কিতাবুস সুনান - ইমাম আবু দাউদ রহঃ

৯. জিহাদের বিধানাবলী

হাদীস নং: ২৫৪০
আন্তর্জাতিক নং: ২৫৪৮
জিহাদের বিধানাবলী
৩১৭. পশু-পক্ষীদের তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে যে সকল নির্দেশ রয়েছে।
২৫৪০. আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুহাম্মাদ আন নুফায়লী ..... সাহল ইবনে হানযালিয়্যা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) এমন একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার অনাহারে পেট ও পিঠ একত্র হয়ে গিয়েছিল। তা দেখে মহানবী (ﷺ) বললেন, তোমরা এ সকল বোবা পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। এদেরকে দানাপানি দিয়ে সুস্থ সবল রাখ ও সুস্থ সবল পশুর পিঠে আরোহণ কর এবং খাওয়ার সময়ও সুস্থ সবল প্রাণীর গোশত খাও।
كتاب الجهاد
باب مَا يُؤْمَرُ بِهِ مِنَ الْقِيَامِ عَلَى الدَّوَابِّ وَالْبَهَائِمِ
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ النُّفَيْلِيُّ، حَدَّثَنَا مِسْكِينٌ، - يَعْنِي ابْنَ بُكَيْرٍ - حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُهَاجِرٍ، عَنْ رَبِيعَةَ بْنِ يَزِيدَ، عَنْ أَبِي كَبْشَةَ السَّلُولِيِّ، عَنْ سَهْلِ ابْنِ الْحَنْظَلِيَّةِ، قَالَ : مَرَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِبَعِيرٍ قَدْ لَحِقَ ظَهْرُهُ بِبَطْنِهِ، فَقَالَ : " اتَّقُوا اللَّهَ فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ الْمُعْجَمَةِ فَارْكَبُوهَا وَكُلُوهَا صَالِحَةً " .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

জীবজন্তুর প্রতি সদয় আচরণ করা ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ হুকুম, বিশেষত গৃহপালিত ও গবাদি পশুর প্রতি। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও জীবজন্তুর প্রতি সদয় ছিলেন। অন্যদেরকেও এ বিষয়ে জোর তাগিদ করতেন। এটাই আলোচ্য হাদীছটির বিষয়বস্তু। হাদীছটি বর্ণনা করেছেন বিখ্যাত সাহাবী সাহল ইবনুর রাবী' আল আনসারী ওরফে ইবনুল হানযালিয়্যাহ। তাঁর পরিচয় সম্পর্কে ইতিহাসে বলা হয়েছে-

وَهُوَ مِنْ أَهْلِ بَبْعَةِ الرِّضْوَانِ (আর তিনি ছিলেন বায়'আতুর রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের একজন)। বায়'আতুর রিযওয়ান ইসলামী ইতিহাসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক বায়'আত। ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধির আগে এ বায়'আত অনুষ্ঠিত হয়। বরং এ বায়'আতই হুদায়বিয়ার সন্ধিস্থাপনের ভিত্তি রচনা করেছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সফরে অংশগ্রহণকারী প্রায় দেড় হাজার সাহাবী থেকে একটি বাবলা গাছের নিচে এ মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে তাদের কেউ পলায়ন করবে না। মক্কার মুশরিকদের মনে এ অঙ্গীকারের দারুণ প্রভাব পড়ে। ফলে সহজেই তারা সন্ধিস্থাপন করতে রাজি হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরামের এরূপ অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ায় আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে আয়াত নাযিল হয়-

لَقَدۡ رَضِیَ اللّٰہُ عَنِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ یُبَایِعُوۡنَکَ تَحۡتَ الشَّجَرَۃ

'নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি খুশি হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে তোমার কাছে বায়'আত গ্রহণ করছিল। (সূরা ফাতহ, আয়াত ১৮)

