মা'আরিফুল হাদীস
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
হাদীস নং: ১২৫
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
ওফাত ও ওফাতপূর্ব অসুস্থতা
১২৫. সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস (একদিন) বললেন, হায়! বৃহস্পতিবার, কেমন ছিল বৃহস্পতিবার দিনটি? (একথা বলে) তিনি এমন কাঁদলেন যে, তার চোখের পানিতে যমীনের পাথরদানা গুলো ভিজে গেল। আমি নিবেদন করলাম, হে ইবনে আব্বাস। বৃহস্পতিবার দিনটি কি ছিল? (যার কথা আপনি এভাবে স্মরণ করছেন।) তিনি তখন বললেন, (বৃহস্পতিবার দিন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর অসুখ বেড়ে গেল এ অবস্থায়ই) তিনি বললেন, كتف (পশুর কাঁধের হাঁড়) নিয়ে আস, আমি তোমাদের জন্য একটি লিপিকা লিখে দিব, যারপর তোমরা কখনো পথহারা হবে না। কিন্তু উপস্থিত লোকেরা তখন মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে গেল, অথচ নবীর সামনে মতবিরোধ ও বাকবিতন্ডা করা উচিত নয়। কেউ কেউ বলল, তিনি কি আমাদেরকে ছেড়ে যাচ্ছেন? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর, (তিনি কি বলেন এবং তাঁর উদ্দেশ্য কি?) তারপর লোকেরা বারবার তাঁর কাছে এ নিবেদন করতে থাকলে তিনি বললেন, আমি যে কাজে ও যে অবস্থায় রয়েছি, সেটা এর চেয়ে অনেক ভাল- যার প্রতি তোমরা আমাকে আহ্বান করছ। তারপর তিনি তিনটি বিষয়ের নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, তোমরা ইয়াহুদীদেরকে আরব দ্বীপ থেকে বের করে দাও। (কোন রাষ্ট্র অথবা গোত্রের পক্ষ থেকে আগত) প্রতিনিধিদের সাথে সেই সুন্দর আচরণ কর, যেমন আচরণ আমি করতাম। সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে এ হাদীসের রাবী সুলায়মান বলেন, সাঈদ ইবনে জুবাইর হয়ত তৃতীয় বিষয়টি বর্ণনাই করেননি অথবা বর্ণনা করেছেন, কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। -বুখারী, মুসলিম
کتاب المناقب والفضائل
قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: يَوْمُ الْخَمِيسِ وَمَا يَوْمُ الْخَمِيسِ؟ ثُمَّ بَكَى حَتَّى بَلَّ دَمْعُهُ الْحَصَى. قُلْتُ: يَا ابْنَ عَبَّاسٍ وَمَا يَوْمُ الْخَمِيسِ؟ قَالَ: اشْتَدَّ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَجَعُهُ فَقَالَ: «ائْتُونِي بِكَتِفٍ أَكْتُبْ لَكُمْ كِتَابًا لَا تَضِلُّوا بَعْدَهُ أَبَدًا» . فَتَنَازَعُوا وَلَا يَنْبَغِي عِنْدَ نَبِيٍّ تَنَازُعٌ. فَقَالُوا: مَا شَأْنُهُ أَهَجَرَ؟ اسْتَفْهِمُوهُ فَذَهَبُوا يَرُدُّونَ عَلَيْهِ. فَقَالَ: «دَعُونِي ذَرُونِي فَالَّذِي أَنَا فِيهِ خَيْرٌ مِمَّا تَدْعُونَنِي إِلَيْهِ» . فَأَمَرَهُمْ بِثَلَاثٍ: فَقَالَ: «أَخْرِجُوا الْمُشْرِكِينَ مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَأَجِيزُوا الْوَفْدَ بِنَحْوِ مَا كُنْتُ أُجِيزُهُمْ» . وَسَكَتَ عَنِ الثَّالِثَةِ أَوْ قَالَهَا فَنَسِيتُهَا قَالَ سُفْيَانُ: هَذَا مِنْ قَول سُلَيْمَان. (رواه البخارى ومسلم)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
একই ঘটনা সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের এ দুটি বর্ণনা। তবে এগুলোর মধ্যে কোন বিরোধ ও বৈপরীত্য নেই, কেবল কোন কোন অংশের কমবেশীর পার্থক্য রয়েছে। সম্ভবতঃ এর কারণ এই যে, যখন ইবনে আব্বাস এ ঘটনা উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহর সামনে বর্ণনা করেছেন, তখন কেবল ঐ অংশসমূহ বর্ণনা করেছেন, যেগুলো, প্রথম রিওয়ায়াতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সে সময় হুযুর (ﷺ)-এর সামনে হযরত উমরের উপস্থিতির কথা এবং তিনি যা বলেছিলেন, সেটারও উল্লেখ করেছেন। আর যখন সাঈদ ইবনে জুবাইবের সামনে বর্ণনা করেছেন, তখন হযরত উমরের উপস্থিতির কথা তো উল্লেখ করেননি; কিন্তু কয়েকটি এমন কথা বর্ণনা করেছেন, যা প্রথম বর্ণনায় উল্লেখ করেননি। আর এমনটি অনেক সময় হয়ে থাকে।
উভয় বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য করলে সম্পূর্ণ ঘটনা এভাবে সামনে আসে যে, বৃহস্পতিবার দিন ছিল। (অর্থাৎ, ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে। (কেননা, একথা নিশ্চিত জানা যে, হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত সোমবারে হয়েছে।) ঐ বৃহস্পতিবারে হুযুর (ﷺ)-এর অসুখ মারাত্মক আকার ধারণ করল, জ্বর খুব বেশী এসে গেল এবং কষ্ট বেড়ে গেল। ঐ সময় তাঁর কাছে কয়েকজন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন- যাদের মধ্যে হযরত উমরও ছিলেন। এ অবস্থায়ই হুযুর (ﷺ) বললেন, লিখার উপকরণ নিয়ে আস, আমি একটি লিখিত জিনিস তোমাদের জন্য রেখে যেতে চাই, যারপর তোমরা কখনো পথহারা হবে না। (মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় রয়েছে: ائْتُونِي بِالْكَتِفِ وَالدَّوَاةِ (অর্থাৎ, পশুর কাঁধের হাড্ডি ও দোয়াত নিয়ে আস।) ১ এসময় হযরত উমর রাযি. সেখানে উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, এখন হুযুর (ﷺ)-এর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাঁরই আনীত কুরআন মজীদ তোমাদের হাতে বর্তমান রয়েছে। আমাদেরও তোমাদের হেদায়াতের জন্য এবং সর্বপ্রকার পথ ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর ঐ কিতাবই যথেষ্ট। (যেমন স্বয়ং কুরআন মজীদে একথা বার বার বলা হয়েছে।) উপস্থিত লোকদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ হয়ে গেল। কেউ কেউ বললেন, লিখার উপকরণ আনা চাই- যাতে হুযুর (ﷺ) যা লিখতে চান, তা লিখা হয়ে যায়।
