মা'আরিফুল হাদীস
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হাদীস নং: ১৪৪
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর ফযীলত ও মর্যাদা
১৪৪. হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, এক দিন তাঁর সামনে আবূ বকর রাযি.-এর কথা আলোচনা করা হলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, আমার আন্তরিক বাসনা যে, আমার সারা জীবনের আমল যদি আবু বকরের এক দিনের আমলের সমান হয়ে যেত এবং তাঁর জীবনের রাত সমূহের এক রাতের আমলের সমান হয়ে যেত। (অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে আমার সারা জীবনের আমলের ঐ বিনিময় যদি দান করেন, যা আবু বকরের এক দিন ও এক রাতের আমলের প্রতিদান হবে, তাহলে আমি এতে খুশী থাকব।) তাঁর যে রাতটির কথা বলেছি, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল ঐ রাত, যে বিশেষ রাতে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে হিজরতের সফরে সাওর গুহার দিকে রওয়ানা হয়ে ছিলেন। তিনি যখন গুহার কাছে পৌঁছলেন (এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গুহার ভিতর প্রবেশ করতে চাইলেন, তখন তিনি বললেন, আল্লাহর দোহাই। আপনি এখনই গুহায় প্রবেশ করবেন না। আমি আগে গুহায় প্রবেশ করব। সেখানে যদি কোন বিনাশক জিনিস থাকে, (যেমন হিংসপ্রাণী, সাপ-বিচ্ছু জাতীয় বিষাক্ত প্রাণী,) তাহলে যা হবে আমার হবে, আপনি নিরাপদ থেকে যাবেন। তারপর আবু বকর রাযি. গুহার ভিতর চলে গেলেন এবং এটা পরিষ্কার করে নিলেন। এ গুহায় এক দিকে কয়েকটি ছিদ্র ছিল। তিনি নিজের লুঙ্গি ছিড়ে এর টুকরোগুলো দিয়ে ছিদ্রগুলো বন্ধ করলেন, কিন্তু দু'টি ছিদ্র অবশিষ্ট রয়ে গেল। আবূ বকর রাযি. তখন তাঁর পা দু'টি এ দু'টির মুখে রেখে দিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বললেন, এবার আপনি ভিতরে প্রবেশ করুন। তিনি তখন গুহার ভিতর প্রবেশ করলেন এবং আবু বকরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এরই মধ্যে আবু বকরের পায়ে সাপে দংশন করল; কিন্তু তিনি এ আশংকায় একটুও নড়াচড়া করলেন না যে, এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ঘুম ভেঙ্গে যাবে। এক সময় বিষের জ্বালায় তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চেহারায় গড়িয়ে পড়ল। (এতে তাঁর চোখ খুলে গেল এবং আবু বকরের চোখ থেকে পানি পড়তে দেখে) তিনি বললেন, হে আবু বকর রাযি.। তোমার কি হয়েছে? আবূ বকর রাযি. উত্তর দিলেন, আমার পিতামাতা আপনার উপর কুরবান হোন। আমাকে সাপে দংশন করেছে। তিনি তখন (ঐ দংশিত স্থানে) নিজের মুখের থুথু লাগিয়ে দিলেন। তখন আবু বকরের যে কষ্ট হচ্ছিল সেটা দূর হয়ে গেল। হযরত উমর রাযি. বলেন, (তারপর আবু বকরের ওফাতের আগে) ঐ বিষের প্রভাব দেখা দিল এবং এটাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে গেল। (এভাবে শাহাদাত ফী সাবীলিল্লাহর মর্যাদাও তাঁর লাভ হয়ে গেল। আর এটা ঠিক এমনই হয়েছে, যেমন খায়বারে খাওয়া বিষমাখা গোশতের বিষক্রিয়া প্রায় চার বছর পর হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের নিকটবর্তী সময়ে পুনরায় দেখা দিয়েছিল এবং এটাই তাঁর ওফাতের কারণ হয়েছিল। (হযরত উমর রাযি. বলেন) আর আবূ বকরের একটি দিন দ্বারা আমার উদ্দেশ্য ঐ দিনটি, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওফাত হয়ে গেল এবং আরবের (কোন এক অঞ্চলের) লোক মুরতাদ হয়ে গেল এবং যাকাত আদায় করতে অস্বীকার করল, তখন আবু বকর রাযি. বললেন, তারা যদি উট বাঁধার একটি রশি দিতেও অস্বীকার করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা। (এ মুহূর্তে) আপনি লোকদের সাথে নম্র আচরণ ও তাদের মন জয়ের চেষ্টা করুন। আবু বকর রাযি. তখন (রাগের সাথে) আমাকে বললেন, তুমি তো জাহিলিয়্যত যুগে খুবই কঠোর ও সাহসী ছিলে, ইসলামের যুগে এসে কি ভয়কাতুরে হয়ে গেলে। (এটা কেমন পরিবর্তন?) ওহীর ধারা (হুযূর (ﷺ)-এর ওফাতের পর) বন্ধ হয়ে গিয়েছে, দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে। আমি জীবিত থাকব আর দ্বীনের মধ্যে পূর্ণতা ক্ষুণ্ণ হবে। (এটা তো হতে পারে না।) -মুসনাদে রযীন
کتاب المناقب والفضائل
عَنْ عُمَرَ ذُكِرَ عِنْدَهُ أَبُو بَكْرٍ فَبَكَى وَقَالَ: وَدِدْتُ أَنَّ عَمَلِي كُلَّهُ مِثْلُ عَمَلِهِ يَوْمًا وَاحِدًا مِنْ أَيَّامِهِ وَلَيْلَةً وَاحِدَةً مِنْ لَيَالِيهِ أَمَّا لَيْلَتُهُ فَلَيْلَةٌ سَارَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْغَار فَلَمَّا انتهينا إِلَيْهِ قَالَ: وَاللَّهِ لَا تَدْخُلُهُ حَتَّى أَدْخُلَ قَبْلَكَ فَإِنْ كَانَ فِيهِ شَيْءٌ أَصَابَنِي دُونَكَ فَدَخَلَ فَكَسَحَهُ وَوَجَدَ فِي جَانِبِهِ ثُقْبًا فَشَقَّ إزَاره وسدها بِهِ وَبَقِي مِنْهَا اثْنَان فألقمها رِجْلَيْهِ ثُمَّ قَالَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ادْخُلْ فَدَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَوُضِعَ رَأسه فِي حجره وَنَامَ فَلُدِغَ أَبُو بَكْرٍ فِي رِجْلِهِ مِنَ الْجُحر وَلم يَتَحَرَّك مَخَافَة أَن ينتبه رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَقَطَتْ دُمُوعُهُ عَلَى وَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَا لَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ؟» قَالَ: لُدِغْتُ فِدَاكَ أَبِي وَأُمِّي فَتَفِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَهَبَ مَا يَجِدُهُ ثُمَّ انْتَقَضَ عَلَيْهِ وَكَانَ سَبَبَ مَوْتِهِ وَأَمَّا يَوْمُهُ فَلَمَّا قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ارْتَدَّتِ الْعَرَبُ وَقَالُوا: لَا نُؤَدِّي زَكَاةً. فَقَالَ: لَوْ مَنَعُونِي عِقَالًا لَجَاهَدْتُهُمْ عَلَيْهِ. فَقُلْتُ: يَا خَلِيفَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَأَلَّفِ النَّاسَ وَارْفُقْ بِهِمْ. فَقَالَ لِي: أَجَبَّارٌ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَخَوَّارٌ فِي الْإِسْلَامِ؟ إِنَّهُ قَدِ انْقَطَعَ الْوَحْيُ وَتَمَّ الدِّينُ أَيَنْقُصُ وَأَنا حَيّ؟ (رَوَاهُ رزين)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হাদীসটির মর্ম বুঝার জন্য যতটুকু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল, তা তরজমার মধ্যেই করে দেওয়া হয়েছে। তবে হযরত উমর রাযি. তাঁর এ বক্তব্যে মুরতাদদের বিরুদ্ধে জেহাদ প্রসঙ্গে হযরত আবু বকর রাযি.-এর যে সাহসী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে তাঁর যে শেষ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন أينقص الدين وأنا حي -ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে কিছু আরয করা জরুরী মনে করছি।
বাস্তব ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওফাতে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য উপকরণ জগতের দৃষ্টিতে বিরাট আশংকাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। মাথার উপর থেকে হুযুর (ﷺ)-এর ছায়া উঠে যাওয়ার কারণে যে নৈরাশ্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, এটা অনুমান করা কঠিন কোন বিষয় নয়। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের মৃত্যুশয্যায়ই হযরত উসামার নেতৃত্বে এক বিরাট কার্যোপলক্ষ্যে সেনা অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী এ সেনা অভিযান অনতিবিলম্বে পরিচালনা করা হোক। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুসলিম সৈন্যদের একটি দল সেখানে রওয়ানা হয়ে গেল। এভাবে তখনকার সামরিক শক্তির একটি বড় অংশ সে রণাঙ্গনে চলে গেল। এ ছাড়া পবিত্র হেজায ভূমির নিকটবর্তী অঞ্চল ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাব হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই নবুওয়াতের দাবী করেছিল এবং কয়েকটি গোত্র তার পক্ষে এসে গিয়ে ছিল। এভাবে যেন একটি রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গিয়েছিল। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এ ফেতনাকেও দ্রুত নির্মূল করতে হবে। তাই হযরত খালেদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে এর জন্যও একটি বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ দিলেন। এসব অবস্থার মধ্যেই হেজাযেরই কোন কোন অঞ্চলের লোকেরা (যারা সবে মাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল।) যাকাত প্রদানে সমষ্টিগতভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। হযরত আবূ বকর রাযি. এটাকে এরতেদাদ তথা ধর্মত্যাগের মত জঘন্য অপরাধ মনে করলেন এবং এর বিরুদ্ধেও জেহাদ ও সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। এর ফল এই হতে পারত যে, তখনকার সকল সামরিক শক্তি ঐসব রনাঙ্গণে চলে যেত, আর এ দিকে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মদীনা মুনাওয়ারার এ অবস্থা হয়ে যেত যে, যদি কোন শত্রু আক্রমণ করে অথবা আশেপাশের মুনাফিকরা যদি কোন ফেতনা সৃষ্টি করে, তাহলে এর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন সামরিক শক্তি বর্তমান থাকত না। এ জন্য হযরত উমর রাযি. মত দেন আর কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলীরও অভিমত ছিল যে, এ নাজুক পরিস্থিতিতে এ মুহূর্তে যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ও সেনা অভিযান চালানো না হোক; বরং পরিণামদর্শিতা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসাবে তাদের ব্যাপারে কিছুটা নম্র আচরণ করা হোক। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের অন্তরে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন যে, এরতেদাদ তথা দ্বীন বর্জনের এ ফেতনার মূলোৎপাটন এ মুহূর্তেই জরুরী, কোন অজুহাতে এটাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। যাকাত দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন, নামাযের মতই এটা যেন ঈমানের অংশ। এটা আদায়ে অস্বীকৃতিকে মেনে নেওয়ার অর্থ হবে দ্বীনের মধ্যে কাটছাটকে মেনে নেওয়া। তাই তিনি বলে দিলেন, দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে, ওহীর ধারা শেষ ও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দ্বীনকে যে আকৃতি ও স্বরূপে রেখে গিয়েছেন, নিজের জীবন দিয়ে হলেও এটা হেফাযত করা আমাদের ফরয কর্তব্য। এসব কথার প্রসঙ্গে শেষে তিনি বলেছেন: أينقص الدين وأنا حي (আমি জীবিত থাকতে দ্বীনের ক্ষতি হবে?) হযরত আবূ বকর রাযি.-এর এ দু'টি শব্দ দ্বারা দ্বীনের সাথে তাঁর যে সবিশেষ প্রেমিকসুলভ সম্পর্ক এবং এর পথে আত্মত্যাগের যে আবেগ ফুটে উঠেছে, অধম সংকলক এটা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম।
এ ঘটনায় এই সূক্ষ্ম বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ও আমাদের সবক গ্রহণ করার মত যে, হযরত উমর রাযি.-এর অভিমত ও রায় হযরত আবূ বকর রাযি.-এর এ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের বিপরীত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে এ সিদ্ধান্তটিই তাঁর দৃষ্টিতে এত বড় হয়ে গেল যে, নিজের সারা জীবনের আমলকে তিনি হযরত আবু বকরের ঐ একটি আমলের চেয়েও ছোট মনে করতে শুরু করলেন এবং প্রকাশ্যে এটা স্বীকারও করলেন। رضى اللَّهُ عَنْهُمَا وراضا هما
বাস্তব ঘটনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওফাতে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য উপকরণ জগতের দৃষ্টিতে বিরাট আশংকাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। মাথার উপর থেকে হুযুর (ﷺ)-এর ছায়া উঠে যাওয়ার কারণে যে নৈরাশ্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, এটা অনুমান করা কঠিন কোন বিষয় নয়। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের মৃত্যুশয্যায়ই হযরত উসামার নেতৃত্বে এক বিরাট কার্যোপলক্ষ্যে সেনা অভিযানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী এ সেনা অভিযান অনতিবিলম্বে পরিচালনা করা হোক। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুসলিম সৈন্যদের একটি দল সেখানে রওয়ানা হয়ে গেল। এভাবে তখনকার সামরিক শক্তির একটি বড় অংশ সে রণাঙ্গনে চলে গেল। এ ছাড়া পবিত্র হেজায ভূমির নিকটবর্তী অঞ্চল ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাব হুযুর (ﷺ)-এর জীবদ্দশাতেই নবুওয়াতের দাবী করেছিল এবং কয়েকটি গোত্র তার পক্ষে এসে গিয়ে ছিল। এভাবে যেন একটি রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গিয়েছিল। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর ওফাতের পর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এ ফেতনাকেও দ্রুত নির্মূল করতে হবে। তাই হযরত খালেদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে এর জন্যও একটি বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ দিলেন। এসব অবস্থার মধ্যেই হেজাযেরই কোন কোন অঞ্চলের লোকেরা (যারা সবে মাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিল।) যাকাত প্রদানে সমষ্টিগতভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। হযরত আবূ বকর রাযি. এটাকে এরতেদাদ তথা ধর্মত্যাগের মত জঘন্য অপরাধ মনে করলেন এবং এর বিরুদ্ধেও জেহাদ ও সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। এর ফল এই হতে পারত যে, তখনকার সকল সামরিক শক্তি ঐসব রনাঙ্গণে চলে যেত, আর এ দিকে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মদীনা মুনাওয়ারার এ অবস্থা হয়ে যেত যে, যদি কোন শত্রু আক্রমণ করে অথবা আশেপাশের মুনাফিকরা যদি কোন ফেতনা সৃষ্টি করে, তাহলে এর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন সামরিক শক্তি বর্তমান থাকত না। এ জন্য হযরত উমর রাযি. মত দেন আর কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলীরও অভিমত ছিল যে, এ নাজুক পরিস্থিতিতে এ মুহূর্তে যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ও সেনা অভিযান চালানো না হোক; বরং পরিণামদর্শিতা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসাবে তাদের ব্যাপারে কিছুটা নম্র আচরণ করা হোক। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের অন্তরে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন যে, এরতেদাদ তথা দ্বীন বর্জনের এ ফেতনার মূলোৎপাটন এ মুহূর্তেই জরুরী, কোন অজুহাতে এটাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। যাকাত দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন, নামাযের মতই এটা যেন ঈমানের অংশ। এটা আদায়ে অস্বীকৃতিকে মেনে নেওয়ার অর্থ হবে দ্বীনের মধ্যে কাটছাটকে মেনে নেওয়া। তাই তিনি বলে দিলেন, দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে, ওহীর ধারা শেষ ও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দ্বীনকে যে আকৃতি ও স্বরূপে রেখে গিয়েছেন, নিজের জীবন দিয়ে হলেও এটা হেফাযত করা আমাদের ফরয কর্তব্য। এসব কথার প্রসঙ্গে শেষে তিনি বলেছেন: أينقص الدين وأنا حي (আমি জীবিত থাকতে দ্বীনের ক্ষতি হবে?) হযরত আবূ বকর রাযি.-এর এ দু'টি শব্দ দ্বারা দ্বীনের সাথে তাঁর যে সবিশেষ প্রেমিকসুলভ সম্পর্ক এবং এর পথে আত্মত্যাগের যে আবেগ ফুটে উঠেছে, অধম সংকলক এটা ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম।
এ ঘটনায় এই সূক্ষ্ম বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ও আমাদের সবক গ্রহণ করার মত যে, হযরত উমর রাযি.-এর অভিমত ও রায় হযরত আবূ বকর রাযি.-এর এ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের বিপরীত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে এ সিদ্ধান্তটিই তাঁর দৃষ্টিতে এত বড় হয়ে গেল যে, নিজের সারা জীবনের আমলকে তিনি হযরত আবু বকরের ঐ একটি আমলের চেয়েও ছোট মনে করতে শুরু করলেন এবং প্রকাশ্যে এটা স্বীকারও করলেন। رضى اللَّهُ عَنْهُمَا وراضا هما
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)