আল্লাহ তা'আলার এ সন্তুষ্টিপ্রকাশ থেকেই অঙ্গীকারটির নাম হয়ে যায় বায়'আতুর রিযওয়ান বা সন্তোষজনক বায়'আত। হযরত ইবনুল হানযালিয়্যাহ রাযি. ছিলেন এ বায়'আতেরই এক গৌরবান্বিত সদস্য।

ইবনুল হানযালিয়্যাহ রাযি. জানান, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে তিনি একটি বাড়ির সামনে একটি উট দেখতে পান। উটটি ছিল খুবই ক্ষুধার্ত ও জীর্ণশীর্ণ। ক্ষুধায় তার পেট পিঠের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল।

এক বর্ণনায় আছে, সময়টা ছিল দিনের শুরুভাগ। তিনি বিকেলবেলা যখন সে পথ দিয়ে ফিরছিলেন, তখনও উটটিকে সেখানে একই অবস্থায় দেখতে পান। তা দেখে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব মায়া হলো। তিনি উটটির মালিককে ডেকে আনতে বললেন। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। অগত্যা উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন-

اِتَّقُوا اللَّهَ فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ الْمُعْجَمَةِ (তোমরা এই অবলা পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো)। البهائم শব্দটি ي بَهِيْمَةٌ এর বহুবচন। শব্দটির উৎপত্তি بَهم থেকে। এর অর্থ কথা বলতে না পারা, বোধ-বুদ্ধিহীন হওয়া। পশু কথাও বলতে পারে না, বোধ-বুদ্ধিও রাখে না। তাই তাকে بَهِيْمَةٌ বলা হয়। শব্দটি ব্যবহার হয় চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রে।

অবশ্য হিংস্র পশুকে بَهِيْمَةٌ বলা হয় না। الْمُعْجَمَة এর উৎপত্তি عجم থেকে। এর অর্থ বাকশক্তিহীন হওয়া। পশু বাকশক্তিহীন হওয়ায় তাকে الْمُعْجَمَة বলা হয়ে থাকে। আলোচ্য হাদীছে البهائم المعجمة (অবলা নির্বোধ প্রাণী)-এর দ্বারা বিশেষভাবে উট বোঝানো হয়েছে।

যা হোক, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সাহাবীগণকে সতর্ক করেন যে- তোমরা এই অবলা পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তা'আলাই এদের সৃষ্টি করেছেন, যেমন তিনি তোমাদেরও সৃষ্টি করেছেন। তিনিই তোমাদেরকে এদের উপর আধিপত্য দিয়েছেন এবং এদেরকে তোমাদের সেবক বানিয়েছেন। ফলে তোমরা এদের দ্বারা নানাভাবে উপকৃত হচ্ছ। সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন-

وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا ۗ لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ. وَلَكُمْ فِيهَا جَمَالٌ حِينَ تُرِيحُونَ وَحِينَ تَسْرَحُونَ. وَتَحْمِلُ أَثْقَالَكُمْ إِلَىٰ بَلَدٍ لَّمْ تَكُونُوا بَالِغِيهِ إِلَّا بِشِقِّ الْأَنفُسِ ۚ إِنَّ رَبَّكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ

'তিনিই চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে তোমাদের জন্য শীত থেকে বাঁচার উপকরণ এবং তাছাড়া আরও বহু উপকার রয়েছে এবং তা থেকেই তোমরা খেয়েও থাক। তোমরা সন্ধ্যাকালে যখন সেগুলোকে বাড়িতে ফিরিয়ে আন এবং ভোরবেলা যখন সেগুলোকে চারণভূমিতে নিয়ে যাও, তখন তার ভেতর তোমাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন শোভাও রয়েছে। এবং তারা তোমাদের ভার বয়ে নিয়ে যায় এমন নগরে, যেখানে প্রাণান্তকর কষ্ট ছাড়া তোমরা পৌঁছতে পারতে না। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের প্রতিপালক অতি মমতাময়, পরম দয়ালু। (সূরা নাহল, আয়াত ৫-৭)