অন্য কিছু লোক ঐ কথা বললেন, যা হযরত উমর রাযি. বলেছিলেন যে, এ কষ্টের সময় হুযুর (ﷺ)-কে আরো কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। আল্লাহ্ তা'আলার হেদায়াতগ্রন্থ কুরআন মজীদই যথেষ্ট। এ সময়ই কেউ কেউ বললেন, ما شأنه أهجر استفهموه (হুযুর (ﷺ)-এর কি অবস্থা, তিনি কি আমাদেরকে ছেড়ে যাচ্ছেন? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর।) তারপর লোকেরা বার বার নিবেদন করতে থাকল। এর দ্বারা তাঁর আল্লাহর প্রতি তাওয়াজ্জুহ ও এসময়কার তাঁর অন্তরের বিশেষ অবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হল। তাই তিনি বললেন, এখন তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, তোমাদের দিকে মনোযোগী করার চেষ্টা করো না। আমি যে ব্যস্ততায় ও যে অবস্থায় রয়েছি, সেটা এর চেয়ে অনেক ভাল, যার দিকে তোমরা আহ্বান করছ। (অর্থাৎ, আমি এ মুহূর্তে আমার দয়াময় প্রভুর দিকে মনোযোগী হয়ে আছি, তাঁর দরবারে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। আর এদিকে তোমরা আমাকে তোমাদের দিকে মনোযোগী করতে চেষ্টা করছ, আমাকে ছেড়ে দাও।) হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এরপর তিনি এ মজলিসেই তিনটি বিষয়ের নির্দেশ দিলেন। একটি এই যে, তোমরা মুশরিকদেরকে আরব ভূমি থেকে বহিষ্কার করে দাও। দ্বিতীয়টি এই যে, সরকার অথবা কোন গোত্রের পক্ষ থেকে আগত প্রতিনিধি দল ও বার্তাবাহকদের সাথে ঐরূপ সুন্দর আচরণ করবে, যেমন আমার কর্মপদ্ধতি ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এ হাদীসের রাবী সাঈদ ইবনে জুবাইরের ছাত্র সুলাইমান তিনটি বিষয়ের মধ্য থেকে এ দু'টি বিষয়ই বর্ণনা করেছেন। তৃতীয়টির ব্যাপারে বলেছেন যে, হয়ত সাঈদ ইবনে জুবাইর সেটি বর্ণনাই করেননি অথবা আমি ভুলে গিয়েছি। এ হল, পূর্ণ ঘটনা, যা 'হাদীসে কিরতাস' তথা 'কাগজের হাদীস' নামে পরিচিত। এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ও ব্যাখ্যাযোগ্য।
একটি এই যে, এ ঘটনা বৃহস্পতিবারের, এর পঞ্চম দিন সোমবার পর্যন্ত হুযুর (ﷺ)ও দুনিয়ায় ছিলেন। এ দিনগুলোর মধ্যে তিনি ঐ লিপিকা লিখেননি; বরং এটা লিখানোর কথা কোন দিন উল্লেখও করেননি। এটা এ কথার নিশ্চিত প্রমাণ যে, এ লিপিকা লিখানোর আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাঁর প্রতি কোন নির্দেশ আসেনি; বরং নিজের পক্ষ থেকেই তাঁর অন্তরে এ খেয়াল এসেছিল এবং পরে স্বয়ং তারই লিখানোর মত রইল না। যদি এটা লিখানোর নির্দেশ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে থাকত, তাহলে তাঁর মতের মধ্যেও পরিবর্তন আসত না; বরং তাঁর নিকট উম্মতের গোমরাহী থেকে হেফাযতের জন্য এটা লিখানো অপরিহার্য হত এবং এ পাঁচ দিনের মধ্যে তিনি এটা লিখিয়ে যেতেন। এটা না লিখলে নবুওয়াতী দায়িত্ব পালনে তাঁর ত্রুটির কারণ হয়ে যেত। (নাউযুবিল্লাহ, তিনি এ থেকে উর্ধ্বে, বহু উর্ধ্বে।) এ ঘটনাটি ঠিক তেমনই হয়েছে, যেমন এ অসুস্থতার ঠিক শুরুতে তিনি হযরত আবু বকরের খেলাফতের ব্যাপারে কিছু লিখে দেওয়ার এবং এর জন্য হযরত আবু বকর ও তাঁর পুত্র আব্দুর রহমানকে ডেকে আনারও ইচ্ছা করেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি নিজেই এটাকে নিষ্প্রয়োজন মনে করে এটা লিখানোর ইচ্ছা পরিত্যাগ করলেন এবং বললেন : وَيَأْبَى اللَّهُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلاَّ أَبَا بَكْرٍ তাই বুঝতে হবে যে, বৃহস্পতিবার দিনের ঐ ঘটনায়ও তাই হয়েছে এবং স্বয়ং হুযুর (ﷺ) এ লিপিকা লিখানো অপ্রয়োজনীয় মনে করে এর ইচ্ছা পরিত্যাগ করেছেন।
কাগজ তলব করা সংক্রান্ত এ হাদীসের ব্যাপারে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যখন হুযুর (ﷺ) কঠিন জ্বর ও কষ্টের সময় লিখার উপকরণ আনতে বললেন, তখন হযরত উমর রাযি. যিনি তখন খেদমতে উপস্থিত ছিলেন, হুযুর (ﷺ)-এর নিকট কোন নিবেদন পেশ করেননি; বরং উপস্থিত লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে এবং তাদেরকে হুযুর (ﷺ)-এর অস্বাভাবিক অবস্থা ও অসুখের প্রচণ্ডতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন যে, এ মুহূর্তে হুযুর (ﷺ)-এর খুব কষ্ট হচ্ছে। এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, এ অবস্থায় হুযুর (ﷺ)-কে কষ্ট দেওয়া ও কিছু লিখিয়ে নেওয়া উচিত হবে না। স্বয়ং কুরআন মজীদের স্পষ্ট দলিলাদি ও হুযুর (ﷺ)-এর শিক্ষা ও দীক্ষার দ্বারা এ বিশ্বাস তাঁর মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যে, মানবজাতির হেদায়াত ও সর্বপ্রকার গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা থেকে হেফাযতের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনীত আল্লাহ্ তা'আলার হেদায়াতগ্রন্থ কুরআন মজীদই যথেষ্ট। এ ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: مَا فَرَّطۡنَا فِی الۡکِتٰبِ مِنۡ شَیۡءٍ আরো বলেছেন: تِبۡیَانًا لِّکُلِّ شَیۡءٍ এবং এইমাত্র বিদায় হজ্বে এ আয়াত নাযিল হয়েছে : اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ এসব আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন যে, মানবজাতির হেদায়াতের জন্য যা বলা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো কুরআনে বলে দেওয়া হয়েছে। এ জাতীয় কোন বিষয় বর্ণনা করা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। দ্বীন অর্থাৎ, জীবন বিধান ও পথ প্রদর্শন পূর্ণাঙ্গ হয়ে গিয়েছে। এ জন্য এ অবস্থায় হুযুর (ﷺ)-কে কোনকিছু লিখিয়ে দেওয়ার জন্য কষ্ট দেওয়া আমাদের উচিত হবে না। কুরআন তোমাদের হাতে বর্তমান রয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলার এ কিতাব আমাদের ও তোমাদের হেদায়াতের জন্য এবং সর্বপ্রকার গোমরাহী থেকে হেফাযতের জন্য যথেষ্ট। منْدَكُمُ القران حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله
আগেই যেমন বলে আসা হয়েছে যে, এই মজলিসি কথাবার্তার পর হুযুর (ﷺ) পাঁচ দিন পর্যন্ত এ দুনিয়ায় ছিলেন; কিন্তু ঐ লিপিকা লিখাননি; বরং এরপর এর আলোচনা পর্যন্ত করেননি। হুযুর (ﷺ)-এর কর্মপদ্ধতি হযরত উমরের মতের পোষকতাই করল এবং এটাই যে সঠিক ছিল, এটা প্রমাণ করল। নিঃসন্দেহে এ ঘটনা হযরত উমর রাযি.-এর বিরাট ফযীলত ও মর্যাদাই নির্দেশ করে। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ সাধারণভাবে এটাই বুঝেছেন ও লিখেছেন।
এ 'হাদীসে কিরতাস' প্রসঙ্গে তৃতীয় একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, হযরত ইবনে আব্বাসের এ রিওয়ায়াতে (যা বুখারী-মুসলিমের বরাতে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।) এর কোন উল্লেখ নেই যে, হুযুর (ﷺ) লিখার উপকরণ আনার জন্য কাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু এ হাদীসেরই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার ফতহুল বারী গ্রন্থে মুসনাদে আহমাদের বরাতে স্বয়ং হযরত আলী রাযি.-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, যার মধ্যে স্পষ্টত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লিখন সামগ্রী আনার হুকুম তাকেই দিযেছিলেন। স্বয়ং হযরত আলী বলেন:
أَمَرَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ آتِيَهُ بِطَبَقٍ يَكْتُبُ فِيهِ مَا لَا تَضِلُّ أُمَّتُهُ مِنْ بَعْدِه
(রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, আমি যেন পশুর হাড্ডি নিয়ে আসি, যাতে তিনি এমন কিছু লিখে দেন যে, এরপর তাঁর উম্মত কখনো গোমরাহ না হয়। (ফতহুল বারী, ১ম খণ্ড)
এ কথা সুবিদিত যে, হযরত আলী রাযি. লিখতে জানতেন। তাকে লিখার সামগ্রী আনার জন্য হুকুম দেওয়ার অর্থ প্রকাশ্যত এই ছিল যে, তিনি লিখার সামগ্রী নিয়ে আসবেন আর হুযূর (ﷺ) যা লিখতে চান তিনি সেটা লিখবেন। আর একথা বাস্তবতার নিরিখে সর্বজন স্বীকৃত যে, হযরত আলীও ঐ লিখা লিখেননি। এটা এ কথার স্পষ্ট দলীল যে, হযরত উমরের ন্যায় তিনিও এটাই সমীচীন মনে করেছিলেন যে, হুযুর (ﷺ) যেন এ কষ্টের সময় কোনকিছু লিখানোর বাড়তি কষ্ট স্বীকার না করেন। আর সম্ভবতঃ তাঁরও মত এই ছিল যে, উম্মতের হেদায়াত ও গোমরাহী থেকে হেফাযতের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।
এ হাদীসে আরেকটি ব্যাখ্যাযোগ্য বিষয় এই যে, সাঈদ ইবনে জুবাইরের উপরের রিওয়ায়াত অনুযায়ী হুযুর (ﷺ) যখন লিখন সামগ্রী আনার হুকুম দিলেন, তখন কিছু লোক বলল, ما شأنه أهجر استفهموه এর সঠিক অর্থ বুঝার জন্য এ অবস্থাটি চোখের সামনে রাখা চাই যে, যখন হুযুর (ﷺ) রোগের প্রচণ্ডতা ও কঠিন কষ্টের অবস্থায় ওসিয়্যত হিসাবে এমন লিপিকা লিখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, যার পর তাঁর উম্মত কখনো পথহারা না হয়, তখন কেউ কেউ অনুভব করলেন যে, হয়ত হুযুর (ﷺ)-এর আখেরাতের সফরের সময় নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছে এবং এজন্যই তিনি ওসিয়্যত হিসাবে কিছু লিখানোর ইচ্ছা করছেন। এ সমস্ত লোক এটা অনুভব করে ভীষণ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার শিকার হয়ে গেলেন এবং তারা এ উদ্বেগের অবস্থায় বললেনঃ ما شأنه أهجر استفهموه (হুযুর (ﷺ)-এর কি অবস্থা, তিনি কি আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর।) এখানে শব্দটি هجر থেকে নির্গত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে বিচ্ছেদ অবলম্বন করা ও ছেড়ে যাওয়া। এ শব্দটি এ অর্থেই উর্দুতেও ব্যবহৃত হয়। وصل এর বিপরীত هجر বলা হয় আর হিজরতের অর্থ হচ্ছে দেশ ত্যাগ করা। কেউ কেউ এটাকে هُجر থেকে নির্গত মনে করেছে- যার অর্থ হচ্ছে, রোগী মানুষের প্রলাপ। এ অর্থ গ্রহণ করলে হাদীসের এ বাক্যের মর্ম এই হবে যে, হুযুর (ﷺ) কিছু লিখানোর জন্য যে বলেছেন, এটা কি প্রলাপ? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর। একথা স্পষ্ট যে, এ অর্থ কোনভাবেই ঠিক হতে পারে না। কেননা, যে রোগী বেহুঁশ অবস্থায় প্রলাপের ন্যায় কথা বলে, সে এ অবস্থায় থাকে না যে, তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হবে। সারকথা, استفهموه শব্দটি এর প্রমাণ যে, هجر শব্দটি هُجر থেকে নির্গত নয়, যার অর্থ হচ্ছে রোগীর প্রলাপবাক্য।
তাছাড়া হুযুর (ﷺ) বলেছিলেন, "লিখন সামগ্রী নিয়ে আস, আমি একটি লিপিকা লিখিয়ে দিব, যার পর তোমরা কখনো পথহারা হবে না।" এটা কখনো এমন কথা ছিল না, যার ব্যাপারে কেউ প্রলাপের সন্দেহ করতে পারে। যদিও أهجر কে অস্বীকৃতিমূলক প্রশ্ন সাব্যস্ত করে এ অর্থও হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, এখানে এ শব্দটি প্রলাপ অর্থে নেওয়া খুবই দূরবর্তী সম্ভাবনা।
হাদীসের এ বাক্য هجراستفهموه এর ব্যাপারে এ কথাটিও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, কথাটি হযরত উমর রাযি.-এর নয়; বরং অন্য কেউ কেউ এটা বলেছিলেন- যাদের নামও হাদীসে উল্লেখিত নেই; বরং فقالوا শব্দ এসেছে। (অর্থাৎ, কোন কোন লোক বলল।) শিয়া লিখকগণ হযরত উমর রাযি.-কে সমালোচনার পাত্র বানানোর জন্য এ বাক্যটি জোর করে তার প্রতি সম্পৃক্ত করেন এবং বলেন, তিনি হুযুর (ﷺ)-এর এ কথাকে প্রলাপ বলেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) অথচ আহলে সুন্নতের হাদীসের কোন নির্ভরযোগ্য কিতাবে এমন কোন রিওয়ায়াত নেই, যার দ্বারা প্রমাণ করা যায় যে, এ কথাটি হযরত উমর রাযি. বলেছিলেন। তিনি এ ক্ষেত্রে তাই বলেছিলেন, যা বুখারী মুসলিমের উপরের প্রথম হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে: عِنْدَكُمُ القُرْآنُ حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله হ্যাঁ, أهجر استفهموه কথাটি কোন কোন সাহাবীই বলেছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তাই, যা উপরে বর্ণনা করে আসা হয়েছে, আর এটা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি তাদের ভালবাসারই দলীল।
হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় এর উপর পর্যলোচনা করেছেন যে, তিনি যে বলেছিলেন, "লিখন সামগ্রী নিয়ে আস, আমি তোমাদের জন্য এমন লিখিত জিনিস লিখিয়ে দিব, যারপর তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না, এখানে তিনি কি লিখাতে চেয়েছিলেন? এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এগুলো সব অনুমান নির্ভর। শিয়া সম্প্রদায়ের দাবী যে, হুযুর (ﷺ) হযরত আলী রাযি.-এর জন্য খেলাফতনামা লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হযরত উমর রাযি.-এর হস্তক্ষেপের কারণে লিখানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, শিয়াদের জন্য এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই। কেননা, তাদের দাবী এই এবং এরই উপর তাদের মৌলিক ইমামতের আকীদা; বরং তাদের পূর্ণ ধর্ম মতের ভিত্তি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে ওফাতের মাত্র ৭০/৭২ দিন পূর্বে 'গাদীরে ঘুম' নামক স্থানে হজ্বের সকল সফরসঙ্গী, হাজার হাজার আনসার ও মুহাজিরকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে সমবেত করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে (যা বিশেষভাবে এ কাজের জন্যই তৈরী করা হয়েছিল।) নিজের পরবর্তী সময়ের জন্য হযরত আলী রাযি.