মা'আরিফুল হাদীস
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হাদীস নং: ১৬৪
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত উসমান যিন্নুরাইন রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৬৪. হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন (হুদায়বিয়ার) বায়আতে রিযওয়ানের নির্দেশ দিলেন, সে সময় হযরত উসমান রাযি. রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দূত হিসাবে মক্কায় ছিলেন। লোকেরা (যারা উপস্থিত ছিল,) বায়আত গ্রহণ করে নিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন, উসমান রাযি. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাজে মক্কায় রয়েছে। (সে যদি উপস্থিত থাকত, তাহলে তোমাদের সাথে সেও বায়আতে শরীক থাকত। তাই আমি তাঁর পক্ষ থেকে বায়আত গ্রহণ করছি।) তারপর তিনি (হযরত উসমানের পক্ষ থেকে) নিজেরই এক হাত অপর হাতের উপর রাখলেন। (হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আনাস বলেন,) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হাত যা দ্বারা তিনি উসমানের পক্ষ থেকে বায়আত গ্রহণ করছিলেন, এটা হযরত উসমানের জন্য অন্যান্য লোকের হাত থেকে উত্তম হয়ে গেল, যারা নিজ হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিল। -তিরমিযী
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ أَنَسِ قَالَ: قَالَ لَمَّا أُمِرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِبَيْعَةِ الرِّضْوَانِ كَانَ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّانَ رَسُولَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى مَكَّةَ فَبَايَعَ النَّاسَ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ عُثْمَانَ فِي حَاجَةِ اللهِ وَحَاجَةِ رَسُولِهِ. فَضَرَبَ بِإِحْدَى يَدَيْهِ عَلَى الأُخْرَى، فَكَانَتْ يَدُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعُثْمَانَ خَيْرًا مِنْ أَيْدِيهِمْ لأَنْفُسِهِمْ. (رواه الترمذى)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
বায়আতে রিযওয়ানের ঘটনা সুবিদিত ও প্রসিদ্ধ। কুরআন মজীদেও এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কেবল এতটুকু আলোচনা করা হচ্ছে, যতটুকু হাদীসের মর্মার্থ বুঝার জন্য জরুরী।
হিজরী ষষ্ঠ বর্ষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি স্বপ্নের ভিত্তিতে অনেক সাহাবায়ে কেরামের পীড়াপীড়িতে উমরা আদায়ের জন্য মক্কা শরীফ যাওয়ার ইচ্ছা করলেন।
যারা বিষয়টি জানতে পারলেন, তারা এ মুবারক সফরে হুযুর (ﷺ)-এর সাথী হওয়া ও উমরার সৌভাগ্য লাভের জন্য সঙ্গী হয়ে গেলেন।
এ সফরসঙ্গীদের সংখ্যা চৌদ্দশ'র কাছাকাছি হয়ে গেল। যেহেতু সফর উমরার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল এবং যিলকদ মাসে হয়েছিল- যা হারাম ও সম্মানিত মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং মক্কার মুশরিকরাও যার সম্মান করত ও যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকত, এ জন্য এর কোন প্রয়োজন মনে করা হয়নি যে, আগেই কাউকে পাঠিয়ে মক্কাবাসীদের সম্মতি নেওয়া হোক। মক্কার মুশরিকরা তখন হুযুর (ﷺ)-এর এবং তাঁর আনীত দ্বীনের চরম শত্রু ছিল। যখন তারা জানতে পারল যে, হুযুর (ﷺ) এক বিরাট দল নিয়ে মক্কায় আসছেন, তখন তারা পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে, তাঁকে এবং তাঁর সাথীদেরকে আমরা আমাদের নগরী মক্কায় প্রবেশ করতে দিব না। যখন হুযুর (ﷺ) এবং তাঁর কাফেলা মক্কার নিকটবর্তী হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে গেলেন, (যেখান থেকে মক্কার দূরত্ব বিশ মাইলের কিছু বেশী।) তখন তিনি মক্কাবাসীদের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারলেন। তিনি কাফেলাসহ হুদায়বিয়ায় অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং হযরত উসমান রাযি.