সুতরাং গরু, মহিষ, উট, ভেড়া ইত্যাদি চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা বহুবিধ উপকার লাভকরতে পারার কারণে তোমাদের কর্তব্য আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করা এবং এগুলোর যথাযথ যত্ন নেওয়া। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ দু'টি উপকারলাভের ক্ষেত্রে করণীয় কর্তব্যের প্রতি দিকনির্দেশনা দান করে বলছেন-

فَارْكَبُوهَا صَالِحَة (তোমরা এতে সওয়ার হবে উপযুক্ত অবস্থায়)। অর্থাৎ উট যখন যাত্রীবহনের উপযুক্ত হয়, তখনই তোমরা এতে সওয়ার হবে। সেজন্য যত্নের সঙ্গে একে দানাপানি খাওয়াবে। যখন দেখবে যাত্রী নিয়ে চলাফেরা করার শক্তি অর্জন করেছে, কেবল তখনই এতে সওয়ার হবে। সে ক্ষেত্রেও একে বাড়তি কষ্ট দেবে না। যতজন যাত্রী বইতে পারে এবং যে পরিমাণ মাল টানতে পারে, কেবল তাতেই ক্ষান্ত থাকবে, তার বেশি নয়। উট চালাবেও যত্নের সঙ্গে। মাঝেমাঝে বিশ্রাম দেবে।

একটানা এবং অতিদ্রুত হাঁকাবে না। মারধরও করবে না। মনে রাখবে, আল্লাহ তা'আলাই তাকে তোমার অধীন করেছেন। তাই তুমি তাকে মারতে পার না। শায়খ আব্দুল আযীয দায়রীনী রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, উটে চড়ার পর তিনি সেটি চালানোর জন্য কখনও জোরে আওয়াজ করতেন না। বড়জোর জামার আস্তিন দিয়ে আঘাত করতেন আর বলতেন, ওহে আব্দুল আযীয! এমনও তো হতে পারে যে, তুমি একদিন জামার আস্তিন দিয়েও আঘাত করতে সক্ষম হবে না।

উল্লেখ্য, পালিত জীবজন্তুকে ঠিকভাবে দানাপানি দেওয়া জরুরি। মালিক এ ব্যাপারে অবহেলা করলে রাষ্ট্র তাকে যথাযথ যত্ন নিতে বাধ্য করতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে।

وَكُلُوْهَا صَالِحَةً (এবং এগুলো খাবেও উপযুক্ত অবস্থায়)। অর্থাৎ তোমরা যদি উট জবাই করে তার গোশত খেতে চাও, তবে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় জবাই করবে না। তাতে যেমন পশুর প্রতি নির্দয়তা প্রকাশ পায়, তেমনি যে গোশত খাওয়া উদ্দেশ্য তাও যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায় না। তারচে' আগে তার যত্ন নেবে, ঠিকভাবে দানাপিনা দেবে, তারপর যখন মোটাতাজা হয়ে খাওয়ার উপযুক্ত হবে, কেবল তখনই জবাই করবে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. পালিত জীবজন্তুকে ঠিকভাবে দানাপানি দেওয়া ও তার যথাযথ যত্ন নেওয়া অবশ্যকর্তব্য।

খ. মালিক তার পালিত পশুর যত্ন নিতে অবহেলা করলে রাষ্ট্র তাকে তা করতে বাধ্য করবে।

গ. কোনও মালিক তার পশুর প্রয়োজনীয় যত্ন না করলে অন্যদের তাকে সতর্ক করা উচিত।

ঘ. নির্বাক ও বোধ-বুদ্ধিহীন হওয়ায় পশুর প্রতি সদয় আচরণ করা উচিত।

ঙ. বাহনজন্তুর পিঠে সওয়ার হওয়ার আগে তাকে দানাপানি দিয়ে উপযুক্ত ও শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

চ. জীর্ণশীর্ণ পশু জবাই করতে নেই। আগে যথাযথ যত্নের মাধ্যমে তাকে পরিপুষ্ট করে তোলা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান