মা'আরিফুল হাদীস

গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়

হাদীস নং: ৯৯
গুণাবলী ও ফযীলত অধ্যায়
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহান গুণাবলি ও সুউচ্চ মর্যাদাসমূহ
৯৯. হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কতক সাহাবী বসে আলোচনা করছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি অন্দরমহল থেকে এলেন। তিনি তাঁদের নিকট আসার কালে শুনতে পেলেন তারা পরস্পর আলোচনা করছেন। তাঁদের মধ্যে একজন (হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর উঁচু মর্যাদা বর্ণনাস্বরূপ) বললেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইব্রাহীম (আ) কে নিজের খলীফা বানিয়েছেন। অন্য এক ব্যক্তি বললেন, হযরত মূসা (আ) কে নিজের সাথে কথা বলার সৌভাগ্যদান করেছেন। এর পর অন্য একজন বললেন, হযরত ঈসা (আ)-এর এই মর্যাদা যে, তিনি আল্লাহর কলিমা ও রূহুল্লাহ্। এরপর এক ব্যক্তি বললেন, হযরত আদম (আ) কে আল্লাহ্ তা'আলা নির্বাচিত করেছেন। (তাঁকে সরাসরি নিজের কুদরতী হাতে বানিয়েছেন আর তাঁকে সিজদা করার জন্য ফেরেশেতাকূলকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সাহাবীগণ এসব আলোচনা করছিলেন) হঠাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের নিকট এসে বললেন, আমি তোমাদের কথা-বার্তা ও তোমাদের বিস্ময় প্রকাশ শুনেছি। নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম (আ) আল্লাহর বন্ধু। আর তিনি এরূপই (তাঁকে আল্লাহ্ তা'আলা নিজের খলীল বানিয়েছেন)। আর নিঃসন্দেহে মূসা (আ) নাজীউল্লাহ্ (আল্লাহর সাথে একান্ত কথোপকথনকারী)। আর তিনি এরূপই। নিঃসন্দেহে ঈসা (আ) রূহুল্লাহ ও আল্লাহর কলিমা। আর তিনি এরূপই। নিঃসন্দেহে আদম (আ) সাফীউল্লাহ্ (আল্লাহর নির্বাচিত) আর বাস্তবেও তিনি তাই। তোমাদের জানা উচিত, আমি হাবীবুল্লাহ্ (আল্লাহর মাহবুব)। আর এটা আমি গর্ব হিসাবে বলছি না। কিয়ামতের দিন আমিই لِوَاءُ الْحَمْدِ (প্রশংসার প্রতাকা) উত্তোলনকারী হব। আদম (আ) ছাড়াও সব আম্বিয়া ও মুরসালীন (নবী-রাসূল) আমার সেই পতাকাতলে হবেন। এ কথা আমি গর্ব হিসাবে বলছি না। আর আমি সর্বপ্রথম সেই ব্যক্তি হব, যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সমীপে সুপারিশ করবে। আর সর্বপ্রথম যার সুপারিশ কবুল করা হবে। আর আমি প্রথম সেই ব্যক্তি হব, যে (জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করার জন্যে) এর হুড়কা নাড়া দেবে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা আমার জন্য এটা খুলিয়ে দেবেন। আমাকে জান্নাতে দাখিল করবেন, আমার সাথে মু'মিন ফকিরগণ হবে। এ কথা আমি গর্ব হিসাবে বলছি না। আর আল্লাহর সমীপে পূর্বাপর সবার থেকে আমার মর্যাদা ও সম্মান অধিক হবে। এটাও আমি গর্ব হিসাবে বলছি না। (জামি' তিরমিযী, মুসনাদে দারিমী)
کتاب المناقب والفضائل
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ جَلَسَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ فَخَرَجَ حَتَّى إِذَا دَنَا مِنْهُمْ سَمِعَهُمْ يَتَذَاكَرُونَ قَالَ بَعْضُهُمْ إِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً. وَقَالَ آخَرُ مُوسَى كَلَّمَهُ تَكْلِيمًا وَقَالَ آخَرُ عِيسَى كَلِمَةُ اللَّهِ وَرُوحُهُ. وَقَالَ آخَرُ آدَمُ اصْطَفَاهُ اللَّهُ فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ: قَدْ سَمِعْتُ كَلاَمَكُمْ وَعَجَبَكُمْ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلُ اللَّهِ وَهُوَ كَذَلِكَ وَمُوسَى نَجِيُّ اللَّهِ وَهُوَ كَذَلِكَ وَعِيسَى رُوحُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ وَهُوَ كَذَلِكَ وَآدَمُ اصْطَفَاهُ اللَّهُ وَهُوَ كَذَلِكَ أَلاَ وَأَنَا حَبِيبُ اللَّهِ وَلاَ فَخْرَ وَأَنَا حَامِلُ لِوَاءِ الْحَمْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ يُحَرِّكُ حِلَقَ الْجَنَّةِ فَيَفْتَحُ اللَّهُ لِيَ فَيُدْخِلُنِيهَا وَمَعِي فُقَرَاءُ الْمُؤْمِنِينَ وَلاَ فَخْرَ وَأَنَا أَكْرَمُ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ وَلاَ فَخْرَ. (رواه الترمذى والدارمى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্বভাব মুবারক ও সাধারণ রীতি ছিল বিনয়-নম্রতা প্রকাশের। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে আল্লাহ্ তা'আলার বাণী- وَاَمَّا بِنِعۡمَۃِ رَبِّکَ فَحَدِّثۡ পালনার্থে আল্লাহর সেই বিশেষ নি'আমতরাজি, সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা এবং স্তরেরও উল্লেখ করতেন, যে গুলোর ব্যাপারে তিনি বৈশিষ্ট্যিমণ্ডিত ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা)-এর আলোচ্য হাদীস ও উপরে যে সব হাদীস লিপিবদ্ধ হয়েছে এ সবই তাঁর সেই বর্ণনার ধারাবাহিকতা।