-কে কুরাইশ সর্দারদের সাথে কথাবার্তা বলার জন্য নিজের বিশেষ দূত বানিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। হযরত উসমানকে তিনি এ জন্য নির্বাচন করলেন যে, বিরোধী নেতাদের মধ্যে তাঁর কিছু নিকটাত্মীয় ছিল। হুযুর (ﷺ) তাঁকে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলেন যে, তিনি যেন কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে বিশেষভাবে এ কথাটি বুঝিয়ে দেন যে, আমরা কেবল উমরার জন্য এসেছি। এর বাইরে আমাদের কোন উদ্দেশ্য নেই, আমরা উমরা আদায় করেই মদীনায় ফিরে যাব।
হযরত উসমান রাযি. মক্কায় চলে গেলেন, কিন্তু সময়ের হিসাবে যে সময় ফিরে আসার কথা সে সময় ফিরে আসেননি। এ দিকে হুযুর (ﷺ)-এর কাফেলায় কোনভাবে এ সংবাদ প্রচারিত হয়ে গেল যে, হযরত উসমানকে শত্রুরা শহীদ করে ফেলেছে। এতে হুযুর (ﷺ) অত্যন্ত মর্মাহত হলেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, যদি এমনটাই হয়ে থাকে, তাহলে যুদ্ধ হবে। সকল সাথীদের মধ্যেও এ সংবাদে চরম উত্তেজনা দেখা দিল। এ পর্যায়ে হুযুর (ﷺ) সাহাবায়ে কেরাম থেকে জেহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ও এতে শাহাদত বরণ পর্যন্ত দৃঢ়পদ থাকার বিশেষ বায়আত ও অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন। এ বায়আত ও প্রতিশ্রুতি একটি বৃক্ষের নীচে নেওয়া হয়েছিল। কুরআন মজীদে এ ক্ষেত্রে বায়আত গ্রহণকারীদের জন্য আল্লাহ্ তা'আলার সবিশেষ সন্তুষ্টির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ জন্যই এর নাম 'বায়আতে রিযওয়ান' (তথা সন্তুষ্টির বায়আত) নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ বায়আত যখন অনুষ্ঠিত হয়, তখন হযরত উসমান রাযি. উপস্থিত ছিলেন না, হুযূর(ﷺ)-এর দূত হিসাবে মক্কায় গিয়েছিলেন। হুদায়বিয়ায় উপস্থিত সকল সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে বায়আত গ্রহণ করলেন। আর হযরত উসমানের অবর্তমানে হুযুর (ﷺ) নিজের একটি হাত হযরত উসমানের হাত সাব্যস্ত করে অপর হাতের উপর রেখে বায়আত করলেন। নিঃসন্দেহে এটা হযরত উসমান রাযি.-এর একটি বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা।
পরে জানা গেল যে, হযরত উসমান রাযি.-এর শাহাদতের সংবাদটি সঠিক ছিল না। তিনি কথাবার্তা বলে সেখান থেকে ফিরে আসলেন। কিন্তু তখন মক্কাবাসী ও কুরাইশ নেতৃবৃন্দ হুযুর (ﷺ) ও তাঁর সাথীদেরকে উমরা আদায়ের জন্য মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দিতে কোনভাবেই রাজী হল না। তারপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে কথাবার্তা বলার জন্য একের পর এক প্রতিনিধি আসল এবং পরিশেষে ঐ সন্ধি সম্পাদিত হল, যা 'হুদায়বিয়ার সন্ধি' নামে ইসলামের ইতিহাসে এক সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা হয়ে আছে এবং কুরআন মজীদে এটাকে 'ফাতহে মুবীন' বলা হয়েছে। (বিস্তারিত সীরাত ও ইতিহাসের কিতাবসমূহে দেখে নেওয়া যেতে পারে।)
হিজরী ষষ্ঠ বর্ষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি স্বপ্নের ভিত্তিতে অনেক সাহাবায়ে কেরামের পীড়াপীড়িতে উমরা আদায়ের জন্য মক্কা শরীফ যাওয়ার ইচ্ছা করলেন।
যারা বিষয়টি জানতে পারলেন, তারা এ মুবারক সফরে হুযুর (ﷺ)-এর সাথী হওয়া ও উমরার সৌভাগ্য লাভের জন্য সঙ্গী হয়ে গেলেন।
