মা'আরিফুল হাদীস
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হাদীস নং: ২০৭
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.
২০৭. হযরত হারেস ইবনে সিম্মাহ আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন, তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আব্দুর রহমান ইবনে আউফকে দেখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাঁকে কালো পাথরের অংশের দিকে দেখেছি এবং লক্ষ্য করেছি যে, তাঁর উপর মুশরিকরা আক্রমণ করছে। আমি তাঁর নিকট ছুটে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম যে, তাঁকে কোনক্রমে বাঁচানো যায় কি না। এ সময়ই আপনার প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ল এবং আমি আপনার দিকে ফিরে আসলাম। নবী করীম (ﷺ) বললেন, জেনে রাখ, আল্লাহর ফিরিশতারা আব্দুর রহমান ইবনে আউফের পক্ষে যুদ্ধ করছে। (বর্ণনাকারী হারেস বলেন,) তাঁর এ কথা শুনে আমি আব্দুর রহমান ইবনে আউফের কাছে ফিরে আসলাম এবং দেখলাম, তাঁর সামনে মুশরিকদের সাতটি লাশ পড়ে আছে। আমি তখন বললাম, তোমার হাত কামিয়াব ও সফল থাকুক। তুমি কি এদের সবাইকে হত্যা করেছ? তিনি উত্তর দিলেন, এই আরতাত ইবনে আবদে শুরাহবীল ও অপর দু'জনকে তো আমি হত্যা করেছি, কিন্তু অন্য চারজনকে কে হত্যা করেছে, আমি দেখিনি। আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যবাদী। (ইবনে মুন্দাহ, তাবরানী, আবূ নুআইম)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ الْحَارِثُ بْنُ الصِّمَّةِ الْاَنْصَارِىِّ قَالَ: سَأَلَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ وَهُوَ فِي الشِّعْبِ: «هَلْ رَأَيْتَ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ؟» قُلْتُ: نَعَمْ يَا رَسُولَ اللهِ، رَأَيْتُهُ إِلَى حَرِّ الْجَبَلِ، وَعَلَيْهِ عَكَرٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ، فَهَرَبْتُ إِلَيْهِ لِأَمْنَعَهُ، فَرَأَيْتُكَ فَعَدَلْتُ إِلَيْكَ. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَمَا إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تُقَاتِلُ مَعَهُ» . فَرَجَعْتُ إِلَى عَبْدِ الرَّحْمَنِ فَأَجِدُهُ بَيْنَ نَفَرٍ سَبْعَةٍ صَرْعَى، فَقُلْتُ لَهُ: ظَفِرَتْ يَمِينُكَ، أَكُلَّ هَؤُلَاءِ قَتَلْتَ؟ قَالَ: أَمَّا هَذَا لِأَرْطاةَ بْنِ شُرَحْبِيلَ، وَهَذَا فَأَنَا قَتَلْتُهُمَا، وَأَمَّا هَؤُلَاءِ فَقَتَلَهُمْ مَنْ لَمْ أَرَهُ. قُلْتُ: صَدَقَ اللهُ وَرَسُولُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. (رواه ابن منذه فى مسنده والطبرانى فى المعجم الكبير و ابو نعيم فى الحلية)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হাদীসটির মর্ম সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য উহুদ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত আলোচনা সমীচীন মনে করছি।
বদরযুদ্ধ- যা দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে সংঘটিত হয়েছিল, এতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশত তের, আর যুদ্ধের উপকরণ ছিল না থাকার মত। কেননা, মদীনা থেকে কোন নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়াই হয়নি। এ জন্য যারা যুদ্ধ উপকরণ সাথে নিতে পারত তারাও সবাই সঙ্গী হয়নি। অপরদিকে মক্কার মুশরিকদের সৈন্য সংখ্যা তিন গুণেরও অধিক প্রায় এক হাজার ছিল। তাছাড়া তারা যুদ্ধের উদ্দেশ্যেই সম্পূর্ণ অস্ত্রসজ্জিত হয়ে এসেছিল। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ গায়েবী মদদে মুসলমানদের অকল্পনীয় বিজয় লাভ হয়। মুসলমান মুজাহিদদের হাতে নিহত হয়ে মক্কার মুশরিকদের মধ্য থেকে সত্তরজন জাহান্নামের যাত্রী হয়- যাদের মধ্যে আবু জাহল এবং তারই মত আরো কয়েকজন কুরাইশ নেতাও ছিল। এর সাথে সত্তরজনকে বন্দী করা হয়।
অন্য সবাই পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধের এ ফলাফল মক্কার মুশরিকদের মধ্যে-বিশেষ করে যেসব মুশরিক যুদ্ধে শরীক ছিল না, তাদের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিল। তাই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, আমাদেরকে এর প্রতিশোধ নিতেই হবে এবং পূর্ণ প্রস্তুতির সাথে মদীনা আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পূর্ণ এক বছর এর প্রস্তুতি গ্রহণ করল এবং বদরের ঘটনার ঠিক এক বছর পর তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মুসলমানদেরকে খতম করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল এবং বিভিন্ন মনযিল অতিক্রম করে মদীনার কাছে পৌছে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে তাদের প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে আসলেন। তাঁর সাথে মুজাহিদদের সংখ্যা মাত্র সাতশ ছিল। মদীনার জনপদের দুই আড়াই মাইল দূরে উহুদ পাহাড় অবিস্থত। এর কোল ঘেঁষে এক প্রশস্ত ময়দান। হুযুর (ﷺ) সেখানেই সাহাবায়ে কেরামের বাহিনীকে এভাবে কাতারবন্দী করলেন যে, উহুদ পাহাড় তাদের পেছনের দিকে ছিল- যার কারণে এ বিষয়টি নিশ্চিত ছিল যে, শত্রুরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারবে না। কিন্তু পাহাড়ে একটি গিরিপথ এমন ছিল যে, সেদিক দিয়ে এসে শত্রুরা আক্রমণ করতে পারত। এর জন্য তিনি এ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন যে, পঞ্চাশজন তীরান্দাজের একটি দলকে গিরিপথের নিকটবর্তী এক পর্বতে নিয়োজিত করলেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে (যিনি তীরান্দাজীতে নিজেও অত্যন্ত অভিজ্ঞ ছিলেন) এ খণ্ড সেনাদের আমির নিযুক্ত করলেন। সাথে সাথে এ কথাও বলে দিলেন যে, তারা যেন সেখানেই থাকে। হুযুর (ﷺ)-এর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, শত্রুসৈন্যরা যেন এ গিরিপথ দিয়ে এসে আক্রমণ করতে না পারে।
যুদ্ধ শুরু হল এবং প্রথম পর্যায়েই মুসলমান মুজাহিদগণ এমন শক্ত আক্রমণ করল যে, শত্রু সৈন্যরা (যাদের সংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে চারগুণেরও বেশী ছিল।) টিকে থাকতে পারল না; বরং তারা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হল। ফলে মুসলিম সৈন্যরা মনে করল যে, যুদ্ধ আমাদের বিজয়ের সাথেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই তারা শত্রুদের পরিত্যক্ত মালে গনীমত সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। গিরিপথে নিয়োজিত তীরান্দাজ দল যখন এ অবস্থা দেখল, তখন তাদের মধ্য থেকেও অনেকেই গনীমতের মাল সংগ্রহ করার জন্য পর্বত থেকে নীচে নেমে এসে ময়দানের দিকে আসতে লাগল। তাদের আমীর ও দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. তাদেরকে ফিরাতে চেষ্টা করলেন এবং স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, হুযুর (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তোমাদেরকে যে কোন অবস্থায় এখানেই থাকতে হবে। তারা বলল, এ নির্দেশ তো ঐ সময় পর্যন্ত ছিল যে পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। কিন্তু এখন যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে এবং শত্রুরা ময়দান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাই আমরা এখানে কেন থাকব। সারকথা, তারা নিজেদের আমীরের কথা মানল না এবং পর্বত থেকে নীচে নেমে এসে তারাও গনীমতের মাল সংগ্রহ করার কাজে লেগে গেল। কিন্তু দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ও কয়েকজন সাথী হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী পর্বতের উপরই রয়ে গেলেন।
খালেদ ইবনে ওয়ালিদ- যিনি তখনও মুসলমান হননি, মুশরিকদের একটি দল সাথে নিয়ে ঐ গিরিপথ দিয়ে এসে গেলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ও তাঁর কয়েকজন সাথী যারা পর্বতের উপর ছিলেন, তাদেরকে প্রতিরোধ করতে চাইলেন, কিন্তু ফিরাতে পারলেন না। ফলে সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ নিজ বাহিনীসহ গিরিপথ দিয়ে এসে পেছন দিক থেকে মুসলমানদের উপর এমন সময় আক্রমণ করল, যখন মুসলমানগণ ভুলক্রমে মনে করেছিলেন যে, যুদ্ধ এখন শেষ হয়ে গিয়েছে। এ আক্রমণ অনেক মুসলমানকে হতভম্ব করে দিল এবং তারা সংগঠিত হয়ে এ আক্রমণের মুকাবেলা করতে পারলেন না। তাদের মধ্যে ভীতভাব সৃষ্টি হয়ে গেল। অনেক বিখ্যাত সাহাবী শহীদ হয়ে গেলেন। এমনকি স্বয়ং হুযুর (ﷺ) মারাত্মকভাবে আহত হলেন। (এ অবস্থার বিশদ বিবরণ ইতিহাসের কিতাবে দেখে নেওয়া যেতে পারে।) তারপর আল্লাহ্ তা'আলার গায়েবী মদদে যুদ্ধের কায়া পাল্টে গেল। সাহাবায়ে কেরাম যারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং একজন অপরজনের খবর পর্যন্ত জানতেন না, একথা জানার পর যে, হুযুর (ﷺ) জীবিত ও নিরাপদে আছেন- পুনরায় সংগঠিত হয়ে গেলেন এবং আল্লাহ্ তা'আলার গায়েবী মদদে পুনরায় শত্রুদলকে পরাজিত করে দিলেন।
উপরে উল্লেখিত হারেস ইবনে সিম্মাহ রাযি. এর এ হাদীসের সম্পর্ক বাহ্যত এ পর্যায়ের সাথে। বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.-এর এ অবস্থা উন্মোচন করে দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন এবং আল্লাহর ফিরিশতারা তাঁর সাথে যুদ্ধে শরীক হয়ে তাঁকে সাহায্য করে যাচ্ছেন। তিনি এর ভিত্তিতেই হারেস ইবনে সিম্মাহকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং হারেস ঐ উত্তর দিলেন- যা হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে। তার উত্তর শুনে হুযুর (ﷺ) বললেন: أما أن الملائكة تقاتل منه (অর্থাৎ, ফিরিশতারা তাঁর সাথী হয়ে যুদ্ধ করছে।) হুযুর (ﷺ)-এর মুখে এ কথা শোনার পর হারেস ইবনে সিম্মাহ আবার সেখানে গেলেন- যেখানে তিনি দেখছিলেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফের উপর মুশরিকদের একটি দল আক্রমণ করছে। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন যে, সাতজন মুশরিকের লাশ সেখানে পড়ে আছে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, এদের সবাইকে তুমিই জাহান্নামে পাঠিয়েছ? তিনি তখন সাতজনের মধ্যে তিনজনের ব্যাপারে বললেন যে, আল্লাহর সাহায্যে এ তিনজনকে আমি হত্যা করেছি। অন্য চারজনের ব্যাপারে আমি জানি না যে, ওদের কে হত্যা করেছে। তাঁর এ উত্তর শুনে হারেস ইবনে সিম্মাহ বললেন : صدق الله ورسوله মর্ম এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কথা বলেছিলেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফের পক্ষ হয়ে ফিরিশতারা যুদ্ধ করছে, এটা আমি নিজের চোখে দেখে নিলাম এবং আমার ঈমান তাজা হয়ে গেল।
এ হাদীস দ্বারা হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফের এ বৈশিষ্ট্যের কথা জানা গেল যে, তিনি উহুদের যুদ্ধে বিশেষ পরীক্ষার সময়েও দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন এবং আল্লাহর প্রেরিত ফিরিশতারা যুদ্ধে তাঁকে সাহায্য করে যাচ্ছিল।
নিঃসন্দেহে এ ঘটনাটি হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফের বিশেষ মর্যাদার দলীল।
অপরদিকে হুযুর (ﷺ) তাঁর ব্যাপারে যে বলেছিলেন, "ফিরিশতারা যুদ্ধে তাকে সাহায্য করছে" এটা ছিল নিঃসন্দেহে হুযুর (ﷺ)-এর একটি মু'জেযা।
বদরযুদ্ধ- যা দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে সংঘটিত হয়েছিল, এতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশত তের, আর যুদ্ধের উপকরণ ছিল না থাকার মত। কেননা, মদীনা থেকে কোন নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়াই হয়নি। এ জন্য যারা যুদ্ধ উপকরণ সাথে নিতে পারত তারাও সবাই সঙ্গী হয়নি। অপরদিকে মক্কার মুশরিকদের সৈন্য সংখ্যা তিন গুণেরও অধিক প্রায় এক হাজার ছিল। তাছাড়া তারা যুদ্ধের উদ্দেশ্যেই সম্পূর্ণ অস্ত্রসজ্জিত হয়ে এসেছিল। এতদসত্ত্বেও আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ গায়েবী মদদে মুসলমানদের অকল্পনীয় বিজয় লাভ হয়। মুসলমান মুজাহিদদের হাতে নিহত হয়ে মক্কার মুশরিকদের মধ্য থেকে সত্তরজন জাহান্নামের যাত্রী হয়- যাদের মধ্যে আবু জাহল এবং তারই মত আরো কয়েকজন কুরাইশ নেতাও ছিল। এর সাথে সত্তরজনকে বন্দী করা হয়।
অন্য সবাই পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধের এ ফলাফল মক্কার মুশরিকদের মধ্যে-বিশেষ করে যেসব মুশরিক যুদ্ধে শরীক ছিল না, তাদের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিল। তাই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, আমাদেরকে এর প্রতিশোধ নিতেই হবে এবং পূর্ণ প্রস্তুতির সাথে মদীনা আক্রমণ করে মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা পূর্ণ এক বছর এর প্রস্তুতি গ্রহণ করল এবং বদরের ঘটনার ঠিক এক বছর পর তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মুসলমানদেরকে খতম করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল এবং বিভিন্ন মনযিল অতিক্রম করে মদীনার কাছে পৌছে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে তাদের প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে আসলেন। তাঁর সাথে মুজাহিদদের সংখ্যা মাত্র সাতশ ছিল। মদীনার জনপদের দুই আড়াই মাইল দূরে উহুদ পাহাড় অবিস্থত। এর কোল ঘেঁষে এক প্রশস্ত ময়দান। হুযুর (ﷺ) সেখানেই সাহাবায়ে কেরামের বাহিনীকে এভাবে কাতারবন্দী করলেন যে, উহুদ পাহাড় তাদের পেছনের দিকে ছিল- যার কারণে এ বিষয়টি নিশ্চিত ছিল যে, শত্রুরা পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারবে না। কিন্তু পাহাড়ে একটি গিরিপথ এমন ছিল যে, সেদিক দিয়ে এসে শত্রুরা আক্রমণ করতে পারত। এর জন্য তিনি এ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন যে, পঞ্চাশজন তীরান্দাজের একটি দলকে গিরিপথের নিকটবর্তী এক পর্বতে নিয়োজিত করলেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে (যিনি তীরান্দাজীতে নিজেও অত্যন্ত অভিজ্ঞ ছিলেন) এ খণ্ড সেনাদের আমির নিযুক্ত করলেন। সাথে সাথে এ কথাও বলে দিলেন যে, তারা যেন সেখানেই থাকে। হুযুর (ﷺ)-এর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, শত্রুসৈন্যরা যেন এ গিরিপথ দিয়ে এসে আক্রমণ করতে না পারে।
যুদ্ধ শুরু হল এবং প্রথম পর্যায়েই মুসলমান মুজাহিদগণ এমন শক্ত আক্রমণ করল যে, শত্রু সৈন্যরা (যাদের সংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে চারগুণেরও বেশী ছিল।) টিকে থাকতে পারল না; বরং তারা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হল। ফলে মুসলিম সৈন্যরা মনে করল যে, যুদ্ধ আমাদের বিজয়ের সাথেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই তারা শত্রুদের পরিত্যক্ত মালে গনীমত সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। গিরিপথে নিয়োজিত তীরান্দাজ দল যখন এ অবস্থা দেখল, তখন তাদের মধ্য থেকেও অনেকেই গনীমতের মাল সংগ্রহ করার জন্য পর্বত থেকে নীচে নেমে এসে ময়দানের দিকে আসতে লাগল। তাদের আমীর ও দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. তাদেরকে ফিরাতে চেষ্টা করলেন এবং স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, হুযুর (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তোমাদেরকে যে কোন অবস্থায় এখানেই থাকতে হবে। তারা বলল, এ নির্দেশ তো ঐ সময় পর্যন্ত ছিল যে পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। কিন্তু এখন যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে এবং শত্রুরা ময়দান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাই আমরা এখানে কেন থাকব। সারকথা, তারা নিজেদের আমীরের কথা মানল না এবং পর্বত থেকে নীচে নেমে এসে তারাও গনীমতের মাল সংগ্রহ করার কাজে লেগে গেল। কিন্তু দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ও কয়েকজন সাথী হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী পর্বতের উপরই রয়ে গেলেন।