-এর ইমামত ও খেলাফতের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেবল ঘোষণাই নয়; বরং হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষে সবার নিকট থেকে বায়আতও নিয়ে ছিলেন। (যদিও আমাদের নিকট এটা কেবল কল্পকাহিনী; কিন্তু শিয়াদের তো এর উপর ঈমান রয়েছে এবং তাদের নির্ভরযোগ্য কিতাব 'আলজামেউল কাফী' 'এহতেজাজে তারমী' ইত্যাদির মধ্যে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।) তাই যখন একটি কাজ হয়ে গিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে শান শওকতের সাথে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে, তাহলে এর জন্য ওসিয়্যত হিসাবে কোন কিছু লিখানোর কি প্রয়োজন রইল। হ্যাঁ, এ হাদীসের ব্যাখ্যায় যে সকল মনীষী এ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, হুযুর (ﷺ) নিজের পরবর্তী সময়ের জন্য হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খেলাফতের ব্যাপারে কিছু লিখাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পরে যখন তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, তকদীরে এলাহীতে এটাই নির্ধারিত হয়ে আছে, তখন কোন কিছু লিখানোর ইচ্ছা তিনি পরিত্যাগ করলেন, এ কথাটি অনেকটা বোধগম্য। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহঃ) বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'উমদাতুল কারী'-তে কিরতাসের হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন:
قال البيهقي: وقد حكى سفيانُ بنُ عيينةَ عن أهلِ العلمِ قيل أنَّ النبيَّ عليه الصلاةُ والسلامُ أرادَ أن يكتبَ استخلافَ أبي بكرٍ رضي اللهُ عنه، ثم تركَ ذلك اعتمادًا على ما علمَ من تقديرِ اللهِ تعالى ذلك، كما همَّ في أولِ مرضِه حين قال: وارأساه، ثم تركَ الكتابَ، وقال: يأبى اللهُ والمؤمنون إلا أبا بكرٍ، ثم قدَّمه في الصلاة. (عمدة القاري، جـ ٢، صـ ١٧١)
ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেছেন যে, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (যিনি এ হাদীসের একজন রাবী।) অনেক আলেম থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, হুযুর (ﷺ) হযরত আবু বকরকে খলীফা নিয়োগ করার বিষয়টি লিখে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। তারপর তিনি আল্লাহর ফায়সালা অনুসারে এটাই হবে বিশ্বাস করে এ লেখার উদ্যোগ ছেড়ে দিলেন। যেমন রোগের সূচনাতেও তিনি একবার এ ইচ্ছা করেছিলেন এবং তারপর এই বলে ছেড়ে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ এবং মু'মিনগণ আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকে গ্রহণ করবে না। এরপর তিনি তাকে নামাযে ইমাম বানিয়ে দিলেন। (উমদাতুল কারীঃ ২য় খণ্ড)
লক্ষণীয় যে, হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা তাবে' তাবেয়ীনদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যেসব আলেম থেকে এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন, তাদের মধ্যে সম্ভবত তাবেয়ীগণও রয়েছেন। এর দ্বারা জানা গেল যে, কিরতাসের হাদীসের ব্যাপারে এ মত যে, হুযুর (ﷺ) হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে খেলাফতের ব্যাপারে কিছু লিখিত দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন, এটা তাবেয়ীদেরও মত।
এ কিরতাসের হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ পর্যন্ত যা কিছু লিখা হয়েছে, এটা একথা স্বীকার করে লিখা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) লিখন সামগ্রী আনার জন্য যা বলেছিলেন, এটা কিছু লিখানোর নিয়্যতেই বলেছিলেন এবং তাঁর ইচ্ছা সে সময় কিছু লিখানোরই ছিল। (যা পরে থাকেনি এবং তিনি কিছু লিখাননি) কিন্তু হাফেয ইবনে হাজার ফতহুল বারী গ্রন্থে কিরতাসের হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে একটি সম্ভাবনা এও উল্লেখ করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে হুযুর (ﷺ)-এর ইচ্ছা কোন কিছু লিখানোর ছিলই না; বরং তিনি আপন সাহাবীদের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন এবং দেখতে চেয়েছিলেন যে, তাঁদের অন্তরে একথা সম্পূর্ণরূপে বদ্ধমূল হয়েছে কিনা যে, আল্লাহর আখেরী কিতাব কুরআন মজীদ উম্মতের হেদায়াতের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে হযরত উমর রাযি. যখন বললেন : عِنْدَكُمُ القُرْآنُ حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله (তোমাদের নিকট কুরআন রয়েছে, আল্লাহর এ কিতাবই তোমাদের জন্য যথেষ্ট।) এবং উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে অন্যরাও এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করল, তখন হুযুর (ﷺ) নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন। (ফাতহুল বারীঃ পৃষ্ঠা-১০১, খণ্ড-১৮)
স্মরণযোগ্য যে, কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় أَطِيعُوا اللَّهَ-এর সাথে أَطِيعُوا الرَّسُول বলে এবং অন্যান্য শিরোনামেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশ ও বাণীসমূহের অনুসরণ ও তাঁর জীবনধারা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য এটাও কুরআনী হেদায়াতের মধ্যে শামিল এবং কুরআন মজীদ এটাকেও নিজের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন। এর জন্য এ সন্দেহ করা যাবে না যে حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নত ও হেদায়াত থেকে অমুখাপেক্ষিতার কথা বলা হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর এ হাদীসের শেষ অংশ এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ মজলিসেই তিনটি বিষয়ের নির্দেশ বিশেষভাবে দিয়েছিলেন। (বুখারী শরীফেরই একটি রিওয়ায়াতের শব্দমালা এই: واوصاهم بثلاث (অর্থাৎ, তিনি এ ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে তিনটি বিষয়ের ওসিয়্যত করলেন।) একটি এই যে, মুশরিকদেরকে আরব ভূখণ্ড থেকে বের করে দিতে হবে। (মনে রাখতে হবে যে, মুশরিক যারা এখানে উদ্দেশ্য কাফের সম্প্রদায়- চাই মুশরিক হোক অথবা আহলে কিতাব।) অন্য বর্ণনায় أَخْرَجُوا اليهود والنصارى শব্দমালাও এসেছে। মর্ম এই যে, 'জাযীরাতুল আরব' ইসলামের কেন্দ্র ও বিশেষ দূর্গ। এখানে কেবল মুসলমানদের আবাস থাকবে, কাফেরদেরকে বসবাসের সুযোগ দেওয়া যাবে না। আর যারা এ পর্যন্ত এখানে বসবাস করছে, তাদেরকে এ অঞ্চলের বাইরে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিবে। (হুযুর (ﷺ)-এর এ নির্দেশ পালনের সৌভাগ্য হযরত উমর ফারুক রাযি.-এর ভাগ্যে জুটেছিল। তিনি স্বীয় খেলাফতকালে এটা পূর্ণ করেছিলেন।) জাযীরাতুল আরবের সীমানা ও পরিধির ব্যাপারে আলেমদের বিভিন্ন মত রয়েছে। প্রাধান্যযোগ্য মত এই যে, এ হাদীসে 'জাযীরাতুল আরব' দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা মুকাররমা, মদীনা মুনাওয়ারা, ইয়ামামা ও তদসংশ্লিষ্ট এলাকা।