এ সফরসঙ্গীদের সংখ্যা চৌদ্দশ'র কাছাকাছি হয়ে গেল। যেহেতু সফর উমরার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল এবং যিলকদ মাসে হয়েছিল- যা হারাম ও সম্মানিত মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং মক্কার মুশরিকরাও যার সম্মান করত ও যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকত, এ জন্য এর কোন প্রয়োজন মনে করা হয়নি যে, আগেই কাউকে পাঠিয়ে মক্কাবাসীদের সম্মতি নেওয়া হোক। মক্কার মুশরিকরা তখন হুযুর (ﷺ)-এর এবং তাঁর আনীত দ্বীনের চরম শত্রু ছিল। যখন তারা জানতে পারল যে, হুযুর (ﷺ) এক বিরাট দল নিয়ে মক্কায় আসছেন, তখন তারা পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে, তাঁকে এবং তাঁর সাথীদেরকে আমরা আমাদের নগরী মক্কায় প্রবেশ করতে দিব না। যখন হুযুর (ﷺ) এবং তাঁর কাফেলা মক্কার নিকটবর্তী হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে গেলেন, (যেখান থেকে মক্কার দূরত্ব বিশ মাইলের কিছু বেশী।) তখন তিনি মক্কাবাসীদের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারলেন। তিনি কাফেলাসহ হুদায়বিয়ায় অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং হযরত উসমান রাযি.-কে কুরাইশ সর্দারদের সাথে কথাবার্তা বলার জন্য নিজের বিশেষ দূত বানিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। হযরত উসমানকে তিনি এ জন্য নির্বাচন করলেন যে, বিরোধী নেতাদের মধ্যে তাঁর কিছু নিকটাত্মীয় ছিল। হুযুর (ﷺ) তাঁকে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলেন যে, তিনি যেন কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে বিশেষভাবে এ কথাটি বুঝিয়ে দেন যে, আমরা কেবল উমরার জন্য এসেছি। এর বাইরে আমাদের কোন উদ্দেশ্য নেই, আমরা উমরা আদায় করেই মদীনায় ফিরে যাব।
হযরত উসমান রাযি. মক্কায় চলে গেলেন, কিন্তু সময়ের হিসাবে যে সময় ফিরে আসার কথা সে সময় ফিরে আসেননি। এ দিকে হুযুর (ﷺ)-এর কাফেলায় কোনভাবে এ সংবাদ প্রচারিত হয়ে গেল যে, হযরত উসমানকে শত্রুরা শহীদ করে ফেলেছে। এতে হুযুর (ﷺ) অত্যন্ত মর্মাহত হলেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, যদি এমনটাই হয়ে থাকে, তাহলে যুদ্ধ হবে। সকল সাথীদের মধ্যেও এ সংবাদে চরম উত্তেজনা দেখা দিল। এ পর্যায়ে হুযুর (ﷺ) সাহাবায়ে কেরাম থেকে জেহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ও এতে শাহাদত বরণ পর্যন্ত দৃঢ়পদ থাকার বিশেষ বায়আত ও অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন। এ বায়আত ও প্রতিশ্রুতি একটি বৃক্ষের নীচে নেওয়া হয়েছিল। কুরআন মজীদে এ ক্ষেত্রে বায়আত গ্রহণকারীদের জন্য আল্লাহ্ তা'আলার সবিশেষ সন্তুষ্টির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ জন্যই এর নাম 'বায়আতে রিযওয়ান' (তথা সন্তুষ্টির বায়আত) নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ বায়আত যখন অনুষ্ঠিত হয়, তখন হযরত উসমান রাযি. উপস্থিত ছিলেন না, হুযূর(ﷺ)-এর দূত হিসাবে মক্কায় গিয়েছিলেন। হুদায়বিয়ায় উপস্থিত সকল সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে বায়আত গ্রহণ করলেন। আর হযরত উসমানের অবর্তমানে হুযুর (ﷺ) নিজের একটি হাত হযরত উসমানের হাত সাব্যস্ত করে অপর হাতের উপর রেখে বায়আত করলেন। নিঃসন্দেহে এটা হযরত উসমান রাযি.-এর একটি বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা।
পরে জানা গেল যে, হযরত উসমান রাযি.-এর শাহাদতের সংবাদটি সঠিক ছিল না। তিনি কথাবার্তা বলে সেখান থেকে ফিরে আসলেন। কিন্তু তখন মক্কাবাসী ও কুরাইশ নেতৃবৃন্দ হুযুর (ﷺ) ও তাঁর সাথীদেরকে উমরা আদায়ের জন্য মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দিতে কোনভাবেই রাজী হল না। তারপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে কথাবার্তা বলার জন্য একের পর এক প্রতিনিধি আসল এবং পরিশেষে ঐ সন্ধি সম্পাদিত হল, যা 'হুদায়বিয়ার সন্ধি' নামে ইসলামের ইতিহাসে এক সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা হয়ে আছে এবং কুরআন মজীদে এটাকে 'ফাতহে মুবীন' বলা হয়েছে। (বিস্তারিত সীরাত ও ইতিহাসের কিতাবসমূহে দেখে নেওয়া যেতে পারে।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)