খালেদ ইবনে ওয়ালিদ- যিনি তখনও মুসলমান হননি, মুশরিকদের একটি দল সাথে নিয়ে ঐ গিরিপথ দিয়ে এসে গেলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ও তাঁর কয়েকজন সাথী যারা পর্বতের উপর ছিলেন, তাদেরকে প্রতিরোধ করতে চাইলেন, কিন্তু ফিরাতে পারলেন না। ফলে সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ নিজ বাহিনীসহ গিরিপথ দিয়ে এসে পেছন দিক থেকে মুসলমানদের উপর এমন সময় আক্রমণ করল, যখন মুসলমানগণ ভুলক্রমে মনে করেছিলেন যে, যুদ্ধ এখন শেষ হয়ে গিয়েছে। এ আক্রমণ অনেক মুসলমানকে হতভম্ব করে দিল এবং তারা সংগঠিত হয়ে এ আক্রমণের মুকাবেলা করতে পারলেন না। তাদের মধ্যে ভীতভাব সৃষ্টি হয়ে গেল। অনেক বিখ্যাত সাহাবী শহীদ হয়ে গেলেন। এমনকি স্বয়ং হুযুর (ﷺ) মারাত্মকভাবে আহত হলেন। (এ অবস্থার বিশদ বিবরণ ইতিহাসের কিতাবে দেখে নেওয়া যেতে পারে।) তারপর আল্লাহ্ তা'আলার গায়েবী মদদে যুদ্ধের কায়া পাল্টে গেল। সাহাবায়ে কেরাম যারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং একজন অপরজনের খবর পর্যন্ত জানতেন না, একথা জানার পর যে, হুযুর (ﷺ) জীবিত ও নিরাপদে আছেন- পুনরায় সংগঠিত হয়ে গেলেন এবং আল্লাহ্ তা'আলার গায়েবী মদদে পুনরায় শত্রুদলকে পরাজিত করে দিলেন।
উপরে উল্লেখিত হারেস ইবনে সিম্মাহ রাযি. এর এ হাদীসের সম্পর্ক বাহ্যত এ পর্যায়ের সাথে। বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.-এর এ অবস্থা উন্মোচন করে দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন এবং আল্লাহর ফিরিশতারা তাঁর সাথে যুদ্ধে শরীক হয়ে তাঁকে সাহায্য করে যাচ্ছেন। তিনি এর ভিত্তিতেই হারেস ইবনে সিম্মাহকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন এবং হারেস ঐ উত্তর দিলেন- যা হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে। তার উত্তর শুনে হুযুর (ﷺ) বললেন: أما أن الملائكة تقاتل منه (অর্থাৎ, ফিরিশতারা তাঁর সাথী হয়ে যুদ্ধ করছে।) হুযুর (ﷺ)-এর মুখে এ কথা শোনার পর হারেস ইবনে সিম্মাহ আবার সেখানে গেলেন- যেখানে তিনি দেখছিলেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফের উপর মুশরিকদের একটি দল আক্রমণ করছে। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন যে, সাতজন মুশরিকের লাশ সেখানে পড়ে আছে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, এদের সবাইকে তুমিই জাহান্নামে পাঠিয়েছ? তিনি তখন সাতজনের মধ্যে তিনজনের ব্যাপারে বললেন যে, আল্লাহর সাহায্যে এ তিনজনকে আমি হত্যা করেছি। অন্য চারজনের ব্যাপারে আমি জানি না যে, ওদের কে হত্যা করেছে। তাঁর এ উত্তর শুনে হারেস ইবনে সিম্মাহ বললেন : صدق الله ورسوله মর্ম এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কথা বলেছিলেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফের পক্ষ হয়ে ফিরিশতারা যুদ্ধ করছে, এটা আমি নিজের চোখে দেখে নিলাম এবং আমার ঈমান তাজা হয়ে গেল।
এ হাদীস দ্বারা হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফের এ বৈশিষ্ট্যের কথা জানা গেল যে, তিনি উহুদের যুদ্ধে বিশেষ পরীক্ষার সময়েও দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন এবং আল্লাহর প্রেরিত ফিরিশতারা যুদ্ধে তাঁকে সাহায্য করে যাচ্ছিল।
নিঃসন্দেহে এ ঘটনাটি হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফের বিশেষ মর্যাদার দলীল।
অপরদিকে হুযুর (ﷺ) তাঁর ব্যাপারে যে বলেছিলেন, "ফিরিশতারা যুদ্ধে তাকে সাহায্য করছে" এটা ছিল নিঃসন্দেহে হুযুর (ﷺ)-এর একটি মু'জেযা।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)