দ্বিতীয় ওসিয়্যতটি তিনি এই করেছিলেন যে, কোন রাষ্ট্র, গোত্র অথবা কোন অঞ্চল থেকে যেসব প্রতিনিধিদল অথবা দূত আসবে, (যদিও তারা অমুসলিম হয়) তাদের সাথে সুন্দর আচরণের ঐ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে, যা আমার রীতি ও অভ্যাস হয়ে আছে। হুযূর (ﷺ) তাদেরকে উপযুক্ত উপঢৌকনও প্রদান করতেন, তাঁর এ সুন্দর ব্যবহার তাদেরকে কুদরতীভাবেই প্রভাবান্বিত করত। এ ছিল দু'টি বিষয়। তৃতীয় ওসিয়্যতের ব্যাপারে হাদীসের একজন রাবী সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেন যে, এ হাদীসের বর্ণনাকারী আমার উস্তাদ সুলায়মান এ দু'টি কথাই বলেছেন। আর তৃতীয় বিষয়টির ব্যাপারে বলেছেন যে, হয়ত হযরত ইবনে আব্বাসের ছাত্র সাঈদ ইবনে জুবাইর আদৌ এটা বর্ণনা করেননি অথবা বর্ণনা করে থাকলেও আমি ভুলে গিয়েছি।
হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ বিভিন্ন আভাস-ইঙ্গিতের ভিত্তিতে এ তৃতীয় ওসিয়্যতটিও নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর তৃতীয় ওসিয়্যতটি এই ছিল যে, তোমরা আল্লাহর কিতাব কুরআন মজীদকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে। অন্য কেউ কেউ বলেছেন, তৃতীয় ওসিয়্যতটি এই ছিল যে, لا تَتَّخَذُوا قَبْرِي وثنا يعبد (অর্থাৎ, এমন যেন না হয় যে, তোমরা আমার কবরকে মূর্তির মত বানিয়ে এর পূজা করতে শুরু করবে। মুওয়াত্তা মালিকে أَخْرَجُوا اليهود -এর সাথে হুযুর (ﷺ)-এর এ ওসিয়্যতও বর্ণনা করা হয়েছে। যাহোক, এ সবগুলোই অনুমাননির্ভর। এতদসত্ত্বেও এগুলো হুযুর (ﷺ)-এর বাণী ও তাঁর পথনির্দেশনা।
টীকা: ১। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে বিশেষ করে হেজাযভূমিতে কাগজ খুব কম পাওয়া যেত। এ জন্য যখন কোন কিছু লিখার প্রয়োজন হত, তখন বিভিন্ন জিনিসে তা লিখা হত। এগুলোর মধ্যে একটি জিনিস পশুর কাঁধের হাড্ডিও ছিল। এর উপর এভাবেই লিখা হত, যেভাবে কাঠের অথবা পাথরের স্লেটে লিখা হয়।
উভয় বর্ণনার প্রতি লক্ষ্য করলে সম্পূর্ণ ঘটনা এভাবে সামনে আসে যে, বৃহস্পতিবার দিন ছিল। (অর্থাৎ, ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে। (কেননা, একথা নিশ্চিত জানা যে, হুযুর (ﷺ)-এর ওফাত সোমবারে হয়েছে।) ঐ বৃহস্পতিবারে হুযুর (ﷺ)-এর অসুখ মারাত্মক আকার ধারণ করল, জ্বর খুব বেশী এসে গেল এবং কষ্ট বেড়ে গেল। ঐ সময় তাঁর কাছে কয়েকজন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন- যাদের মধ্যে হযরত উমরও ছিলেন। এ অবস্থায়ই হুযুর (ﷺ) বললেন, লিখার উপকরণ নিয়ে আস, আমি একটি লিখিত জিনিস তোমাদের জন্য রেখে যেতে চাই, যারপর তোমরা কখনো পথহারা হবে না। (মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় রয়েছে: ائْتُونِي بِالْكَتِفِ وَالدَّوَاةِ (অর্থাৎ, পশুর কাঁধের হাড্ডি ও দোয়াত নিয়ে আস।) ১ এসময় হযরত উমর রাযি. সেখানে উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, এখন হুযুর (ﷺ)-এর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাঁরই আনীত কুরআন মজীদ তোমাদের হাতে বর্তমান রয়েছে। আমাদেরও তোমাদের হেদায়াতের জন্য এবং সর্বপ্রকার পথ ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর ঐ কিতাবই যথেষ্ট। (যেমন স্বয়ং কুরআন মজীদে একথা বার বার বলা হয়েছে।) উপস্থিত লোকদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ হয়ে গেল। কেউ কেউ বললেন, লিখার উপকরণ আনা চাই- যাতে হুযুর (ﷺ) যা লিখতে চান, তা লিখা হয়ে যায়।
অন্য কিছু লোক ঐ কথা বললেন, যা হযরত উমর রাযি. বলেছিলেন যে, এ কষ্টের সময় হুযুর (ﷺ)-কে আরো কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। আল্লাহ্ তা'আলার হেদায়াতগ্রন্থ কুরআন মজীদই যথেষ্ট। এ সময়ই কেউ কেউ বললেন, ما شأنه أهجر استفهموه (হুযুর (ﷺ)-এর কি অবস্থা, তিনি কি আমাদেরকে ছেড়ে যাচ্ছেন? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর।) তারপর লোকেরা বার বার নিবেদন করতে থাকল। এর দ্বারা তাঁর আল্লাহর প্রতি তাওয়াজ্জুহ ও এসময়কার তাঁর অন্তরের বিশেষ অবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হল। তাই তিনি বললেন, এখন তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও, তোমাদের দিকে মনোযোগী করার চেষ্টা করো না। আমি যে ব্যস্ততায় ও যে অবস্থায় রয়েছি, সেটা এর চেয়ে অনেক ভাল, যার দিকে তোমরা আহ্বান করছ। (অর্থাৎ, আমি এ মুহূর্তে আমার দয়াময় প্রভুর দিকে মনোযোগী হয়ে আছি, তাঁর দরবারে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। আর এদিকে তোমরা আমাকে তোমাদের দিকে মনোযোগী করতে চেষ্টা করছ, আমাকে ছেড়ে দাও।) হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এরপর তিনি এ মজলিসেই তিনটি বিষয়ের নির্দেশ দিলেন। একটি এই যে, তোমরা মুশরিকদেরকে আরব ভূমি থেকে বহিষ্কার করে দাও। দ্বিতীয়টি এই যে, সরকার অথবা কোন গোত্রের পক্ষ থেকে আগত প্রতিনিধি দল ও বার্তাবাহকদের সাথে ঐরূপ সুন্দর আচরণ করবে, যেমন আমার কর্মপদ্ধতি ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এ হাদীসের রাবী সাঈদ ইবনে জুবাইরের ছাত্র সুলাইমান তিনটি বিষয়ের মধ্য থেকে এ দু'টি বিষয়ই বর্ণনা করেছেন। তৃতীয়টির ব্যাপারে বলেছেন যে, হয়ত সাঈদ ইবনে জুবাইর সেটি বর্ণনাই করেননি অথবা আমি ভুলে গিয়েছি। এ হল, পূর্ণ ঘটনা, যা 'হাদীসে কিরতাস' তথা 'কাগজের হাদীস' নামে পরিচিত। এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ও ব্যাখ্যাযোগ্য।
একটি এই যে, এ ঘটনা বৃহস্পতিবারের, এর পঞ্চম দিন সোমবার পর্যন্ত হুযুর (ﷺ)ও দুনিয়ায় ছিলেন। এ দিনগুলোর মধ্যে তিনি ঐ লিপিকা লিখেননি; বরং এটা লিখানোর কথা কোন দিন উল্লেখও করেননি। এটা এ কথার নিশ্চিত প্রমাণ যে, এ লিপিকা লিখানোর আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাঁর প্রতি কোন নির্দেশ আসেনি; বরং নিজের পক্ষ থেকেই তাঁর অন্তরে এ খেয়াল এসেছিল এবং পরে স্বয়ং তারই লিখানোর মত রইল না। যদি এটা লিখানোর নির্দেশ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে থাকত, তাহলে তাঁর মতের মধ্যেও পরিবর্তন আসত না; বরং তাঁর নিকট উম্মতের গোমরাহী থেকে হেফাযতের জন্য এটা লিখানো অপরিহার্য হত এবং এ পাঁচ দিনের মধ্যে তিনি এটা লিখিয়ে যেতেন। এটা না লিখলে নবুওয়াতী দায়িত্ব পালনে তাঁর ত্রুটির কারণ হয়ে যেত। (নাউযুবিল্লাহ, তিনি এ থেকে উর্ধ্বে, বহু উর্ধ্বে।) এ ঘটনাটি ঠিক তেমনই হয়েছে, যেমন এ অসুস্থতার ঠিক শুরুতে তিনি হযরত আবু বকরের খেলাফতের ব্যাপারে কিছু লিখে দেওয়ার এবং এর জন্য হযরত আবু বকর ও তাঁর পুত্র আব্দুর রহমানকে ডেকে আনারও ইচ্ছা করেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি নিজেই এটাকে নিষ্প্রয়োজন মনে করে এটা লিখানোর ইচ্ছা পরিত্যাগ করলেন এবং বললেন : وَيَأْبَى اللَّهُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلاَّ أَبَا بَكْرٍ তাই বুঝতে হবে যে, বৃহস্পতিবার দিনের ঐ ঘটনায়ও তাই হয়েছে এবং স্বয়ং হুযুর (ﷺ) এ লিপিকা লিখানো অপ্রয়োজনীয় মনে করে এর ইচ্ছা পরিত্যাগ করেছেন।
কাগজ তলব করা সংক্রান্ত এ হাদীসের ব্যাপারে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যখন হুযুর (ﷺ) কঠিন জ্বর ও কষ্টের সময় লিখার উপকরণ আনতে বললেন, তখন হযরত উমর রাযি. যিনি তখন খেদমতে উপস্থিত ছিলেন, হুযুর (ﷺ)-এর নিকট কোন নিবেদন পেশ করেননি; বরং উপস্থিত লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে এবং তাদেরকে হুযুর (ﷺ)-এর অস্বাভাবিক অবস্থা ও অসুখের প্রচণ্ডতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন যে, এ মুহূর্তে হুযুর (ﷺ)-এর খুব কষ্ট হচ্ছে। এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, এ অবস্থায় হুযুর (ﷺ)-কে কষ্ট দেওয়া ও কিছু লিখিয়ে নেওয়া উচিত হবে না। স্বয়ং কুরআন মজীদের স্পষ্ট দলিলাদি ও হুযুর (ﷺ)-এর শিক্ষা ও দীক্ষার দ্বারা এ বিশ্বাস তাঁর মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যে, মানবজাতির হেদায়াত ও সর্বপ্রকার গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা থেকে হেফাযতের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনীত আল্লাহ্ তা'আলার হেদায়াতগ্রন্থ কুরআন মজীদই যথেষ্ট। এ ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: مَا فَرَّطۡنَا فِی الۡکِتٰبِ مِنۡ شَیۡءٍ আরো বলেছেন: تِبۡیَانًا لِّکُلِّ شَیۡءٍ এবং এইমাত্র বিদায় হজ্বে এ আয়াত নাযিল হয়েছে : اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ এসব আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন যে, মানবজাতির হেদায়াতের জন্য যা বলা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো কুরআনে বলে দেওয়া হয়েছে। এ জাতীয় কোন বিষয় বর্ণনা করা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। দ্বীন অর্থাৎ, জীবন বিধান ও পথ প্রদর্শন পূর্ণাঙ্গ হয়ে গিয়েছে। এ জন্য এ অবস্থায় হুযুর (ﷺ)-কে কোনকিছু লিখিয়ে দেওয়ার জন্য কষ্ট দেওয়া আমাদের উচিত হবে না। কুরআন তোমাদের হাতে বর্তমান রয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলার এ কিতাব আমাদের ও তোমাদের হেদায়াতের জন্য এবং সর্বপ্রকার গোমরাহী থেকে হেফাযতের জন্য যথেষ্ট। منْدَكُمُ القران حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله
আগেই যেমন বলে আসা হয়েছে যে, এই মজলিসি কথাবার্তার পর হুযুর (ﷺ) পাঁচ দিন পর্যন্ত এ দুনিয়ায় ছিলেন; কিন্তু ঐ লিপিকা লিখাননি; বরং এরপর এর আলোচনা পর্যন্ত করেননি। হুযুর (ﷺ)-এর কর্মপদ্ধতি হযরত উমরের মতের পোষকতাই করল এবং এটাই যে সঠিক ছিল, এটা প্রমাণ করল। নিঃসন্দেহে এ ঘটনা হযরত উমর রাযি.-এর বিরাট ফযীলত ও মর্যাদাই নির্দেশ করে। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ সাধারণভাবে এটাই বুঝেছেন ও লিখেছেন।
এ 'হাদীসে কিরতাস' প্রসঙ্গে তৃতীয় একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, হযরত ইবনে আব্বাসের এ রিওয়ায়াতে (যা বুখারী-মুসলিমের বরাতে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।) এর কোন উল্লেখ নেই যে, হুযুর (ﷺ) লিখার উপকরণ আনার জন্য কাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন; কিন্তু এ হাদীসেরই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার ফতহুল বারী গ্রন্থে মুসনাদে আহমাদের বরাতে স্বয়ং হযরত আলী রাযি.-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, যার মধ্যে স্পষ্টত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লিখন সামগ্রী আনার হুকুম তাকেই দিযেছিলেন। স্বয়ং হযরত আলী বলেন:
أَمَرَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ آتِيَهُ بِطَبَقٍ يَكْتُبُ فِيهِ مَا لَا تَضِلُّ أُمَّتُهُ مِنْ بَعْدِه
(রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, আমি যেন পশুর হাড্ডি নিয়ে আসি, যাতে তিনি এমন কিছু লিখে দেন যে, এরপর তাঁর উম্মত কখনো গোমরাহ না হয়। (ফতহুল বারী, ১ম খণ্ড)
এ কথা সুবিদিত যে, হযরত আলী রাযি. লিখতে জানতেন। তাকে লিখার সামগ্রী আনার জন্য হুকুম দেওয়ার অর্থ প্রকাশ্যত এই ছিল যে, তিনি লিখার সামগ্রী নিয়ে আসবেন আর হুযূর (ﷺ) যা লিখতে চান তিনি সেটা লিখবেন। আর একথা বাস্তবতার নিরিখে সর্বজন স্বীকৃত যে, হযরত আলীও ঐ লিখা লিখেননি। এটা এ কথার স্পষ্ট দলীল যে, হযরত উমরের ন্যায় তিনিও এটাই সমীচীন মনে করেছিলেন যে, হুযুর (ﷺ) যেন এ কষ্টের সময় কোনকিছু লিখানোর বাড়তি কষ্ট স্বীকার না করেন। আর সম্ভবতঃ তাঁরও মত এই ছিল যে, উম্মতের হেদায়াত ও গোমরাহী থেকে হেফাযতের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।
এ হাদীসে আরেকটি ব্যাখ্যাযোগ্য বিষয় এই যে, সাঈদ ইবনে জুবাইরের উপরের রিওয়ায়াত অনুযায়ী হুযুর (ﷺ) যখন লিখন সামগ্রী আনার হুকুম দিলেন, তখন কিছু লোক বলল, ما شأنه أهجر استفهموه এর সঠিক অর্থ বুঝার জন্য এ অবস্থাটি চোখের সামনে রাখা চাই যে, যখন হুযুর (ﷺ) রোগের প্রচণ্ডতা ও কঠিন কষ্টের অবস্থায় ওসিয়্যত হিসাবে এমন লিপিকা লিখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, যার পর তাঁর উম্মত কখনো পথহারা না হয়, তখন কেউ কেউ অনুভব করলেন যে, হয়ত হুযুর (ﷺ)-এর আখেরাতের সফরের সময় নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছে এবং এজন্যই তিনি ওসিয়্যত হিসাবে কিছু লিখানোর ইচ্ছা করছেন। এ সমস্ত লোক এটা অনুভব করে ভীষণ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার শিকার হয়ে গেলেন এবং তারা এ উদ্বেগের অবস্থায় বললেনঃ ما شأنه أهجر استفهموه (হুযুর (ﷺ)-এর কি অবস্থা, তিনি কি আমাদেরকে ছেড়ে যাবেন? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর।) এখানে শব্দটি هجر থেকে নির্গত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে বিচ্ছেদ অবলম্বন করা ও ছেড়ে যাওয়া। এ শব্দটি এ অর্থেই উর্দুতেও ব্যবহৃত হয়। وصل এর বিপরীত هجر বলা হয় আর হিজরতের অর্থ হচ্ছে দেশ ত্যাগ করা। কেউ কেউ এটাকে هُجر থেকে নির্গত মনে করেছে- যার অর্থ হচ্ছে, রোগী মানুষের প্রলাপ। এ অর্থ গ্রহণ করলে হাদীসের এ বাক্যের মর্ম এই হবে যে, হুযুর (ﷺ) কিছু লিখানোর জন্য যে বলেছেন, এটা কি প্রলাপ? তাঁকে জিজ্ঞাসা কর। একথা স্পষ্ট যে, এ অর্থ কোনভাবেই ঠিক হতে পারে না। কেননা, যে রোগী বেহুঁশ অবস্থায় প্রলাপের ন্যায় কথা বলে, সে এ অবস্থায় থাকে না যে, তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হবে। সারকথা, استفهموه শব্দটি এর প্রমাণ যে, هجر শব্দটি هُجر থেকে নির্গত নয়, যার অর্থ হচ্ছে রোগীর প্রলাপবাক্য।
তাছাড়া হুযুর (ﷺ) বলেছিলেন, "লিখন সামগ্রী নিয়ে আস, আমি একটি লিপিকা লিখিয়ে দিব, যার পর তোমরা কখনো পথহারা হবে না।" এটা কখনো এমন কথা ছিল না, যার ব্যাপারে কেউ প্রলাপের সন্দেহ করতে পারে। যদিও أهجر কে অস্বীকৃতিমূলক প্রশ্ন সাব্যস্ত করে এ অর্থও হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, এখানে এ শব্দটি প্রলাপ অর্থে নেওয়া খুবই দূরবর্তী সম্ভাবনা।
হাদীসের এ বাক্য هجراستفهموه এর ব্যাপারে এ কথাটিও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, কথাটি হযরত উমর রাযি.-এর নয়; বরং অন্য কেউ কেউ এটা বলেছিলেন- যাদের নামও হাদীসে উল্লেখিত নেই; বরং فقالوا শব্দ এসেছে। (অর্থাৎ, কোন কোন লোক বলল।) শিয়া লিখকগণ হযরত উমর রাযি.-কে সমালোচনার পাত্র বানানোর জন্য এ বাক্যটি জোর করে তার প্রতি সম্পৃক্ত করেন এবং বলেন, তিনি হুযুর (ﷺ)-এর এ কথাকে প্রলাপ বলেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) অথচ আহলে সুন্নতের হাদীসের কোন নির্ভরযোগ্য কিতাবে এমন কোন রিওয়ায়াত নেই, যার দ্বারা প্রমাণ করা যায় যে, এ কথাটি হযরত উমর রাযি. বলেছিলেন। তিনি এ ক্ষেত্রে তাই বলেছিলেন, যা বুখারী মুসলিমের উপরের প্রথম হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে: عِنْدَكُمُ القُرْآنُ حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله হ্যাঁ, أهجر استفهموه কথাটি কোন কোন সাহাবীই বলেছিলেন। কিন্তু এর মর্ম তাই, যা উপরে বর্ণনা করে আসা হয়েছে, আর এটা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি তাদের ভালবাসারই দলীল।
হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় এর উপর পর্যলোচনা করেছেন যে, তিনি যে বলেছিলেন, "লিখন সামগ্রী নিয়ে আস, আমি তোমাদের জন্য এমন লিখিত জিনিস লিখিয়ে দিব, যারপর তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না, এখানে তিনি কি লিখাতে চেয়েছিলেন? এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এগুলো সব অনুমান নির্ভর। শিয়া সম্প্রদায়ের দাবী যে, হুযুর (ﷺ) হযরত আলী রাযি.-এর জন্য খেলাফতনামা লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হযরত উমর রাযি.-এর হস্তক্ষেপের কারণে লিখানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, শিয়াদের জন্য এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই। কেননা, তাদের দাবী এই এবং এরই উপর তাদের মৌলিক ইমামতের আকীদা; বরং তাদের পূর্ণ ধর্ম মতের ভিত্তি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে ওফাতের মাত্র ৭০/৭২ দিন পূর্বে 'গাদীরে ঘুম' নামক স্থানে হজ্বের সকল সফরসঙ্গী, হাজার হাজার আনসার ও মুহাজিরকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে সমবেত করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে (যা বিশেষভাবে এ কাজের জন্যই তৈরী করা হয়েছিল।) নিজের পরবর্তী সময়ের জন্য হযরত আলী রাযি.-এর ইমামত ও খেলাফতের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেবল ঘোষণাই নয়; বরং হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষে সবার নিকট থেকে বায়আতও নিয়ে ছিলেন। (যদিও আমাদের নিকট এটা কেবল কল্পকাহিনী; কিন্তু শিয়াদের তো এর উপর ঈমান রয়েছে এবং তাদের নির্ভরযোগ্য কিতাব 'আলজামেউল কাফী' 'এহতেজাজে তারমী' ইত্যাদির মধ্যে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।) তাই যখন একটি কাজ হয়ে গিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে শান শওকতের সাথে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে, তাহলে এর জন্য ওসিয়্যত হিসাবে কোন কিছু লিখানোর কি প্রয়োজন রইল। হ্যাঁ, এ হাদীসের ব্যাখ্যায় যে সকল মনীষী এ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, হুযুর (ﷺ) নিজের পরবর্তী সময়ের জন্য হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খেলাফতের ব্যাপারে কিছু লিখাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পরে যখন তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, তকদীরে এলাহীতে এটাই নির্ধারিত হয়ে আছে, তখন কোন কিছু লিখানোর ইচ্ছা তিনি পরিত্যাগ করলেন, এ কথাটি অনেকটা বোধগম্য। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহঃ) বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'উমদাতুল কারী'-তে কিরতাসের হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন:
قال البيهقي: وقد حكى سفيانُ بنُ عيينةَ عن أهلِ العلمِ قيل أنَّ النبيَّ عليه الصلاةُ والسلامُ أرادَ أن يكتبَ استخلافَ أبي بكرٍ رضي اللهُ عنه، ثم تركَ ذلك اعتمادًا على ما علمَ من تقديرِ اللهِ تعالى ذلك، كما همَّ في أولِ مرضِه حين قال: وارأساه، ثم تركَ الكتابَ، وقال: يأبى اللهُ والمؤمنون إلا أبا بكرٍ، ثم قدَّمه في الصلاة. (عمدة القاري، جـ ٢، صـ ١٧١)
ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেছেন যে, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (যিনি এ হাদীসের একজন রাবী।) অনেক আলেম থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, হুযুর (ﷺ) হযরত আবু বকরকে খলীফা নিয়োগ করার বিষয়টি লিখে দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন। তারপর তিনি আল্লাহর ফায়সালা অনুসারে এটাই হবে বিশ্বাস করে এ লেখার উদ্যোগ ছেড়ে দিলেন। যেমন রোগের সূচনাতেও তিনি একবার এ ইচ্ছা করেছিলেন এবং তারপর এই বলে ছেড়ে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ এবং মু'মিনগণ আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকে গ্রহণ করবে না। এরপর তিনি তাকে নামাযে ইমাম বানিয়ে দিলেন। (উমদাতুল কারীঃ ২য় খণ্ড)
