কিতাবুস সুনান- ইমাম ইবনে মাজা রহঃ

৫. নামাযের আদ্যোপান্ত বর্ণনা এবং সুন্নাতসমূহ

হাদীস নং: ৯০৩
আন্তর্জাতিক নং: ৯০৩
নামাযের আদ্যোপান্ত বর্ণনা এবং সুন্নাতসমূহ
নবী (ﷺ)-এর প্রতি দরূদ পাঠ
৯০৩। আবু বকর ইবন আবু শায়বা ও মুহাম্মাদ ইবন মুসান্না (রাহঃ)... আবু সা'য়ীদ খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই হলো আপনার প্রতি সালাম, যা আমরা জানতে পেরেছি। তবে দরূদ কিরূপে পড়তে হবে? তিনি বললেন, তোমরা বলবেঃ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ “হে আল্লাহ! আপনি আপনার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি রহমত নাযিল করেছেন ইবরাহীম (আ)-এর উপর। আর আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তাঁর বংশধরদের উপর বরকত দান করুন, যেরূপ আপনি বরকত দিয়েছেন ইবরাহীম (আ)-এর উপর।”
أبواب إقامة الصلوات والسنة فيها
بَاب الصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ مَخْلَدٍ، ح وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا أَبُو عَامِرٍ، قَالَ أَنْبَأَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ الْهَادِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ خَبَّابٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذَا السَّلاَمُ عَلَيْكَ قَدْ عَرَفْنَاهُ فَكَيْفَ الصَّلاَةُ قَالَ ‏ "‏ قُولُوا اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ ‏"‏ ‏.‏

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এতদ্বারা জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আমাদের সালাত প্রেরণের তরীকা হচ্ছে আমরা তাঁর কাছে এ প্রার্থনা জানাবো যে, তিনি যেন তাঁর নবীর প্রতি সালাত ও বরকতরাশি অবতীর্ণ করেন। তা এ জন্যে যে, আমরা যেহেতু দীন ভিখারী রিক্তহস্ত, আমাদের আদৌ এ যোগ্যতা নেই যে, আমাদের পরম হিতৈষী এবং আল্লাহর সম্মানিত বরণীয় নবীর দরবারে কোন উপঢৌকন পেশ করতে পারি, এ জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারেই আমাদের আকূল ফরিয়াদ, তিনি নিজে যেন সালাত ও বরকত নাযিল করেন অর্থাৎ তাঁর প্রদত্ত দানে সম্মানে রহমতে সোহাগে বাৎসল্যে মকবুলিয়তের স্তর অধিক থেকে অধিকতর উন্নীত করে তাঁর খাস রহমতের দ্বারা ধন্য করেন। উপরন্তু তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতিও যেন তিনি অনুরূপ আচরণ করেন।

