মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৯২
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত আলী রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৯২. হযরত বারা ইবনে আযেব ও যায়েদ ইবনে আরকাম রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন 'গাদীরেখুম' নামক স্থানে অবতরণ ও অবস্থান গ্রহণ করলেন, তখন হযরত আলী রাযি.-এর হাত ধরে (সফরসঙ্গী ও উপস্থিত লোকদেরকে সম্বোধন করে) বললেন, তোমরা কি জাননা যে, আমি মুসলমানদের জন্য তাদের জীবন থেকেও অধিকতর প্রিয়? সবাই উত্তর দিল, অবশ্যই। তারপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান না যে, আমি প্রতিটি মুসলমানের নিকট তার জীবন থেকে অধিকতর প্রিয়? উত্তরে সবাই বললেন, অবশ্যই। তারপর বললেন, হে আল্লাহ্! আমি যার বন্ধু আলীও তার বন্ধু। হে আল্লাহ্! যে ব্যক্তি আলীর সাথে বন্ধুত্ব রাখে, তুমি তার সাথে বন্ধুত্ব রাখ, আর যে তার সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তুমি তার সাথে শত্রুতা পোষণ কর। তারপর হযরত উমর রাযি. হযরত আলী রাযি.-এর সাথে সাক্ষাত করলেন (এবং তাঁকে মুবারকবাদ দিতে গিয়ে) বললেন, হে ইবনে আবু তালেব! মুবারক ও ধন্য হোক তোমার জীবন, তুমি সকাল-সন্ধ্যা (অর্থাৎ, সর্বদা) প্রতিটি মু'মিন নর নারীর বন্ধু ও প্রিয়পাত্র হয়ে গেলে। (মুসনাদে আহমাদ)
کتاب المناقب والفضائل
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ وَزَيْدِ بْنِ اَرْقَمَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا نَزَلَ بِغَدِيرِ خُمٍّ، أَخَذَ بِيَدِ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، فَقَالَ: «أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ؟» قَالُوا: بَلَى، قَالَ: «أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى لِكُلِّ مُؤْمِنٍ مِنْ نَفْسِهِ؟» قَالُوا: بَلَى، قَالَ: «مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ، فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ، وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ» فَلَقِيَهُ عُمَرُ بَعْدَ ذَلِكَ، فَقَالَ «لَهُ هَنِيئًا يَا ابْنَ أَبِي طَالِبٍ، أَصْبَحْتَ وَأَمْسَيْتَ مَوْلَى كُلِّ مُؤْمِنٍ، وَمُؤْمِنَةٍ» (رواه احمد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসে উল্লেখিত ঘটনাটি বিদায় হজ্ব থেকে ফিরে আসার সময়কার। গাদীর শব্দের অর্থ পুকুর ও জলাশয়, আর ঘুম একটি স্থানের নাম, যার পাশে এ জলাশয়টি ছিল। এ স্থানটি মক্কা থেকে মদীনা যাওয়ার পথে বিখ্যাত জনপদ 'জুহফা' থেকে তিন মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিল। হুযুর (ﷺ) বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে স্বীয় সফরসঙ্গীদের পুরা কাফেলার সাথে যার মধ্যে মদীনা ও আশপাশের সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন, যারা এ পবিত্র সফরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন- ১৮ই যিলহজ্ব এ স্থানে পৌছেছিলেন এবং অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এখানে তিনি সফরসঙ্গীদেরকে একত্রিত করে একটি ভাষণ দিলেন। এ ভাষণ সম্পর্কে হাদীসের কিতাবসমূহে যেসব বর্ণনা রয়েছে, এগুলোকে একত্রিত করলে অনুমান হয় যে, তিনি এ ভাষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে একটি কথা হযরত আলী রাযি.-এর ব্যাপারে ওটাও ছিল, যা এ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। এ কথাটি তিনি একটি ভূমিকাসহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলেছেন।

সূরা আহযাবের ৬নং আয়াতে বলা হয়েছে: النبي أولى بالمؤمنين من أنفسهم এর অর্থ এই যে, প্রতিটি মানুষেরই প্রকৃতিগতভাবে সবচেয়ে বেশী ভালবাসা ও কল্যাণকামিতা থাকে নিজের নফস ও প্রিয় জীবনের সাথে। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)এর হক ও দাবী এই যে, ঈমানদারগণ নিজের সত্তা ও প্রিয় জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসা রাখবে তাঁর সাথে। কুরআন পাকের এ আয়াতের দিকে ইশারা করে হুযূর (ﷺ) উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, তোমরা কি এ কথা জান না যে, আমি সকল ঈমানদারদের ভালবাসা ও বন্ধুত্বের অধিক হকদার তাদের নিজেদের সত্তা ও জীবন থেকেও উপস্থিত সবাই এক বাক্যে নিবেদন করল যে, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা কি একথা জান না যে, প্রতিটি মু'মিনের তার নফস ও জীবনের সাথে যে ভালবাসা ও সম্পর্ক থাকে, এর চেয়ে বেশী মহব্বত ও সম্পর্ক আমার সাথে থাকা চাই? উপস্থিত সবাই বলল, হ্যাঁ, এমনটাই হওয়া চাই। আমাদের উপর আপনার হক ও অধিকার এই যে, আমরা যেন আমাদের নফস ও জীবন থেকেও আপনাকে বেশী ভালবাসি। তারপর হুযুর (ﷺ) হযরত আলী রাযি.-এর হাতটি নিজের হাতে নিয়ে বললেন:

اللهم من كنت مولاه فعلي مولاه اللهم وال من والاه وعاد من عاداه

হে আল্লাহ্! (তুমি সাক্ষী থাক) আমি যার বন্ধু, আলীও তার বন্ধু। তাই হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে দু‘আ করছি যে, যে ব্যক্তি আলীকে ভালবাসে তুমি তার সাথে ভালবাসা ও মহব্বতের আচরণ কর, আর যে তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তুমি তার সাথে শত্রুতার আচরণ কর। হুযুর (ﷺ)-এর এ ভাষণের পর হযরত উমর রাযি. হযরত আলী রাযি.-এর সাথে সাক্ষাত করলেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ দিতে গিয়ে বললেন, হে ইবনে আবু তালেব! তোমার ভাগ্য প্রসন্ন যে, হুযুর (ﷺ)-এর এ বাণী অনুযায়ী তুমি প্রতিটি মু'মিন নর নারীর প্রিয়পাত্র হয়ে গেলে, প্রত্যেকেই তোমার সাথে ভালবাসার সম্পর্ক রাখবে।

এ পর্যন্ত কেবল হাদীসের বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অধম সংকলক পাঠকদেরকে একথা বলে দেওয়া সমীচীন মনে করছে যে, শিয়া পণ্ডিত ও লিখকগণ এ হাদীসকে তাদের ঐ আকীদা ও দাবীর পক্ষে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী দলীল হিসাবে পেশ করে যে, 'গাদীরে খুম' এর এ ভাষণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের পরবর্তী সময়ের জন্য হযরত আলী রাযি.-কে খলীফা ও আপন স্থলাভিষিক্ত এবং উম্মতের ইমাম ও শাসক বানিয়ে দিয়েছিলেন আর এ ভাষণের বিশেষ উদ্দেশ্যও এটাই ছিল। তারা বলে যে, 'মাওলা' শব্দের অর্থ হচ্ছে মনিব, মালিক ও শাসক। এই হাদীসের মর্ম এই হবে যে, আমি যাদের মনিব ও শাসক, আলীও তাদের সবার মনিব ও শাসক। অতএব, এটা ছিল হযরত আলীর খেলাফত এবং উম্মতের উপর তাঁর নেতৃত্বের ঘোষণা। সামনের ছত্রগুলোতে ইনশাআল্লাহ পাঠকগণ জেনে নিতে পারবেন যে, শিয়া পণ্ডিতদের এ দাবী এবং তাদের এ দলীল কতটা দুর্বল ও অবাস্তব।

বাস্তব কথা এই যে, আরবী ভাষায় অনেক শব্দ এমন রয়েছে, যেগুলো বিশ বিশটি, অথবা এর চেয়েও বেশী অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'মাওলা' শব্দটিও এসব শব্দমালার অন্তর্ভুক্ত। আরবী ভাষার প্রসিদ্ধ ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অভিধান القاموس المحيط এ এই 'মাওলা' শব্দের নিম্নে উল্লেখিত একুশটি অর্থ লিখা হয়েছে। মাওলার অর্থ ১. মালিক, ২. বান্দা, ৩. আযাদকারী, ৪. আযাদকৃত, ৫. সাথী, ৬. ঘনিষ্ঠ, ৭. প্রতিবেশী, ৮. চুক্তিকারী, ৯. পুত্র, ১০. চাচা, ১১. মেহমান, ১২. অংশীদার, ১৩. বোনের ছেলে, ১৪, অভিভাবক, ১৫. প্রতিপালনকারী, ১৬. সাহায্যকারী, ১৭. অনুগ্রহকারী, ১৮. অনুগ্রহপ্রাপ্ত, ১৯. প্রেমিক, ২০. অনুসারী, ২১. জামাতা। (আলকামূসুল মুহীত: খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৪০৪)

(এসব শব্দের তরজমা মিসবাহুল লুগাতের এবারতে পাঠকবর্গ দেখে নিতে পারবেন যা মামনে উদ্ধৃত করা হচ্ছে) আরবী ভাষার আরেকটি প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য অভিধান আকরাবুল মাওয়ারেদেও মাওলা শব্দের এসব অর্থই লিখা হয়েছে। (আকরাবুল মাওয়ারেদ দ্বিতীয় খণ্ড: ১৪৮৮)
হাদীসের অভিধানের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য কিতাব النهاية لدين الأثير الجزري في غريب الحديث الآثار এতেও প্রায় এসব অর্থ লিখা হয়েছে। আল্লামা তাহের পাটনী مجمع بحار النوار গ্রন্থে নেহায়ারই বরাতে এর পূর্ণ এবারত উদ্ধৃত করে দিয়েছে।

মিসবাহুল লুগাত যার মধ্যে আরবী শব্দসমূহের অর্থ উর্দু ভাষায় লিখা হয়েছে, এর মধ্যে এসব শব্দের তরজমা এসে গিয়েছে, যা আল কামূসুল মুহীত ও আকরাবুল মাওয়াবেদ ইত্যাদি কিতাবসমূহে লিখা হয়েছে। আমরা এখানে এর অবিকল এবারত উদ্ধৃত করছি।

'মাওলা' শব্দের অর্থ: মালিক ও সরদার, গোলাম আযাদকারী, আযাদকৃত, অনুগ্রহকারী, অনুগ্রহপ্রাপ্ত, ভালবাসা দানকারী, সাথী, চুক্তিকারী, প্রতিবেশী, মেহমান, অংশীদার, পুত্র, চাচাতো ভাই, ভাতিজা, চাচা, জামাতা, আত্মীয়, অভিভাবক, অনুসারী। (মিসবাহুল লুগাত: পৃষ্ঠা-৯৬৮)

একথা জানা থাকা চাই যে, কুরআন পাকের কোন আয়াতে অথবা হুযুর (ﷺ)-এর কোন বাণীতে অথবা যে কোন অলংকারপূর্ণ বক্তব্যে যখন কোন একাধিক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার হয়, তখন স্বয়ং এ শব্দে অথবা এর অগ্র পশ্চাতে এমন ইঙ্গিত বর্তমান থাকে, যা এ শব্দের অর্থ ও মর্মকে নির্ধারণ করে দেয়। এ ব্যাখ্যাধীন হাদীসে এমন ইঙ্গিত বর্তমান রয়েছে, যার দ্বারা এ হাদীসে উল্লেখিত 'মাওলা' শব্দটির অর্থ নির্দিষ্ট হয়ে যায়। হাদীসের শেষ দু‘আ সম্বলিত বাক্যটি হচ্ছে, اللهم! وال من والاه، وعاد من عاداه হে আল্লাহ্! যে ব্যক্তি আলীর সাথে বন্ধুত্ব রাখে, তুমি তাকে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা দান কর, আর যে তার সাথে শত্রুতা রাখে, তুমি তার সাথে শত্রুতার আচরণ কর।) এর দ্বারা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় যে, হাদীসের মধ্যে 'মাওলা' শব্দটি বন্ধু ও প্রিয়জনের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং من كنت مولاه فعلي مولاه এর অর্থ তাই, যা উপরে ব্যাখ্যায় বলে আসা হয়েছে।

তারপর হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর যা কিছু হয়েছে, এটা এ কথার উজ্জ্বল ও অকাট্য প্রমাণ যে, গাদীরে ঘুমের হাজার হাজার সাহাবীর এ সমাবেশের কোন একজন মানুষ- এমনকি স্বয়ং হযরত আলী এবং তাঁর অতি নিকটের লোকেরাও হুযূর (ﷺ)-এর এ বাণী ও বক্তব্যের মর্ম এটা বুঝেননি যে, হুযূর (ﷺ) তাঁর পরবর্তী সময়ের জন্য হযরত আলীর জন্য খেলাফত ও উম্মতের ইমাম হওয়ার কথা ঘোষণা করছেন। যদি স্বয়ং হযরত আলী রাযি. এবং তিনি ছাড়া অন্য যে কেউ এমন বুঝে থাকতেন, তাহলে তাদের অবশ্য কর্তব্য ছিল যে, যখন খেলাফতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হচ্ছিল, তখন তারা বলতেন যে, মাত্র সত্তর বাহাত্তর দিন পূর্বে 'গাদীরে ঘুম' নামক স্থানে হুযুর (ﷺ) হযরত আলীকে নিজের খলীফা ও স্থলাভিসিক্ত বানিয়ে দিয়েছেন এবং গুরুত্ব সহকারে এর ঘোষণা দিয়ে গিয়েছেন। এক কথায় এ বিষয়টির ফায়সালা স্বয়ং তিনি করে গিয়েছেন এবং হযরত আলীকে তাঁর পরবর্তী সময়ের জন্য খলীফা নির্বাচন করে গিয়েছেন। এখন তিনিই হুযুর (ﷺ)-এর খলীফা এবং তাঁর স্থলে উম্মতের ইমাম ও শাসক থাকবেন। কিন্তু এ কথা সবার জানা যে, না হযরত আলী রাযি. এ কথা বলেছেন, না অন্য কেউ; বরং সবাই হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. কে হুযূর (ﷺ) এর খলীফা ও স্থলাভিসিক্ত স্বীকার করে তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করে নিলেন। বরং ঘটনা এই যে, যদি শিয়া পণ্ডিতদের এ কথা মেনে নেওয়া হয় যে, হুযুর (ﷺ) গাদীরে ঘুমের এ ভাষণে من كنت مولاه فعلى مولاه বলে হযরত আলী রাযি.-এর খেলাফতের স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাহলে (আল্লাহ তা'আলার নিকট) হযরত আলী রাযি. সবচেয়ে বড় অপরাধী সাব্যস্ত হবেন যে, তিনি হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর এর ভিত্তিতে খেলাফতের দাবী কেন করলেন না? তার তো অবশ্য কর্তব্য ছিল যে, তিনি হুযুর (ﷺ)-এর এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং এ ঘোষণা কার্যকর করার জন্য ময়দানে নেমে আসবেন, আর যদি কোন আশঙ্কা থাকত, তাহলে এর মুকাবিলা করতেন। এ কথাটিই হযরত হাসান রাযি.-এর পৌত্র হাসান মুসাল্লাছ ঐ ব্যক্তির জবাবে বলেছিলেন যে, হযরত আলী রাযি. এর ব্যাপারে রাফেজীদের মত কট্টর আকীদা পোষণ করত এবং হুযুর (ﷺ)-এর বাণী: من كنت مولاه فعلى مولاه এর ব্যাপারে বলত যে, এ বাণীর দ্বারা হুযুর (ﷺ) হযরত আলী রাযি.-কে খলীফা মনোনীত করেছিলেন। হযরত হাসান মুসাল্লাছ ঐ ব্যক্তিকে বলেছিলেন:

وَلَوْ كَانَ الْأَمْرُ كَمَا تَقُولُونَ إِنَّ الله جل وعلى رسوله صلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اخْتَارًا عَلِيًّا لهذا الأمرُ وَالْقِيَامُ عَلَى النَّاسِ بَعْدَهُ فَإِنْ عَليًّا اعظم الناس خطيئة وجرما اذ ترك أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم .

যদি বিষয়টি তাই হয় যা তোমরা বলছ যে, আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) হযরত আলীকে তাঁর পরবর্তী সময়ের জন্য খেলাফত ও ইমামতের জন্য নির্বাচন করেছিলেন, তাহলে হযরত আলী সবচেয়ে বেশী অপরাধী হবেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশ অমান্য করেছেন। (এযালাতুল খেফা: পৃষ্ঠা-২২৩, খণ্ড-১)

তারপর যখন ঐ ব্যক্তি হযরত হাসান মুসাল্লাছ থেকে এ কথা শুনে নিজ আকীদার স্বপক্ষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বাণী: من كلت مؤلاءٌ فَعَلِيٌّ مَوْلاهُ এর বরাত দিল, তখন হাসান মুসাল্লাহ বললেন:

أَمَا وَاللَّهِ لَوْ يَعْنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِذَالِكَ الْأَمْرُ وَالسُّلْطَانُ وَالصِّيَامُ عَلَى النَّاسِ لأَفْصَحُ بِهِ كَمَا أَفْصَحُ بالصلوة والزكوة والصيام والحَج وَلَقَالَ أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ هَذَا الْوَلِيُّ بَعْدِي فَاسْمَعُوا وَاطِيعُوا.

শুনে রাখ, আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি যে, যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর উদ্দেশ্য এর দ্বারা হযরত আলীকে খলীফা ও শাসক বানানো হত, তাহলে কথাটি তিনি এমন স্পষ্ট করে বলতেন, যেভাবে নামায, যাকাত, রোযা ও হজ্বের ব্যাপারটি স্পষ্ট করে বলেছেন। তিনি পরিষ্কার বলতেন যে, হে লোকসকল! এ আলী আমার পর শাসন ক্ষমতার অধিকারী হবেন। অতঃপর তোমরা তাঁর কথা শুনবে ও তাঁর নির্দেশ পালন করবে। (এযালাতুল খেফা: পৃষ্ঠা-২২৩)

এখানে একটি কথা থেকে যায়, যা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে যে, তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উদ্দেশ্য এ বক্তব্য দ্বারা কি ছিল এবং হযরত আলী রাযি. সম্পর্কে এ ভাষণে একথাটি তিনি বিশেষ কি কারণে ও বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে বলেছিলেন।

ঘটনা এই যে, হুযুর (ﷺ) বিদায় হজ্বের কিছুদিন পূর্বে হযরত আলী রাযি. কে প্রায় তিনশ লোকের এক জামাআতসহ ইয়ামান পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বিদায় হজ্বে ইয়ামান থেকে মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। ইয়ামানে অবস্থানকালে তাঁর কয়েকজন সাথীর সাথে তাঁর কোন কোন পদক্ষেপের ব্যাপারে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তাঁরাও বিদায় হজ্বে অংশ গ্রহণের জন্য হযরত আলীর সাথে মক্কায় এসেছিলেন। এখানে এসে কেউ কেউ হুযুর (ﷺ)-এর নিকটও নিজেদের অনুভূতি ও ধারণা অনুযায়ী হযরত আলী রাযি.-এর ব্যাপারে অভিযোগ করলেন এবং অন্য লোকদের নিকটও এর আলোচনা করলেন। নিঃসন্দেহে এটা তাদের বড় ভুল ছিল। হুযুর (ﷺ)-এর নিকট যারা অভিযোগ করেছিলেন, হুযুর (ﷺ) আল্লাহর নিকট এবং দ্বীনি ক্ষেত্রে হযরত আলী রাযি.-এর যে মর্যাদা ও অবস্থান রয়েছে, সেটা তাদেরকে বলে দিয়ে এবং পদক্ষেপসমূহ সমর্থন করে তাদের ধারণার সংশোধন করে দিলেন। কিন্তু বিষয়টি অন্যদের নিকটও পৌঁছে গিয়েছিল। আর শয়তান এ ধরনের সুযোগ থেকে ফায়দা লুটে অন্তরে বিভেদ ও কলুষতা সৃষ্টি করে দেয়। তাই হুযুর (ﷺ) যখন এ পরিস্থিতি জানতে পারলেন, তখন তিনি এ প্রয়োজন অনুভব করলেন যে, হযরত আলী রাযি. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে যে গ্রহণযোগ্যতা ও প্রিয়পাত্র হওয়ার যে সৌভাগ্য লাভে ধন্য হয়ে আছেন, এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে অবহিত করা হোক এবং গুরুত্ব সহকারে এর ঘোষণা ও প্রচার করা হোক। এ উদ্দেশ্যেই তিনি গাদীরে ঘুমের এ ভাষণে যার জন্য তিনি আপন সফরসঙ্গী সাহাবীদেরকে সমবেত করেছিলেন- বিশেষ গুরুত্বসহকারে হযরত আলী রাযি.-এর হাত নিজের হাতের ভিতর নিয়ে বলেছিলেন:

من كُنت مَوْلاهُ فَعَلى مَوْلاه اللهم وال من والاه وعادَ مِنْ عاداه

পূর্বেই যেমন উল্লেখ করে আসা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ)-এর এ কথার মর্ম এটাই যে, আমি যার প্রিয়পাত্র, আলীও তার প্রিয়পাত্র। অতএব, যে আমাকে ভালবাসে সে যেন আলীকেও ভালবাসে। সামনে তিনি দু‘আ করছেন, হে আল্লাহ্! যে ব্যক্তি আলীর সাথে ভালবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখে, তাকে তুমি তোমার ভালবাসা ও বন্ধুত্ব দান কর, আর যে আলীর সাথে শত্রুতা রাখে, তুমি তার সাথে শত্রুতার আচরণ কর। আগেও যেমন বলে আসা হয়েছে যে, এ দু‘আ সম্বলিত বাক্যটি এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যে, এ হাদীসে মাওলা শব্দটি প্রিয়পাত্র ও বন্ধুর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

সারকথা, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণীর من انت مَوْلاهُ فعلى مَوْلاهُ সাথে ইমামত ও খেলাফতের কোন সম্পর্ক নেই। আশা করি, এ পর্যন্ত এ প্রসঙ্গে যা নিবেদন করা হয়েছে, এটা প্রতিটি ঈমানদার ও সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে।
(إن في ذلك لذكرى لمن كان له قلب أو الْقِي السمع وهو شهيد)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৯২ | মুসলিম বাংলা