আলোচ্য হাদীসে যে সব সাহাবীর আলোচনা উল্লিখিত হয়েছে তাঁরা হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত আদম (আ) প্রমুখের প্রতি আল্লাহ তা'আলার দানকৃত বিশেষ নি'আমতরাজি সম্বন্ধে অবগত ছিলেন, তাই তাঁরা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা ও কুরআন মজীদ থেকে এ সব তাঁদের জানা ছিল। তবে সম্ভবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার স্তর সম্বন্ধে তাঁদের জানা অপ্রতুল ছিল। এজন্য এটা তাঁদের প্রয়োজন ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এ ব্যাপারে তাঁদেরকে বলবেন। সুতরাং তিনি তাঁদেরকে বললেন এবং এভাবে বললেন যে, হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ) ও হযরত আদম (আ)-এর প্রতি আল্লাহ্ যে সব নি'আমতরাজি এবং তাঁদের যে ফযীলত ও প্রশংসা তাঁরা করছিলেন, প্রথমে তিনি সে সবের সত্যায়ন করেন। এর পর নিজের সম্বন্ধে বলেন, আমার প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার এ বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত নি'আমতরাজি রয়েছে যে, আমাকে মাহবুবের স্থান দেওয়া হয়েছে। আর আমি আল্লাহর হাবীব। (উল্লেখ্য, সাহাবা কিরামকে তিনি একথা বলেছিলেন, তাঁরা জানতেন যে, মাহবুবের স্থান সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবার উর্ধ্বে। এ জন্য তিনি এ বিষয় অধিক সুস্পষ্ট করার প্রয়োজন মনে করেন নি)।

এরপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কতক সেই নি'আমতের উল্লেখ করেন, যেগুলোর প্রকাশ এ জগত সমাপ্তির পর কিয়ামতে হবে। সে গুলোর মধ্যে لِوَاءُ الْحَمْدِ (প্রশংসার পতাকা) হাতে আসা। সর্ব প্রথম সুপারিশকারী ও সর্ব প্রথম সুপারিশ গৃহীত হওয়ার বিষয় উল্লিখিত হাদীসসমূহেও এসেছে। এরপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার দু'টি বিশেষ নি'আমতের উল্লেখ করেন। ১. জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করাবার জন্যে সর্ব প্রথম আমিই এর হুড়কাগুলো নাড়া দেব। (যে ভাবে কোন ঘরের দরজা খুলবার জন্যে করাঘাত করা হয়) আল্লাহ্ তা'আলা তৎক্ষণাত দরজা খুলিয়ে দেবেন ও আমাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। আর আমার সাথে মু'মিনদের ফকিরগণ হবে। তাদেরকেও আমার সাথে জান্নাতে দাখিল করা হবে। (এসব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহবুবের দরজায় আসীন হওয়ার বাহ্যিক বিষয় হবে।)

এ ধারাবাহিকতায় তিনি শেষ কথা এই বলেন যে, وَأَنَا أَكْرَمُ الْأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ عَلَى اللَّهِ অর্থাৎ এটাও আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ নি'আমত যে, তাঁর পূর্বাপর সবার থেকে অধিক সম্মান ও মর্যাদা আমারই। আর মর্যাদার যে স্তর আমাকে দেওয়া হয়েছে তা পূর্বাপর কাউকেই দেওয়া হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এই বাণীসমূহে আল্লাহ্ তা'আলার যে সব নি'আমতরাজির উল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রতিটির সাথে এটাও বলেছেন وَلَا فَخْرَ যে ভাবে বলা হয়েছে এর অর্থ এটাই যে, আল্লাহ্ তা'আলার এসব বিশেষ নি'আমতের উল্লেখ আমি গর্ব ও নিজের বড়ত্ব প্রকাশের জন্য করছি না, বরং কেবল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে নি'আমতের আলোচনা ও শোকর আদায়ের জন্যে এবং তোমাদেরকে জ্ঞাত করার জন্য করছি। যেন তোমরাও সেই মহান আল্লাহর শোকর আদায় কর। কেননা, এসব নি'আমত তোমাদের জন্য সৌভাগ্য ও কল্যাণের ওসীলা হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান