মা'আরিফুল হাদীস

কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়

হাদীস নং: ২৮
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়
পার্থিব বিষয়ে হুযুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যক্তিগত অভিমতের স্তর

আল্লাহর নবী, নবী ও রাসূল হিসাবে যে নিদের্শই দিয়েছেন তা অপরিহার্য আনুগত্যের বিষয়। এর সম্পর্ক আল্লাহর অধিকারের সাথে হোক অথবা বান্দার অধিকারের সাথে, ইবাদতের সাথে, লেন-দেনের সাথে, চরিত্রের সাথে হোক কিংবা সামাজিকতার সাথে অথবা জীবনের কোন শাখার সাথে হোক। তবে আল্লাহর নবী কখনো নিছক কোন পার্থিব বিষয়ে স্বীয় ব্যক্তিগত অভিমতের পরামর্শ দিয়ে থাকতেন। এ ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, তা উম্মতের জন্য অবশ্য আনুগত্যযোগ্য নয়। বরং এটাও প্রয়োজন নয় যে, তা সর্বদা সঠিক হবে। তাতে ভুলও হতে পারে। নিম্নের হাদীসের দাবি এটাই।
২৮. হযরত রাফি' ইবনে খাদীজ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (হিজরত করে) মদীনা এলেন। তখন তিনি দেখলেন, মদীনাবাসী খেজুর বৃক্ষের ওপর তা'বীর (পুংকেশর গর্ভকেশরে স্থাপন-অনুবাদক) এর কাজ করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এটা কি করছ? (আর কি জন্য করছ?) তারা নিবেদন করলেন, এটা আমরা পূর্ব থেকে করে আসছি। তিনি বললেন, সম্ভবত তোমরা এটা না করলে উত্তম হবে। তখন তারা তা ছেড়ে দেন। সুতরাং ফলন কম হল। তাঁরা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট একথা উল্লেখ করলেন। তখন তিনি বললেন, আমি (স্বীয় প্রকৃতি হিসেবে) কেবল একজন মানুষ। যখন আমি তোমাদেরকে দীনের ব্যাপারে কোন বিষয়ের নির্দেশ দেই, তখন তা অবশ্য কর্তব্য ধরে নাও (আর এর ওপর আমল কর)। আর যখন আমি আমার ব্যক্তিগত অভিমতে কোন বিষয়ে তোমাদেরকে বলি তবে আমি কেবল একজন মানুষ। (মুসলিম)
کتاب الاعتصام بالکتاب والسنۃ
عَنْ رَافِعِ بْنِ خَدِيجٍ قَالَ قَدِمَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَهُمْ يَأْبُرُونَ النَّخْلَ فَقَالَ: مَا تَصْنَعُونَ. قَالُوا كُنَّا نَصْنَعُهُ قَالَ: لَعَلَّكُمْ لَوْ لَمْ تَفْعَلُوا كَانَ خَيْرًا. فَتَرَكُوهُ فَنَقَصَتْ فَذَكَرُوا ذَلِكَ لَهُ فَقَالَ: إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْيٍ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ. (رواه مسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

মদীনা তাইয়্যিবা খেজুর ফলনের বিশেষ অঞ্চল ছিল। আর এখনও এরকমই আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হিজরত করে সেখানে পৌঁছালেন তখন তিনি দেখলেন, সেখানের লোকজন খেজুর গাছগুলোর মধ্যে একটি গাছকে নর ও অন্য গাছটিকে মাদা নির্ধারণ করে সেগুলোর ফুলের কলিতে এক বিশেষ পদ্ধতিতে সংযোগ স্থাপন করছে। যাকে তা'বীর বলা হত। যেহেতু মক্কা মুকাররমা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে খেজুর ফলত না, এজন্য এ তা'বীরের কাজ তাঁর জন্য একটি নতুন বিষয় ছিল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা-করলেন, তোমরা এটা কী করছ এবং কি জন্য করছ? তারা এর কোন বিশেষ রহস্য ও উপকারিতা বলতে পারেননি। তারা কেবল এই বলেন যে, প্রথম থেকেই আমরা তা করে আসছি। অর্থাৎ আমাদের বাপ-দাদাকে করতে দেখেছি এজন্য আমরাও করছি।

এটাকে তিনি জাহিলী যুগের অন্যান্য বহু অনর্থক বিষয়ের ন্যায় এক অতিরিক্ত ও ফায়দাহীন কাজ মনে করলেন এবং বললেন, সম্ভবত যদি এটা না কর ভাল হবে। তারা তাঁর এ কথা শুনে তা'বীরের কাজ ছেড়ে দিলেন। কিন্তু ফল দাঁড়ালো যে, খেজুরের ফলন কমে গেল। তখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এটা উল্লেখ করা হল। তিনি বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرِّ مِثْلُكُمُ الخ (অর্থাৎ আপন সত্তাগতভাবে আমি একজন মানুষ) আমার সব কথা দীনী হিদায়াত ও ওহীর ভিত্তিতে নয় বরং একজন মানুষ হিসাবেও কথা বলি। তবে যখন আমি নবী ও রাসূল হিসাবে দীনের লাইনে কোন নির্দেশ দেই, তা অবশ্য পালনীয়। আর যখন আমি কোন পার্থিব ব্যাপারে নিজের ব্যক্তিগত অভিমতে কিছু বলি, তবে এর মর্যাদা একজন মানুষের অভিমত। এতে ভুলও হতে পারে। আর তা'বীরের ব্যাপারে যে কথা আমি বলেছি, তা আমার ব্যক্তিগত ধারণা ও আমার ব্যক্তিগত অভিমত ছিল।

ঘটনা এই যে, বহু জিনিসে আল্লাহ্ তা'আলা আশ্চর্যজনক ও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যাবলি রেখেছেন, যার পূর্ণ জ্ঞানও কেবল তাঁরই রয়েছে। তা'বীরের কাজে আল্লাহ্ তা'আলা বৈশিষ্ট্য রেখছেন যে, এর দ্বারা ফলন বেশি হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছু বলা হয়নি। আর তাঁর এটা জানার প্রয়োজনও ছিল না। তিনি উদ্যান কাজের রহস্য বলার জন্য আসেননি। বরং মনুষ্য জগতের হিদায়াত এবং এ জগতকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। আর এজন্য যে ইলমের প্রয়োজন ছিল তা তাঁকে পরিপূর্ণ দান করা হয়েছিল।

আলোচ্য হাদীস থেকে এটাও জানা গেল যে, এ দুনিয়ার প্রত্যেক বিষয় ও প্রত্যেক জিনিসের ইলম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছিল, এ ধারণা ও আকীদা পোষণ করা ভুল। যারা এরূপ আকীদা পোষণ করে তারা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উচ্চাসন সম্পর্কে একেবারে অপরিচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ২৮ | মুসলিম বাংলা