মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৯৩
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত আলী রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৯৩. হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বিচারক বানিয়ে ইয়ামানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে বিচারক বানিয়ে পাঠিয়েছেন, অথচ আমার বয়স কম। আর (বিচারক কাজে) আমার তেমন কোন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নেই। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ্ তা'আলা তোমার অন্তরকে পথপ্রদর্শন করবেন এবং তোমার যবানকে স্থির রাখবেন। (অর্থাৎ, অন্তরে তাই আসবে এবং মুখে তাই ফুটবে, যা সঠিক ও সত্য হবে।) যখন তোমার নিকট দু'ব্যক্তি কোন বিষয় নিয়ে আসবে, তখন প্রথম ব্যক্তির বক্তব্য শুনেই কোন ফায়সালা দিয়ে দিবে না- যে পর্যন্ত না দ্বিতীয় ব্যক্তির বক্তব্য শুনে নাও। এ পদ্ধতিটি তোমার বিচারকার্যে খুবই সহায়ক হবে। হযরত আলী রাযি. বলেন, (হুযুর (ﷺ)-এর এ দু‘আ ও শিক্ষার পর) আমার কোন বিচারকার্যে কোন সংশয়-সন্দেহও সৃষ্টি হয়নি। (তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عَلِيٍّ قَالَ: بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْيَمَنِ قَاضِيًا، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ تُرْسِلُنِي وَأَنَا حَدِيثُ السِّنِّ، وَلَا عِلْمَ لِي بِالْقَضَاءِ، فَقَالَ: «إِنَّ اللَّهَ سَيَهْدِي قَلْبَكَ، وَيُثَبِّتُ لِسَانَكَ، فَإِذَا جَلَسَ بَيْنَ يَدَيْكَ الْخَصْمَانِ، فَلَا تَقْضِيَنَّ حَتَّى تَسْمَعَ مِنَ الْآخَرِ، كَمَا سَمِعْتَ مِنَ الْأَوَّلِ، فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يَتَبَيَّنَ لَكَ الْقَضَاءُ»، قَالَ: «فَمَا زِلْتُ قَاضِيًا، أَوْ مَا شَكَكْتُ فِي قَضَاءٍ بَعْدُ» (رواه الترمذى وابوداؤد وابن ماجه)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীসের মূল পাঠের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা অনুবাদের মধ্যেই করে দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, এ ঘটনার বর্ণনা হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে বিভিন্ন রাবী থেকে করা হয়েছে- যেগুলোর মধ্য থেকে কোন কোনটির মধ্যে কিছু অতিরিক্ত সংযোজনও রয়েছে। এসব বর্ণনাগুলো সামনে রাখলে পূর্ণ ঘটনাটি সামনে এসে যায়।

কানযুল উম্মালে ইবনে জারীরের বরাতে ঘটনাটি এভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে, ইয়ামান দেশের কিছু লোক হুযুর (ﷺ)-এর খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করল যে, আপনি আমাদের এখানে এমন একজন লোক পাঠিয়ে দেন, যিনি আমাদেরকে দ্বীন শিখাবেন, শরী‘আতের বিধি-বিধান শিক্ষা দিবেন এবং আমাদের মামলা-মোকদ্দমা ও বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহের ফায়সালা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী দান করবেন। হুযুর (ﷺ) হযরত আলীকে বললেন যে, তুমি এ কাজের জন্য ইয়ামানে চলে যাও। হযরত আলী রাযি. বলেন, আমি নিবেদন করলাম, এমনটাও হতে পারে যে, সেখানকার লোকেরা আমার নিকট এমন মোকদ্দমা ও এমন বিষয়াদি নিয়ে আসবে-যেগুলোর ব্যাপারে আমার জানা নেই। তখন হুযুর (ﷺ) আমার বুকের উপর নিজের মুবারক হাত রাখলেন এবং বললেন: اذهب فإن الله سيهدي قلبك ويثبت لسانك (যাও আল্লাহ্ তা'আলা তোমার অন্তরের পথ প্রদর্শন করবেন এবং তোমার যবানকে সুদৃঢ় ও স্থির রাখবেন।) সামনে হযরত আলী রাযি. বলেন, এরপর থেকে এ পর্যন্ত কোন বিচারকার্যে কোন দ্বিধা ও সংশয় আমার হয়নি। (কানযুল উম্মাল: পৃষ্ঠা-১১৩)

কানযুল উম্মালেই মুস্তাদরিকে হাকিম, ইবনে সা'দ, মুসনাদে আহমদ, ইবনে জারীর প্রমুখদের বরাতে এ ঘটনা সম্পর্কে আরেকটি রেওয়ায়াত হযরত আলী রাযি. থেকেই বর্ণিত হয়েছে। সেখানে একথা রয়েছে যে, যখন আমি হুযুর (ﷺ)-এর নিকট নিবেদন করলাম যে, আমি তো অল্প বয়সী মানুষ এবং আমার বিচারকার্য ও মোকাদ্দমার ফায়সালার ব্যাপারে কোন বিশেষ দূরদর্শিতা অর্জিত হয়নি। হুযুর (ﷺ) তখন নিজের হস্ত মুবারক আমার বুকে রেখে দু‘আ করলেন اللَّهمَّ ثبِّتْ لسانَهُ واهد قلبه (হে আল্লাহ! তুমি তাঁর যবানকে স্থির রাখ এবং তাঁর অন্তরকে সঠিক বিষয় বুঝার ক্ষমতা দান কর।) সবশেষে হযরত আলী রাযি.-এর বক্তব্য হচ্ছে এই: فما أشكل على قضاء بعد (হুযুর (ﷺ)-এর এ দু‘আর পর বিচারকার্য পরিচালনায় আমার কোন সমস্যা হয়নি।)

অধম সংকলকের ধারণা যে, হুযুর (ﷺ) যখন হযরত আলীর রাযি. বুকে হাত রেখে দু‘আ করলেন, তখনই তাঁর বিশ্বাস হয়ে গেল যে, এ দু‘আ কবুল করে নেওয়া হয়েছে। তাই তিনি বললেন: إن الله سيهدى قلبك ويُثبت لسانك এখানে سيهدى শব্দের মধ্যে س অক্ষরটি বিশ্বাস ও ইয়াকীন প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, কুরআন মজীদে মূসা (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর নিজ সম্প্রদায়কে বলেছিলেন: قَالَ كَلَّا ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ এ বাস্তবতা উম্মতের সর্বজন স্বীকৃত বিষয়সমূহের মধ্যে গণ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু‘আর ফলে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত আলীকে মোকাদ্দমা ও বিচারকার্যে বিশেষ যোগ্যতা দান করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে তিনি অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। নিঃসন্দেহে এটা তাঁর বিশেষ মর্যাদা এবং এরই সাথে হুযুর (ﷺ)-এর মু'জেযা বিশেষও।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৯৩ | মুসলিম বাংলা