মা'আরিফুল হাদীস

কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়

হাদীস নং: ৯৩
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৯৩. হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে 'আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) যমীনে অবতরণ করবেন। এখানে এসে তিনি বিয়ে করবেন। তাঁর সন্তানাদিও হবে এবং তিনি পঁয়তাল্লিশ বছর বসবাস করবেন। এর পর তাঁর ইন্তিকাল হবে। ইন্তিকালের পর তাঁকে আমার সাথে (সেই স্থানে যেখানে আমাকে দাফন করা হবে) দাফন করা হবে। এরপর যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন আমি ও হযরত ঈসা ইবনে মারয়াম, আবু বকর ও উমরের মধ্যবর্তী একই কবর থেকে উঠব। (ইবনে জাওযী কিতাবুল ওফা)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَنْزِلُ عِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ اِلَى الْاَرْضِ فَيَتَزَوَّجُ وَيُوْلَدُ لَهُ وَيَمْكُثُ خَمْسًا وَاَرْبَعِيْنَ سَنَةً ثُمَّ يَمُوْتُ فَيَدْفَنُ مَعِىَ فِىْ قَبْرِىْ فَأَقُوْمُ أَنَا وَعِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ فِىْ قَبْرٍ وَاحِدٍ بَيْنَ أَبِىْ بَكْرٍ وَعُمَرَ. (رواه ابن الجوزى فى كتاب الوفا)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এটা সর্বজন সমর্থিত কথা যে, হযরত ঈসা (আ) যখন আমাদের এ জগতে ছিলেন, তখন তিনি এখানে গোটা জীবন একাকী কাটিয়েছেন। বিয়ে করেন নি। অথচ বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজনাবলির মধ্যে গণ্য। এতে রয়েছে বিরাট হিকমাত। এজন্য যতদূর জানা যায়, তাঁর পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলার সব নবী-রাসূল এবং তাঁর পর আগমনকারী খাতিমুন্নাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিয়ে করেছেন। ইবনুল জাওযীর কিতাবুল্ ওফা-র এই বর্ণনা থেকে জানা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শেষ যুগে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের সংবাদ দিয়ে এটাও বলেছেন যে, অবতরণের পর এখানের জীবনে তিনি বিয়ে করবেন এবং সন্তানাদিও হবে। পূর্বে এ বর্ণনায় তাঁর অবস্থানকাল পঁয়তাল্লিশ বছর বর্ণনা করা হয়েছে। আর হযরত আবু হুরাইরা (রা)-এর উপরোক্ত বর্ণনায় (যা সুনানে আবু দাউদের বরাতে উপরে উদ্ধৃত করা হয়েছে) অবতরণের পর তাঁর অবস্থান চল্লিশ বলা হয়েছে। অন্যান্য বর্ণনায়ও তাঁর অবস্থানকাল চল্লিশ বছরই বলা হয়েছে। কতক ভাষ্যকার এর কারণ এই বলেছেন যে, চল্লিশ সংক্রান্ত বর্ণনায় ঊর্ধ্বের সংখ্যা বিলুপ্ত করা হয়েছে। আর আরবী পরিভাষায় সাধারণত এরূপ হয়ে থাকে যে, ভাঙ্গা সংখ্যা বিলুপ্ত করা হয়। আল্লাহই ভাল জানেন।

বর্ণনার শেষাংশে এটাও রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ) এখানে ইন্তিকাল করবেন। আর যেখানে আমাকে কবরস্থ করা হবে, সেখানে তাঁকেও কবরস্থ করা হবে। আর যখন কিয়ামত কায়িম হবে তখন আমি ও তিনি একই সাথে উঠব। আবূ বকর এবং উমরও ডানে বামে আমাদের সাথে হবে। এই বর্ণনা থেকে জানা গেল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর ভবিষ্যতের যে সব বিষয় প্রতিভাত করা হয়েছিল, যা তিনি উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে এটাও ছিল যে, যে স্থানে আমাকে কবরস্থ করা হবে সেখানে আমার পর আমার উভয় বিশেষ সাথী আবু বকর ও উমরকে কবরস্থ করা হবে। আর শেষ যুগে যখনই ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) অবতরণ করবেন এবং এখানে ইন্তিকাল করবেন তখন তাঁকেও সেই স্থানে আমার সাথে কবরস্থ করা হবে। আর যখন কিয়ামত কায়িম হবে তখন আমরা উভয় একই সাথে উঠব। আবূ বকর ও উমর আমাদের ডানে বামে হবে।

জানা আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তিকাল উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর হুজরা শরীফে হয়েছিল। আর তাঁর এক বাণী অনুযায়ী সেখানেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়। এরপর যখন সিদ্দীকে আকবর (রা)-এর ইন্তিকাল হল, তাঁকেও সেখানে সোজাসুজি কবরস্থ করা হয়। তারপর যখন হযরত উমর (রা) কে শহীদ করা হল, তখন হযরত 'আইশা (রা)-এর সম্মতি ও অনুমতিক্রমে তাঁকেও সেখানে সিদ্দীকে আকবরের বরাবর কবরস্থ করা হয়। বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সেই প্রকোষ্ঠে একটি কবরের স্থান তাঁর পরও বাকি রয়েছে।

এরপর জ্যেষ্ঠ্য দোহিত্র হযরত হাসান ইবনে আলী (রা)-এর ইন্তিকাল হল। লোকজন তাঁকে তথায় কবরস্থ করতে চাইলেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত সিদ্দীকা (রা) সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি দান করেন। তবে তখন উমাইয়া শাসনের যে শাসক পবিত্র মদীনায় ছিলেন তিনি বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। (সম্ভবত এ কারণে যে, হযরত উসমান (রা) কে সেখানে কবরস্থ করা হয়নি।) এরপর যখন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা) ইন্তিকাল করেন (যিনি 'আশারা-মুবাশশারার মধ্যে ছিলেন) তখনও হযরত সিদ্দীকা (রা) তাঁকে তথায় কবরস্থ করার অনুমতি দিলেন। কিন্তু তাঁকেও সেখানে কবাস্থ করা যায়নি।

এরপর স্বয়ং উম্মুল মু'মিনীন হযরত সিদ্দীকা (রা)-এর মৃত্যুকালীন রোগের সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনাকে কি সেখানে কবরস্থ করা হবে? তিনি বললেন, বাকী' কবরস্থানে যেখানে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্যান্য পবিত্র বিবিগণ কবরস্থ হয়েছেন আমাকেও তাঁদের সাথে বাকী'তেই কবরস্থ করা হবে। সুতরাং তাঁকেও সেখানেই কবরস্থ কর হয়। মোটকথা, হযরত উমর (রা)-এর পর পবিত্র রওযায় এক কবরের যে স্থান ছিল তা শূন্যই রয়েছে। আর উপরে উল্লিখিত বর্ণনানুযায়ী হযরত ঈসা (আ) অবতণের পর যখন ইন্তিকাল করবেন, তখন তিনি সেখানেই কবরস্থ হবেন।

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রা) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রসিদ্ধ সাহাবী। প্রথমে তিনি ইয়াহুদী ছিলেন। তাওরাত ও প্রাচীন আসমানী গ্রন্থ সমূহের অনেক বড় আলিম ছিলেন। ইমাম তিরমিযী স্বীয় সনদসহ জামি' তিরমিযীতে তাঁর এ কথা বর্ণনা করেছেন যা মিশকাত সংকলকও তিরমিযীরই বরাতে স্বীয় কিতাবে উদ্ধৃত করেছেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ৯৩ | মুসলিম বাংলা