতপূর্ণ নাম 'হামীদ' এবং মাজীদ দিয়ে। কোন কোন উঁচু স্তরের বুযুর্গ থেকে উদ্ধৃত করা হয়ে থাকে যে, (اَللّٰهُمَّ) শব্দটি আল্লাহ তা'আলার সকল আসমাউল হুসনা (গুণবাচক বিশেষ্য) এর প্রতিনিধিত্বকারী আর এর মাধ্যমে দু'আ করা মানেই হচ্ছে তাঁর সমস্ত গুণবাচক নাম (৯৯) এর মাধ্যমে দু'আ করা। শায়খ ইবনুল কাইয়েম (جلاء الأفهام) 'জালাউল আফহাম' গ্রন্থে এ সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছ-পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন- যা পণ্ডিত শ্রেণীর লোকদের দেখবার মতো। তিনি তাতে বলেছেন যে, এ অর্থটা সৃষ্টি হয়েছে اَللّٰهُمَّ শব্দটির তাব্দীদযুক্ত 'মীম' অক্ষর থেকে। তারপর তিনি ভাষা বিজ্ঞানের যুক্তি প্রমাণ দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারপর তাঁর সে দাবীর পক্ষে পূর্ববর্তী যুগের কতিপয় বুযুর্গের অভিমত উদ্ধৃত রয়েছেন।২ আর হামীদ ও মাজীদ আল্লাহ তা'আলার দু'টি অতীব বরকতপূর্ণ নাম। তাঁর তাবৎ জালালী ও জামালী গুণের প্রতিফলন ঘটেছে এতে। হামীদ হচ্ছেন সেই পবিত্র সত্তা যাঁর মধ্যে এমন সব গুণাবলী ও কৃতিত্বের সমাবেশ ঘটেছে যে, সকলের স্তব-স্তুতি স্বগুণে-স্বমহিমায় তাঁরই পাওনা।

আর মাজীদ হচ্ছেন সেই পবিত্র সত্তা, যাঁর মধ্যে প্রতাপ-প্রতিপত্তি মাহাত্ম্যপূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান। এ হিসাবে إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, হে আল্লাহ! তুমি সমস্ত জালালী ও জামালী গুণাবলীর আধার। এজন্যে সাইয়িদিনা মুহাম্মদ এবং আলে-মুহাম্মদ-এর উপর সালাত ও বরকত প্রেরণের প্রার্থনা তোমারই দরবারে জানাচ্ছি। কুরআন মজীদে হযরত ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি রহমত বর্ষণের কথা যেখানেই উল্লেখিত হয়েছে, সেখানেই আল্লাহর এ দু'টি নামের ঐ বৈশিষ্ট্য ও অনন্যতার জন্যে এগুলোকেই বিলকুল এরূপই বাক্যের উপসংহার রূপে ব্যবহার করা হয়েছে।
{رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ } [هود: 73]
মোদ্দাকথা اَللّٰهُمَّ দিয়ে দরূদ শরীফের সূচনা এবং إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ দিয়ে এর সমাপ্তি টানা বেশ অর্থপূর্ণ। এ দু'টি কালিমার এই তাৎপর্যপূর্ণ আবহ দরূদ শরীফের আবেদনকে অনেক তীব্র করে তুলেছে:
اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ اَللّٰهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ


১. ইমাম রাগিব ইস্পাহানী তাঁর বিখ্যাত 'মুফরদাতুল কুরআনে' 'আল' শব্দ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে বলেছেন:
ويستعمل فيمن يختص بالإنسان اختصاصا ذاتيا إما بقرابة قريبة أو بموالاة قال عز وجل (وال ابراهيم وال عمران) وقال أدخلوا آل فرعون أشد العذاب
মানুষের সঙ্গে বিশেষভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অথবা নিকটতম নৈকট্যসূত্রে অথবা বন্ধুত্ব সূত্রে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে । শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন : اٰل إبْرَاهِيمَ اٰل عمران (ইবরাহীমের বংশধর, ইমরানের পরিবার) তিনি আরো বলেন, أَدْخِلُوا اٰلَ فَرْعَونَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ফিরাউনের বংশধরকে কঠোরতম আযাবে নিক্ষেপ করো- (আলমুফরাদাত, পৃষ্ঠা-২০)
২. প্রায় দশ পৃষ্ঠাব্যাপী আলোচনার পর তিনি লিখেছেন:
وهذا القول الذي اخترناه قد جاء عن غير واحد من السلف قال الحسن البصري اللهم مجمع الدعاء وقال أبو رجاء العطاردي أن الميم في قوله اللهم فيها تسعة وتسعون اسما من أسماء الله تعالى وقال النضر شميل من قال اللهم فقد دعا الله لجميع أسمائه-جلاء الأفهام
আমরা যে বক্তব্যটা গ্রহণ করেছি, তা একাধিক অতীত মণীষী থেকে বর্ণিত হয়েছে। হযরত হাসান বছরী বলেন, আল্লাহুম্মা হচ্ছে সমস্ত দু'আর সমষ্টি। আবু রাজা আল-আতারিদী বলেন, আল্লাহুম্মা'র মীম-এর মধ্যেই আল্লাহ তা'আলার ৯৯ নাম নিহিত রয়েছে। নযর ইবনে শামীল বলেন- যে ব্যক্তি আল্লাহুম্মা বলে, সে যেন আল্লাহর সমস্ত নামেই তাঁকে ডাকলো। -জিলাউল আফহাম, পৃষ্ঠা-৯৪
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)