দরূদ শরীফে 'আল' শব্দের মর্ম

আরবী ভাষায় বিশেষত কুরআন শরীফের ভাষায় কোন ব্যক্তির আল বলা হয় তার সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকে-চাই তা রক্তের বা আত্মীয়তার বন্ধনের সম্পৃক্ততাই হোক, যেমন তার স্ত্রী পুত্র, চাই তার সাথে বন্ধুত্ব বা তার আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ হিসাবে সম্পৃক্ততাই হোক- যেমন তার বন্ধু-বান্ধব, পার্শ্বচর, ভক্ত-অনুরক্ত এবং মিশনের অনুসারীবৃন্দ।১ এ জন্যে ভাষাগত দিক থেকে ওখানে 'আল' শব্দের দুটি অর্থ হতে পারে, কিন্তু আবু হুমায়দ সায়েদীর যবানীতে বর্ণিত হাদীসে দরূদ শরীফের যে শব্দমালা আছে, তার দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে 'আল' শব্দের দ্বারা ঘরের লোকজন বা অর্থাৎ নবী করীম (স) এর সহধর্মিণীগণ তাঁর পরিবার-পরিজনই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নবী করীম (স)-এর মহধর্মিণীগণ তাঁর আল-আওলাদ এবং তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্তগণ যাঁরা তাঁর জীবন ধারনার সাথে জড়িত হয়ে ধন্য হয়েছেন (মর্যাদার দিক থেকে বড় হয়ে ও অনেকের জীবনে এ সৌভাগ্য ঘটেনি) অনুরূপভাবে এটাও তাঁদের একটি বিশেষ ও অনন্য মর্যাদা যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মতো তাঁদের প্রতিও দরূদ ও সালাম প্রেরণ করা হয়ে থাকে। আর এজন্যে এটাও কোন জরুরী ব্যাপার নয় যে, উম্মুল মু'মিনীন তথা নবী সহধর্মিণীগণ যাঁরা নিঃসন্দেহে 'আল' গন্ডীভুক্ত ছিলেন- তাঁরাই উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী বলে বিবেচিত হবেন (তাঁদের উপরে কেউ হতে পারেন না) আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম হওয়ার মাপকাঠি হচ্ছে ঈমান এবং ঈমানওয়ালা সৎকর্মাদি এবং ঈমানী উচ্চমানের অবস্থাদি-যাকে এক কথায় تقوى (তাকওয়া) বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
{ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ} [الحجرات: 13]
- "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে তারাই-যারা তাকওয়া-পরহেজগারীতে সর্বাগ্রগামী।"
এর উপমা ঠিক এরূপ, যেমন আমাদের এ প্রাত্যহিক জগতে যখন কোন প্রিয়জন বা অন্তরঙ্গ ব্যক্তি কোন বুযুর্গের জন্যে কোন হাদিয়া-তোহফা প্রেরণ করে, তখন তার উদ্দিষ্ট থাকে, ঐ বুযুর্গ এবং তাঁর সাথে সম্পৃক্ত ঘনিষ্ঠ জনরা এবং তাঁর পরিবার-পরিজনও তা' ব্যবহার করে আনন্দ পাবেন। এটাই উঢৌকনদাতা এবং তার ঘনিষ্ঠ প্রিয় জনদের স্বাভাবিক কামনা হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি দরূদ শরীফও একটি তোহফা ও সওগাত স্বরূপ, যা উক্ত জনেরা নবী করীম ﷺ-এর খিদমতে পাঠিয়ে থাকেন। রাসূলে পাক ﷺ-এর সাথে সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিবার-পরিজনকে এতে শামিল করে নেওয়াটা হচ্ছে তাঁকে প্রাণ ভরে ভালবাসারই নিদর্শন। এবং এতে রাসূলে করীম ﷺ-এর আনন্দিত হওয়াটাও অত্যন্ত স্বাভাবিক। এ জন্যে এসব ব্যাপারে কে অগ্রগণ্য কে পরে গণ্য, এসব কালাম শাস্ত্রীয় বিতর্ক উত্থাপন করা মোটেই সুরুচির পরিচায়ক নয়। সে যাই হোক, এ অধম লেখকের মতে, এ ব্যাপারে অগ্রগণ্য অভিমত হচ্ছে, দরূদ শরীফে 'আলে-মুহম্মদ' বলতে, নবী করীম ﷺ-এর পরিবার-পরিজন-তাঁর সহধর্মিণীগণ তাঁর সন্তান সন্ততিরাই বুঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে আলে ইবরাহীম বলতে ইবরাহীম (আ)-এর পরিবার-পরিজনকেই বুঝানো হয়েছে। কুরআন শরীফে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহধর্মিণীকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছেঃ
{رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ } [هود: 73]
- নিঃসন্দেহে উক্ত আয়াতে বর্ণিত 'আহলে বায়ত' হচ্ছেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আহলে বায়ত তথা পরিবার-পরিজন।

দরূদ শরীফে ব্যবহৃত উপমাটির তাৎপর্য ও ধরন

দরূদ শরীফে আল্লাহ তা'আলার নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর 'আল'-এর প্রতি সালাত ও বরকত নাযিলের দরখাস্ত করতে গিয়ে আরয করা হয়েছে, এমনি সালাত ও বরকত তুমি তাঁদের প্রতি নাযিল কর, যেমনটি ইতিপূর্বে তুমি ইবরাহীম (আ) ও তাঁর 'আল'-এর প্রতি করেছিলে।

এ উপমা সম্পর্কে একটি মশহুর ইলমী আপত্তি উত্থাপন করা হয়ে থাকে এই যে, উপমায় সাধারণত উপমা উপমেয় এর তুলনায় শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে উপমেয় তার তুলনায় কম মর্যাদা সম্পন্ন হয়ে থাকে। যেমন ঠাণ্ডা পানিকে বরফের সাথে উপমা দিয়ে বলা হয়ে থাকে- এ ঠাণ্ডা পানিটুকু বরফের মত ঠাণ্ডা। এতে শৈত্যগুণ যে বরফেই বেশি, তা স্বীকৃত। কেননা, পানি যতই ঠাণ্ডা হোক না কেন, বরফ থেকে তা পানিতে কিছু না কিছু কমই থাকবে। বরফের শৈত্য তার চাইতে অধিক। উক্ত নিয়মানুযায়ী ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর আলের শ্রেষ্ঠত্বই প্রতিপন্ন হয়। কেননা দরূদ শরীফে মুহম্মদ ﷺ এবং তাঁর 'আলের' প্রতি ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর 'আল'-এর অনুরূপ সালাত ও রহমত-বরকত বর্ষণের দু'আ করা হয়েছে।

হাদীসের ভাষ্যকারগণ নানাভাবে এর জবাব দিয়েছেন- যা 'ফতহুল বারী' প্রভৃতি কিতাবে দেখে নেয়া যেতে পারে। এ অধম লেখকের মতে এর সর্বাগ্রগণ্য সন্তোষজনক জবাব হচ্ছে-উপমা অনেক সময় কেবল একটি নির্দিষ্ট ধরন বুঝাবার উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কোন ব্যক্তি এক সুনির্দিষ্ট ধরনের কাপড়ের একটি টুকরো নিয়ে কাপড়ের বড় কোন দোকানে যায় যে, আমার এরূপ কাপড় চাই। অথচ সে যে কাপড়টি চায়, তার হাতে রক্ষিত পুরনো জীর্ণশীর্ণ বিবর্ণ কাপড় খণ্ডের তুলনায় তা উৎকৃষ্টই হয়ে থাকে। এ জাতীয় দোকানে রক্ষিত কাপড়টি নিশ্চয়ই নতুন এবং এর চাইতে মুল্যবান ও চকচকে। নিঃসন্দেহে এ হিসাবে তার বাঞ্ছিত উপমেয় কাপড়টি অধিকতর মূল্যবান। দরূদ শরীফে ব্যবহৃত উপমাটি ঠিক এ ধরনেরই। তার অর্থ এই যে, যে জাতীয় বা যে ধরনের সালাত ও বরকতরাশি ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর 'আল'-এর প্রতি বর্ষণ করে তাঁদেরকে ধন্য করা হয়েছিল, ঠিক সে ধরনের সালাত ও বরকতরাশি মুহম্মদ ﷺ এবং তাঁর 'আল' (পরিজনের) প্রতি বর্ষণ করে তাঁদেরকেও ধন্য কর! হযরত ইবরাহীম (আ) কয়েক দিক দিয়ে সকল নবী-রাসূল বরং গোটা বিশ্বচরাচরের মধ্যে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী
* আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তাঁর আপন অন্তরঙ্গ-খলীল বানিয়েছেন:
وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيْلاً
* আল্লাহ তা'আলা তাঁকে 'ইমামতে কুবরা' দানে ধন্য করেছিলেন:
إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا
* তিনি তাঁকে বায়তুল্লাহ্ শরীফের নির্মাতা বানিয়েছেন
* তাঁর পরবর্তী আমলে কিয়ামত পর্যন্ত নবুওয়াতকে তাঁরই পরিবারে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। বাইরের অন্য কেউই আর নবী হননি।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পূর্বে হযরত ইবরাহীম (আ) ছাড়া আর কারো প্রতি আল্লাহ্ এত দান ও করুণা বর্ষিত হয়নি এবং মহবুবিয়ত ও মকবুলিয়তের এত উচ্চ আসনে আর কেউই আসীন হননি। তাই দরূদ শরীফে আল্লাহ তা'আলার দরবারে এ দু'আই করা হয়ে থাকে যে, এ জাতীয় দানসমূহের দ্বারা আপনি আপনার হাবীব মুহম্মদ (স) এবং তাঁর 'আল'-কেও ধন্য করুন!

মোদ্দা কথা, এ উপমা হচ্ছে একান্তই ধরন-ধারণ নির্ধারক, যাতে অনেক সময় উপমার চাইতে উপমেয়ই উত্তম হয়ে যায়। উপরে বর্ণিত কাপড়ের উপমাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

১. ইমাম রাগিব ইস্পাহানী তাঁর বিখ্যাত 'মুফরদাতুল কুরআনে' 'আল' শব্দ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে বলেছেন:
ويستعمل فيمن يختص بالإنسان اختصاصا ذاتيا إما بقرابة قريبة أو بموالاة قال عز وجل (وال ابراهيم وال عمران) وقال أدخلوا آل فرعون أشد العذاب
মানুষের সঙ্গে বিশেষভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অথবা নিকটতম নৈকট্যসূত্রে অথবা বন্ধুত্ব সূত্রে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে । শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন : اٰل إبْرَاهِيمَ اٰل عمران (ইবরাহীমের বংশধর, ইমরানের পরিবার) তিনি আরো বলেন, أَدْخِلُوا اٰلَ فَرْعَونَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ফিরাউনের বংশধরকে কঠোরতম আযাবে নিক্ষেপ করো- (আলমুফরাদাত, পৃষ্ঠা-২০)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)