লক্ষণীয় যে, হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা তাবে' তাবেয়ীনদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি যেসব আলেম থেকে এ কথাটি উদ্ধৃত করেছেন, তাদের মধ্যে সম্ভবত তাবেয়ীগণও রয়েছেন। এর দ্বারা জানা গেল যে, কিরতাসের হাদীসের ব্যাপারে এ মত যে, হুযুর (ﷺ) হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-কে খেলাফতের ব্যাপারে কিছু লিখিত দেওয়ার ইচ্ছা করেছিলেন, এটা তাবেয়ীদেরও মত।
এ কিরতাসের হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ পর্যন্ত যা কিছু লিখা হয়েছে, এটা একথা স্বীকার করে লিখা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) লিখন সামগ্রী আনার জন্য যা বলেছিলেন, এটা কিছু লিখানোর নিয়্যতেই বলেছিলেন এবং তাঁর ইচ্ছা সে সময় কিছু লিখানোরই ছিল। (যা পরে থাকেনি এবং তিনি কিছু লিখাননি) কিন্তু হাফেয ইবনে হাজার ফতহুল বারী গ্রন্থে কিরতাসের হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে একটি সম্ভাবনা এও উল্লেখ করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে হুযুর (ﷺ)-এর ইচ্ছা কোন কিছু লিখানোর ছিলই না; বরং তিনি আপন সাহাবীদের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন এবং দেখতে চেয়েছিলেন যে, তাঁদের অন্তরে একথা সম্পূর্ণরূপে বদ্ধমূল হয়েছে কিনা যে, আল্লাহর আখেরী কিতাব কুরআন মজীদ উম্মতের হেদায়াতের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে হযরত উমর রাযি. যখন বললেন : عِنْدَكُمُ القُرْآنُ حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله (তোমাদের নিকট কুরআন রয়েছে, আল্লাহর এ কিতাবই তোমাদের জন্য যথেষ্ট।) এবং উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে অন্যরাও এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করল, তখন হুযুর (ﷺ) নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন। (ফাতহুল বারীঃ পৃষ্ঠা-১০১, খণ্ড-১৮)
স্মরণযোগ্য যে, কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় أَطِيعُوا اللَّهَ-এর সাথে أَطِيعُوا الرَّسُول বলে এবং অন্যান্য শিরোনামেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশ ও বাণীসমূহের অনুসরণ ও তাঁর জীবনধারা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য এটাও কুরআনী হেদায়াতের মধ্যে শামিল এবং কুরআন মজীদ এটাকেও নিজের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন। এর জন্য এ সন্দেহ করা যাবে না যে حَسْبُكُمْ كِتَابُ الله এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নত ও হেদায়াত থেকে অমুখাপেক্ষিতার কথা বলা হয়েছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর এ হাদীসের শেষ অংশ এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ মজলিসেই তিনটি বিষয়ের নির্দেশ বিশেষভাবে দিয়েছিলেন। (বুখারী শরীফেরই একটি রিওয়ায়াতের শব্দমালা এই: واوصاهم بثلاث (অর্থাৎ, তিনি এ ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে তিনটি বিষয়ের ওসিয়্যত করলেন।) একটি এই যে, মুশরিকদেরকে আরব ভূখণ্ড থেকে বের করে দিতে হবে। (মনে রাখতে হবে যে, মুশরিক যারা এখানে উদ্দেশ্য কাফের সম্প্রদায়- চাই মুশরিক হোক অথবা আহলে কিতাব।) অন্য বর্ণনায় أَخْرَجُوا اليهود والنصارى শব্দমালাও এসেছে। মর্ম এই যে, 'জাযীরাতুল আরব' ইসলামের কেন্দ্র ও বিশেষ দূর্গ। এখানে কেবল মুসলমানদের আবাস থাকবে, কাফেরদেরকে বসবাসের সুযোগ দেওয়া যাবে না। আর যারা এ পর্যন্ত এখানে বসবাস করছে, তাদেরকে এ অঞ্চলের বাইরে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিবে। (হুযুর (ﷺ)-এর এ নির্দেশ পালনের সৌভাগ্য হযরত উমর ফারুক রাযি.-এর ভাগ্যে জুটেছিল। তিনি স্বীয় খেলাফতকালে এটা পূর্ণ করেছিলেন।) জাযীরাতুল আরবের সীমানা ও পরিধির ব্যাপারে আলেমদের বিভিন্ন মত রয়েছে। প্রাধান্যযোগ্য মত এই যে, এ হাদীসে 'জাযীরাতুল আরব' দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মক্কা মুকাররমা, মদীনা মুনাওয়ারা, ইয়ামামা ও তদসংশ্লিষ্ট এলাকা।
দ্বিতীয় ওসিয়্যতটি তিনি এই করেছিলেন যে, কোন রাষ্ট্র, গোত্র অথবা কোন অঞ্চল থেকে যেসব প্রতিনিধিদল অথবা দূত আসবে, (যদিও তারা অমুসলিম হয়) তাদের সাথে সুন্দর আচরণের ঐ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে, যা আমার রীতি ও অভ্যাস হয়ে আছে। হুযূর (ﷺ) তাদেরকে উপযুক্ত উপঢৌকনও প্রদান করতেন, তাঁর এ সুন্দর ব্যবহার তাদেরকে কুদরতীভাবেই প্রভাবান্বিত করত। এ ছিল দু'টি বিষয়। তৃতীয় ওসিয়্যতের ব্যাপারে হাদীসের একজন রাবী সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেন যে, এ হাদীসের বর্ণনাকারী আমার উস্তাদ সুলায়মান এ দু'টি কথাই বলেছেন। আর তৃতীয় বিষয়টির ব্যাপারে বলেছেন যে, হয়ত হযরত ইবনে আব্বাসের ছাত্র সাঈদ ইবনে জুবাইর আদৌ এটা বর্ণনা করেননি অথবা বর্ণনা করে থাকলেও আমি ভুলে গিয়েছি।
হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ বিভিন্ন আভাস-ইঙ্গিতের ভিত্তিতে এ তৃতীয় ওসিয়্যতটিও নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর তৃতীয় ওসিয়্যতটি এই ছিল যে, তোমরা আল্লাহর কিতাব কুরআন মজীদকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে। অন্য কেউ কেউ বলেছেন, তৃতীয় ওসিয়্যতটি এই ছিল যে, لا تَتَّخَذُوا قَبْرِي وثنا يعبد (অর্থাৎ, এমন যেন না হয় যে, তোমরা আমার কবরকে মূর্তির মত বানিয়ে এর পূজা করতে শুরু করবে। মুওয়াত্তা মালিকে أَخْرَجُوا اليهود -এর সাথে হুযুর (ﷺ)-এর এ ওসিয়্যতও বর্ণনা করা হয়েছে। যাহোক, এ সবগুলোই অনুমাননির্ভর। এতদসত্ত্বেও এগুলো হুযুর (ﷺ)-এর বাণী ও তাঁর পথনির্দেশনা।
টীকা: ১। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে বিশেষ করে হেজাযভূমিতে কাগজ খুব কম পাওয়া যেত। এ জন্য যখন কোন কিছু লিখার প্রয়োজন হত, তখন বিভিন্ন জিনিসে তা লিখা হত। এগুলোর মধ্যে একটি জিনিস পশুর কাঁধের হাড্ডিও ছিল। এর উপর এভাবেই লিখা হত, যেভাবে কাঠের অথবা পাথরের স্লেটে লিখা হয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)